📄 স্ত্রীকে লেখা গাজি আনোয়ার পাশার হৃদয়ছোঁয়া শেষ চিঠি
গাজি আনোয়ার পাশা। তুর্কি বীর মুজাহিদদের একজন। যিনি আজীবন ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে বীরবিক্রম যুদ্ধ করেন। অবশেষে রাশিয়ার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত জিহাদে প্রাণপণ যুদ্ধ করে শাহাদাতের অমীয় সুধাপান করেন। এই লড়াকু শাহাদাতের মাত্র একদিন পূর্বে প্রিয়তমা স্ত্রী নাজিয়া সুলতানার নামে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। শাহজাদি নাজিয়া পরবর্তী সময়ে সে চিঠি তুরস্কের সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন। তারই অনুবাদ ২২ এপ্রিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। পত্রটি এতোটাই আবেদনময়ী, মর্মস্পর্শী ও শিক্ষণীয় যে, প্রত্যেক নওজোয়ানের জন্যই তা পাঠ করা উচিত। এখানে অনুবাদটি পেশ করা হলো :
আমার জীবনসঙ্গিনী, আমার সুখ ও স্বপ্নের ঠিকানা, প্রিয়তমা নাজিয়া! মহান আল্লাহ তোমার সহায়।
তোমার লেখা সর্বশেষ পত্রটি এ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে। বিশ্বাস করো, তোমার এ চিঠি আমার হৃদয়ে মিশে থাকবে আজীবন। তোমার মায়াবী চেহারা আজ আমি দেখতে পাচ্ছি না সত্য, কিন্তু তোমার লেখা চিঠির প্রতিটি ছত্রে-ছত্রে অক্ষরে-অক্ষরে দৃষ্টিপাত করলেই তোমার আঙুলগুলো নড়াচড়ার দৃশ্য আমার দু'নয়নে ভেসে ওঠে। যেগুলো এক সময় আমার এলোকেশ নিয়ে খেলা করত। তাঁবুঘেরা এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভেসে উঠছে তোমার কান্তিময় মুখ। হায়! তুমি লিখেছ— আমি কি-না তোমায় ভুলে বসে আছি। তোমার ভালোবাসার কোনো মূল্য দিই নি! তুমি বলেছ, আমি তোমার প্রেম-পিয়াসি হৃদয়কে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দূর দেশের এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগুন আর রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে আছি! আর আমি মোটেও ভাবছি না যে, একজন অবলা নারী নিস্তব্ধ রজনীতে আমার বিরহের বেদনায় অস্থির হয়ে আছে। আর আকাশের তারা গুনছে। তুমি এও বলেছ, আমি নিছক তরবারির প্রতিই আসক্ত ও অনুরক্ত। অথচ এ কথাগুলো লেখার সময় তুমি হয়তো একটুও ভেবে দেখো নি যে, তোমার প্রতিটি শব্দের বাণ—যা তুমি নিঃসন্দেহে নিখাদ ভালোবাসার টানেই লিখেছ—আমার অবুঝ হৃদয়ে কতটা খুন ঝরাবে! আমি তোমাকে কী করে বোঝাবো যে, এ পৃথিবীতে তোমার ভালোবাসাই আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তুমিই আমার সকল ভালোবাসার শুরু ও শেষ। তুমিই আমার সকল ভালোবাসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। ইতোপূর্বে আমি কখনো কাউকে ভালোবাসি নি। একমাত্র তুমিই আমার হৃদয় ছিনিয়ে নিয়েছ। তবুও আজ কেন আমি এতো দূরে! কেন তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি! হে প্রিয়তমা, এ প্রশ্ন তুমি অবশ্যই করতে পারো। তাহলে শোনো—আমি কোনো ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভবের আশায় এই ভিনদেশে আসি নি। তাছাড়া আমি যে এখানে এসে নিজের জন্য কোনো রাজসিংহাসন নির্মাণ করছি তাও তো নয়! যেমনটি আমার শত্রুরা রটিয়েছে! আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে অর্পিত দায়িত্বের টানেই কেবল তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে বড় দায়িত্ব আর কী আছে বলো? আর এটি এমনই মহিমাময় ফরজ, যার প্রতিজ্ঞা করলেই মানুষ 'জান্নাতুল ফেরদাউস'-এর মালিক হতে পারে। আলহামদু লিল্লাহ, আমি কেবল প্রতিজ্ঞাতেই সীমাবদ্ধ থাকি নি; বরং বাস্তবে এই কর্তব্য আদায় করতে যাচ্ছি এখন।
