📄 সিন্ধুর এক প্রবীণ আলেমের মহামূল্যবান উক্তি
ইমাম আবু নসর ফাতাহ ইবনু আবদুল্লাহ সিন্ধি রহ. ছিলেন সিন্ধু বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত আলেম। মুসলিমদের সিন্ধু বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকাহ ও আকায়েদ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আল্লামা সামআনি রহ. তার নিম্নোক্ত ঘটনা সনদসহ বর্ণনা করেন:
আবদুল্লাহ ইবনু হুসাইন বলেন, 'একবার আমি আবু নসর সিন্ধির সঙ্গে কাদাটে পথ ধরে চলছিলাম। সাথে ছিল তার অসংখ্য ভক্তবৃন্দ। হঠাৎ দেখতে পেলাম—সাইয়িদ বংশীয় এক আরবি রাজপুত্র মাতাল অবস্থায় কাদামাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই আবু নসর তার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার মুখ থেকে মদের দুর্গন্ধ আসছে। রাজপুত্র আবু নসরকে লক্ষ্য করে বলল, হে গোলাম, আমার কঠিন বেহাল দশা দেখেও তুমি নিশ্চিন্ত মনে চলে যাচ্ছ? আর তোমার পেছনে পেছনে এতগুলো মানুষ তারাও তোমার মতোই নির্দ্বিধায় চলে যাচ্ছে?
আবু নসর নির্ভয়ে শাহজাদাকে জবাব দিলেন, শাহজাদা, তুমি জানো, আমি কেন এমনটি করেছি? আসলে কথা হলো, আমরা তোমাদের পূর্বপুরুষ সাহাবা ও তাবিয়িন রহ.-এর অনুকরণ করতে শুরু করেছি। আর তোমরা কিনা আমাদের পূর্বপুরুষ কাফের-মুশরিকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছ!
টিকাঃ
১৬৬ আল্লামা সামআনি, আল-আনসাব: পৃ.৩১৩
ইমাম আবু নসর ফাতাহ ইবনু আবদুল্লাহ সিন্ধি রহ. ছিলেন সিন্ধু বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত আলেম। মুসলিমদের সিন্ধু বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকাহ ও আকায়েদ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আল্লামা সামআনি রহ. তার নিম্নোক্ত ঘটনা সনদসহ বর্ণনা করেন:
আবদুল্লাহ ইবনু হুসাইন বলেন, 'একবার আমি আবু নসর সিন্ধির সঙ্গে কাদাটে পথ ধরে চলছিলাম। সাথে ছিল তার অসংখ্য ভক্তবৃন্দ। হঠাৎ দেখতে পেলাম—সাইয়িদ বংশীয় এক আরবি রাজপুত্র মাতাল অবস্থায় কাদামাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে আমাদের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই আবু নসর তার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার মুখ থেকে মদের দুর্গন্ধ আসছে। রাজপুত্র আবু নসরকে লক্ষ্য করে বলল, হে গোলাম, আমার কঠিন বেহাল দশা দেখেও তুমি নিশ্চিন্ত মনে চলে যাচ্ছ? আর তোমার পেছনে পেছনে এতগুলো মানুষ তারাও তোমার মতোই নির্দ্বিধায় চলে যাচ্ছে?
আবু নসর নির্ভয়ে শাহজাদাকে জবাব দিলেন, শাহজাদা, তুমি জানো, আমি কেন এমনটি করেছি? আসলে কথা হলো, আমরা তোমাদের পূর্বপুরুষ সাহাবা ও তাবিয়িন রহ.-এর অনুকরণ করতে শুরু করেছি। আর তোমরা কিনা আমাদের পূর্বপুরুষ কাফের-মুশরিকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছ!
