📄 মুসলিম উম্মাহে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ফিতনা
আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু ওই সকল মনীষীদের একজন, যারা ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন। উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণের পর লোকেরা তার নিকট আবেদন করল—আপনি মাঠে নামেন! আমরা আপনার হাতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য বাইআত নেবো; কিন্তু তিনি মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে। তবুও তিনি নিজ অবস্থানে অনড় ছিলেন।
একবার গণ্ডগোলের সময় লোকজন এসে তাকে বলল, আপনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন! সকলেই আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট থাকবে। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যদি প্রাচ্যের কেউ বিরোধিতা করে? সকলে একবাক্যে বলে উঠল—তবে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সমগ্র মুসলিম জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার খাতিরে একজনকে হত্যা করা হলে তাতে কী ক্ষতি হবে? উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! যদি বিশ্বের সকল মুসলমানের হাতে বর্ষার হাতল থাকে আর আমার হাতে থাকে ধারালো অংশ, তবুও আমি পুরো পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে কোনো মুসলিম হত্যা করা পছন্দ করবো না。
সাহাবাযুগে কঠিন দলাদলির সময় ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু দুই দলের সঙ্গে পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন। কোনো পক্ষের সঙ্গেই তিনি গভীরভাবে মেশেন নি। আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়ের রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইবনু উমার ইবনু জুবায়ের ও তার প্রতিপক্ষ উভয়ের পেছনে নামাজ পড়তেন। এ প্রসঙ্গে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল—আপনি উভয় দলের পেছনে নামাজ পড়ছেন, অথচ এরা একে অপরকে হত্যা করছে? এর উত্তর তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যখন কেউ حَيَّ عَلَى الصَّلاة [নামাজের দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। আর যদি কেউ حَيَّ عَلَى الْفَلَاح [সফলতার দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, তবে আমি তার আহ্বানেও সাড়া দিই; কিন্তু কেউ حَيَّ عَلَى قَتْلِ أَخِيْكُمُ الْمُسْلِم ]এসো, তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের রক্ত ঝরাতে]-বলে ডাক দিলে আমি তার ডাকে সাড়া দিই না。
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে এসব দলাদলির সময় কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করতে বলল এবং কুরআনে কারিমে বর্ণিত জিহাদের বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। উত্তরে তিনি বললেন—
إنا قتلنا حتى كان الدين لله ولم تكن فتنة، وإنكم قاتلتم حتى كان الدين لغير الله، وحتى كانت فتنة.
আমরা জিহাদ করেছি ফিতনা খতম করে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। আর তোমরা জিহাদ করছ ফিতনা সৃষ্টি করে অন্য ধর্ম বিজয় লাভ করার উদ্দেশ্যে。
টিকাঃ
১৭৪ তবাকাতে ইবনে সাদ: ৪/১৫১
১৭৫ প্রাগুক্ত: পৃ.১৬৯-১৭০
১৭৬ প্রাগুক্ত: পৃ.১৫১
আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু ওই সকল মনীষীদের একজন, যারা ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন। উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণের পর লোকেরা তার নিকট আবেদন করল—আপনি মাঠে নামেন! আমরা আপনার হাতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য বাইআত নেবো; কিন্তু তিনি মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে। তবুও তিনি নিজ অবস্থানে অনড় ছিলেন।
