📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 পর-বিমুখতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা

📄 পর-বিমুখতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা


কাজি বাক্কার ইবনু কুতাইবা রহ. মিশরের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ছিলেন। যিনি ইমাম তহাবি রহ.-এর উস্তাদ ছিলেন। এমনকি ইমাম তহাবি রহ. স্বীয় কিতাব শরহু মাআনিল আসার-এর কতিপয় হাদিসও তার সনদে উল্লেখ করেছেন। সে যুগে মিশরের শাসনকর্তা ছিলেন আহমদ ইবনু তুলুন। তিনি ইমাম বাক্কারের হাদিসের দরসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। দরসের পূর্বে রাজার প্রহরীরা ঘোষণা করত-আপনারা কেউ নিজ স্থান হতে সরবেন না। সকলেই নিজ নিজ আসনে স্থির হয়ে বসুন। অতঃপর রাজা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সারিতে চুপচাপ বসে পড়তেন এবং দরস গ্রহণে মনোনিবেশ করতেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজা ও কাজি বাক্কার রহ.-এর মাঝে একটা মধুর সম্পর্ক বজায় ছিল। তখন রাজা তাকে মাসিক ভাতা ছাড়াও বাৎসরিক একহাজার দিনার হাদিয়া পেশ করতেন। ঘটনাক্রমে একটি রাজনৈতিক ব্যাপারে উভয়ের মাঝে অমিল দেখা দিল। রাজা চাচ্ছিলেন কাজি বাক্কারের সমর্থনে তার প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে; কিন্তু কাজি সাহেবের নিকট বিষয়টি মনঃপূত না হওয়ায় সমর্থন করেন নি। এ কারণে তাদের সম্পর্কে ভাটা পড়ল। বিষয়টি একপর্যায়ে এতদূর গড়ালো যে, বাদশা কাজি সাহেবকে গ্রেফতার করলেন এবং ইতোপূর্বে তাকে যেসব স্বর্ণমুদ্রা হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো একসঙ্গে ফেরত দিতে বললেন। বাদশা ভেবেছিল-এ ফরমান কাজি সাহেবকে বেশ জব্দ করে ছাড়বে; কিন্তু কাজি সাহেব এ নির্দেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্তে নিজ কক্ষে ঢুকলেন এবং আঠারোটি থলে নিয়ে আসলেন, যার প্রত্যেকটিতে একহাজার করে দিনার ছিল। বাদশা থলেগুলো ভালো করে হাতিয়ে দেখলেন যে, হুবহু সেই থলে যা তিনি কাজি সাহেবের নিকট প্রতি বছর পাঠাতেন। তার মুখে আঁটা সীলমোহর পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। বাদশা রীতিমতো থতমত খেয়ে গেলেন যে, কাজি সাহেব একটি থলেও খুলে দেখেন নি; যেভাবে পাঠানো হয়েছিল ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করে রেখেছেন!
পরবর্তী সময়ে জানা গেল যে, কাজি সাহেব থলেগুলো এই ভেবে খুলেন নি-আজ হয়তো আমার সঙ্গে বাদশার ভালো সম্পর্ক আছে, ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। তখন এগুলো তাকে ফেরত দেওয়া যাবে। বাদশা কাজি সাহেবের দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, আত্মপ্রত্যয় ও অমুখাপেক্ষীতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা দেখে লজ্জায় মাথা নোয়াতে বাধ্য হলেন।

টিকাঃ
১২০ আন-নুজুমুয যাহেরা: ৩/১৯

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 সুস্থতার মূল্যায়ন

📄 সুস্থতার মূল্যায়ন


আবু হামজা মুহাম্মদ ইবনু মায়মুন সুকরি রহ. [মৃত্যু: ১৬৮হি.] ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। সুকরি'র শাব্দিক অর্থ হলো— নেশাখোর। শব্দটি মূলত নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রেতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়; কিন্তু আবু হামজার বর্ণনাশৈলী ও বাচনভঙ্গি এতটাই চমৎকার ও আকর্ষণীয় ছিল— যে কেউ তার কথায় মুগ্ধ হয়ে যেত। বিধায় তাকে সুকরি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
আবু হামজার একটি বিশেষ গুণ ছিল— কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তিনি অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হওয়া সমপরিমাণ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতেন। তিনি বলতেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে সুস্থতার নিয়ামত দান করে আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অন্তত এ পরিমাণ অর্থ সদকা করা উচিত। আবু হামজার প্রতি তাঁর প্রতিবেশীরা বেশ সন্তুষ্ট ছিল। একবার জনৈক প্রতিবেশী নিজ বাড়ি বিক্রি করার ইচ্ছা করল। গ্রাহক মূল্য জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, মূল বাড়ির মূল্য দুই হাজার টাকা আর দুই হাজার টাকা হলো আবু হামজার পড়শি হওয়ার মূল্য। আবু হামজা রহ. এ সংবাদ পেয়ে প্রতিবেশী লোকটিকে নিজ গাঁট থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে বললেন, বাড়ি বিক্রির প্রয়োজন নেই। এগুলো দিয়ে আপাতত কাজ সারো。

টিকাঃ
১২১ তারিখে বাগদাদ: ৩/২৬৮-২৬৯

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 আগুনও শীতল হয়ে গেল!

📄 আগুনও শীতল হয়ে গেল!


