📄 সত্যের সন্ধানে হিন্দু রাজা
আবু মুহাম্মদ নজিদি বলেন, আমি ২৮৮ হিজরিতে সিন্ধু প্রদেশের প্রসিদ্ধ নগরী মানসুরায় বসবাস করতাম। সেখানকার কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক আমাকে বললেন যে, ২৭০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি সিন্ধুর গভর্নর নিযুক্ত হন। তার প্রধান কার্যালয় ছিল মানসুরাতে। একই সাথে সিন্ধুর আরুর নামক শহরের [সম্ভবত এটি রোহাড়ির প্রাচীন নাম] হিন্দু রাজা মাহরুক ইবনু রাতেক মানসুরার শাসকের নিকট এ মর্মে নিবেদন করলেন, দয়া করে সিন্ধি ভাষায় ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদি বিষয়াদি লিখে পাঠাবেন।
মানসুরার শাসক আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি জনৈক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। যার বংশমূল ইরাকে হলেও লালিত-পালিত হয়েছিলেন মানসুরায়। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। বেশ কয়েকটি ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। আবদুল্লাহ হুবারি তাকে রাজার আবেদনের বিষয়টি খুলে বললে বিজ্ঞ লোকটি ইসলামের সকল মৌলিক বিষয়াদিকে একগুচ্ছ কবিতার মালায় গেঁথে ফেললেন। তাতে ইসলামের যাবতীয় মৌলিক বিষয়সহ প্রাসঙ্গিক শিক্ষা-দীক্ষাও সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করেন। শাসক আবদুল্লাহ কবিতাগুচ্ছটি রাজা মাহরুকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। রাজা কবিতাগুলো শুনে বেশ আনন্দিত হলেন এবং আবদুল্লাহর নিকট কবিতার রচয়িতাকে রাজদরবারে পাঠানোর আবেদন করলেন। আবদুল্লাহ তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন। রাজাও তার প্রতি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন।
অতঃপর ২৭৩ হিজরিতে সিন্ধুর গভর্নর আবদুল্লার সঙ্গে উক্ত আলেমের সাক্ষাৎ হয়। আবদুল্লাহ তার নিকট রাজার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমি যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছি, তখনই তিনি খাঁটি অন্তরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু রাজত্ব হারানোর ভয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন নি। পাশাপাশি তিনি রাজার বিভিন্ন গুণ-গরিমার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, রাজা তাকে সিন্ধু ভাষায় কুরআনে কারিমের তাফসির লেখার জন্য আরজি জানালে তিনি প্রতিদিন কয়েক আয়াতের তাফসির করে রাজাকে শোনাতেন। একপর্যায়ে যখন সূরা ইয়াসিনের-
قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ.
কাফের বলে, মাটিতে মিশে পচে-গলে যাওয়া হাড়সমূহকে পুনরায় কে জীবিত করবে?
এ আয়াতে এসে পৌঁছলেন এবং এর তরজমা ও তাফসির রাজাকে শোনালেন, তখন তিনি পুনরায় উক্ত আয়াতের তাফসির শুনতে চাইলেন। দ্বিতীয়বার যখন উক্ত আয়াতের তরজমা ও তাফসির শুনলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মণি-মুক্তা খচিত সোনার আসন থেকে নেমে পড়লেন এবং কয়েক পা অগ্রসর হয়ে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অথচ তখন মাটি ছিল বেশ ভেজা। রাজা সেজদারত অবস্থায় এত অধিক কান্নাকাটি করেন যে, চোখের পানিতে কাদা সৃষ্টি হয়ে তা মুখমণ্ডলে লেগে একাকার হয়ে গেল। খানিকপর মাথা উঁচিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তিনিই চিরন্তন ও শাশ্বত প্রতিপালক। এরপর তিনি একটি কামরা নির্মাণ করলেন। সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একাকী আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আর সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সকলে জানত, রাজা সেখানে বসে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে থাকেন。
টিকাঃ
১৬৯ সূরা ইয়াসিন : ৭৮
১৭০ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.৮৯-৯১