টিকাঃ
১৬৬ আল্লামা সামআনি, আল-আনসাব: পৃ.৩১৩
📄 ভারতবর্ষে আগমনকারী সাহাবিগণের তালিকা
বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ হতে জানা যায়, ভারতবর্ষে নবীজির পঁচিশজন সাহাবির আগমন ঘটে। বারোজন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে, পাঁচজন উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত কালে, তিনজন আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে, চারজন মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ও একজন ইয়াযিদ ইবনু মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে।
তাদের মধ্যে মুখাজরিমিন ও মুদরিকিন—উভয় শ্রেণির লোকই ছিলেন। মুখাজরিমিন হলো ওই সকল ব্যক্তিবর্গ, যারা ইসলাম ও জাহিলি—উভয় যুগ পেয়েছেন; কিন্তু তারা নবীজির যুগ পেয়েও তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেন নি।
আর মুদরিকিন হলো—যারা কেবল নবীজির যুগ পেয়েছেন। তবে যে কোনো কারণে তাঁর সাক্ষাৎ মেলে নি। [তাদেরকে সাহাবিদের দলভুক্ত করা হয়েছে রূপকার্থে。
টিকাঃ
১৬৮ প্রাগুক্ত: ১/১০-১১
বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ হতে জানা যায়, ভারতবর্ষে নবীজির পঁচিশজন সাহাবির আগমন ঘটে। বারোজন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে, পাঁচজন উসমান রাজিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত কালে, তিনজন আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে, চারজন মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ও একজন ইয়াযিদ ইবনু মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে।
তাদের মধ্যে মুখাজরিমিন ও মুদরিকিন—উভয় শ্রেণির লোকই ছিলেন। মুখাজরিমিন হলো ওই সকল ব্যক্তিবর্গ, যারা ইসলাম ও জাহিলি—উভয় যুগ পেয়েছেন; কিন্তু তারা নবীজির যুগ পেয়েও তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেন নি।
আর মুদরিকিন হলো—যারা কেবল নবীজির যুগ পেয়েছেন। তবে যে কোনো কারণে তাঁর সাক্ষাৎ মেলে নি। [তাদেরকে সাহাবিদের দলভুক্ত করা হয়েছে রূপকার্থে。
টিকাঃ
১৬৮ প্রাগুক্ত: ১/১০-১১
📄 সত্যের সন্ধানে হিন্দু রাজা
আবু মুহাম্মদ নজিদি বলেন, আমি ২৮৮ হিজরিতে সিন্ধু প্রদেশের প্রসিদ্ধ নগরী মানসুরায় বসবাস করতাম। সেখানকার কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক আমাকে বললেন যে, ২৭০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি সিন্ধুর গভর্নর নিযুক্ত হন। তার প্রধান কার্যালয় ছিল মানসুরাতে। একই সাথে সিন্ধুর আরুর নামক শহরের [সম্ভবত এটি রোহাড়ির প্রাচীন নাম] হিন্দু রাজা মাহরুক ইবনু রাতেক মানসুরার শাসকের নিকট এ মর্মে নিবেদন করলেন, দয়া করে সিন্ধি ভাষায় ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদি বিষয়াদি লিখে পাঠাবেন।
মানসুরার শাসক আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি জনৈক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। যার বংশমূল ইরাকে হলেও লালিত-পালিত হয়েছিলেন মানসুরায়। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। বেশ কয়েকটি ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। আবদুল্লাহ হুবারি তাকে রাজার আবেদনের বিষয়টি খুলে বললে বিজ্ঞ লোকটি ইসলামের সকল মৌলিক বিষয়াদিকে একগুচ্ছ কবিতার মালায় গেঁথে ফেললেন। তাতে ইসলামের যাবতীয় মৌলিক বিষয়সহ প্রাসঙ্গিক শিক্ষা-দীক্ষাও সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করেন। শাসক আবদুল্লাহ কবিতাগুচ্ছটি রাজা মাহরুকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। রাজা কবিতাগুলো শুনে বেশ আনন্দিত হলেন এবং আবদুল্লাহর নিকট কবিতার রচয়িতাকে রাজদরবারে পাঠানোর আবেদন করলেন। আবদুল্লাহ তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন। রাজাও তার প্রতি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন।
অতঃপর ২৭৩ হিজরিতে সিন্ধুর গভর্নর আবদুল্লার সঙ্গে উক্ত আলেমের সাক্ষাৎ হয়। আবদুল্লাহ তার নিকট রাজার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমি যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছি, তখনই তিনি খাঁটি অন্তরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু রাজত্ব হারানোর ভয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন নি। পাশাপাশি তিনি রাজার বিভিন্ন গুণ-গরিমার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, রাজা তাকে সিন্ধু ভাষায় কুরআনে কারিমের তাফসির লেখার জন্য আরজি জানালে তিনি প্রতিদিন কয়েক আয়াতের তাফসির করে রাজাকে শোনাতেন। একপর্যায়ে যখন সূরা ইয়াসিনের-
قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ.