প্রিয়তমা, তোমার বিয়োগ-ব্যথা সদ্য শানিত তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো—যা আমার হৃদয়কে সর্বক্ষণ ক্ষত-বিক্ষত করে; কিন্তু এই বিরহ ব্যথাতেও আমি বেশ আনন্দিত, দারুণ তৃপ্ত। কেননা, শুধু তোমার ভালোবাসাই আমার প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় এক চ্যালেঞ্জ। ছিল এক মহা পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলার দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া, এই পরীক্ষায় আমি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি। এবং আল্লাহ তাআলার মহব্বত ও তাঁর নির্দেশকে নিজের প্রেম ও মনের চাহিদার ওপর প্রাধান্য দেওয়ার পরীক্ষায় সফল হয়েছি। এজন্য অবশ্য তোমারও আনন্দিত হওয়া উচিত একথা ভেবে যে, তোমার ভালোবাসার মানুষটির ঈমান অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত। যার কারণে তিনি আল্লাহর ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে তোমার ভালোবাসাকে অবলীলায় বলি দিতে পেরেছেন। ওগো প্রিয়া, তোমার ওপর তরবারির জিহাদ ফরজ নয়। তাই বলে তুমি জিহাদের বিধানের আওতামুক্ত নও। কারণ, নারী কিংবা পুরুষ, কোনো মুসলিমই জিহাদের বিধানের বাইরে নয়। তোমার জিহাদ হলো, তুমিও নিজের চাহিদা ও ভালোবাসার ওপর আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রধান্য দেবে। স্বামীর সঙ্গে আন্তরিক ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। মনে রেখো—এই কামনা কখনোই করবে না, তোমার স্বামী রণাঙ্গন হতে অক্ষতবস্থায় তোমার আদর- সোহাগ ও ভালোবাসার কোলে ফিরে আসুক। কারণ, এই কামনা হবে শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, যা আল্লাহর নিকট ঘৃণিত; বরং সর্বক্ষণ এই দুআ করবে—‘আল্লাহ তাআলা যেন তোমার স্বামীর জিহাদ কবুল করেন। তাকে বিজয়বেশে ফিরিয়ে আনেন। নতুবা শাহাদাতের অমীয় সুধা সেই ঠোঁটে পান করান, যে ঠোঁট কখনো নাপাক মদ দ্বারা সিক্ত হয় নি; বরং আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াতে সদা সতেজ ছিল।
প্রিয় নাজিয়া, আহ! সে মুহূর্তটি কতইনা বরকতপূর্ণ ও মহিমাময় হবে, যখন আল্লাহর রাস্তায় এ শির, যাকে তুমি অত্যন্ত চমৎকার বলতে, দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিথর পড়ে থাকবে। যে দেহ তোমার ভালোবাসার দৃষ্টিতে কোনো যোদ্ধার দেহ ছিল না; ছিল এক সুঠামদেহী লাবণ্যময় সুপুরুষের দেহ। এ মুহূর্তে আমার সবচে' প্রবল ইচ্ছা ও বাসনা হলো শহিদ হওয়া এবং খালেদ বিন ওয়ালিদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়া। এ দুনিয়ার প্রাপ্তি ও তৃপ্তি যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কী অর্থ? মৃত্যু যখন সুনিশ্চিত, তবে বিছানায় শুয়ে মরবো কেন? শহিদি মরণই কাম্য। কারণ, শহিদি মরণ মরণ নয়; বরং প্রকৃত জীবন। অনন্ত-অসীম জীবন।
নাজিয়া, তোমার প্রতি আমার প্রথম অসিয়ত হলো—আমি শহিদ হয়ে গেলে তোমার দেবর নুরিপাশার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাবে। তোমার পরে আমার নিকট সবচে' প্রিয় পাত্র হলো নুরি। আমি চাই আমার মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে আমরণ সে বিশ্বস্ততার সাথে তোমার সেবা করুক। আমার দ্বিতীয় অসিয়ত হলো—তোমার যত সন্তান হবে তাদের সকলকে আমার জীবন-কাহিনি শুনাবে এবং তাদেরকে ইসলাম ও দেশের জন্য জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় পাঠিয়ে দেবে। যদি তুমি আমার এ অসিয়ত পূর্ণ না করো, তবে মনে রেখো, জান্নাতে আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে না। আমার তৃতীয় অসিয়ত হলো, মোস্তফা কামাল পাশার সঙ্গে সদা সদাচার করবে। যথাসাধ্য তার সাহায্য করবে। কারণ, এ মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তার ওপরই নির্ভরশীল রেখেছেন।
