📄 আগুনও শীতল হয়ে গেল!
নমরুদ ইবরাহিম আ.-কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে ভস্ম করতে চেয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ কৃপায় তাকে উক্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেছেন। এটা ইবরাহিম আ.-এর প্রসিদ্ধ মু'জিযা। তেমনি এক অস্বাভাবিক ঘটনা আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের এক বুজুর্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি হলেন আবু মুসলিম খাওলানি রহ.। তদানীন্তনকালে ইয়েমেনের মিথ্যা নবির দাবিদার আসওয়াদ আনাসি তাকে ডেকে নিজ নবুওতের স্বীকারোক্তি নেয়ার জন্য বল প্রয়োগ করল; কিন্তু তিনি প্রিয় নবিজির পরে অন্য কাউকে নবী মানতে অস্বীকৃতি জানালেন। এর শাস্তিস্বরূপ আসওয়াদ আনাসি একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ব্যবস্থা করে খাওলানি রহ.-কে তাতে নিক্ষেপ করল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা উক্ত আগুনকে তার জন্য শীতল ও নিরাপদ করে দিলেন। অগ্নিকুণ্ড হতে অক্ষতবস্থায় বের হয়ে আসলেন তিনি। লোকেরা আসওয়াদ আনাসিকে এ মর্মে পরামর্শ দিল যে, আপনি তাকে অন্য শান্তি দিয়ে পণ্ডশ্রম না করে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেন। কারণ, তাকে এদেশে থাকতে দিলে সে জনসাধারণকে নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। কাজেই তাকে দেশান্তর করে দেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আসওয়াদ খাওলানি রহ.-কে দেশান্তর করে দিল। ইয়েমেন থেকে নির্বাসিত হয়ে তিনি মদিনা মুনাওয়ারা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি যখন মদিনায় পৌঁছেন, তার পূর্বেই নবীজির ওফাত হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু তখন খলিফা ছিলেন। খাওলানি রহ. মসজিদে নববির নিকট পৌঁছেই উট বেঁধে রাখলেন এবং একটি খুঁটি আড়াল করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন。
উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—কোথা হতে এসেছ? জবাবে তিনি বললেন, ইয়েমেন হতে। এদিকে আসওয়াদ আনাসি কর্তৃক জনৈক মুসলিম অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা মদিনাসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এজন্য উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের সেই বন্ধুর ঘটনাটা শোনাবে কি, যাকে আল্লাহর দুশমন [আসওয়াদ] আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে হেফাজত করেছেন? তার কোনো ক্ষয়-ক্ষতি হয় নি। আবু মুসলিম খাওলানি রহ.-এর মূল নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনু সাউব। তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন না বিধায় বললেন, ঘটনার শিকার আবদুল্লাহ ইবনু সাউব। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কসম করে বলো, তুমিই সেই ব্যক্তি নও কি? উত্তরে আবু মুসলিম বললেন, হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি。
উমার এ কথা শুনে তার কপালে চুমু খেলেন এবং আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে বললেন, ওই মহান সত্তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, যিনি আমাকে মৃত্যুর পূর্বে এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সাক্ষাতে ধন্য করেছেন যাকে ইবরাহিম আ.-এর ন্যায় কুদরতিভাবে অগ্নিকুণ্ড থেকে হেফাজত করেছেন。
পরবর্তী সময়ে আবু মুসলিম খাওলানি রহ. মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেশ সমীহ করতেন। তিনি মাঝে মধ্যে মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুকে নরম-গরম নসিহত করতেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু ও তার কথা যথেষ্ট মূল্যায়ন করতেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একবার সরকারি কর্মচারীরা দু-তিন মাসের বেতন পায় নি। এরই মাঝে একদিন আবু মুসলিম খাওলানি রহ. বক্তৃতার মাঝে বলে উঠলেন-মুআবিয়া! এ সম্পদ তোমারও নয়, তোমার পিতা-মাতারও নয়। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত লোকদেরকে ক্ষাণিকটা অপেক্ষা করার ইঙ্গিত দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর হতে গোসল সেরে এসে বললেন, লোকসকল, আবু মুসলিম বলেছেন, এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমারও নয়, আমার পিতা-মাতারও নয়। তিনি ঠিকই বলেছেন। আরেকটি কথা হলো-আমি প্রিয় নবিজিকে বলতে শুনেছি-'ক্রোধ শয়তানের বিশেষ প্রভাবের কারণে সৃষ্টি হয়। শয়তান হলো আগুনের তৈরি আর পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। কাজেই তোমাদের রাগ এলে গোসল করে নেবে।' এবার তোমরা নিজ নিজ বেতন-ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তুলে নাও। আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন。
টিকাঃ
১২২ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১২৮-১৩০
📄 চোরের জন্য দুআ
রবি' ইবনু খুসাইম রহ. প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আল্লাহর ওলি ছিলেন। ইবাদত-বন্দেগি ও দুনিয়া বিমুখতায় ছিলেন অতুলনীয়। একবার তার ঘোড়া চুরি হয়ে গেলে সকলে বলল, হুজুর, চোরকে বদদোয়া করে দেন! তিনি বললেন, না; বরং আমি তার জন্য এই দুআ করি-
যদি সে সম্পদশালী হয়, আল্লাহ যেন তার এ কুঅভ্যাস দূর করে দেন, তাকে সঠিক বুঝ দান করেন। আর যদি গরিব ও অসহায় হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা দান করেন。
টিকাঃ
১২৩ প্রাগুক্ত: ২/১১১
📄 এক জ্ঞানগর্ভ উক্তি
মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি শিখখির রহ. বলেন-
لأن أبيت نائما وأصبح نادما أحب إلى من أن أبيت قائما وأصبح معجبا.
