📄 অসাধারণ প্রতিভা
মেধা ও বিচক্ষণতায় কাজি ইয়াস রহ. ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার বহু ঘটনা ও ইতিহাস আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। একবার জনৈক ব্যক্তি তার দরবারে এসে অভিযোগ করল—আমি অমুকের কাছে কিছু সম্পদ আমানত রেখেছিলাম; কিন্তু সে এখন আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। কাজি ইয়াস রহ. বিবাদীকে জিজ্ঞাসা করলে সে অস্বীকার করে বলল, বাদী লোকটি আমার কাছে কোনো কিছুই আমানত রাখে নি। কাজি ইয়াস রহ. বাদীকে বললেন, তুমি কোথায় তার কাছে আমানত রেখেছ? উত্তরে সে বলল, জঙ্গলের একটি জায়গায়। কাজি সাহেব রহ. জিজ্ঞাসা করলেন—সে জায়গায় কোনো আলামত আছে কি? বাদী বলল, জি, হ্যাঁ! সেখানে একটি গাছ আছে। গাছটির নিচেই আমি তার কাছে আমানত রেখেছিলাম। কাজি সাহেব রহ. তাকে বললেন, তুমি গাছটির নিচে গিয়ে দেখো। হতে পারে তুমি সম্পদ আমানত রাখার পরিবর্তে সেখানে পুঁতে রেখেছ আর এখন তা ভুলে গেছ। বাদী চলে যাবার পর কাজি সাহেব বিবাদীকে বললেন, সে আসা পর্যন্ত তুমি এখানে বসে থাকো। অতঃপর কাজি সাহেব অন্যান্য বিচারকার্যে মগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পর কাজি সাহেব বিবাদীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী মনে হয়, বাদী কি এতক্ষণে সেখানে পৌঁছতে পেরেছে? বিবাদী অমনি বলে উঠল—না! এখনো পৌঁছতে পারে নি। ব্যস, কাজি সাহেব তখনি অপরাধীকে চিহ্নিত করে পাকড়াও করে ফেললেন। কারণ, বিবাদীর উক্ত গাছ ও তার দূরত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকাই প্রমাণ বহন করে যে, আসলেই গাছের নিচে সে বাদীর সঙ্গে কোনো লেনদেন করেছে। যখন তার প্রতারণার গোমর ফাঁস হয়ে গেল, তখন নিজেই নিজের কু-কীর্তির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হলো。
আরেক ব্যক্তির ঘটনা:
সে কাজি ইয়াস রহ.-এর কাছে এসে অভিযোগ করল—অমুক ব্যক্তি আমার আমানত আত্মসাৎ করে বসে আছে। কাজি সাহেব তাকে বললেন, তুমি এখন চলে যাও। তবে তুমি যে আমার নিকট এসে বিবাদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ—তা যেন সে বুঝতে না পারে। দু'দিন পর পুনরায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। লোকটি চলে যাবার পর কাজি সাহেব বিবাদীকে ডেকে বললেন, আমার কাছে বেশ কিছু সম্পদ এসেছে। তোমার কাছে সংরক্ষণ করার মতো ভালো ব্যবস্থা আছে কি? সে বলল, জি, হ্যাঁ। আমার ঘরটি এর জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। কাজি সাহেব বললেন, ঠিক আছে, তুমি গিয়ে এর জন্য জায়গার ব্যবস্থা করে রাখো। লোকটি সেখান থেকে প্রফুল্লচিত্তে চলে গেল। এদিকে বাদী এসে হাজির। কাজি সাহেব তাকে বললেন, এখন তার কাছে গিয়ে তোমার আমানত চাও। যদি ফেরত দেয়, তবে তো বেশ ভালো কথা। অন্যথায় তুমি তাকে বলবে—আমার মাল আমাকে ফেরত দাও, নতুবা আমি কাজি সাহেবের কাছে মামলা দায়ের করবো। বাদী কাজি সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী তার কাছে গিয়ে আমানত চাইতেই সে দিয়ে দিল। অতঃপর বিবাদী কাজির নিকট সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করে চলে এলো। কাজি সাহেব রহ. তাকে খুব শাসিয়ে বিদায় দিলেন。
টিকাঃ
১২৭ আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম, আততুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিসসিয়াসাতিশ-শারইয়্যাহ: পৃ.২২-২৩
📄 দূরদর্শিতা