আবু মুহাম্মদ নজিদি বলেন, আমি ২৮৮ হিজরিতে সিন্ধু প্রদেশের প্রসিদ্ধ নগরী মানসুরায় বসবাস করতাম। সেখানকার কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক আমাকে বললেন যে, ২৭০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি সিন্ধুর গভর্নর নিযুক্ত হন। তার প্রধান কার্যালয় ছিল মানসুরাতে। একই সাথে সিন্ধুর আরুর নামক শহরের [সম্ভবত এটি রোহাড়ির প্রাচীন নাম] হিন্দু রাজা মাহরুক ইবনু রাতেক মানসুরার শাসকের নিকট এ মর্মে নিবেদন করলেন, দয়া করে সিন্ধি ভাষায় ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদি বিষয়াদি লিখে পাঠাবেন।
মানসুরার শাসক আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি জনৈক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। যার বংশমূল ইরাকে হলেও লালিত-পালিত হয়েছিলেন মানসুরায়। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। বেশ কয়েকটি ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। আবদুল্লাহ হুবারি তাকে রাজার আবেদনের বিষয়টি খুলে বললে বিজ্ঞ লোকটি ইসলামের সকল মৌলিক বিষয়াদিকে একগুচ্ছ কবিতার মালায় গেঁথে ফেললেন। তাতে ইসলামের যাবতীয় মৌলিক বিষয়সহ প্রাসঙ্গিক শিক্ষা-দীক্ষাও সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করেন। শাসক আবদুল্লাহ কবিতাগুচ্ছটি রাজা মাহরুকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। রাজা কবিতাগুলো শুনে বেশ আনন্দিত হলেন এবং আবদুল্লাহর নিকট কবিতার রচয়িতাকে রাজদরবারে পাঠানোর আবেদন করলেন। আবদুল্লাহ তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন। রাজাও তার প্রতি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন।
অতঃপর ২৭৩ হিজরিতে সিন্ধুর গভর্নর আবদুল্লার সঙ্গে উক্ত আলেমের সাক্ষাৎ হয়। আবদুল্লাহ তার নিকট রাজার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমি যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছি, তখনই তিনি খাঁটি অন্তরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু রাজত্ব হারানোর ভয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন নি। পাশাপাশি তিনি রাজার বিভিন্ন গুণ-গরিমার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, রাজা তাকে সিন্ধু ভাষায় কুরআনে কারিমের তাফসির লেখার জন্য আরজি জানালে তিনি প্রতিদিন কয়েক আয়াতের তাফসির করে রাজাকে শোনাতেন। একপর্যায়ে যখন সূরা ইয়াসিনের-
قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ.
কাফের বলে, মাটিতে মিশে পচে-গলে যাওয়া হাড়সমূহকে পুনরায় কে জীবিত করবে?
এ আয়াতে এসে পৌঁছলেন এবং এর তরজমা ও তাফসির রাজাকে শোনালেন, তখন তিনি পুনরায় উক্ত আয়াতের তাফসির শুনতে চাইলেন। দ্বিতীয়বার যখন উক্ত আয়াতের তরজমা ও তাফসির শুনলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মণি-মুক্তা খচিত সোনার আসন থেকে নেমে পড়লেন এবং কয়েক পা অগ্রসর হয়ে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অথচ তখন মাটি ছিল বেশ ভেজা। রাজা সেজদারত অবস্থায় এত অধিক কান্নাকাটি করেন যে, চোখের পানিতে কাদা সৃষ্টি হয়ে তা মুখমণ্ডলে লেগে একাকার হয়ে গেল। খানিকপর মাথা উঁচিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তিনিই চিরন্তন ও শাশ্বত প্রতিপালক। এরপর তিনি একটি কামরা নির্মাণ করলেন। সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একাকী আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আর সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সকলে জানত, রাজা সেখানে বসে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে থাকেন。
টিকাঃ
১৬৯ সূরা ইয়াসিন : ৭৮
১৭০ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.৮৯-৯১
📄 সুলতান মাহমুদ গজনবি ও আবুল হাসান খেরকানি রহ.