একবার গণ্ডগোলের সময় লোকজন এসে তাকে বলল, আপনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন! সকলেই আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট থাকবে। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যদি প্রাচ্যের কেউ বিরোধিতা করে? সকলে একবাক্যে বলে উঠল—তবে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সমগ্র মুসলিম জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার খাতিরে একজনকে হত্যা করা হলে তাতে কী ক্ষতি হবে? উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! যদি বিশ্বের সকল মুসলমানের হাতে বর্ষার হাতল থাকে আর আমার হাতে থাকে ধারালো অংশ, তবুও আমি পুরো পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে কোনো মুসলিম হত্যা করা পছন্দ করবো না。
সাহাবাযুগে কঠিন দলাদলির সময় ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু দুই দলের সঙ্গে পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন। কোনো পক্ষের সঙ্গেই তিনি গভীরভাবে মেশেন নি। আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়ের রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইবনু উমার ইবনু জুবায়ের ও তার প্রতিপক্ষ উভয়ের পেছনে নামাজ পড়তেন। এ প্রসঙ্গে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল—আপনি উভয় দলের পেছনে নামাজ পড়ছেন, অথচ এরা একে অপরকে হত্যা করছে? এর উত্তর তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যখন কেউ حَيَّ عَلَى الصَّلاة [নামাজের দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। আর যদি কেউ حَيَّ عَلَى الْفَلَاح [সফলতার দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, তবে আমি তার আহ্বানেও সাড়া দিই; কিন্তু কেউ حَيَّ عَلَى قَتْلِ أَخِيْكُمُ الْمُسْلِم ]এসো, তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের রক্ত ঝরাতে]-বলে ডাক দিলে আমি তার ডাকে সাড়া দিই না。
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে এসব দলাদলির সময় কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করতে বলল এবং কুরআনে কারিমে বর্ণিত জিহাদের বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। উত্তরে তিনি বললেন—
إنا قتلنا حتى كان الدين لله ولم تكن فتنة، وإنكم قاتلتم حتى كان الدين لغير الله، وحتى كانت فتنة.
আমরা জিহাদ করেছি ফিতনা খতম করে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। আর তোমরা জিহাদ করছ ফিতনা সৃষ্টি করে অন্য ধর্ম বিজয় লাভ করার উদ্দেশ্যে。
টিকাঃ
১৭৪ তবাকাতে ইবনে সাদ: ৪/১৫১
১৭৫ প্রাগুক্ত: পৃ.১৬৯-১৭০
১৭৬ প্রাগুক্ত: পৃ.১৫১
📄 একটি চমৎকার উপমা
নবীজির ইন্তেকাল পরবর্তী দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার অবস্থানের যথার্থতা একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে প্রমাণিত করেছেন। তিনি বলেন—
إنما كان مثلنا في هذه الفتنة كمثل قوم كانوا يسيرون على جادة يعرفونها، فبينماهم كذلك إذ غشيتهم سحابة وظلمة، فأخذ بعضنا يمينا وبعضنا شمالا، فأخطأنا الطريق وأقمنا حيث أدركنا ذلك حتى تجلى عنا ذلك حتى أبصرنا الطريق الأول فعرفناه فأخذنا فيه إنما هؤلاء فتيان قريش يتقاتلون على هذا السلطان وعلى هذا لدنيا، والله ما أبالى ألّا يكون لي ما يقتل فيه بعضهم بعضا بنعلي.
এই ফিতনার যুগে আমার অবস্থানের উপমা হলো এমন কিছু লোকের মতো, যারা একটি চেনা-জানা পথ ধরে চলছে। হঠাৎ তারা ঘুটঘুটে অন্ধকার ও প্রচণ্ড ঝড়ের সম্মুখীন হলো। এতে সকলেই ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে লাগল; কিন্তু আমি আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ পর ঝড় থেমে গিয়ে আলো প্রস্ফুটিত হলো। পথ-ঘাট স্পষ্ট হয়ে উঠল। যে স্থানে আমাদের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে আবার পূর্বের পথ ধরে আমি চলতে শুরু করলাম। যে পার্থিব পদমর্যাদার লোভে কুরাইশ যুবকরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছে, খোদার কসম! আমি তা আমার একটি জুতার বিনিময়েও গ্রহণ করতে রাজি নই!