কাজি ইয়াস রহ. সম্পর্কে ইবরাহিম ইবনু মারজুক বসরি রহ. বর্ণনা করেন, ইয়াস ইবনু মুআবিয়া রহ. কাজি হওয়ার পূর্বে একদিন আমরা তার পাশে বসা ছিলাম। ইতোমধ্যে একটি লোক এসে আমাদের পাশের একটি উঁচু দোকানে বসে পড়ল। এবং পথচারীদের গভীরভাবে দেখতে লাগল। হঠাৎ সে বসা থেকে উঠে একজনকে অনুসরণ করে চলতে লাগল। অতঃপর তার চেহারাটি পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় নিজ আসনে বসে পড়ল। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া এসব গতিবিধি লক্ষ্য করে আমাদের বললেন, বলো তো দেখি, এ লোকটি কী খুঁজছে? আমরা বললাম, জনাব, আপনিই বলেন! তিনি বললেন, লোকটি বাচ্চাদের শিক্ষক। তার এক অন্ধশিক্ষার্থী হারিয়ে গেছে। তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। অতঃপর আমরা উঠে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—ভাই, আপনি কী খুঁজছেন? লোকটি বলল, আমার একটি শিশুশিক্ষার্থী হারিয়ে গেছে। আমি তাকেই খুঁজছি। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম—বাচ্চাটি কেমন ছিল? সে বাচ্চাটির সব গুণাগুণ বর্ণনা করে পরিশেষে বলল, তার একটি চোখ ছিল না। অতঃপর জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী করেন? সে উত্তর করল—বাচ্চাদের পড়াই। তখন আমরা হতবাক হয়ে ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, এসব বিষয় আপনি কীভাবে জানলেন? তিনি উত্তর করলেন, আমি লোকটিকে দেখলাম, সে এসেই কোনো উন্নত ও উঁচু জায়গা খুঁজছে। আমি তার আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ করে বুঝলাম, সে কোনো রাজ-বংশীয় নয়। তখন মনে মনে ভাবলাম—তাহলে আর এমন কে হবে, যে রাজা-বাদশাদের মতো উঁচুস্থানে বসতে পছন্দ করে? হঠাৎ মনে হলো এ অভিরুচি একজন শিক্ষকেরই হতে পারে। তখন ধরে নিলাম লোকটি শিশুশিক্ষক। সবশেষে আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, বাচ্চা হারানোর বিষয়টি আপনি কীভাবে আঁচ করলেন? ইয়াস রহ. বললেন, আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, সে এমন একজন অতিসাধারণ পথিককে দেখার জন্য উৎকণ্ঠ হয়ে পড়ল, যার একটি চোখ ছিল অন্ধ। এতে আমি সহজেই বুঝতে পারলাম যে, লোকটি শিশুকে খুঁজছে। আর সে শিশুটিও অন্ধ !
টিকাঃ
১২৮ প্রাগুক্ত: পৃ.২৯
📄 খলিফা মামুনুর রশিদের প্রজ্ঞাময় উক্তি
আবদুল্লাহ ইবনু তাহের বলেন, একদিন আমি খলিফা মামুনুর রশিদের নিকট বসা ছিলাম। তিনি তাঁর ছেলেকে 'এই চাকর' বলে ডাকলেন; কিন্তু কোনো সাড়া এলো না। দ্বিতীয়বার ডাক দিতেই এক তুর্কি যুবক বিড়বিড় করতে করতে বের হলো। এবং রুক্ষকণ্ঠে বলল, আমাদের দেখলেই আপনি 'এই ছেলে এই ছেলে' বলে ডাকতে থাকেন। আর কতকাল এ বিড়ম্বনা পোহাতে হবে আমাদের? খলিফা তার এমন কথা শুনে মাথা নুইয়ে ফেললেন। এহেন অবস্থা দেখে নিশ্চিত হয়ে গেলাম, তিনি হয়তো এক্ষণে তার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেবেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পর খলিফা স্বাভাবিক হয়ে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, আবদুল্লাহ, যদি কোনো ভদ্রলোক তার আচার-ব্যবহার শালীন ও মার্জিত রাখতে চায়, তবে তার চাকর-বাকরদের স্বভাব-চরিত্র বিগড়ে যায়। কথা-বার্তা কর্কশ হয়ে যায়। আর যদি নিজের আচরণ রুক্ষ করে, তাহলে চাকর-বাকররা নম্র ও ভদ্র হয়ে যায়। অবশ্য আমি নিজের স্বভাব বিকৃত করে চাকরদের স্বভাব ভালো করতে চাই না。
টিকাঃ
১২৯ আল-ইয়াওকিতুল আসরিয়্যাহ: পৃ.১৪২
📄 যে স্বাদ কখনো ফুরায় না!
খলিফা মামুনুর রশিদ একদিন হাসান ইবনু সুহাইলকে বললেন, আমি পৃথিবীর সকল বস্তুর স্বাদ সম্পর্কে ভেবে দেখেছি, কোনো স্বাদই স্থায়ী নয়। সকল স্বাদ হতেই মানুষ কোনো এক সময়ে এসে নিঃস্পৃহ ও অভক্ত হয়ে যায়; কিন্তু সাতটি বস্তুর স্বাদ হতে মানুষ কখনো বিরক্ত ও নিরানন্দ হয় না। সেগুলো হলো:
১.আটার রুটি
২. ছাগলের গোশত
৩. ঠান্ডা পানি
৪. কোমল ও মসৃণ কাপড়
৫. সুগন্ধ
৬. নরম বিছানা
৭. যে কোনো সৌন্দর্য উপভোগ করা।
হাসান ইবনু সুহাইল বললেন, আমিরুল মুমিনিন, একটি কিন্তু থেকে গেল! তা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করা। খলিফা মামুন তার কথাকে সমর্থন করলেন।
টিকাঃ
১৩০ প্রাগুক্ত: পৃ.১৪৪