📄 মাজহাবগত মহানুভবতা
ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে শরিয়তের অনেক মাসআলায় তুমুল মতপার্থক্য চলে আসছে। কোনো কোনো সময় উত্তম-অনুত্তম নিয়েই বিরাট তর্ক-বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে একে অপরকে সূক্ষ্ম জ্ঞানের মারপ্যাঁচেও ফেলতেন। যেমন—রুকুতে যাবার সময় হাত উঠানো-না উঠানো, আমিন আস্তে বা জোরে বলা ইত্যাদি。
উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে মতানৈক্য কেবল উত্তম-অনুত্তম নিয়ে। নতুবা এতে কারও দ্বিমত নেই যে, এসব কারণে নামাজ নষ্ট কিংবা অসম্পূর্ণ হবে না; বরং নামাজ হয়ে যাবে। এ কারণেই এসব বিষয়ে পারস্পরিক কঠিন মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও ইমামদের মাঝে উদারতা ও মহানুভবতার অসংখ্য নজির পাওয়া যায়। যার একটি নজির এখানে তুলে ধরা হলো:
আল্লামা তাহতাবি রহ. বর্ণনা করেন, কাজি আবু আসেম রহ. একজন উঁচুমাপের হানাফি আলেম ছিলেন। তিনি একবার বিখ্যাত শাফেয়ি আলেম আল্লামা কাফফাল রহ.-এর মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। শাফেয়ি মাজহাবে ইকামতে—
أشهد أن لا إله إلا الله - أشهد أن محمدا رسول الله
حي على الصلاة - حي على الفلاح
কেবল একবার করে বলা হয়। আর হানাফি মাজহাবে দুই-দুইবার বলা হয়। আল্লামা কাফফাল রহ. কাজি আবু আসেম হানাফি রহ.-কে দেখে তার সম্মানার্থে মুআজ্জিনকে বলে দিয়েছিলেন—আজ ইকামতের সময় উক্ত বাক্যগুলো দুইবার করে পড়বে। অতঃপর আল্লামা কাফফাল রহ. কাজি আবু আসেম রহ.-কে নামাজ পড়াতে অনুরোধ করলেন। তিনি নামাজে শাফেয়ি মাজহাব অনুকরণে সর্বপ্রথম সূরা ফাতিহার পূর্বে বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়লেন। এছাড়াও নামাজের অন্যান্য কার্যাবলী শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পালন করলেন。
স্মর্তব্য—এরূপ উদারতা কেবল উত্তম-অনুত্তমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হালাল-হারাম তথা জায়েয়-নাজায়েয় সংক্রান্ত বিষয়ে অবশ্যই নিজ মাজহাবের অনুসরণ করবে。
টিকাঃ
১২৫ তাহতাবি: ১/৫০
📄 অভিযোগ যেমন বিচারকার্য তেমন
ইমাম শাবি রহ. বর্ণনা করেন, একবার উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে জনৈকা নারী এসে আবেদন জানাল—আমিরুল মুমিনিন, আমার স্বামীর মতো নেককার মানুষ সম্ভবত পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তিনি দিনভর রোজা রাখেন আর সারারাত নামাজে কাটান। এ পর্যন্ত বলেই সে নীরব হয়ে গেল। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ না বুঝে তাকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করেন এবং ক্ষমা করে দেন! নেককার নারীরা এভাবেই স্বামীর প্রশংসা করে থাকে।’
এবার সেই নারী উমারের এ মন্তব্য শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কাব ইবনু সাওয়ার রাজিয়াল্লাহু আনহু। তিনি মহিলাকে ফিরে যেতে দেখে উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আপনি ভেবেছেন সে তার স্বামীর প্রশংসা করেছে, বাস্তবে তা নয়; সে মূলত স্বামীর বিরুদ্ধে আপনার নিকট অভিযোগ করতে এসেছে। তার স্বামী সারাক্ষণ ইবাদতে ডুবে থাকে। স্ত্রীর হক যথাযথ আদায় করে না। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আচ্ছা, এই খবর! তাকে ডাকো。
অতঃপর তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুঝতে পারেন যে, কাব ইবনু সাওয়ারের ধারণাই ঠিক ছিল। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু কাব রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, এখন তুমিই এর ফয়সালা করো। কাব রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আপনার সম্মুখে আমি কীভাবে ফয়সালা দেবো!
উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হ্যাঁ, যেহেতু তুমিই তার অভিযোগটি ধরতে পেরেছ, তাই তুমিই এর সমাধান দাও। এরপর কাব রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক পুরুষকে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। এ হিসেবে কেউ যদি চারটি বিয়ে করে, তবুও প্রত্যেক স্ত্রীর ভাগে চারদিনে একদিন করে পড়বে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়—প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য স্বামীর ওপর হক হলো প্রতি চারদিনে একদিন। কাজেই আপনি এ ফয়সালা দেন যে, উক্ত মহিলার স্বামী তিনদিন ইবাদত করবে, চতুর্থদিন অবশ্যই স্ত্রীর হক আদায় করবে。
কাব ইবনু সারওয়ার রাজিয়াল্লাহু আনহুর ফয়সালা শুনে উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু আঁতকে উঠলেন এবং বললেন, এ ফয়সালাটি তোমার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার চেয়েও অধিক সূক্ষ্ম ও চমৎকার। এরপর তিনি তাকে বসরার বিচারক পদে নিয়োজিত করলেন。
টিকাঃ
১২৬ ইবনু আবদিল বার, আল-ইস্তিআব: ৩/২৮৬
📄 অসাধারণ প্রতিভা
মেধা ও বিচক্ষণতায় কাজি ইয়াস রহ. ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার বহু ঘটনা ও ইতিহাস আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। একবার জনৈক ব্যক্তি তার দরবারে এসে অভিযোগ করল—আমি অমুকের কাছে কিছু সম্পদ আমানত রেখেছিলাম; কিন্তু সে এখন আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। কাজি ইয়াস রহ. বিবাদীকে জিজ্ঞাসা করলে সে অস্বীকার করে বলল, বাদী লোকটি আমার কাছে কোনো কিছুই আমানত রাখে নি। কাজি ইয়াস রহ. বাদীকে বললেন, তুমি কোথায় তার কাছে আমানত রেখেছ? উত্তরে সে বলল, জঙ্গলের একটি জায়গায়। কাজি সাহেব রহ. জিজ্ঞাসা করলেন—সে জায়গায় কোনো আলামত আছে কি? বাদী বলল, জি, হ্যাঁ! সেখানে একটি গাছ আছে। গাছটির নিচেই আমি তার কাছে আমানত রেখেছিলাম। কাজি সাহেব রহ. তাকে বললেন, তুমি গাছটির নিচে গিয়ে দেখো। হতে পারে তুমি সম্পদ আমানত রাখার পরিবর্তে সেখানে পুঁতে রেখেছ আর এখন তা ভুলে গেছ। বাদী চলে যাবার পর কাজি সাহেব বিবাদীকে বললেন, সে আসা পর্যন্ত তুমি এখানে বসে থাকো। অতঃপর কাজি সাহেব অন্যান্য বিচারকার্যে মগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পর কাজি সাহেব বিবাদীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী মনে হয়, বাদী কি এতক্ষণে সেখানে পৌঁছতে পেরেছে? বিবাদী অমনি বলে উঠল—না! এখনো পৌঁছতে পারে নি। ব্যস, কাজি সাহেব তখনি অপরাধীকে চিহ্নিত করে পাকড়াও করে ফেললেন। কারণ, বিবাদীর উক্ত গাছ ও তার দূরত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকাই প্রমাণ বহন করে যে, আসলেই গাছের নিচে সে বাদীর সঙ্গে কোনো লেনদেন করেছে। যখন তার প্রতারণার গোমর ফাঁস হয়ে গেল, তখন নিজেই নিজের কু-কীর্তির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হলো。
আরেক ব্যক্তির ঘটনা:
সে কাজি ইয়াস রহ.-এর কাছে এসে অভিযোগ করল—অমুক ব্যক্তি আমার আমানত আত্মসাৎ করে বসে আছে। কাজি সাহেব তাকে বললেন, তুমি এখন চলে যাও। তবে তুমি যে আমার নিকট এসে বিবাদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ—তা যেন সে বুঝতে না পারে। দু'দিন পর পুনরায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। লোকটি চলে যাবার পর কাজি সাহেব বিবাদীকে ডেকে বললেন, আমার কাছে বেশ কিছু সম্পদ এসেছে। তোমার কাছে সংরক্ষণ করার মতো ভালো ব্যবস্থা আছে কি? সে বলল, জি, হ্যাঁ। আমার ঘরটি এর জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। কাজি সাহেব বললেন, ঠিক আছে, তুমি গিয়ে এর জন্য জায়গার ব্যবস্থা করে রাখো। লোকটি সেখান থেকে প্রফুল্লচিত্তে চলে গেল। এদিকে বাদী এসে হাজির। কাজি সাহেব তাকে বললেন, এখন তার কাছে গিয়ে তোমার আমানত চাও। যদি ফেরত দেয়, তবে তো বেশ ভালো কথা। অন্যথায় তুমি তাকে বলবে—আমার মাল আমাকে ফেরত দাও, নতুবা আমি কাজি সাহেবের কাছে মামলা দায়ের করবো। বাদী কাজি সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী তার কাছে গিয়ে আমানত চাইতেই সে দিয়ে দিল। অতঃপর বিবাদী কাজির নিকট সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করে চলে এলো। কাজি সাহেব রহ. তাকে খুব শাসিয়ে বিদায় দিলেন。
টিকাঃ
১২৭ আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম, আততুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিসসিয়াসাতিশ-শারইয়্যাহ: পৃ.২২-২৩
📄 দূরদর্শিতা
কাজি ইয়াস রহ. সম্পর্কে ইবরাহিম ইবনু মারজুক বসরি রহ. বর্ণনা করেন, ইয়াস ইবনু মুআবিয়া রহ. কাজি হওয়ার পূর্বে একদিন আমরা তার পাশে বসা ছিলাম। ইতোমধ্যে একটি লোক এসে আমাদের পাশের একটি উঁচু দোকানে বসে পড়ল। এবং পথচারীদের গভীরভাবে দেখতে লাগল। হঠাৎ সে বসা থেকে উঠে একজনকে অনুসরণ করে চলতে লাগল। অতঃপর তার চেহারাটি পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় নিজ আসনে বসে পড়ল। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া এসব গতিবিধি লক্ষ্য করে আমাদের বললেন, বলো তো দেখি, এ লোকটি কী খুঁজছে? আমরা বললাম, জনাব, আপনিই বলেন! তিনি বললেন, লোকটি বাচ্চাদের শিক্ষক। তার এক অন্ধশিক্ষার্থী হারিয়ে গেছে। তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। অতঃপর আমরা উঠে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—ভাই, আপনি কী খুঁজছেন? লোকটি বলল, আমার একটি শিশুশিক্ষার্থী হারিয়ে গেছে। আমি তাকেই খুঁজছি। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম—বাচ্চাটি কেমন ছিল? সে বাচ্চাটির সব গুণাগুণ বর্ণনা করে পরিশেষে বলল, তার একটি চোখ ছিল না। অতঃপর জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী করেন? সে উত্তর করল—বাচ্চাদের পড়াই। তখন আমরা হতবাক হয়ে ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, এসব বিষয় আপনি কীভাবে জানলেন? তিনি উত্তর করলেন, আমি লোকটিকে দেখলাম, সে এসেই কোনো উন্নত ও উঁচু জায়গা খুঁজছে। আমি তার আপাদ-মস্তক নিরীক্ষণ করে বুঝলাম, সে কোনো রাজ-বংশীয় নয়। তখন মনে মনে ভাবলাম—তাহলে আর এমন কে হবে, যে রাজা-বাদশাদের মতো উঁচুস্থানে বসতে পছন্দ করে? হঠাৎ মনে হলো এ অভিরুচি একজন শিক্ষকেরই হতে পারে। তখন ধরে নিলাম লোকটি শিশুশিক্ষক। সবশেষে আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, বাচ্চা হারানোর বিষয়টি আপনি কীভাবে আঁচ করলেন? ইয়াস রহ. বললেন, আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, সে এমন একজন অতিসাধারণ পথিককে দেখার জন্য উৎকণ্ঠ হয়ে পড়ল, যার একটি চোখ ছিল অন্ধ। এতে আমি সহজেই বুঝতে পারলাম যে, লোকটি শিশুকে খুঁজছে। আর সে শিশুটিও অন্ধ !
টিকাঃ
১২৮ প্রাগুক্ত: পৃ.২৯