প্রিয়তমা, এবার তাহলে বিদায় দাও। কেন যেন আমার মন বলছে, এ চিঠিই তোমার प्रति আমার জীবনের শেষ চিঠি। এরপর আর কখনো কোনো চিঠি লেখার সুযোগ হবে না। কী আশ্চর্য! আগামীকালই হয়তো আমি শহিদ হয়ে যাবো! দেখো, ধৈর্য হারাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর রাস্তায় কবুল করেছেন—এটা তোমার জন্য গর্বের বিষয়। অতএব, আমার শাহাদাতের পর ব্যাকুল ও অস্থির না হয়ে খুশি ও আনন্দিত হবে।
নাজিয়া, এখন বিদায় নিচ্ছি। আমার স্বপ্ন ও কল্পনার জগতে তোমাকে আলিঙ্গন করছি। ইন শা আল্লাহ, জান্নাতে দেখা হবে। তারপর আর কখনো বিচ্ছিন্ন হবো না।
ইতি তোমার আনোয়ার।
উল্লেখ্য, এ চিঠি লেখার সময় মোস্তফা কামাল পাশা কেবলমাত্র ইসলামের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তখনো তিনি তুরস্কে ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি, যেসব পদক্ষেপ তাকে পরবর্তী সময়ে জগদ্বিখ্যাত করেছিল।
টিকাঃ
১৪১ আবদুল মজিদ আতিকি কর্তৃক রচিত কাবুল বুক ডিপো লাহোর থেকে প্রকাশিত ‘তুরকানে আহরার' গ্রন্থ হতে সংগৃহীত : পৃ.১২৭-১৩০
গাজি আনোয়ার পাশা। তুর্কি বীর মুজাহিদদের একজন। যিনি আজীবন ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে বীরবিক্রম যুদ্ধ করেন। অবশেষে রাশিয়ার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত জিহাদে প্রাণপণ যুদ্ধ করে শাহাদাতের অমীয় সুধাপান করেন। এই লড়াকু শাহাদাতের মাত্র একদিন পূর্বে প্রিয়তমা স্ত্রী নাজিয়া সুলতানার নামে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। শাহজাদি নাজিয়া পরবর্তী সময়ে সে চিঠি তুরস্কের সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন। তারই অনুবাদ ২২ এপ্রিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। পত্রটি এতোটাই আবেদনময়ী, মর্মস্পর্শী ও শিক্ষণীয় যে, প্রত্যেক নওজোয়ানের জন্যই তা পাঠ করা উচিত। এখানে অনুবাদটি পেশ করা হলো :
আমার জীবনসঙ্গিনী, আমার সুখ ও স্বপ্নের ঠিকানা, প্রিয়তমা নাজিয়া! মহান আল্লাহ তোমার সহায়।
তোমার লেখা সর্বশেষ পত্রটি এ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে। বিশ্বাস করো, তোমার এ চিঠি আমার হৃদয়ে মিশে থাকবে আজীবন। তোমার মায়াবী চেহারা আজ আমি দেখতে পাচ্ছি না সত্য, কিন্তু তোমার লেখা চিঠির প্রতিটি ছত্রে-ছত্রে অক্ষরে-অক্ষরে দৃষ্টিপাত করলেই তোমার আঙুলগুলো নড়াচড়ার দৃশ্য আমার দু'নয়নে ভেসে ওঠে। যেগুলো এক সময় আমার এলোকেশ নিয়ে খেলা করত। তাঁবুঘেরা এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভেসে উঠছে তোমার কান্তিময় মুখ। হায়! তুমি লিখেছ— আমি কি-না তোমায় ভুলে বসে আছি। তোমার ভালোবাসার কোনো মূল্য দিই নি! তুমি বলেছ, আমি তোমার প্রেম-পিয়াসি হৃদয়কে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দূর দেশের এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগুন আর রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে আছি! আর আমি মোটেও ভাবছি না যে, একজন অবলা নারী নিস্তব্ধ রজনীতে আমার বিরহের বেদনায় অস্থির হয়ে আছে। আর আকাশের তারা গুনছে। তুমি এও বলেছ, আমি নিছক তরবারির প্রতিই আসক্ত ও অনুরক্ত। অথচ এ কথাগুলো লেখার সময় তুমি হয়তো একটুও ভেবে দেখো নি যে, তোমার প্রতিটি শব্দের বাণ—যা তুমি নিঃসন্দেহে নিখাদ ভালোবাসার টানেই লিখেছ—আমার অবুঝ হৃদয়ে কতটা খুন ঝরাবে! আমি তোমাকে কী করে বোঝাবো যে, এ পৃথিবীতে তোমার ভালোবাসাই আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তুমিই আমার সকল ভালোবাসার শুরু ও শেষ। তুমিই আমার সকল ভালোবাসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু। ইতোপূর্বে আমি কখনো