কাফের বলে, মাটিতে মিশে পচে-গলে যাওয়া হাড়সমূহকে পুনরায় কে জীবিত করবে?
এ আয়াতে এসে পৌঁছলেন এবং এর তরজমা ও তাফসির রাজাকে শোনালেন, তখন তিনি পুনরায় উক্ত আয়াতের তাফসির শুনতে চাইলেন। দ্বিতীয়বার যখন উক্ত আয়াতের তরজমা ও তাফসির শুনলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মণি-মুক্তা খচিত সোনার আসন থেকে নেমে পড়লেন এবং কয়েক পা অগ্রসর হয়ে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অথচ তখন মাটি ছিল বেশ ভেজা। রাজা সেজদারত অবস্থায় এত অধিক কান্নাকাটি করেন যে, চোখের পানিতে কাদা সৃষ্টি হয়ে তা মুখমণ্ডলে লেগে একাকার হয়ে গেল। খানিকপর মাথা উঁচিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তিনিই চিরন্তন ও শাশ্বত প্রতিপালক। এরপর তিনি একটি কামরা নির্মাণ করলেন। সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একাকী আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আর সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সকলে জানত, রাজা সেখানে বসে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে থাকেন。
টিকাঃ
১৬৯ সূরা ইয়াসিন : ৭৮
১৭০ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.৮৯-৯১
আবু মুহাম্মদ নজিদি বলেন, আমি ২৮৮ হিজরিতে সিন্ধু প্রদেশের প্রসিদ্ধ নগরী মানসুরায় বসবাস করতাম। সেখানকার কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক আমাকে বললেন যে, ২৭০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি সিন্ধুর গভর্নর নিযুক্ত হন। তার প্রধান কার্যালয় ছিল মানসুরাতে। একই সাথে সিন্ধুর আরুর নামক শহরের [সম্ভবত এটি রোহাড়ির প্রাচীন নাম] হিন্দু রাজা মাহরুক ইবনু রাতেক মানসুরার শাসকের নিকট এ মর্মে নিবেদন করলেন, দয়া করে সিন্ধি ভাষায় ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদি বিষয়াদি লিখে পাঠাবেন।
মানসুরার শাসক আবদুল্লাহ ইবনু উমার হুবারি জনৈক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন। যার বংশমূল ইরাকে হলেও লালিত-পালিত হয়েছিলেন মানসুরায়। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। বেশ কয়েকটি ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। আবদুল্লাহ হুবারি তাকে রাজার আবেদনের বিষয়টি খুলে বললে বিজ্ঞ লোকটি ইসলামের সকল মৌলিক বিষয়াদিকে একগুচ্ছ কবিতার মালায় গেঁথে ফেললেন। তাতে ইসলামের যাবতীয় মৌলিক বিষয়সহ প্রাসঙ্গিক শিক্ষা-দীক্ষাও সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করেন। শাসক আবদুল্লাহ কবিতাগুচ্ছটি রাজা মাহরুকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। রাজা কবিতাগুলো শুনে বেশ আনন্দিত হলেন এবং আবদুল্লাহর নিকট কবিতার রচয়িতাকে রাজদরবারে পাঠানোর আবেদন করলেন। আবদুল্লাহ তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন। রাজাও তার প্রতি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন।
অতঃপর ২৭৩ হিজরিতে সিন্ধুর গভর্নর আবদুল্লার সঙ্গে উক্ত আলেমের সাক্ষাৎ হয়। আবদুল্লাহ তার নিকট রাজার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমি যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছি, তখনই তিনি খাঁটি অন্তরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু রাজত্ব হারানোর ভয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন নি। পাশাপাশি তিনি রাজার বিভিন্ন গুণ-গরিমার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, রাজা তাকে সিন্ধু ভাষায় কুরআনে কারিমের তাফসির লেখার জন্য আরজি জানালে তিনি প্রতিদিন কয়েক আয়াতের তাফসির করে রাজাকে শোনাতেন। একপর্যায়ে যখন সূরা ইয়াসিনের-
قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ.