নবীজির ইন্তেকাল পরবর্তী দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার অবস্থানের যথার্থতা একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে প্রমাণিত করেছেন। তিনি বলেন—
إنما كان مثلنا في هذه الفتنة كمثل قوم كانوا يسيرون على جادة يعرفونها، فبينماهم كذلك إذ غشيتهم سحابة وظلمة، فأخذ بعضنا يمينا وبعضنا شمالا، فأخطأنا الطريق وأقمنا حيث أدركنا ذلك حتى تجلى عنا ذلك حتى أبصرنا الطريق الأول فعرفناه فأخذنا فيه إنما هؤلاء فتيان قريش يتقاتلون على هذا السلطان وعلى هذا لدنيا، والله ما أبالى ألّا يكون لي ما يقتل فيه بعضهم بعضا بنعلي.
এই ফিতনার যুগে আমার অবস্থানের উপমা হলো এমন কিছু লোকের মতো, যারা একটি চেনা-জানা পথ ধরে চলছে। হঠাৎ তারা ঘুটঘুটে অন্ধকার ও প্রচণ্ড ঝড়ের সম্মুখীন হলো। এতে সকলেই ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে লাগল; কিন্তু আমি আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ পর ঝড় থেমে গিয়ে আলো প্রস্ফুটিত হলো। পথ-ঘাট স্পষ্ট হয়ে উঠল। যে স্থানে আমাদের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে আবার পূর্বের পথ ধরে আমি চলতে শুরু করলাম। যে পার্থিব পদমর্যাদার লোভে কুরাইশ যুবকরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছে, খোদার কসম! আমি তা আমার একটি জুতার বিনিময়েও গ্রহণ করতে রাজি নই!
📄 ইজহারুল হক গ্রন্থ সম্পর্কে জনৈক বিধর্মীর মূল্যায়ন
মাওলানা রহমাতুল্লাহ কিরানুবি রহ.-এর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ইজহারুল হক-এর উর্দু অনুবাদ বাইবেল সে কুরআন তক (বাইবেল হতে কুরআন পর্যন্ত) অধমের টীকাসহ ইতোপূর্বে জনগণের খেদমতে প্রকাশিত হয়ে এসেছে। গ্রন্থটি সম্পর্কে জনৈক ইংরেজি সাংবাদিকের একটি মন্তব্য সকলের মুখে ঝঙ্কার তুলেছে। মন্তব্যটি হলো— যদি এ গ্রন্থটি ক্রমশ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তবে খ্রিস্টধর্মের উন্নতি-অগ্রগতির চাকা অচল হয়ে যাবে।
আমি এ মন্তব্যের উদ্ধৃতি খোঁজ করতে লাগলাম; কিন্তু অনেক খোজাখুঁজির পরও কোনো উদ্ধৃতি পেলাম না। আমি উক্ত মন্তব্যটি মাদরাসায়ে সাওলাতিয়া’র মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ সালিম সাহেব কর্তৃক রচিত এক মুজাহিদ মি’মার গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছি। তিনি তাঁর কিতাবে উল্লিখিত উক্তিটিকে লন্ডনের টাইমস পত্রিকার বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন— আলিগড় জেলার প্রধান প্রশাসক মরহুম হাজি নওয়াব ইসমাইল খান সাহেব মক্কা শরিফে মাওলানা রহমাতুল্লাহ সাহেবকে টাইমস পত্রিকার উল্লিখিত মন্তব্যের কাটিংটা বিশেষভাবে দিয়েছিলেন。
এ সূত্রের বরাত দিয়েই মন্তব্যটি আমি আমার বিভিন্ন লিখনীতে উল্লেখ করতাম; কিন্তু কিছুদিন পূর্বে জনাব ডাক্তার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ সাহেব মন্তব্যটি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজে বের করার জন্য টাইমস পত্রিকার অডিটর সাহেবের নিকট জিজ্ঞাসা করেন। অডিটর সাহেব কেবল নিজের অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন নি; বরং এ-ও বলেছেন যে, এখানে সব প্রবন্ধের সূচি দেওয়া আছে। অতএব, উক্ত মন্তব্যটি এখানে প্রকাশিত হলে অবশ্যই সূচিতে উল্লেখ থাকত।