নমরুদ ইবরাহিম আ.-কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে ভস্ম করতে চেয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ কৃপায় তাকে উক্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেছেন। এটা ইবরাহিম আ.-এর প্রসিদ্ধ মু'জিযা। তেমনি এক অস্বাভাবিক ঘটনা আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের এক বুজুর্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি হলেন আবু মুসলিম খাওলানি রহ.। তদানীন্তনকালে ইয়েমেনের মিথ্যা নবির দাবিদার আসওয়াদ আনাসি তাকে ডেকে নিজ নবুওতের স্বীকারোক্তি নেয়ার জন্য বল প্রয়োগ করল; কিন্তু তিনি প্রিয় নবিজির পরে অন্য কাউকে নবী মানতে অস্বীকৃতি জানালেন। এর শাস্তিস্বরূপ আসওয়াদ আনাসি একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ব্যবস্থা করে খাওলানি রহ.-কে তাতে নিক্ষেপ করল; কিন্তু আল্লাহ তাআলা উক্ত আগুনকে তার জন্য শীতল ও নিরাপদ করে দিলেন। অগ্নিকুণ্ড হতে অক্ষতবস্থায় বের হয়ে আসলেন তিনি। লোকেরা আসওয়াদ আনাসিকে এ মর্মে পরামর্শ দিল যে, আপনি তাকে অন্য শান্তি দিয়ে পণ্ডশ্রম না করে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেন। কারণ, তাকে এদেশে থাকতে দিলে সে জনসাধারণকে নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। কাজেই তাকে দেশান্তর করে দেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আসওয়াদ খাওলানি রহ.-কে দেশান্তর করে দিল। ইয়েমেন থেকে নির্বাসিত হয়ে তিনি মদিনা মুনাওয়ারা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি যখন মদিনায় পৌঁছেন, তার পূর্বেই নবীজির ওফাত হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু তখন খলিফা ছিলেন। খাওলানি রহ. মসজিদে নববির নিকট পৌঁছেই উট বেঁধে রাখলেন এবং একটি খুঁটি আড়াল করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন。
উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—কোথা হতে এসেছ? জবাবে তিনি বললেন, ইয়েমেন হতে। এদিকে আসওয়াদ আনাসি কর্তৃক জনৈক মুসলিম অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা মদিনাসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এজন্য উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের সেই বন্ধুর ঘটনাটা শোনাবে কি, যাকে আল্লাহর দুশমন [আসওয়াদ] আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে হেফাজত করেছেন? তার কোনো ক্ষয়-ক্ষতি হয় নি। আবু মুসলিম খাওলানি রহ.-এর মূল নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনু সাউব। তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন না বিধায় বললেন, ঘটনার শিকার আবদুল্লাহ ইবনু সাউব। উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কসম করে বলো, তুমিই সেই ব্যক্তি নও কি? উত্তরে আবু মুসলিম বললেন, হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি。
উমার এ কথা শুনে তার কপালে চুমু খেলেন এবং আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে বললেন, ওই মহান সত্তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, যিনি আমাকে মৃত্যুর পূর্বে এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সাক্ষাতে ধন্য করেছেন যাকে ইবরাহিম আ.-এর ন্যায় কুদরতিভাবে অগ্নিকুণ্ড থেকে হেফাজত করেছেন。
পরবর্তী সময়ে আবু মুসলিম খাওলানি রহ. মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেশ সমীহ করতেন। তিনি মাঝে মধ্যে মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুকে নরম-গরম নসিহত করতেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু ও তার কথা যথেষ্ট মূল্যায়ন করতেন। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে একবার সরকারি কর্মচারীরা দু-তিন মাসের বেতন পায় নি। এরই মাঝে একদিন আবু মুসলিম খাওলানি রহ. বক্তৃতার মাঝে বলে উঠলেন-মুআবিয়া! এ সম্পদ তোমারও নয়, তোমার পিতা-মাতারও নয়। মুআবিয়া রাজিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত লোকদেরকে ক্ষাণিকটা অপেক্ষা করার ইঙ্গিত দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর হতে গোসল সেরে এসে বললেন, লোকসকল, আবু মুসলিম বলেছেন, এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমারও নয়, আমার পিতা-মাতারও নয়। তিনি ঠিকই বলেছেন। আরেকটি কথা হলো-আমি প্রিয় নবিজিকে বলতে শুনেছি-'ক্রোধ শয়তানের বিশেষ প্রভাবের কারণে সৃষ্টি হয়। শয়তান হলো আগুনের তৈরি আর পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। কাজেই তোমাদের রাগ এলে গোসল করে নেবে।' এবার তোমরা নিজ নিজ বেতন-ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তুলে নাও। আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন。

টিকাঃ
১২২ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১২৮-১৩০

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 চোরের জন্য দুআ

📄 চোরের জন্য দুআ


রবি' ইবনু খুসাইম রহ. প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আল্লাহর ওলি ছিলেন। ইবাদত-বন্দেগি ও দুনিয়া বিমুখতায় ছিলেন অতুলনীয়। একবার তার ঘোড়া চুরি হয়ে গেলে সকলে বলল, হুজুর, চোরকে বদদোয়া করে দেন! তিনি বললেন, না; বরং আমি তার জন্য এই দুআ করি-
যদি সে সম্পদশালী হয়, আল্লাহ যেন তার এ কুঅভ্যাস দূর করে দেন, তাকে সঠিক বুঝ দান করেন। আর যদি গরিব ও অসহায় হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা দান করেন。

টিকাঃ
১২৩ প্রাগুক্ত: ২/১১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00