📄 আলি রা.-এর অদ্ভুত ফয়সালা
একবার নবীজি আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমেনে পাঠালেন। সেখানকার লোকজন বাঘ শিকারে অভ্যস্ত ছিল। সে লক্ষ্যে তারা গর্ত খনন করে নানা কৌশলে বাঘকে গর্তে ফেলে শিকার করত। নিয়মানুযায়ী একদিন তারা একটি গর্ত খুঁড়ে বাঘকে তাতে ফেলে দিল। আর গর্তের চারপাশে লোকজন তামাশা দেখার জন্য ভিড় জমালো। প্রচণ্ড গাদাগাদি ও ভিড়ের কারণে এক ব্যক্তি তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে গর্তে পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বাঁচাতে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে ধরে ফেলল। তারও একই অবস্থা। সে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তার পাশের ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরলো। তৃতীয় ব্যক্তিরও অনুরূপ অবস্থা হলো। তখন পাশের ব্যক্তির হাত ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল। ফলে তাদের কেউই নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। চারজনই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে গর্তে পড়ে গেল。
এদিকে বাঘ তখনো জীবিত ছিল। সে এদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করল; একপর্যায়ে তারা সকলে সেখানেই প্রাণ হারাল। তাদের মৃত্যুর পর আত্মীয়- স্বজনদের মাঝে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো তাদের রক্তপণ নিয়ে। এমনকি একপর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিল। এহেন পরিস্থিতিতে আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু ফয়সালা করলেন-উক্ত চার ব্যক্তির রক্তপণ আদায়ের জিম্মাদারি গর্ত খননকারীর ওপর বর্তাবে। তবে প্রথম ব্যক্তি পাবে তার রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। দ্বিতীয় ব্যক্তি এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয় ব্যক্তি এক অর্ধাংশ আর চতুর্থ ব্যক্তি পাবে পূর্ণ একটি রক্তপণ। এ ঘটনা নবীজির খেদমতে পেশ করা হলে তিনি একে সমর্থন করেন。
আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, এ ফয়সালার তাৎপর্য হলো-চার ব্যক্তি-ই অনিচ্ছাকৃত হত্যার শিকার হয়েছে। আর এর দায়-দায়িত্ব ছিল গর্ত খননকারীর ওপর। তবে প্রথম ব্যক্তি যেহেতু নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও তিনজনকে জড়িয়েছে, সেহেতু সে তিনজনের-ই হত্যাকারীরূপে বিবেচিত হবে। তাই তার রক্তপণের তিনটি অংশ প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির অংশে যোগ হবে। ফলে তার অংশে থাকবে স্রেফ রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। অনুরূপ দ্বিতীয় ব্যক্তি নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও দুজনের হত্যাকারী হিসাবে সাব্যস্ত হয়েছে। তাই তার রক্তপণ হতে দুজনে দু'অংশ পাবে। আর সে পাবে এক তৃতীয়াংশ। আর তৃতীয় ব্যক্তি ছিল এক ব্যক্তি হত্যাকারী। অতএব, তার রক্তপণের একাংশ পাবে নিহত ব্যক্তি আর অপরাংশ পাবে সে নিজে। পক্ষান্তরে চতুর্থ ব্যক্তি কাউকে টানা-হেঁচড়া করেনি বিধায় কারও হত্যাকারী নয়। তাই সে পাবে পূর্ণ রক্তপণ。
টিকাঃ
১১৮ তাফসিরে কুরতুবি: ১৫/১৬৩
📄 চক্রবৃদ্ধি সুদ
'রিচার্ড প্রাইস' ছিলেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত খ্রিস্টান পাদ্রি [ধর্মতত্ত্ববিদ] এবং অর্থনীতিবিদ। তিনি তার এক নিবন্ধে সুদ সম্পর্কে রীতিমতো পরিসংখ্যান চালিয়ে উল্লেখ করেছেন- 'যদি কাউকে ১ম খ্রিস্টাব্দ সনে মাত্র এক আনা সুদে ঋণ প্রদান করা হয়, তবে পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থা বিশ্বময় চালু হওয়ার পূর্বে উক্ত এক আনা সুদের প্রবৃদ্ধি এত বিশাল হবে যে, যা দ্বারা পৃথিবীর আয়তন হতে কয়েকগুণ বড় একটি স্বর্ণের স্তুপ নির্মাণ কর যাবে।
টিকাঃ
১১৯ সূত্র: L. Leantyer: A Short Coursre of Political Economy, Progress Publishers, Moscow 1968
📄 পর-বিমুখতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা
কাজি বাক্কার ইবনু কুতাইবা রহ. মিশরের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ছিলেন। যিনি ইমাম তহাবি রহ.-এর উস্তাদ ছিলেন। এমনকি ইমাম তহাবি রহ. স্বীয় কিতাব শরহু মাআনিল আসার-এর কতিপয় হাদিসও তার সনদে উল্লেখ করেছেন। সে যুগে মিশরের শাসনকর্তা ছিলেন আহমদ ইবনু তুলুন। তিনি ইমাম বাক্কারের হাদিসের দরসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। দরসের পূর্বে রাজার প্রহরীরা ঘোষণা করত-আপনারা কেউ নিজ স্থান হতে সরবেন না। সকলেই নিজ নিজ আসনে স্থির হয়ে বসুন। অতঃপর রাজা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সারিতে চুপচাপ বসে পড়তেন এবং দরস গ্রহণে মনোনিবেশ করতেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজা ও কাজি বাক্কার রহ.-এর মাঝে একটা মধুর সম্পর্ক বজায় ছিল। তখন রাজা তাকে মাসিক ভাতা ছাড়াও বাৎসরিক একহাজার দিনার হাদিয়া পেশ করতেন। ঘটনাক্রমে একটি রাজনৈতিক ব্যাপারে উভয়ের মাঝে অমিল দেখা দিল। রাজা চাচ্ছিলেন কাজি বাক্কারের সমর্থনে তার প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে; কিন্তু কাজি সাহেবের নিকট বিষয়টি মনঃপূত না হওয়ায় সমর্থন করেন নি। এ কারণে তাদের সম্পর্কে ভাটা পড়ল। বিষয়টি একপর্যায়ে এতদূর গড়ালো যে, বাদশা কাজি সাহেবকে গ্রেফতার করলেন এবং ইতোপূর্বে তাকে যেসব স্বর্ণমুদ্রা হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো একসঙ্গে ফেরত দিতে বললেন। বাদশা ভেবেছিল-এ ফরমান কাজি সাহেবকে বেশ জব্দ করে ছাড়বে; কিন্তু কাজি সাহেব এ নির্দেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্তে নিজ কক্ষে ঢুকলেন এবং আঠারোটি থলে নিয়ে আসলেন, যার প্রত্যেকটিতে একহাজার করে দিনার ছিল। বাদশা থলেগুলো ভালো করে হাতিয়ে দেখলেন যে, হুবহু সেই থলে যা তিনি কাজি সাহেবের নিকট প্রতি বছর পাঠাতেন। তার মুখে আঁটা সীলমোহর পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। বাদশা রীতিমতো থতমত খেয়ে গেলেন যে, কাজি সাহেব একটি থলেও খুলে দেখেন নি; যেভাবে পাঠানো হয়েছিল ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করে রেখেছেন!
পরবর্তী সময়ে জানা গেল যে, কাজি সাহেব থলেগুলো এই ভেবে খুলেন নি-আজ হয়তো আমার সঙ্গে বাদশার ভালো সম্পর্ক আছে, ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। তখন এগুলো তাকে ফেরত দেওয়া যাবে। বাদশা কাজি সাহেবের দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, আত্মপ্রত্যয় ও অমুখাপেক্ষীতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা দেখে লজ্জায় মাথা নোয়াতে বাধ্য হলেন।
টিকাঃ
১২০ আন-নুজুমুয যাহেরা: ৩/১৯
📄 সুস্থতার মূল্যায়ন
আবু হামজা মুহাম্মদ ইবনু মায়মুন সুকরি রহ. [মৃত্যু: ১৬৮হি.] ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। সুকরি'র শাব্দিক অর্থ হলো— নেশাখোর। শব্দটি মূলত নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রেতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়; কিন্তু আবু হামজার বর্ণনাশৈলী ও বাচনভঙ্গি এতটাই চমৎকার ও আকর্ষণীয় ছিল— যে কেউ তার কথায় মুগ্ধ হয়ে যেত। বিধায় তাকে সুকরি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
আবু হামজার একটি বিশেষ গুণ ছিল— কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তিনি অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হওয়া সমপরিমাণ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতেন। তিনি বলতেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে সুস্থতার নিয়ামত দান করে আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অন্তত এ পরিমাণ অর্থ সদকা করা উচিত। আবু হামজার প্রতি তাঁর প্রতিবেশীরা বেশ সন্তুষ্ট ছিল। একবার জনৈক প্রতিবেশী নিজ বাড়ি বিক্রি করার ইচ্ছা করল। গ্রাহক মূল্য জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, মূল বাড়ির মূল্য দুই হাজার টাকা আর দুই হাজার টাকা হলো আবু হামজার পড়শি হওয়ার মূল্য। আবু হামজা রহ. এ সংবাদ পেয়ে প্রতিবেশী লোকটিকে নিজ গাঁট থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে বললেন, বাড়ি বিক্রির প্রয়োজন নেই। এগুলো দিয়ে আপাতত কাজ সারো。
টিকাঃ
১২১ তারিখে বাগদাদ: ৩/২৬৮-২৬৯