📄 দ্বীনপ্রচারে উদারতা ও বিচক্ষণতার গুরুত্ব
দাওয়াত ও তাবলিগ তথা দ্বীনের প্রচার-প্রসারকার্যে এমনিতেই বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা থাকা চাই। তবে সন্দিগ্ধ রোগীর চিকিৎসা করা তুলনামূলক কঠিন কাজ। এ ক্ষেত্রে একজন দ্বীনের দায়ির জন্য সীমাহীন ধৈর্য-সহ্য, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং কথাকে শ্রোতার অন্তরে বদ্ধমূল করার মতো যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি। আজ অধ্যয়নের ফাঁকে একটি হাদিস নজরে পড়েছে। এতে রাসুলুল্লাহ সা. সংশয়াকুল রোগীর চিকিৎসা কীভাবে করতেন, তা সহজেই অনুমেয়। আবু উমামা রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার নবীজির নিকট কুরাইশ বংশের এক যুবক এসে এক অদ্ভুত বিষয়ের আবেদন জানাল। বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে জিনা করার অনুমতি দেন। ভেবে দেখুন— কী ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক প্রস্তাব! যা পেশ করা হলো এমন পবিত্র সত্তার নিকট, যাঁর পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার সামনে ফেরেশতা পর্যন্ত তুচ্ছ ও অতি নগণ্য। তাও আবার সাধারণ গুনাহর আবেদন নয়; জিনার মতো জঘন্য কাজের আবেদন! যার নাম পর্যন্ত কোনো ভদ্র ও শালীন ব্যক্তি মুখে উচ্চারণ করতে পারে না। নবীজি ছাড়া অন্য কেউ হলে হয়তো তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। এজন্যই উপস্থিত জনতা যুবকটির প্রতি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল এবং ইচ্ছামতো শাসাতে লাগল; কিন্তু জীবন উৎসর্গ করতে হয় রহমত ও শান্তির ধারকবাহক এ মহান সত্তার জন্য। তিনি যুবকটির হাব-ভাব ও চাল-চলন দেখে সহজেই আঁচ করতে পারলেন যে, সে শঠ, ধূর্ত কিংবা ইসলামবিদ্বেষী নয়; বরং সে সন্দেহের রোগী ও দুর্বল ঈমানের অধিকারী। তাকে ঘৃণা-লাঞ্ছনার পরিবর্তে আদর-স্নেহ ও মায়াডোরে বন্দি করাই কাম্য। তাই তিনি সাহাবিদের শাসাতে বারণ করলেন এবং যুবককে বললেন, তুমি আমার কাছে এসো। সে কাছে এলে তাকে দরদভরা কন্ঠে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কি এ কাজটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে? যুবক উত্তরে বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক! কস্মিন কালেও না। তখন তিনি বললেন, তবে তো অন্যরাও তাদের মায়ের এ কাজটি পছন্দ করবে না。
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তোমার মেয়ে এ জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ুক, এটাকি তুমি কখনো চাইবে? যুবক বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক! কক্ষনো না। নবীজি বললেন, তাহলে অন্য কেউ নিজ মেয়ে এ কাজে লিপ্ত হোক, তা চাইবে না। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কি এ কাজ তোমার বোনের জন্য পছন্দ করবে? যুবক বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন কুরবান হোক! কখনো না। নবীজি বললেন, তাহলে অন্যরাও তাদের বোনের জন্য এ কাজকে পছন্দ করবে না。
সবশেষে নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কি এ কাজ তোমার ফুফু বা খালার জন্য পছন্দ করবে? যুবক বলল, না, হে আল্লাহর রাসুল! খোদার কসম! আমি এ কাজ আমার ফুফু বা খালার জন্য কখনোই পছন্দ করবো না।
কথা শুনে নবীজি বললেন-তাহলে তো অন্য লোকেরাও তাদের ফুফু বা খালার জন্য এ কাজ পছন্দ করবে না। অতঃপর তিনি নিজ স্নেহ ও উদারতার হাত মোবারক তার মাথায় রেখে বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি এ যুবকের গুনাহ মাফ করে দেন! তার হৃদয়কে নির্মল ও স্বচ্ছ করে দেন!'