কাফের বলে, মাটিতে মিশে পচে-গলে যাওয়া হাড়সমূহকে পুনরায় কে জীবিত করবে?
এ আয়াতে এসে পৌঁছলেন এবং এর তরজমা ও তাফসির রাজাকে শোনালেন, তখন তিনি পুনরায় উক্ত আয়াতের তাফসির শুনতে চাইলেন। দ্বিতীয়বার যখন উক্ত আয়াতের তরজমা ও তাফসির শুনলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মণি-মুক্তা খচিত সোনার আসন থেকে নেমে পড়লেন এবং কয়েক পা অগ্রসর হয়ে মাটিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অথচ তখন মাটি ছিল বেশ ভেজা। রাজা সেজদারত অবস্থায় এত অধিক কান্নাকাটি করেন যে, চোখের পানিতে কাদা সৃষ্টি হয়ে তা মুখমণ্ডলে লেগে একাকার হয়ে গেল। খানিকপর মাথা উঁচিয়ে বললেন, নিঃসন্দেহে তিনিই চিরন্তন ও শাশ্বত প্রতিপালক। এরপর তিনি একটি কামরা নির্মাণ করলেন। সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একাকী আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আর সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সকলে জানত, রাজা সেখানে বসে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে থাকেন。
টিকাঃ
১৬৯ সূরা ইয়াসিন : ৭৮
১৭০ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.৮৯-৯১
📄 সুলতান মাহমুদ গজনবি ও আবুল হাসান খেরকানি রহ.
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. একবার খোরাসান গমন করেন। অতঃপর সেখানকার বিখ্যাত বুজুর্গ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ জাগল; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, আমি এখানে শাইখ খেরকানির সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসি নি। অতএব, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা বেয়াদবি হবে। এ ভেবেই তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত মুলতবি করেন। দীর্ঘদিন পর তিনি পুনরায় গজনি থেকে স্রেফ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি'র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খেরকান গমন করেন। সাথে সাথে এক লোককে বলে পাঠালেন, সুলতান মাহমুদ গজনি থেকে এসেছেন। অতএব, সৌজন্য ও ভদ্রতার খাতিরে আপনি খানকা হতে বেরিয়ে আসুন সুলতানকে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেন। বার্তাবাহককে সুলতান এ-ও বলেছিলেন, যদি শাইখ খেরকানি বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানান, তবে তাঁকে আল্লাহ পাকের এই মহান বিধানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেবে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য হতে যারা দায়িত্বশীল তাদের।
বার্তাবাহক শায়খের নিকট সুলতানের পয়গام পৌঁছল; কিন্তু শাইখ খানকা হতে বের হতে অসম্মতি জানালেন এবং সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। বার্তাবাহক সুলতানের নির্দেশনা মোতাবেক আয়াতটি শোনালো। জবাবে শাইখ বললেন, আমাকে অপারগ মনে করো। সুলতান মাহমুদকে বলবে—আমি এখনো أطيعوا الله-এর আমলে এতই নিমগ্ন যে, রাসুলের আনুগত্যের হক পর্যন্ত আদায় করতে পারছি না; বরং এ ব্যাপারে আমি খুবই লজ্জিত। অতএব, اول الأمر-এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ কোথায়?