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. একবার খোরাসান গমন করেন। অতঃপর সেখানকার বিখ্যাত বুজুর্গ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ জাগল; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, আমি এখানে শাইখ খেরকানির সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসি নি। অতএব, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা বেয়াদবি হবে। এ ভেবেই তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত মুলতবি করেন। দীর্ঘদিন পর তিনি পুনরায় গজনি থেকে স্রেফ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি'র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খেরকান গমন করেন। সাথে সাথে এক লোককে বলে পাঠালেন, সুলতান মাহমুদ গজনি থেকে এসেছেন। অতএব, সৌজন্য ও ভদ্রতার খাতিরে আপনি খানকা হতে বেরিয়ে আসুন সুলতানকে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেন। বার্তাবাহককে সুলতান এ-ও বলেছিলেন, যদি শাইখ খেরকানি বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানান, তবে তাঁকে আল্লাহ পাকের এই মহান বিধানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেবে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য হতে যারা দায়িত্বশীল তাদের।
বার্তাবাহক শায়খের নিকট সুলতানের পয়গام পৌঁছল; কিন্তু শাইখ খানকা হতে বের হতে অসম্মতি জানালেন এবং সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। বার্তাবাহক সুলতানের নির্দেশনা মোতাবেক আয়াতটি শোনালো। জবাবে শাইখ বললেন, আমাকে অপারগ মনে করো। সুলতান মাহমুদকে বলবে—আমি এখনো أطيعوا الله-এর আমলে এতই নিমগ্ন যে, রাসুলের আনুগত্যের হক পর্যন্ত আদায় করতে পারছি না; বরং এ ব্যাপারে আমি খুবই লজ্জিত। অতএব, اول الأمر-এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ কোথায়?
বার্তাবাহক এ সংবাদ গিয়ে সুলতান মাহমুদকে শুনালে তিনি কাঁদতে লাগলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, চলো, তাকে আমরা যা ভেবেছি, তিনি তা নন। তিনি আমদের ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
এরপর সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. আজব বেশ-ভূষায় খেরকানির দরবারে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নিজে পরলেন স্বীয় চাকর আয়াজের পোশাক। আর আয়াজকে পরালেন নিজের শাহি পোশাক। দশজন চাকরানীকে পরালেন চাকর-বাকরদের পোশাক। অতঃপর সদলবলে যখন সুলতান দরবারে প্রবেশ করে সমস্বরে সালাম দিলেন। শাইখ খেরকানি রহ. সালামের জবাব দিলেন ঠিকই; কিন্তু বাদশার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন না। আর আয়াজের পোশাক পরিহিত সুলতানের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও করলেন না; বরং সুলতানের পোশাক পরিহিত আয়াযের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এ অবস্থা দেখে আয়াযের পোশাক পরিহিত সুলতান শাইখকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী ব্যাপার! আপনি সুলতানের সম্মানার্থে একটু দাঁড়ালেনও না, তাঁর প্রতি একটু ভ্রুক্ষেপ করেও দেখলেন না? ফকিরি ও দরবেশি জগতের তেলেসমাতি কি এমনই যে, এখানে বাদশাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়?
শাইখ বললেন, হ্যাঁ! বিষয়টি এমনই। তবে তুমি যাকে এ ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলে সে মূলত ফাঁদে পড়ে নি; তুমিই বরং এ ফাঁদের বড় শিকার। সুলতান যখন বুঝতে পারলেন যে, শাইখ ব্যাপারটি আঁচ করে ফেলেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত আদবের সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে আরজ করলেন— অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, চাকরের পোশাকে সজ্জিত এ বেগানা চাকরানীগুলোকে দরবার থেকে বের করে দাও। সুলতান তাদের বের হবার নির্দেশ দিলে তারা বের হয়ে গেল। অতঃপর সুলতান আরজ করলেন, হজরত, দয়া করে যদি বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর কোনো ঘটনা আমাকে শোনাতেন!
শাইখ বললেন, বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর উক্তি হলো—যে আমাকে দেখতে পেরেছে, সে সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতনের বদ অভ্যাস থেকে রেহাই পেল।
সুলতান বললেন, কথাটি ঠিক বুঝলাম না! বায়েজিদ বোস্তামির মর্যাদা কি নবীজির চেয়েও বেশি? নবিজিকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেই শত ভাগ ভালো ছিলেন না। আবু জাহল ও আবু লাহাবও তাঁকে দেখেছে; কিন্তু তারা কাফেরই ছিল। তাহলে বায়েজিদের দর্শনকারী সকল জালেম কীভাবে ভালো মানুষে পরিণত হবে?