সারা রাত [কোনো নফল ইবাদত না করে] ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়ে সকালে লজ্জিত হওয়াটা আমার নিকট রাতভর ইবাদতে কাটিয়ে আত্মগুণাভিমানী হওয়া হতে উত্তম。
তিনি আরও বলেন—
‘তুমি এ কাজটি কেন করলে’—কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার এ প্রশ্নের চাইতে ‘তুমি এ কাজটি কেন করলে না’—এ প্রশ্নটি আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়。
টিকাঃ
১২৪ প্রাগুক্ত: ২/২০০
📄 মাজহাবগত মহানুভবতা
ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে শরিয়তের অনেক মাসআলায় তুমুল মতপার্থক্য চলে আসছে। কোনো কোনো সময় উত্তম-অনুত্তম নিয়েই বিরাট তর্ক-বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে একে অপরকে সূক্ষ্ম জ্ঞানের মারপ্যাঁচেও ফেলতেন। যেমন—রুকুতে যাবার সময় হাত উঠানো-না উঠানো, আমিন আস্তে বা জোরে বলা ইত্যাদি。
উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে মতানৈক্য কেবল উত্তম-অনুত্তম নিয়ে। নতুবা এতে কারও দ্বিমত নেই যে, এসব কারণে নামাজ নষ্ট কিংবা অসম্পূর্ণ হবে না; বরং নামাজ হয়ে যাবে। এ কারণেই এসব বিষয়ে পারস্পরিক কঠিন মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও ইমামদের মাঝে উদারতা ও মহানুভবতার অসংখ্য নজির পাওয়া যায়। যার একটি নজির এখানে তুলে ধরা হলো:
আল্লামা তাহতাবি রহ. বর্ণনা করেন, কাজি আবু আসেম রহ. একজন উঁচুমাপের হানাফি আলেম ছিলেন। তিনি একবার বিখ্যাত শাফেয়ি আলেম আল্লামা কাফফাল রহ.-এর মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। শাফেয়ি মাজহাবে ইকামতে—
أشهد أن لا إله إلا الله - أشهد أن محمدا رسول الله
حي على الصلاة - حي على الفلاح
কেবল একবার করে বলা হয়। আর হানাফি মাজহাবে দুই-দুইবার বলা হয়। আল্লামা কাফফাল রহ. কাজি আবু আসেম হানাফি রহ.-কে দেখে তার সম্মানার্থে মুআজ্জিনকে বলে দিয়েছিলেন—আজ ইকামতের সময় উক্ত বাক্যগুলো দুইবার করে পড়বে। অতঃপর আল্লামা কাফফাল রহ. কাজি আবু আসেম রহ.-কে নামাজ পড়াতে অনুরোধ করলেন। তিনি নামাজে শাফেয়ি মাজহাব অনুকরণে সর্বপ্রথম সূরা ফাতিহার পূর্বে বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়লেন। এছাড়াও নামাজের অন্যান্য কার্যাবলী শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পালন করলেন。
স্মর্তব্য—এরূপ উদারতা কেবল উত্তম-অনুত্তমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হালাল-হারাম তথা জায়েয়-নাজায়েয় সংক্রান্ত বিষয়ে অবশ্যই নিজ মাজহাবের অনুসরণ করবে。
টিকাঃ
১২৫ তাহতাবি: ১/৫০