এ ঘটনার পর থেকে আমি মন্তব্যটি বর্ণনা করা পরিহার করেছি। গত মাসে আমার এক শুভাকাঙ্খী মুহতারাম জনাব মুহাম্মদ হাসান আসকরি সাহেব আমাকে একটি সংকলন প্রদান করেছেন। যা দেখে আমার প্রবল ধারণা হলো—এটা সেই মন্তব্য প্রতিবেদন, যা এতদিন টাইমস পত্রিকার উদ্ধৃতিতে লোকমুখে প্রচার হয়ে আসছে। বইটি মূলত বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ‘গারসিন দেতাসি’র কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন। তাতে তিনি লিখেছেন—
ক্যামব্রিজের ধর্মবিভাগের শিক্ষক পাদ্রি উইলিয়াম সাহেব বলেছেন, প্রাচ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হচ্ছে। কনস্টান্টিনোপলে যে ধর্মীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে মুসলিমরা এমন যোগ্যতা প্রদর্শন করেছে, যা দেখে তৎক্ষণাৎ অসংখ্য খ্রিস্টান নিজ ধর্ম ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল!
এই অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে মুসলিম কর্তৃক রচিত সদ্য প্রকাশিত একটি আরবি অনবদ্য গ্রন্থের আলোচনা উঠল। যার জবাব আজ পর্যন্ত কোনো খ্রিস্টান দিতে পাওেরনি। যদি এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে মুসলিমদের উন্নতি-অগ্রগতির ধারা রোখা যাবে না।
স্মর্তব্য—উক্ত প্রবন্ধ আর ইজহারুল হক গ্রন্থের প্রকাশকাল একই সময়। অতএব, প্রবন্ধে উল্লিখিত আরবি কিতাব বলতে ইজহারুল হক-কেই বোঝানো হয়েছে—তা বলার অপেক্ষা রাখে না。
টিকাঃ
১৭৭ এক মুজাহিদ মি’মার: পৃ.২৬
১৭৮ মাকালাতে গারসিন দেতাসি : প্রকাশকাল : ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ
মাওলানা রহমাতুল্লাহ কিরানুবি রহ.-এর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ইজহারুল হক-এর উর্দু অনুবাদ বাইবেল সে কুরআন তক (বাইবেল হতে কুরআন পর্যন্ত) অধমের টীকাসহ ইতোপূর্বে জনগণের খেদমতে প্রকাশিত হয়ে এসেছে। গ্রন্থটি সম্পর্কে জনৈক ইংরেজি সাংবাদিকের একটি মন্তব্য সকলের মুখে ঝঙ্কার তুলেছে। মন্তব্যটি হলো— যদি এ গ্রন্থটি ক্রমশ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তবে খ্রিস্টধর্মের উন্নতি-অগ্রগতির চাকা অচল হয়ে যাবে।
আমি এ মন্তব্যের উদ্ধৃতি খোঁজ করতে লাগলাম; কিন্তু অনেক খোজাখুঁজির পরও কোনো উদ্ধৃতি পেলাম না। আমি উক্ত মন্তব্যটি মাদরাসায়ে সাওলাতিয়া’র মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ সালিম সাহেব কর্তৃক রচিত এক মুজাহিদ মি’মার গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছি। তিনি তাঁর কিতাবে উল্লিখিত উক্তিটিকে লন্ডনের টাইমস পত্রিকার বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন— আলিগড় জেলার প্রধান প্রশাসক মরহুম হাজি নওয়াব ইসমাইল খান সাহেব মক্কা শরিফে মাওলানা রহমাতুল্লাহ সাহেবকে টাইমস পত্রিকার উল্লিখিত মন্তব্যের কাটিংটা বিশেষভাবে দিয়েছিলেন。