শাইখ সুলতানের এ কথা শুনে বললেন, মাহমুদ, নিজের অবস্থানানুপাতে কথা বলো। আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখো। একথা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নাও যে, নবীজিকে সাহাবায়ে কেরাম রাজিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া কেউ দেখে নি। কেন তুমি কুরআনে কারিমের এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য করো নি—
وَتَرَاهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ .
আর আপনি তাদেরকে দেখবেন যে, তারা আপনার প্রতি তাকিয়ে আছে, বস্তুত তারা কিছুই দেখছে না।
সুলতান মাহমুদ শায়খের এ কথাটি বেশ পছন্দ করলেন এবং আরজি পেশ করলেন—আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, তুমি চারটি কাজকে আঁকড়ে ধরবে—
✓ ১.গুনাহ পরিহার
✓ ২. জামাতে নামাজ
✓ ৩. দান-দক্ষিণা
✓ ৪. দয়া-মায়া।
অতঃপর সুলতান দুআর আবেদন জানালে শাইখ বললেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর দুআ করি—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ.
হে আল্লাহ, আপনি মুমিন নারী ও পুরুষ—সকলকে মাফ করে দেন।
সুলতান বললেন, এটা তো ঢালাও দুআ। আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দুআ করবেন!
শাইখ বললেন, মাহমুদ, তুমি যাও। তোমার পরিণামও তোমার নামের মতো মাহমুদ [প্রশংসিত] হোক!
ফেরার মুহূর্তে সুলতান একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে শায়খের খেদমতে পেশ করলেন। শাইখ সুলতানের সামনে জবের রুটি পেশ করে তাকে খেতে বললেন। সুলতান রুটির একাংশ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বুঝলেন যে, রুটিটা অত্যন্ত শক্ত। দীর্ঘক্ষণ চিবানোর পরও রুটি না বিন্দুমাত্র নরম হয়েছে আর না গলধঃকরণ সম্ভব হয়েছে!
শাইখ জিজ্ঞাসা করলেন—রুটিটা তোমার কণ্ঠনালিতে আটকে যাচ্ছে, তাই না? সুলতান হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। শাইখ বললেন, আমার এ জবের শুকনো রুটি যেমন তোমার কণ্ঠনালিতে পৌঁছতে কষ্ট হচ্ছে, অনুরূপ তোমার স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি এ থলেটিও আমার কণ্ঠনালি ভেদ করতে কষ্ট হচ্ছে। এটা আমার সামনে থেকে সরাও। আমি অনেক আগেই এসবকে পরিহার করেছি।
সুলতান মাহমুদ শায়খের স্মৃতিস্বরূপ কোনো কিছু চাইলেন। শাইখ তাকে নিজের ছেঁড়া-ফাঁড়া দরবেশি জামা দান করলেন। সুলতান শায়খের মজলিস হতে বিদায়ের জন্য দাঁড়ালে শাইখও তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন।
সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন—হজরত, আমি যখন আপনার দরবারে এসেছি তখন আপনি আমার প্রতি একটুও ভ্রুক্ষেপ করেন নি। আর এখন কিনা আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন!
শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ. বললেন, যখন তুমি আমার দরবারে প্রবেশ করেছ, তোমার সঙ্গে ছিল চাকর-বাকর। তুমি বাদশাহি অহঙ্কারে মত্ত ছিলে। তখন এসেছিলে পরীক্ষা করার জন্য। আর এখন তুমি বিদায় নিচ্ছ নিজেকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে。
টিকাঃ
১৭১ সূরা নিসা: ৫৯
১৭২ সূরা আরাফ: ১৯৮
১৭৩ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.১০৯-১১৩
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. একবার খোরাসান গমন করেন। অতঃপর সেখানকার বিখ্যাত বুজুর্গ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ জাগল; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, আমি এখানে শাইখ খেরকানির সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসি নি। অতএব, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা বেয়াদবি হবে। এ ভেবেই তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত মুলতবি করেন। দীর্ঘদিন পর তিনি পুনরায় গজনি থেকে স্রেফ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি'র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খেরকান গমন করেন। সাথে সাথে এক লোককে বলে পাঠালেন, সুলতান মাহমুদ গজনি থেকে এসেছেন। অতএব, সৌজন্য ও ভদ্রতার খাতিরে আপনি খানকা হতে বেরিয়ে আসুন সুলতানকে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেন। বার্তাবাহককে সুলতান এ-ও বলেছিলেন, যদি শাইখ খেরকানি বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানান, তবে তাঁকে আল্লাহ পাকের এই মহান বিধানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেবে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য হতে যারা দায়িত্বশীল তাদের।
বার্তাবাহক শায়খের নিকট সুলতানের পয়গام পৌঁছল; কিন্তু শাইখ খানকা হতে বের হতে অসম্মতি জানালেন এবং সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। বার্তাবাহক সুলতানের নির্দেশনা মোতাবেক আয়াতটি শোনালো। জবাবে শাইখ বললেন, আমাকে অপারগ মনে করো। সুলতান মাহমুদকে বলবে—আমি এখনো أطيعوا الله-এর আমলে এতই নিমগ্ন যে, রাসুলের আনুগত্যের হক পর্যন্ত আদায় করতে পারছি না; বরং এ ব্যাপারে আমি খুবই লজ্জিত। অতএব, اول الأمر-এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ কোথায়?