বার্তাবাহক এ সংবাদ গিয়ে সুলতান মাহমুদকে শুনালে তিনি কাঁদতে লাগলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, চলো, তাকে আমরা যা ভেবেছি, তিনি তা নন। তিনি আমদের ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
এরপর সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. আজব বেশ-ভূষায় খেরকানির দরবারে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নিজে পরলেন স্বীয় চাকর আয়াজের পোশাক। আর আয়াজকে পরালেন নিজের শাহি পোশাক। দশজন চাকরানীকে পরালেন চাকর-বাকরদের পোশাক। অতঃপর সদলবলে যখন সুলতান দরবারে প্রবেশ করে সমস্বরে সালাম দিলেন। শাইখ খেরকানি রহ. সালামের জবাব দিলেন ঠিকই; কিন্তু বাদশার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন না। আর আয়াজের পোশাক পরিহিত সুলতানের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও করলেন না; বরং সুলতানের পোশাক পরিহিত আয়াযের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এ অবস্থা দেখে আয়াযের পোশাক পরিহিত সুলতান শাইখকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী ব্যাপার! আপনি সুলতানের সম্মানার্থে একটু দাঁড়ালেনও না, তাঁর প্রতি একটু ভ্রুক্ষেপ করেও দেখলেন না? ফকিরি ও দরবেশি জগতের তেলেসমাতি কি এমনই যে, এখানে বাদশাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়?
শাইখ বললেন, হ্যাঁ! বিষয়টি এমনই। তবে তুমি যাকে এ ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলে সে মূলত ফাঁদে পড়ে নি; তুমিই বরং এ ফাঁদের বড় শিকার। সুলতান যখন বুঝতে পারলেন যে, শাইখ ব্যাপারটি আঁচ করে ফেলেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত আদবের সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে আরজ করলেন— অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, চাকরের পোশাকে সজ্জিত এ বেগানা চাকরানীগুলোকে দরবার থেকে বের করে দাও। সুলতান তাদের বের হবার নির্দেশ দিলে তারা বের হয়ে গেল। অতঃপর সুলতান আরজ করলেন, হজরত, দয়া করে যদি বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর কোনো ঘটনা আমাকে শোনাতেন!
শাইখ বললেন, বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর উক্তি হলো—যে আমাকে দেখতে পেরেছে, সে সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতনের বদ অভ্যাস থেকে রেহাই পেল।
সুলতান বললেন, কথাটি ঠিক বুঝলাম না! বায়েজিদ বোস্তামির মর্যাদা কি নবীজির চেয়েও বেশি? নবিজিকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেই শত ভাগ ভালো ছিলেন না। আবু জাহল ও আবু লাহাবও তাঁকে দেখেছে; কিন্তু তারা কাফেরই ছিল। তাহলে বায়েজিদের দর্শনকারী সকল জালেম কীভাবে ভালো মানুষে পরিণত হবে?
শাইখ সুলতানের এ কথা শুনে বললেন, মাহমুদ, নিজের অবস্থানানুপাতে কথা বলো। আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখো। একথা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নাও যে, নবীজিকে সাহাবায়ে কেরাম রাজিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া কেউ দেখে নি। কেন তুমি কুরআনে কারিমের এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য করো নি—
وَتَرَاهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ .
আর আপনি তাদেরকে দেখবেন যে, তারা আপনার প্রতি তাকিয়ে আছে, বস্তুত তারা কিছুই দেখছে না।
সুলতান মাহমুদ শায়খের এ কথাটি বেশ পছন্দ করলেন এবং আরজি পেশ করলেন—আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, তুমি চারটি কাজকে আঁকড়ে ধরবে—
✓ ১.গুনাহ পরিহার
✓ ২. জামাতে নামাজ
✓ ৩. দান-দক্ষিণা
✓ ৪. দয়া-মায়া।
অতঃপর সুলতান দুআর আবেদন জানালে শাইখ বললেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর দুআ করি—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ.
হে আল্লাহ, আপনি মুমিন নারী ও পুরুষ—সকলকে মাফ করে দেন।
সুলতান বললেন, এটা তো ঢালাও দুআ। আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দুআ করবেন!
শাইখ বললেন, মাহমুদ, তুমি যাও। তোমার পরিণামও তোমার নামের মতো মাহমুদ [প্রশংসিত] হোক!
ফেরার মুহূর্তে সুলতান একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে শায়খের খেদমতে পেশ করলেন। শাইখ সুলতানের সামনে জবের রুটি পেশ করে তাকে খেতে বললেন। সুলতান রুটির একাংশ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বুঝলেন যে, রুটিটা অত্যন্ত শক্ত। দীর্ঘক্ষণ চিবানোর পরও রুটি না বিন্দুমাত্র নরম হয়েছে আর না গলধঃকরণ সম্ভব হয়েছে!
শাইখ জিজ্ঞাসা করলেন—রুটিটা তোমার কণ্ঠনালিতে আটকে যাচ্ছে, তাই না? সুলতান হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। শাইখ বললেন, আমার এ জবের শুকনো রুটি যেমন তোমার কণ্ঠনালিতে পৌঁছতে কষ্ট হচ্ছে, অনুরূপ তোমার স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি এ থলেটিও আমার কণ্ঠনালি ভেদ করতে কষ্ট হচ্ছে। এটা আমার সামনে থেকে সরাও। আমি অনেক আগেই এসবকে পরিহার করেছি।
সুলতান মাহমুদ শায়খের স্মৃতিস্বরূপ কোনো কিছু চাইলেন। শাইখ তাকে নিজের ছেঁড়া-ফাঁড়া দরবেশি জামা দান করলেন। সুলতান শায়খের মজলিস হতে বিদায়ের জন্য দাঁড়ালে শাইখও তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন।
সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন—হজরত, আমি যখন আপনার দরবারে এসেছি তখন আপনি আমার প্রতি একটুও ভ্রুক্ষেপ করেন নি। আর এখন কিনা আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন!
শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ. বললেন, যখন তুমি আমার দরবারে প্রবেশ করেছ, তোমার সঙ্গে ছিল চাকর-বাকর। তুমি বাদশাহি অহঙ্কারে মত্ত ছিলে। তখন এসেছিলে পরীক্ষা করার জন্য। আর এখন তুমি বিদায় নিচ্ছ নিজেকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে。
টিকাঃ
১৭১ সূরা নিসা: ৫৯
১৭২ সূরা আরাফ: ১৯৮
১৭৩ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.১০৯-১১৩
সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. একবার খোরাসান গমন করেন। অতঃপর সেখানকার বিখ্যাত বুজুর্গ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ জাগল; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, আমি এখানে শাইখ খেরকানির সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসি নি। অতএব, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা বেয়াদবি হবে। এ ভেবেই তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত মুলতবি করেন। দীর্ঘদিন পর তিনি পুনরায় গজনি থেকে স্রেফ শাইখ আবুল হাসান খেরকানি'র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খেরকান গমন করেন। সাথে সাথে এক লোককে বলে পাঠালেন, সুলতান মাহমুদ গজনি থেকে এসেছেন। অতএব, সৌজন্য ও ভদ্রতার খাতিরে আপনি খানকা হতে বেরিয়ে আসুন সুলতানকে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেন। বার্তাবাহককে সুলতান এ-ও বলেছিলেন, যদি শাইখ খেরকানি বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানান, তবে তাঁকে আল্লাহ পাকের এই মহান বিধানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেবে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য হতে যারা দায়িত্বশীল তাদের।
বার্তাবাহক শায়খের নিকট সুলতানের পয়গام পৌঁছল; কিন্তু শাইখ খানকা হতে বের হতে অসম্মতি জানালেন এবং সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। বার্তাবাহক সুলতানের নির্দেশনা মোতাবেক আয়াতটি শোনালো। জবাবে শাইখ বললেন, আমাকে অপারগ মনে করো। সুলতান মাহমুদকে বলবে—আমি এখনো أطيعوا الله-এর আমলে এতই নিমগ্ন যে, রাসুলের আনুগত্যের হক পর্যন্ত আদায় করতে পারছি না; বরং এ ব্যাপারে আমি খুবই লজ্জিত। অতএব, اول الأمر-এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ কোথায়?