এ সূত্রের বরাত দিয়েই মন্তব্যটি আমি আমার বিভিন্ন লিখনীতে উল্লেখ করতাম; কিন্তু কিছুদিন পূর্বে জনাব ডাক্তার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ সাহেব মন্তব্যটি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজে বের করার জন্য টাইমস পত্রিকার অডিটর সাহেবের নিকট জিজ্ঞাসা করেন। অডিটর সাহেব কেবল নিজের অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন নি; বরং এ-ও বলেছেন যে, এখানে সব প্রবন্ধের সূচি দেওয়া আছে। অতএব, উক্ত মন্তব্যটি এখানে প্রকাশিত হলে অবশ্যই সূচিতে উল্লেখ থাকত।
এ ঘটনার পর থেকে আমি মন্তব্যটি বর্ণনা করা পরিহার করেছি। গত মাসে আমার এক শুভাকাঙ্খী মুহতারাম জনাব মুহাম্মদ হাসান আসকরি সাহেব আমাকে একটি সংকলন প্রদান করেছেন। যা দেখে আমার প্রবল ধারণা হলো—এটা সেই মন্তব্য প্রতিবেদন, যা এতদিন টাইমস পত্রিকার উদ্ধৃতিতে লোকমুখে প্রচার হয়ে আসছে। বইটি মূলত বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ‘গারসিন দেতাসি’র কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন। তাতে তিনি লিখেছেন—
ক্যামব্রিজের ধর্মবিভাগের শিক্ষক পাদ্রি উইলিয়াম সাহেব বলেছেন, প্রাচ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হচ্ছে। কনস্টান্টিনোপলে যে ধর্মীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে মুসলিমরা এমন যোগ্যতা প্রদর্শন করেছে, যা দেখে তৎক্ষণাৎ অসংখ্য খ্রিস্টান নিজ ধর্ম ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল!
এই অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে মুসলিম কর্তৃক রচিত সদ্য প্রকাশিত একটি আরবি অনবদ্য গ্রন্থের আলোচনা উঠল। যার জবাব আজ পর্যন্ত কোনো খ্রিস্টান দিতে পাওেরনি। যদি এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে মুসলিমদের উন্নতি-অগ্রগতির ধারা রোখা যাবে না।
স্মর্তব্য—উক্ত প্রবন্ধ আর ইজহারুল হক গ্রন্থের প্রকাশকাল একই সময়। অতএব, প্রবন্ধে উল্লিখিত আরবি কিতাব বলতে ইজহারুল হক-কেই বোঝানো হয়েছে—তা বলার অপেক্ষা রাখে না。
টিকাঃ
১৭৭ এক মুজাহিদ মি’মার: পৃ.২৬
১৭৮ মাকালাতে গারসিন দেতাসি : প্রকাশকাল : ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ
📄 মরা লাশের অসিয়ত
সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু খাজরাজ গোত্রের একজন বিখ্যাত আনসারি সাহাবি। বক্তা হিসেবে তার খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। প্রিয় নবীজি সা.-এর ওহি লেখার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সুনানে তিরমিজিতে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সা. তার সম্পর্কে ইরশাদ করেন-
نِعْمَ الرَّجُلُ ثَابِتُ بْنُ قَيْسِ بْن شَمَّاسٍ.
সাবেত ইবনু কায়েস ইবনু সাম্মাস অত্যন্ত ভালো মানুষ।
আতা খোরাসানি রহ. বলেন—আমি মদিনা শরিফে এসে এমন কাউকে খুঁজছিলাম, যিনি আমাকে সাবেত ইবনু কায়েসের জীবনাদর্শ শোনাতে পারেন। লোকজন আমাকে এ ব্যাপারে তার মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলল। আমি তার কাছে গিয়ে সাবেত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। তার একটি হলো—তিনি বলেন, আমি আমার বাবার কাছে শুনেছি—যখন নবীজির ওপর কুরআনে কারিমের এ আয়াত নাজিল হলো—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ.
নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না。
তখন সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর মনে ভীতি সঞ্চার হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘরের এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন। অমনি তার অজান্তে দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। নবীজি বিষয়টি জানতে পেরে তাকে ডেকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি সৌন্দর্য ও চাকচিক্য অত্যন্ত পছন্দ করি। আবার আমি কওমের সরদারও। (তাই আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি উক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই কি না?) এ কথা শুনে নবীজি বললেন—
إِنَّكَ لَسْتَ مِنْهُمْ، بَلْ تَعِيْشُ بِخَيْرٍ وَتَمُوتُ بِخَيْرٍ وَيُدْخِلُكَ اللهُ الْجَنَّةَ.
নিশ্চয়ই তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। বরং আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম জীবন ও উত্তম মরণ দান করবেন। অধিকন্তু জান্নাতে প্রবেশ করাবেন。
নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল হওয়ার সময়ও হুবহু একই ঘটনার অবতারণা হয়—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর নিজেদের আওয়াজকে উঁচু করো না আর তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলো না。
এ ক্ষেত্রেও সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্রিয় নবীজি তাকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার স্বর কিছুটা উঁচু। এজন্য আমি শঙ্কিত। আমার উচ্চস্বরের দরুন না জানি সকল আমল বরবাদ হয়ে যায়।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর কথা শুনে নবীজি ইরশাদ করেন—
إِنَّكَ لَسْتَ مِنْهُمْ، بَلْ تَعِيْشُ حَمِيدًا وَتُقْتَلُ شَهِيدًا وَيُدْخِلَكَ اللَّهُ الْجَنَّةَ.
নিঃসন্দেহে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। বরং তুমি প্রশংসিত জীবন-যাপন করবে, শহিদি মৃত্যু লাভ করবে এবং আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাত দান করবেন।
নবীজির তিরোধানের পর আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে মুসাইলামা কাজ্জাবের ফিতনার আবির্ভাব ঘটল। মুসলিমদের একটি লশকর ইয়ামাহ নামক স্থানে তার বিরুদ্ধে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু ও এ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে শত্রু বাহিনীর অপ্রতিরুদ্ধ হামলা মোকাবেলা করতে না পেরে মুসলিম সেনাদল তিন তিন বার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাবেত ও তার সঙ্গী সালেম রাজিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে একে অপরকে বলতে লাগলেন—আমরা তো নবীজির সঙ্গে এরূপ যুদ্ধ কখনো করি নি। অতঃপর তারা উভয়ে একটি গর্ত খনন করে তাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। যাতে পেছনে হটার কোনো সুযোগ না থাকে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস বাকি থাকা পর্যন্ত তারা সে গর্তে দৃঢ় পদ থেকে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। একপর্যায়ে দুজনেই জীবনদাতার সমীপে জীবন সঁপে দিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা ঘটনা বর্ণনা করার পর বললেন, সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পরদিন এক ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি স্বপ্নদ্রষ্টাকে বলছেন, গতকাল শহিদ হওয়ার পর আমার লাশের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছিল। আমার বুকে ছিল একটি মূল্যবান বর্ম। লোকটি সেটি খুলে নিয়ে গেছে। সে বর্তমানে সৈন্যবাহিনীর তাঁবুর শেষ প্রান্তে অমুক স্থানে রয়েছে। তার সামনে বাঁধা আছে একটি মোটা তাগড়া ঘোড়া। সে আমার বর্মটিকে হাঁড়ি দিয়ে ঢেকে রেখেছে। আর হাঁড়ির ওপর রেখেছে উটের হাওদা। তুমি খালেদ বিন ওয়ালিদকে গিয়ে বলো সে যেন আমার বর্মটি উদ্ধার করে।