বার্তাবাহক এ সংবাদ গিয়ে সুলতান মাহমুদকে শুনালে তিনি কাঁদতে লাগলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, চলো, তাকে আমরা যা ভেবেছি, তিনি তা নন। তিনি আমদের ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
এরপর সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. আজব বেশ-ভূষায় খেরকানির দরবারে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নিজে পরলেন স্বীয় চাকর আয়াজের পোশাক। আর আয়াজকে পরালেন নিজের শাহি পোশাক। দশজন চাকরানীকে পরালেন চাকর-বাকরদের পোশাক। অতঃপর সদলবলে যখন সুলতান দরবারে প্রবেশ করে সমস্বরে সালাম দিলেন। শাইখ খেরকানি রহ. সালামের জবাব দিলেন ঠিকই; কিন্তু বাদশার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন না। আর আয়াজের পোশাক পরিহিত সুলতানের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও করলেন না; বরং সুলতানের পোশাক পরিহিত আয়াযের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এ অবস্থা দেখে আয়াযের পোশাক পরিহিত সুলতান শাইখকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী ব্যাপার! আপনি সুলতানের সম্মানার্থে একটু দাঁড়ালেনও না, তাঁর প্রতি একটু ভ্রুক্ষেপ করেও দেখলেন না? ফকিরি ও দরবেশি জগতের তেলেসমাতি কি এমনই যে, এখানে বাদশাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়?
শাইখ বললেন, হ্যাঁ! বিষয়টি এমনই। তবে তুমি যাকে এ ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলে সে মূলত ফাঁদে পড়ে নি; তুমিই বরং এ ফাঁদের বড় শিকার। সুলতান যখন বুঝতে পারলেন যে, শাইখ ব্যাপারটি আঁচ করে ফেলেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত আদবের সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে আরজ করলেন— অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, চাকরের পোশাকে সজ্জিত এ বেগানা চাকরানীগুলোকে দরবার থেকে বের করে দাও। সুলতান তাদের বের হবার নির্দেশ দিলে তারা বের হয়ে গেল। অতঃপর সুলতান আরজ করলেন, হজরত, দয়া করে যদি বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর কোনো ঘটনা আমাকে শোনাতেন!
শাইখ বললেন, বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর উক্তি হলো—যে আমাকে দেখতে পেরেছে, সে সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতনের বদ অভ্যাস থেকে রেহাই পেল।
সুলতান বললেন, কথাটি ঠিক বুঝলাম না! বায়েজিদ বোস্তামির মর্যাদা কি নবীজির চেয়েও বেশি? নবিজিকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেই শত ভাগ ভালো ছিলেন না। আবু জাহল ও আবু লাহাবও তাঁকে দেখেছে; কিন্তু তারা কাফেরই ছিল। তাহলে বায়েজিদের দর্শনকারী সকল জালেম কীভাবে ভালো মানুষে পরিণত হবে?
শাইখ সুলতানের এ কথা শুনে বললেন, মাহমুদ, নিজের অবস্থানানুপাতে কথা বলো। আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখো। একথা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নাও যে, নবীজিকে সাহাবায়ে কেরাম রাজিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া কেউ দেখে নি। কেন তুমি কুরআনে কারিমের এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য করো নি—
وَتَرَاهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ .
আর আপনি তাদেরকে দেখবেন যে, তারা আপনার প্রতি তাকিয়ে আছে, বস্তুত তারা কিছুই দেখছে না।
সুলতান মাহমুদ শায়খের এ কথাটি বেশ পছন্দ করলেন এবং আরজি পেশ করলেন—আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, তুমি চারটি কাজকে আঁকড়ে ধরবে—
✓ ১.গুনাহ পরিহার
✓ ২. জামাতে নামাজ
✓ ৩. দান-দক্ষিণা
✓ ৪. দয়া-মায়া।
অতঃপর সুলতান দুআর আবেদন জানালে শাইখ বললেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর দুআ করি—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ.
হে আল্লাহ, আপনি মুমিন নারী ও পুরুষ—সকলকে মাফ করে দেন।
সুলতান বললেন, এটা তো ঢালাও দুআ। আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দুআ করবেন!
শাইখ বললেন, মাহমুদ, তুমি যাও। তোমার পরিণামও তোমার নামের মতো মাহমুদ [প্রশংসিত] হোক!
ফেরার মুহূর্তে সুলতান একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে শায়খের খেদমতে পেশ করলেন। শাইখ সুলতানের সামনে জবের রুটি পেশ করে তাকে খেতে বললেন। সুলতান রুটির একাংশ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বুঝলেন যে, রুটিটা অত্যন্ত শক্ত। দীর্ঘক্ষণ চিবানোর পরও রুটি না বিন্দুমাত্র নরম হয়েছে আর না গলধঃকরণ সম্ভব হয়েছে!
শাইখ জিজ্ঞাসা করলেন—রুটিটা তোমার কণ্ঠনালিতে আটকে যাচ্ছে, তাই না? সুলতান হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। শাইখ বললেন, আমার এ জবের শুকনো রুটি যেমন তোমার কণ্ঠনালিতে পৌঁছতে কষ্ট হচ্ছে, অনুরূপ তোমার স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি এ থলেটিও আমার কণ্ঠনালি ভেদ করতে কষ্ট হচ্ছে। এটা আমার সামনে থেকে সরাও। আমি অনেক আগেই এসবকে পরিহার করেছি।
সুলতান মাহমুদ শায়খের স্মৃতিস্বরূপ কোনো কিছু চাইলেন। শাইখ তাকে নিজের ছেঁড়া-ফাঁড়া দরবেশি জামা দান করলেন। সুলতান শায়খের মজলিস হতে বিদায়ের জন্য দাঁড়ালে শাইখও তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন।
সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন—হজরত, আমি যখন আপনার দরবারে এসেছি তখন আপনি আমার প্রতি একটুও ভ্রুক্ষেপ করেন নি। আর এখন কিনা আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন!
শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ. বললেন, যখন তুমি আমার দরবারে প্রবেশ করেছ, তোমার সঙ্গে ছিল চাকর-বাকর। তুমি বাদশাহি অহঙ্কারে মত্ত ছিলে। তখন এসেছিলে পরীক্ষা করার জন্য। আর এখন তুমি বিদায় নিচ্ছ নিজেকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে。
টিকাঃ
১৭১ সূরা নিসা: ৫৯
১৭২ সূরা আরাফ: ১৯৮
১৭৩ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.১০৯-১১৩
📄 মুসলিম উম্মাহে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ফিতনা
আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু ওই সকল মনীষীদের একজন, যারা ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন। উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণের পর লোকেরা তার নিকট আবেদন করল—আপনি মাঠে নামেন! আমরা আপনার হাতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য বাইআত নেবো; কিন্তু তিনি মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে। তবুও তিনি নিজ অবস্থানে অনড় ছিলেন।
একবার গণ্ডগোলের সময় লোকজন এসে তাকে বলল, আপনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন! সকলেই আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট থাকবে। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যদি প্রাচ্যের কেউ বিরোধিতা করে? সকলে একবাক্যে বলে উঠল—তবে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সমগ্র মুসলিম জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার খাতিরে একজনকে হত্যা করা হলে তাতে কী ক্ষতি হবে? উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! যদি বিশ্বের সকল মুসলমানের হাতে বর্ষার হাতল থাকে আর আমার হাতে থাকে ধারালো অংশ, তবুও আমি পুরো পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে কোনো মুসলিম হত্যা করা পছন্দ করবো না。