বার্তাবাহক এ সংবাদ গিয়ে সুলতান মাহমুদকে শুনালে তিনি কাঁদতে লাগলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, চলো, তাকে আমরা যা ভেবেছি, তিনি তা নন। তিনি আমদের ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
এরপর সুলতান মাহমুদ গজনবি রহ. আজব বেশ-ভূষায় খেরকানির দরবারে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নিজে পরলেন স্বীয় চাকর আয়াজের পোশাক। আর আয়াজকে পরালেন নিজের শাহি পোশাক। দশজন চাকরানীকে পরালেন চাকর-বাকরদের পোশাক। অতঃপর সদলবলে যখন সুলতান দরবারে প্রবেশ করে সমস্বরে সালাম দিলেন। শাইখ খেরকানি রহ. সালামের জবাব দিলেন ঠিকই; কিন্তু বাদশার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন না। আর আয়াজের পোশাক পরিহিত সুলতানের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও করলেন না; বরং সুলতানের পোশাক পরিহিত আয়াযের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এ অবস্থা দেখে আয়াযের পোশাক পরিহিত সুলতান শাইখকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কী ব্যাপার! আপনি সুলতানের সম্মানার্থে একটু দাঁড়ালেনও না, তাঁর প্রতি একটু ভ্রুক্ষেপ করেও দেখলেন না? ফকিরি ও দরবেশি জগতের তেলেসমাতি কি এমনই যে, এখানে বাদশাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়?
শাইখ বললেন, হ্যাঁ! বিষয়টি এমনই। তবে তুমি যাকে এ ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলে সে মূলত ফাঁদে পড়ে নি; তুমিই বরং এ ফাঁদের বড় শিকার। সুলতান যখন বুঝতে পারলেন যে, শাইখ ব্যাপারটি আঁচ করে ফেলেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত আদবের সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে আরজ করলেন— অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, চাকরের পোশাকে সজ্জিত এ বেগানা চাকরানীগুলোকে দরবার থেকে বের করে দাও। সুলতান তাদের বের হবার নির্দেশ দিলে তারা বের হয়ে গেল। অতঃপর সুলতান আরজ করলেন, হজরত, দয়া করে যদি বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর কোনো ঘটনা আমাকে শোনাতেন!
শাইখ বললেন, বায়েজিদ বোস্তামি রহ.-এর উক্তি হলো—যে আমাকে দেখতে পেরেছে, সে সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতনের বদ অভ্যাস থেকে রেহাই পেল।
সুলতান বললেন, কথাটি ঠিক বুঝলাম না! বায়েজিদ বোস্তামির মর্যাদা কি নবীজির চেয়েও বেশি? নবিজিকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেই শত ভাগ ভালো ছিলেন না। আবু জাহল ও আবু লাহাবও তাঁকে দেখেছে; কিন্তু তারা কাফেরই ছিল। তাহলে বায়েজিদের দর্শনকারী সকল জালেম কীভাবে ভালো মানুষে পরিণত হবে?