কাউকে ভালোবাসি নি। একমাত্র তুমিই আমার হৃদয় ছিনিয়ে নিয়েছ। তবুও আজ কেন আমি এতো দূরে! কেন তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি! হে প্রিয়তমা, এ প্রশ্ন তুমি অবশ্যই করতে পারো। তাহলে শোনো—আমি কোনো ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভবের আশায় এই ভিনদেশে আসি নি। তাছাড়া আমি যে এখানে এসে নিজের জন্য কোনো রাজসিংহাসন নির্মাণ করছি তাও তো নয়! যেমনটি আমার শত্রুরা রটিয়েছে! আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে অর্পিত দায়িত্বের টানেই কেবল তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে বড় দায়িত্ব আর কী আছে বলো? আর এটি এমনই মহিমাময় ফরজ, যার প্রতিজ্ঞা করলেই মানুষ 'জান্নাতুল ফেরদাউস'-এর মালিক হতে পারে। আলহামদু লিল্লাহ, আমি কেবল প্রতিজ্ঞাতেই সীমাবদ্ধ থাকি নি; বরং বাস্তবে এই কর্তব্য আদায় করতে যাচ্ছি এখন।
প্রিয়তমা, তোমার বিয়োগ-ব্যথা সদ্য শানিত তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো—যা আমার হৃদয়কে সর্বক্ষণ ক্ষত-বিক্ষত করে; কিন্তু এই বিরহ ব্যথাতেও আমি বেশ আনন্দিত, দারুণ তৃপ্ত। কেননা, শুধু তোমার ভালোবাসাই আমার প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় এক চ্যালেঞ্জ। ছিল এক মহা পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলার দরবারে অসংখ্য শুকরিয়া, এই পরীক্ষায় আমি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি। এবং আল্লাহ তাআলার মহব্বত ও তাঁর নির্দেশকে নিজের প্রেম ও মনের চাহিদার ওপর প্রাধান্য দেওয়ার পরীক্ষায় সফল হয়েছি। এজন্য অবশ্য তোমারও আনন্দিত হওয়া উচিত একথা ভেবে যে, তোমার ভালোবাসার মানুষটির ঈমান অত্যন্ত দৃঢ় ও মজবুত। যার কারণে তিনি আল্লাহর ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে তোমার ভালোবাসাকে অবলীলায় বলি দিতে পেরেছেন। ওগো প্রিয়া, তোমার ওপর তরবারির জিহাদ ফরজ নয়। তাই বলে তুমি জিহাদের বিধানের আওতামুক্ত নও। কারণ, নারী কিংবা পুরুষ, কোনো মুসলিমই জিহাদের বিধানের বাইরে নয়। তোমার জিহাদ হলো, তুমিও নিজের চাহিদা ও ভালোবাসার ওপর আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রধান্য দেবে। স্বামীর সঙ্গে আন্তরিক ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। মনে রেখো—এই কামনা কখনোই করবে না, তোমার স্বামী রণাঙ্গন হতে অক্ষতবস্থায় তোমার আদর- সোহাগ ও ভালোবাসার কোলে ফিরে আসুক। কারণ, এই কামনা হবে শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, যা আল্লাহর নিকট ঘৃণিত; বরং সর্বক্ষণ এই দুআ করবে—‘আল্লাহ তাআলা যেন তোমার স্বামীর জিহাদ কবুল করেন। তাকে বিজয়বেশে ফিরিয়ে আনেন। নতুবা শাহাদাতের অমীয় সুধা সেই ঠোঁটে পান করান, যে ঠোঁট কখনো নাপাক মদ দ্বারা সিক্ত হয় নি; বরং আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াতে সদা সতেজ ছিল।
প্রিয় নাজিয়া, আহ! সে মুহূর্তটি কতইনা বরকতপূর্ণ ও মহিমাময় হবে, যখন আল্লাহর রাস্তায় এ শির, যাকে তুমি অত্যন্ত চমৎকার বলতে, দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিথর পড়ে থাকবে। যে দেহ তোমার ভালোবাসার দৃষ্টিতে কোনো যোদ্ধার দেহ ছিল না; ছিল এক সুঠামদেহী লাবণ্যময় সুপুরুষের দেহ। এ মুহূর্তে আমার সবচে' প্রবল ইচ্ছা ও বাসনা হলো শহিদ হওয়া এবং খালেদ বিন ওয়ালিদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়া। এ দুনিয়ার প্রাপ্তি ও তৃপ্তি যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কী অর্থ? মৃত্যু যখন সুনিশ্চিত, তবে বিছানায় শুয়ে মরবো কেন? শহিদি মরণই কাম্য। কারণ, শহিদি মরণ মরণ নয়; বরং প্রকৃত জীবন। অনন্ত-অসীম জীবন।