সাহাবাযুগে কঠিন দলাদলির সময় ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু দুই দলের সঙ্গে পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন। কোনো পক্ষের সঙ্গেই তিনি গভীরভাবে মেশেন নি। আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়ের রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইবনু উমার ইবনু জুবায়ের ও তার প্রতিপক্ষ উভয়ের পেছনে নামাজ পড়তেন। এ প্রসঙ্গে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল—আপনি উভয় দলের পেছনে নামাজ পড়ছেন, অথচ এরা একে অপরকে হত্যা করছে? এর উত্তর তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যখন কেউ حَيَّ عَلَى الصَّلاة [নামাজের দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। আর যদি কেউ حَيَّ عَلَى الْفَلَاح [সফলতার দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, তবে আমি তার আহ্বানেও সাড়া দিই; কিন্তু কেউ حَيَّ عَلَى قَتْلِ أَخِيْكُمُ الْمُسْلِم ]এসো, তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের রক্ত ঝরাতে]-বলে ডাক দিলে আমি তার ডাকে সাড়া দিই না。
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে এসব দলাদলির সময় কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করতে বলল এবং কুরআনে কারিমে বর্ণিত জিহাদের বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। উত্তরে তিনি বললেন—
إنا قتلنا حتى كان الدين لله ولم تكن فتنة، وإنكم قاتلتم حتى كان الدين لغير الله، وحتى كانت فتنة.
আমরা জিহাদ করেছি ফিতনা খতম করে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। আর তোমরা জিহাদ করছ ফিতনা সৃষ্টি করে অন্য ধর্ম বিজয় লাভ করার উদ্দেশ্যে。
টিকাঃ
১৭৪ তবাকাতে ইবনে সাদ: ৪/১৫১
১৭৫ প্রাগুক্ত: পৃ.১৬৯-১৭০
১৭৬ প্রাগুক্ত: পৃ.১৫১
আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু ওই সকল মনীষীদের একজন, যারা ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতেন। উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণের পর লোকেরা তার নিকট আবেদন করল—আপনি মাঠে নামেন! আমরা আপনার হাতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য বাইআত নেবো; কিন্তু তিনি মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে। তবুও তিনি নিজ অবস্থানে অনড় ছিলেন।
একবার গণ্ডগোলের সময় লোকজন এসে তাকে বলল, আপনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন! সকলেই আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট থাকবে। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যদি প্রাচ্যের কেউ বিরোধিতা করে? সকলে একবাক্যে বলে উঠল—তবে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সমগ্র মুসলিম জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার খাতিরে একজনকে হত্যা করা হলে তাতে কী ক্ষতি হবে? উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! যদি বিশ্বের সকল মুসলমানের হাতে বর্ষার হাতল থাকে আর আমার হাতে থাকে ধারালো অংশ, তবুও আমি পুরো পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে কোনো মুসলিম হত্যা করা পছন্দ করবো না。
সাহাবাযুগে কঠিন দলাদলির সময় ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু দুই দলের সঙ্গে পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন। কোনো পক্ষের সঙ্গেই তিনি গভীরভাবে মেশেন নি। আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়ের রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইবনু উমার ইবনু জুবায়ের ও তার প্রতিপক্ষ উভয়ের পেছনে নামাজ পড়তেন। এ প্রসঙ্গে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল—আপনি উভয় দলের পেছনে নামাজ পড়ছেন, অথচ এরা একে অপরকে হত্যা করছে? এর উত্তর তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যখন কেউ حَيَّ عَلَى الصَّلاة [নামাজের দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। আর যদি কেউ حَيَّ عَلَى الْفَلَاح [সফলতার দিকে আসো] বলে আহ্বান করে, তবে আমি তার আহ্বানেও সাড়া দিই; কিন্তু কেউ حَيَّ عَلَى قَتْلِ أَخِيْكُمُ الْمُسْلِم ]এসো, তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের রক্ত ঝরাতে]-বলে ডাক দিলে আমি তার ডাকে সাড়া দিই না。
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে এসব দলাদলির সময় কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করতে বলল এবং কুরআনে কারিমে বর্ণিত জিহাদের বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। উত্তরে তিনি বললেন—
إنا قتلنا حتى كان الدين لله ولم تكن فتنة، وإنكم قاتلتم حتى كان الدين لغير الله، وحتى كانت فتنة.