অতঃপর আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে বলবে, আমার নিকট অমুক অমুক ব্যক্তি এত টাকা ঋণ পাবে। আমি এত টাকা রেখে যাচ্ছি। আমার অমুক অমুক গোলাম মুক্ত। সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু স্বপ্নদ্রষ্টাকে এ-ও বলে দিলেন যে, তুমি আমার কথাগুলোকে নিছক স্বপ্নের কথা ভেবে অবহেলা করবে না। প্রতিটি কথাকে যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। লোকটি খালেদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে সব খুলে বললে তিনি লোক মারফত বর্মের বিষয়টিকে অনুসন্ধান করেন এবং যথারীতি তা উদ্ধারও করেন। অতঃপর লোকটি আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে পুরো ঘটনা শুনালেন। তিনি সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহুর অসিয়তকে পূর্ণ করার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করেন।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত কেউ মৃত্যুর পরে অসিয়ত করেছেন আর তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে আমার জানামতে এমন ঘটনা নেই। হাফিজ ইবনু কাসির রহ. বলেন, এ ঘটনা ইমাম তবরানি রহ. বর্ণনা করেন। এর সমার্থবোধক আরও কয়েকটি হাদিস রয়েছে。
টিকাঃ
১৮০ তিরমিজি: ৩৮০৪
১৮১ সূরা লুকমান: ১৮
১৮২ তবরানি: ১৩২০; মুস্তাদরাকে হাকেম: ৫০৩৬
১৮৩ সূরা হুজুরাত : ২
১৮৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৫
সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু খাজরাজ গোত্রের একজন বিখ্যাত আনসারি সাহাবি। বক্তা হিসেবে তার খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। প্রিয় নবীজি সা.-এর ওহি লেখার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সুনানে তিরমিজিতে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সা. তার সম্পর্কে ইরশাদ করেন-
نِعْمَ الرَّجُلُ ثَابِتُ بْنُ قَيْسِ بْن شَمَّاسٍ.
সাবেত ইবনু কায়েস ইবনু সাম্মাস অত্যন্ত ভালো মানুষ।
আতা খোরাসানি রহ. বলেন—আমি মদিনা শরিফে এসে এমন কাউকে খুঁজছিলাম, যিনি আমাকে সাবেত ইবনু কায়েসের জীবনাদর্শ শোনাতে পারেন। লোকজন আমাকে এ ব্যাপারে তার মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলল। আমি তার কাছে গিয়ে সাবেত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। তার একটি হলো—তিনি বলেন, আমি আমার বাবার কাছে শুনেছি—যখন নবীজির ওপর কুরআনে কারিমের এ আয়াত নাজিল হলো—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ.
নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না。
তখন সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর মনে ভীতি সঞ্চার হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘরের এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন। অমনি তার অজান্তে দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। নবীজি বিষয়টি জানতে পেরে তাকে ডেকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি সৌন্দর্য ও চাকচিক্য অত্যন্ত পছন্দ করি। আবার আমি কওমের সরদারও। (তাই আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি উক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই কি না?) এ কথা শুনে নবীজি বললেন—
إِنَّكَ لَسْتَ مِنْهُمْ، بَلْ تَعِيْشُ بِخَيْرٍ وَتَمُوتُ بِخَيْرٍ وَيُدْخِلُكَ اللهُ الْجَنَّةَ.
নিশ্চয়ই তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। বরং আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম জীবন ও উত্তম মরণ দান করবেন। অধিকন্তু জান্নাতে প্রবেশ করাবেন。
নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল হওয়ার সময়ও হুবহু একই ঘটনার অবতারণা হয়—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর নিজেদের আওয়াজকে উঁচু করো না আর তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলো না。
এ ক্ষেত্রেও সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্রিয় নবীজি তাকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার স্বর কিছুটা উঁচু। এজন্য আমি শঙ্কিত। আমার উচ্চস্বরের দরুন না জানি সকল আমল বরবাদ হয়ে যায়।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর কথা শুনে নবীজি ইরশাদ করেন—
إِنَّكَ لَسْتَ مِنْهُمْ، بَلْ تَعِيْشُ حَمِيدًا وَتُقْتَلُ شَهِيدًا وَيُدْخِلَكَ اللَّهُ الْجَنَّةَ.