নাজিয়া, তোমার প্রতি আমার প্রথম অসিয়ত হলো—আমি শহিদ হয়ে গেলে তোমার দেবর নুরিপাশার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাবে। তোমার পরে আমার নিকট সবচে' প্রিয় পাত্র হলো নুরি। আমি চাই আমার মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে আমরণ সে বিশ্বস্ততার সাথে তোমার সেবা করুক। আমার দ্বিতীয় অসিয়ত হলো—তোমার যত সন্তান হবে তাদের সকলকে আমার জীবন-কাহিনি শুনাবে এবং তাদেরকে ইসলাম ও দেশের জন্য জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় পাঠিয়ে দেবে। যদি তুমি আমার এ অসিয়ত পূর্ণ না করো, তবে মনে রেখো, জান্নাতে আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে না। আমার তৃতীয় অসিয়ত হলো, মোস্তফা কামাল পাশার সঙ্গে সদা সদাচার করবে। যথাসাধ্য তার সাহায্য করবে। কারণ, এ মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তার ওপরই নির্ভরশীল রেখেছেন।
প্রিয়তমা, এবার তাহলে বিদায় দাও। কেন যেন আমার মন বলছে, এ চিঠিই তোমার प्रति আমার জীবনের শেষ চিঠি। এরপর আর কখনো কোনো চিঠি লেখার সুযোগ হবে না। কী আশ্চর্য! আগামীকালই হয়তো আমি শহিদ হয়ে যাবো! দেখো, ধৈর্য হারাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর রাস্তায় কবুল করেছেন—এটা তোমার জন্য গর্বের বিষয়। অতএব, আমার শাহাদাতের পর ব্যাকুল ও অস্থির না হয়ে খুশি ও আনন্দিত হবে।
নাজিয়া, এখন বিদায় নিচ্ছি। আমার স্বপ্ন ও কল্পনার জগতে তোমাকে আলিঙ্গন করছি। ইন শা আল্লাহ, জান্নাতে দেখা হবে। তারপর আর কখনো বিচ্ছিন্ন হবো না।
ইতি তোমার আনোয়ার।
উল্লেখ্য, এ চিঠি লেখার সময় মোস্তফা কামাল পাশা কেবলমাত্র ইসলামের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তখনো তিনি তুরস্কে ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি, যেসব পদক্ষেপ তাকে পরবর্তী সময়ে জগদ্বিখ্যাত করেছিল।
টিকাঃ
১৪১ আবদুল মজিদ আতিকি কর্তৃক রচিত কাবুল বুক ডিপো লাহোর থেকে প্রকাশিত ‘তুরকানে আহরার' গ্রন্থ হতে সংগৃহীত : পৃ.১২৭-১৩০
📄 দুই ভাইয়ের একরাত
মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির রহ. ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ও হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি বলেন, একদিন আমি সারা রাত আমার মায়ের পা টিপছিলাম। আর আমার ভাই আবু বকর ইবনুল মুনকাদির রাতভর নামাজ পড়ছিল; কিন্তু কিছুতেই আমি আমার রাতটিকে তার রাতের বিনিময়ে গ্রহণ করতে রাজি নই।
টিকাঃ
১৪২ শামসুল আইম্মাহ সারাখসি, আল-মাবসুত : ১০/১৪০
মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির রহ. ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ও হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি বলেন, একদিন আমি সারা রাত আমার মায়ের পা টিপছিলাম। আর আমার ভাই আবু বকর ইবনুল মুনকাদির রাতভর নামাজ পড়ছিল; কিন্তু কিছুতেই আমি আমার রাতটিকে তার রাতের বিনিময়ে গ্রহণ করতে রাজি নই।
টিকাঃ
১৪২ শামসুল আইম্মাহ সারাখসি, আল-মাবসুত : ১০/১৪০
📄 রণাঙ্গনে দুই সাহাবির দুআ
ইমাম বাগাবি রহ. সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাজিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদযুদ্ধ চলাকালীন আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, আসেন, আমরা উভয়ে মিলে দুআ করি। অতঃপর আমরা ময়দানের এক কোণে চলে যাই। আমি দুআ করলাম-হে আল্লাহ, আগামীকাল যখন যুদ্ধ আরম্ভ হবে, আমার মোকাবেলা যেন কোনো হৃষ্টপুষ্ট তাগড়া নওজোয়ানের সঙ্গে হয়। আমি তার সঙ্গে কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য লড়বো। আপনি আমাকে উক্ত যুদ্ধে জয়ী করেন!
আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহু আমার দুআ শুনে আমিন বললেন। তারপর তিনি দুআ করলেন-হে আল্লাহ, আগামীকাল আমাকে কোনো শক্তিশালী কাফেরের মোকাবেলা করার তাওফিক দেন! তার সঙ্গে আমি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য লড়াই করবো। অতঃপর আমার প্রতিপক্ষ কাফের যেন আমাকে পাকড়াও করে আমার নাক, কান ইত্যাদি কেটে দেয়। যাতে কিয়ামতের দিন আপনার সামনে আরজ করতে পারি-হে আল্লাহ, আমি আপনার ও আপনার রাসুলের রাস্তায় এ নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সেদিন আপনি আমার কথার সমর্থন জানাবেন।
সাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহুর দুআ আমার দুআর চেয়ে উত্তম ছিল। অতঃপর পরের দিন আমি দেখলাম, যথারীতি তার নাক ও কান কাটা অবস্থায় একটি সুতোয় ঝুলছে!
টিকাঃ
১৪৩ আল-ইসাবাহ: ২/২৭৮
ইমাম বাগাবি রহ. সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাজিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদযুদ্ধ চলাকালীন আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, আসেন, আমরা উভয়ে মিলে দুআ করি। অতঃপর আমরা ময়দানের এক কোণে চলে যাই। আমি দুআ করলাম-হে আল্লাহ, আগামীকাল যখন যুদ্ধ আরম্ভ হবে, আমার মোকাবেলা যেন কোনো হৃষ্টপুষ্ট তাগড়া নওজোয়ানের সঙ্গে হয়। আমি তার সঙ্গে কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য লড়বো। আপনি আমাকে উক্ত যুদ্ধে জয়ী করেন!
আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহু আমার দুআ শুনে আমিন বললেন। তারপর তিনি দুআ করলেন-হে আল্লাহ, আগামীকাল আমাকে কোনো শক্তিশালী কাফেরের মোকাবেলা করার তাওফিক দেন! তার সঙ্গে আমি আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য লড়াই করবো। অতঃপর আমার প্রতিপক্ষ কাফের যেন আমাকে পাকড়াও করে আমার নাক, কান ইত্যাদি কেটে দেয়। যাতে কিয়ামতের দিন আপনার সামনে আরজ করতে পারি-হে আল্লাহ, আমি আপনার ও আপনার রাসুলের রাস্তায় এ নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সেদিন আপনি আমার কথার সমর্থন জানাবেন।
সাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাজিয়াল্লাহু আনহুর দুআ আমার দুআর চেয়ে উত্তম ছিল। অতঃপর পরের দিন আমি দেখলাম, যথারীতি তার নাক ও কান কাটা অবস্থায় একটি সুতোয় ঝুলছে!
টিকাঃ
১৪৩ আল-ইসাবাহ: ২/২৭৮
📄 অকুতোভয় ঈমানদীপ্ত এক সাহাবির কাহিনি
একদা খলিফাতুল মুসলিমিন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু রোমের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল পাঠালেন। শত্রুরা তাকেসহ কাফেলার সকলকে বন্দি করে ফেলল। এ মহান ব্যক্তিকে যখন রোম-সম্রাটের দরবারে নিয়ে যাওয়া হলো, সম্রাট তাকে এ মর্মে প্রস্তাব প্রদান করে যে, যদি তুমি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করো তবে তোমাকে আমার সাম্রাজ্যের অংশীদার করবো। হতভাগা সম্রাট ভেবেছিল ধন-সম্পদ ও পদমর্যাদার মোহ এ মরুচারী যাযাবরকে কাত করে দেবে; কিন্তু তার ধারণা ছিল না যে, তার সামনে দণ্ডায়মান মুহাম্মাদে আরাবির একজন ভক্ত ও আত্মনিবেদিত সাহাবি। যার অভাব-অনটন ও দরিদ্রতার সম্মুখে এক-দুটি নয়-হাজারো সাম্রাজ্য উৎসর্গ হয়ে থাকে。
আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু তার প্রস্তাব স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। এই বিমুখতার দরুন আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু তা-ই পেয়েছেন, যা এ পৃথিবীতে সত্য পথের পথিকগণ পেয়ে থাকেন। সম্রাট তাকে শূলে চড়িয়ে তির মারতে মারতে হত্যা করার নির্দেশ দিল। সিপাহিরা নির্দেশমতো তাকে শূলে চড়ালো। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। তাকে ঝাঁজরা করার জন্য কামানগুলো তাক করানো হলো। মৃত্যু তার সম্মুখে অপেক্ষমাণ; কিন্তু সম্রাট এ দৃশ্য দেখে অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল যে, এ নির্ভীক খোদাভক্ত প্রেমীর চেহারায় দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও ভয়-ভীতির বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। মৃত্যুকে এত সহজে বরণ করার দৃশ্য সম্রাট ইতোপূর্বে কাউকে দেখে নি। তাই সে ভাবলো—তাকে এমন কোনো ভয়ঙ্কর পদ্ধতিতে হত্যা করতে হবে, যেন তার মতো অকুতোভয় সাহসী ব্যক্তিও ঘাবড়াতে বাধ্য হয়। সেজন্য সম্রাট তাকে শূলকাষ্ঠ হতে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল। আর একটি ডেগে পানি ঢেলে তা ফোটানোর হুকুম করল। পানি ভর্তি ডেগটি যখন টগবগ করছিল, ঠিক তখনি আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহুর পবিত্র কাফেলার এক বন্দি সাহাবিকে এনে তারই সম্মুখে ডেগে ছেড়ে দেওয়া হলো। আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আর দেখলেন, তার সঙ্গী বন্দিকে ডেগে ছাড়ামাত্রই তার হাড্ডি থেকে গোশত খসে পড়ল। আর হাড্ডিগুলো ডেগের মধ্যে বীভৎসরূপে চকচক করতে লাগল। নির্দয় সম্রাট আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, যদি তুই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না করিস, তবে তোকেও ঠিক এই পরিণতির শিকার হতে হবে; কিন্তু এ ভয়ঙ্কর দৃশ্য আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুকে তার সাহসী অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে নি। তার জবানে একটাই কথা ছিল—এ টগবগে ফুটন্ত পানিতে পড়ে ঝলসে যাওয়া সম্ভব, তবুও ঈমান ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
অতঃপর সৈন্যরা তাকেও তাতে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু এখানে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো। যেই আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু কিছুক্ষণ পূর্বে প্রফুল্লচিত্তে মৃত্যুকে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন, তিনিই এখন কড়াইয়ের কাছে যেতেই তার আঁখিযুগল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল! তাকে অশ্রুসিক্ত দেখে সম্রাট ভাবল, এটাই আমার বিজয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে ডেকে এনে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করল। উত্তরে আবদুল্লাহ বললেন, আমি এই আক্ষেপ করে কেঁদেছিলাম, যদি আমার শত প্রাণ থাকত আর সবগুলোকে আজ আল্লাহর রাস্তায় কুরবান করতে পারতাম!
বাদশা এ কথা শুনে বিস্মিত হলো। কারণ, সে লোমহর্ষক ও বিভীষিকাময় মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ানো ব্যক্তির মুখ থেেেক এরূপ উত্তর কখনো আশা করে নি। পরিশেষে বাদশা ভাবলো এমন লোকের শাস্তি হয়তো প্রাণে না মেরে বাঁচিয়ে রাখা। তাই সম্রাট তাকে লক্ষ্য করে বলল, ঠিক আছে, তুই কেবল আমার কপালে চুমু খেলেই তোকে ছেড়ে দেবো। আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এর বিনিময়ে কেবল আমাকে নয়; বরং আমার সকল সঙ্গীকেও মুক্ত করলে আমি তা করতে পারি। বাদশা বলল, আচ্ছা, তা-ই হবে। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার কপালে চুমু খেলেন এবং সকল সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপদে ফিরে এলেন।
এই পবিত্র কাফেলা যখন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে পুরো ঘটনা শুনালেন, তখন তিনি স্বস্থান হতে দাঁড়িয়ে গেলেন। এবং আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু যে ঈমানি চেতনা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অলৌকিকভাবে সদলবলে নিরাপদে ফিরে এসেছেন তার স্বীকৃতি ও পুরস্কারস্বরূপ তার কপালে চুম্বন করলেন。
টিকাঃ
১৪৪ প্রাগুক্ত: ২/২৮৮
একদা খলিফাতুল মুসলিমিন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু রোমের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল পাঠালেন। শত্রুরা তাকেসহ কাফেলার সকলকে বন্দি করে ফেলল। এ মহান ব্যক্তিকে যখন রোম-সম্রাটের দরবারে নিয়ে যাওয়া হলো, সম্রাট তাকে এ মর্মে প্রস্তাব প্রদান করে যে, যদি তুমি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করো তবে তোমাকে আমার সাম্রাজ্যের অংশীদার করবো। হতভাগা সম্রাট ভেবেছিল ধন-সম্পদ ও পদমর্যাদার মোহ এ মরুচারী যাযাবরকে কাত করে দেবে; কিন্তু তার ধারণা ছিল না যে, তার সামনে দণ্ডায়মান মুহাম্মাদে আরাবির একজন ভক্ত ও আত্মনিবেদিত সাহাবি। যার অভাব-অনটন ও দরিদ্রতার সম্মুখে এক-দুটি নয়-হাজারো সাম্রাজ্য উৎসর্গ হয়ে থাকে。
আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু তার প্রস্তাব স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। এই বিমুখতার দরুন আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু তা-ই পেয়েছেন, যা এ পৃথিবীতে সত্য পথের পথিকগণ পেয়ে থাকেন। সম্রাট তাকে শূলে চড়িয়ে তির মারতে মারতে হত্যা করার নির্দেশ দিল। সিপাহিরা নির্দেশমতো তাকে শূলে চড়ালো। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। তাকে ঝাঁজরা করার জন্য কামানগুলো তাক করানো হলো। মৃত্যু তার সম্মুখে অপেক্ষমাণ; কিন্তু সম্রাট এ দৃশ্য দেখে অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল যে, এ নির্ভীক খোদাভক্ত প্রেমীর চেহারায় দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও ভয়-ভীতির বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। মৃত্যুকে এত সহজে বরণ করার দৃশ্য সম্রাট ইতোপূর্বে কাউকে দেখে নি। তাই সে ভাবলো—তাকে এমন কোনো ভয়ঙ্কর পদ্ধতিতে হত্যা করতে হবে, যেন তার মতো অকুতোভয় সাহসী ব্যক্তিও ঘাবড়াতে বাধ্য হয়। সেজন্য সম্রাট তাকে শূলকাষ্ঠ হতে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল। আর একটি ডেগে পানি ঢেলে তা ফোটানোর হুকুম করল। পানি ভর্তি ডেগটি যখন টগবগ করছিল, ঠিক তখনি আবদুল্লাহ ইবনু হুযাফা রাজিয়াল্লাহু আনহুর পবিত্র কাফেলার এক বন্দি সাহাবিকে এনে তারই সম্মুখে ডেগে ছেড়ে দেওয়া হলো। আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আর দেখলেন, তার সঙ্গী বন্দিকে ডেগে ছাড়ামাত্রই তার হাড্ডি থেকে গোশত খসে পড়ল। আর হাড্ডিগুলো ডেগের মধ্যে বীভৎসরূপে চকচক করতে লাগল। নির্দয় সম্রাট আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, যদি তুই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না করিস, তবে তোকেও ঠিক এই পরিণতির শিকার হতে হবে; কিন্তু এ ভয়ঙ্কর দৃশ্য আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুকে তার সাহসী অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে নি। তার জবানে একটাই কথা ছিল—এ টগবগে ফুটন্ত পানিতে পড়ে ঝলসে যাওয়া সম্ভব, তবুও ঈমান ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
অতঃপর সৈন্যরা তাকেও তাতে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু এখানে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো। যেই আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু কিছুক্ষণ পূর্বে প্রফুল্লচিত্তে মৃত্যুকে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন, তিনিই এখন কড়াইয়ের কাছে যেতেই তার আঁখিযুগল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল! তাকে অশ্রুসিক্ত দেখে সম্রাট ভাবল, এটাই আমার বিজয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে ডেকে এনে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করল। উত্তরে আবদুল্লাহ বললেন, আমি এই আক্ষেপ করে কেঁদেছিলাম, যদি আমার শত প্রাণ থাকত আর সবগুলোকে আজ আল্লাহর রাস্তায় কুরবান করতে পারতাম!
বাদশা এ কথা শুনে বিস্মিত হলো। কারণ, সে লোমহর্ষক ও বিভীষিকাময় মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ানো ব্যক্তির মুখ থেেেক এরূপ উত্তর কখনো আশা করে নি। পরিশেষে বাদশা ভাবলো এমন লোকের শাস্তি হয়তো প্রাণে না মেরে বাঁচিয়ে রাখা। তাই সম্রাট তাকে লক্ষ্য করে বলল, ঠিক আছে, তুই কেবল আমার কপালে চুমু খেলেই তোকে ছেড়ে দেবো। আবদুল্লাহ রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এর বিনিময়ে কেবল আমাকে নয়; বরং আমার সকল সঙ্গীকেও মুক্ত করলে আমি তা করতে পারি। বাদশা বলল, আচ্ছা, তা-ই হবে। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার কপালে চুমু খেলেন এবং সকল সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপদে ফিরে এলেন।
এই পবিত্র কাফেলা যখন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে পুরো ঘটনা শুনালেন, তখন তিনি স্বস্থান হতে দাঁড়িয়ে গেলেন। এবং আবদুল্লাহ ইবনু হুজাফা রাজিয়াল্লাহু আনহু যে ঈমানি চেতনা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অলৌকিকভাবে সদলবলে নিরাপদে ফিরে এসেছেন তার স্বীকৃতি ও পুরস্কারস্বরূপ তার কপালে চুম্বন করলেন。
টিকাঃ
১৪৪ প্রাগুক্ত: ২/২৮৮