আমরা জিহাদ করেছি ফিতনা খতম করে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। আর তোমরা জিহাদ করছ ফিতনা সৃষ্টি করে অন্য ধর্ম বিজয় লাভ করার উদ্দেশ্যে。
টিকাঃ
১৭৪ তবাকাতে ইবনে সাদ: ৪/১৫১
১৭৫ প্রাগুক্ত: পৃ.১৬৯-১৭০
১৭৬ প্রাগুক্ত: পৃ.১৫১
📄 একটি চমৎকার উপমা
নবীজির ইন্তেকাল পরবর্তী দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার অবস্থানের যথার্থতা একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে প্রমাণিত করেছেন। তিনি বলেন—
إنما كان مثلنا في هذه الفتنة كمثل قوم كانوا يسيرون على جادة يعرفونها، فبينماهم كذلك إذ غشيتهم سحابة وظلمة، فأخذ بعضنا يمينا وبعضنا شمالا، فأخطأنا الطريق وأقمنا حيث أدركنا ذلك حتى تجلى عنا ذلك حتى أبصرنا الطريق الأول فعرفناه فأخذنا فيه إنما هؤلاء فتيان قريش يتقاتلون على هذا السلطان وعلى هذا لدنيا، والله ما أبالى ألّا يكون لي ما يقتل فيه بعضهم بعضا بنعلي.
এই ফিতনার যুগে আমার অবস্থানের উপমা হলো এমন কিছু লোকের মতো, যারা একটি চেনা-জানা পথ ধরে চলছে। হঠাৎ তারা ঘুটঘুটে অন্ধকার ও প্রচণ্ড ঝড়ের সম্মুখীন হলো। এতে সকলেই ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে লাগল; কিন্তু আমি আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ পর ঝড় থেমে গিয়ে আলো প্রস্ফুটিত হলো। পথ-ঘাট স্পষ্ট হয়ে উঠল। যে স্থানে আমাদের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে আবার পূর্বের পথ ধরে আমি চলতে শুরু করলাম। যে পার্থিব পদমর্যাদার লোভে কুরাইশ যুবকরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছে, খোদার কসম! আমি তা আমার একটি জুতার বিনিময়েও গ্রহণ করতে রাজি নই!
নবীজির ইন্তেকাল পরবর্তী দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার অবস্থানের যথার্থতা একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে প্রমাণিত করেছেন। তিনি বলেন—
إنما كان مثلنا في هذه الفتنة كمثل قوم كانوا يسيرون على جادة يعرفونها، فبينماهم كذلك إذ غشيتهم سحابة وظلمة، فأخذ بعضنا يمينا وبعضنا شمالا، فأخطأنا الطريق وأقمنا حيث أدركنا ذلك حتى تجلى عنا ذلك حتى أبصرنا الطريق الأول فعرفناه فأخذنا فيه إنما هؤلاء فتيان قريش يتقاتلون على هذا السلطان وعلى هذا لدنيا، والله ما أبالى ألّا يكون لي ما يقتل فيه بعضهم بعضا بنعلي.
এই ফিতনার যুগে আমার অবস্থানের উপমা হলো এমন কিছু লোকের মতো, যারা একটি চেনা-জানা পথ ধরে চলছে। হঠাৎ তারা ঘুটঘুটে অন্ধকার ও প্রচণ্ড ঝড়ের সম্মুখীন হলো। এতে সকলেই ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে লাগল; কিন্তু আমি আপন স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিকক্ষণ পর ঝড় থেমে গিয়ে আলো প্রস্ফুটিত হলো। পথ-ঘাট স্পষ্ট হয়ে উঠল। যে স্থানে আমাদের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে আবার পূর্বের পথ ধরে আমি চলতে শুরু করলাম। যে পার্থিব পদমর্যাদার লোভে কুরাইশ যুবকরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছে, খোদার কসম! আমি তা আমার একটি জুতার বিনিময়েও গ্রহণ করতে রাজি নই!