নিঃসন্দেহে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। বরং তুমি প্রশংসিত জীবন-যাপন করবে, শহিদি মৃত্যু লাভ করবে এবং আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাত দান করবেন।
নবীজির তিরোধানের পর আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে মুসাইলামা কাজ্জাবের ফিতনার আবির্ভাব ঘটল। মুসলিমদের একটি লশকর ইয়ামাহ নামক স্থানে তার বিরুদ্ধে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহু ও এ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে শত্রু বাহিনীর অপ্রতিরুদ্ধ হামলা মোকাবেলা করতে না পেরে মুসলিম সেনাদল তিন তিন বার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাবেত ও তার সঙ্গী সালেম রাজিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে একে অপরকে বলতে লাগলেন—আমরা তো নবীজির সঙ্গে এরূপ যুদ্ধ কখনো করি নি। অতঃপর তারা উভয়ে একটি গর্ত খনন করে তাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। যাতে পেছনে হটার কোনো সুযোগ না থাকে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস বাকি থাকা পর্যন্ত তারা সে গর্তে দৃঢ় পদ থেকে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। একপর্যায়ে দুজনেই জীবনদাতার সমীপে জীবন সঁপে দিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা ঘটনা বর্ণনা করার পর বললেন, সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পরদিন এক ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি স্বপ্নদ্রষ্টাকে বলছেন, গতকাল শহিদ হওয়ার পর আমার লাশের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছিল। আমার বুকে ছিল একটি মূল্যবান বর্ম। লোকটি সেটি খুলে নিয়ে গেছে। সে বর্তমানে সৈন্যবাহিনীর তাঁবুর শেষ প্রান্তে অমুক স্থানে রয়েছে। তার সামনে বাঁধা আছে একটি মোটা তাগড়া ঘোড়া। সে আমার বর্মটিকে হাঁড়ি দিয়ে ঢেকে রেখেছে। আর হাঁড়ির ওপর রেখেছে উটের হাওদা। তুমি খালেদ বিন ওয়ালিদকে গিয়ে বলো সে যেন আমার বর্মটি উদ্ধার করে।
অতঃপর আবু বকর সিদ্দিক রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে বলবে, আমার নিকট অমুক অমুক ব্যক্তি এত টাকা ঋণ পাবে। আমি এত টাকা রেখে যাচ্ছি। আমার অমুক অমুক গোলাম মুক্ত। সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু স্বপ্নদ্রষ্টাকে এ-ও বলে দিলেন যে, তুমি আমার কথাগুলোকে নিছক স্বপ্নের কথা ভেবে অবহেলা করবে না। প্রতিটি কথাকে যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। লোকটি খালেদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে সব খুলে বললে তিনি লোক মারফত বর্মের বিষয়টিকে অনুসন্ধান করেন এবং যথারীতি তা উদ্ধারও করেন। অতঃপর লোকটি আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে পুরো ঘটনা শুনালেন। তিনি সাবেত ইবনু কায়েস রাজিয়াল্লাহু আনহুর অসিয়তকে পূর্ণ করার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এবং তা যথাযথ বাস্তবায়ন করেন।
সাবেত রাজিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত কেউ মৃত্যুর পরে অসিয়ত করেছেন আর তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে আমার জানামতে এমন ঘটনা নেই। হাফিজ ইবনু কাসির রহ. বলেন, এ ঘটনা ইমাম তবরানি রহ. বর্ণনা করেন। এর সমার্থবোধক আরও কয়েকটি হাদিস রয়েছে。
টিকাঃ
১৮০ তিরমিজি: ৩৮০৪
১৮১ সূরা লুকমান: ১৮
১৮২ তবরানি: ১৩২০; মুস্তাদরাকে হাকেম: ৫০৩৬
১৮৩ সূরা হুজুরাত : ২
১৮৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩২৫