শাইখ সুলতানের এ কথা শুনে বললেন, মাহমুদ, নিজের অবস্থানানুপাতে কথা বলো। আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখো। একথা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নাও যে, নবীজিকে সাহাবায়ে কেরাম রাজিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া কেউ দেখে নি। কেন তুমি কুরআনে কারিমের এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য করো নি—
وَتَرَاهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ .
আর আপনি তাদেরকে দেখবেন যে, তারা আপনার প্রতি তাকিয়ে আছে, বস্তুত তারা কিছুই দেখছে না।
সুলতান মাহমুদ শায়খের এ কথাটি বেশ পছন্দ করলেন এবং আরজি পেশ করলেন—আমাকে কিছু নসিহত করেন!
শাইখ বললেন, তুমি চারটি কাজকে আঁকড়ে ধরবে—
✓ ১.গুনাহ পরিহার
✓ ২. জামাতে নামাজ
✓ ৩. দান-দক্ষিণা
✓ ৪. দয়া-মায়া।
অতঃপর সুলতান দুআর আবেদন জানালে শাইখ বললেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর দুআ করি—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ.
হে আল্লাহ, আপনি মুমিন নারী ও পুরুষ—সকলকে মাফ করে দেন।
সুলতান বললেন, এটা তো ঢালাও দুআ। আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দুআ করবেন!
শাইখ বললেন, মাহমুদ, তুমি যাও। তোমার পরিণামও তোমার নামের মতো মাহমুদ [প্রশংসিত] হোক!
ফেরার মুহূর্তে সুলতান একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে শায়খের খেদমতে পেশ করলেন। শাইখ সুলতানের সামনে জবের রুটি পেশ করে তাকে খেতে বললেন। সুলতান রুটির একাংশ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বুঝলেন যে, রুটিটা অত্যন্ত শক্ত। দীর্ঘক্ষণ চিবানোর পরও রুটি না বিন্দুমাত্র নরম হয়েছে আর না গলধঃকরণ সম্ভব হয়েছে!
শাইখ জিজ্ঞাসা করলেন—রুটিটা তোমার কণ্ঠনালিতে আটকে যাচ্ছে, তাই না? সুলতান হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। শাইখ বললেন, আমার এ জবের শুকনো রুটি যেমন তোমার কণ্ঠনালিতে পৌঁছতে কষ্ট হচ্ছে, অনুরূপ তোমার স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি এ থলেটিও আমার কণ্ঠনালি ভেদ করতে কষ্ট হচ্ছে। এটা আমার সামনে থেকে সরাও। আমি অনেক আগেই এসবকে পরিহার করেছি।
সুলতান মাহমুদ শায়খের স্মৃতিস্বরূপ কোনো কিছু চাইলেন। শাইখ তাকে নিজের ছেঁড়া-ফাঁড়া দরবেশি জামা দান করলেন। সুলতান শায়খের মজলিস হতে বিদায়ের জন্য দাঁড়ালে শাইখও তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন।
সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন—হজরত, আমি যখন আপনার দরবারে এসেছি তখন আপনি আমার প্রতি একটুও ভ্রুক্ষেপ করেন নি। আর এখন কিনা আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন!
শাইখ আবুল হাসান খেরকানি রহ. বললেন, যখন তুমি আমার দরবারে প্রবেশ করেছ, তোমার সঙ্গে ছিল চাকর-বাকর। তুমি বাদশাহি অহঙ্কারে মত্ত ছিলে। তখন এসেছিলে পরীক্ষা করার জন্য। আর এখন তুমি বিদায় নিচ্ছ নিজেকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করে。
টিকাঃ
১৭১ সূরা নিসা: ৫৯
১৭২ সূরা আরাফ: ১৯৮
১৭৩ ফুকাহায়ে হিন্দ: পৃ.১০৯-১১৩