বর্ণনাকারী আবু উমামা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এরপর থেকে যুবকটি এত উত্তম চরিত্র ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হয়ে গেল যে, কখনো কারও দিকে ভ্রুক্ষেপই করত না। ইমাম হাইসামি রহ. হাদিসটির সনদ সহিহ বলে মন্তব্য করেন。
টিকাঃ
১১৭ মাজমাউয-যাওয়ায়েদ: ১/১২৯
📄 আলি রা.-এর অদ্ভুত ফয়সালা
একবার নবীজি আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমেনে পাঠালেন। সেখানকার লোকজন বাঘ শিকারে অভ্যস্ত ছিল। সে লক্ষ্যে তারা গর্ত খনন করে নানা কৌশলে বাঘকে গর্তে ফেলে শিকার করত। নিয়মানুযায়ী একদিন তারা একটি গর্ত খুঁড়ে বাঘকে তাতে ফেলে দিল। আর গর্তের চারপাশে লোকজন তামাশা দেখার জন্য ভিড় জমালো। প্রচণ্ড গাদাগাদি ও ভিড়ের কারণে এক ব্যক্তি তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে গর্তে পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বাঁচাতে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে ধরে ফেলল। তারও একই অবস্থা। সে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তার পাশের ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরলো। তৃতীয় ব্যক্তিরও অনুরূপ অবস্থা হলো। তখন পাশের ব্যক্তির হাত ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল। ফলে তাদের কেউই নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। চারজনই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে গর্তে পড়ে গেল。
এদিকে বাঘ তখনো জীবিত ছিল। সে এদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করল; একপর্যায়ে তারা সকলে সেখানেই প্রাণ হারাল। তাদের মৃত্যুর পর আত্মীয়- স্বজনদের মাঝে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো তাদের রক্তপণ নিয়ে। এমনকি একপর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিল। এহেন পরিস্থিতিতে আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু ফয়সালা করলেন-উক্ত চার ব্যক্তির রক্তপণ আদায়ের জিম্মাদারি গর্ত খননকারীর ওপর বর্তাবে। তবে প্রথম ব্যক্তি পাবে তার রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। দ্বিতীয় ব্যক্তি এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয় ব্যক্তি এক অর্ধাংশ আর চতুর্থ ব্যক্তি পাবে পূর্ণ একটি রক্তপণ। এ ঘটনা নবীজির খেদমতে পেশ করা হলে তিনি একে সমর্থন করেন。
আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, এ ফয়সালার তাৎপর্য হলো-চার ব্যক্তি-ই অনিচ্ছাকৃত হত্যার শিকার হয়েছে। আর এর দায়-দায়িত্ব ছিল গর্ত খননকারীর ওপর। তবে প্রথম ব্যক্তি যেহেতু নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও তিনজনকে জড়িয়েছে, সেহেতু সে তিনজনের-ই হত্যাকারীরূপে বিবেচিত হবে। তাই তার রক্তপণের তিনটি অংশ প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির অংশে যোগ হবে। ফলে তার অংশে থাকবে স্রেফ রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। অনুরূপ দ্বিতীয় ব্যক্তি নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও দুজনের হত্যাকারী হিসাবে সাব্যস্ত হয়েছে। তাই তার রক্তপণ হতে দুজনে দু'অংশ পাবে। আর সে পাবে এক তৃতীয়াংশ। আর তৃতীয় ব্যক্তি ছিল এক ব্যক্তি হত্যাকারী। অতএব, তার রক্তপণের একাংশ পাবে নিহত ব্যক্তি আর অপরাংশ পাবে সে নিজে। পক্ষান্তরে চতুর্থ ব্যক্তি কাউকে টানা-হেঁচড়া করেনি বিধায় কারও হত্যাকারী নয়। তাই সে পাবে পূর্ণ রক্তপণ。
টিকাঃ
১১৮ তাফসিরে কুরতুবি: ১৫/১৬৩
📄 চক্রবৃদ্ধি সুদ
'রিচার্ড প্রাইস' ছিলেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত খ্রিস্টান পাদ্রি [ধর্মতত্ত্ববিদ] এবং অর্থনীতিবিদ। তিনি তার এক নিবন্ধে সুদ সম্পর্কে রীতিমতো পরিসংখ্যান চালিয়ে উল্লেখ করেছেন- 'যদি কাউকে ১ম খ্রিস্টাব্দ সনে মাত্র এক আনা সুদে ঋণ প্রদান করা হয়, তবে পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থা বিশ্বময় চালু হওয়ার পূর্বে উক্ত এক আনা সুদের প্রবৃদ্ধি এত বিশাল হবে যে, যা দ্বারা পৃথিবীর আয়তন হতে কয়েকগুণ বড় একটি স্বর্ণের স্তুপ নির্মাণ কর যাবে।
টিকাঃ
১১৯ সূত্র: L. Leantyer: A Short Coursre of Political Economy, Progress Publishers, Moscow 1968
📄 পর-বিমুখতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা
কাজি বাক্কার ইবনু কুতাইবা রহ. মিশরের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ছিলেন। যিনি ইমাম তহাবি রহ.-এর উস্তাদ ছিলেন। এমনকি ইমাম তহাবি রহ. স্বীয় কিতাব শরহু মাআনিল আসার-এর কতিপয় হাদিসও তার সনদে উল্লেখ করেছেন। সে যুগে মিশরের শাসনকর্তা ছিলেন আহমদ ইবনু তুলুন। তিনি ইমাম বাক্কারের হাদিসের দরসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। দরসের পূর্বে রাজার প্রহরীরা ঘোষণা করত-আপনারা কেউ নিজ স্থান হতে সরবেন না। সকলেই নিজ নিজ আসনে স্থির হয়ে বসুন। অতঃপর রাজা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সারিতে চুপচাপ বসে পড়তেন এবং দরস গ্রহণে মনোনিবেশ করতেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজা ও কাজি বাক্কার রহ.-এর মাঝে একটা মধুর সম্পর্ক বজায় ছিল। তখন রাজা তাকে মাসিক ভাতা ছাড়াও বাৎসরিক একহাজার দিনার হাদিয়া পেশ করতেন। ঘটনাক্রমে একটি রাজনৈতিক ব্যাপারে উভয়ের মাঝে অমিল দেখা দিল। রাজা চাচ্ছিলেন কাজি বাক্কারের সমর্থনে তার প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে; কিন্তু কাজি সাহেবের নিকট বিষয়টি মনঃপূত না হওয়ায় সমর্থন করেন নি। এ কারণে তাদের সম্পর্কে ভাটা পড়ল। বিষয়টি একপর্যায়ে এতদূর গড়ালো যে, বাদশা কাজি সাহেবকে গ্রেফতার করলেন এবং ইতোপূর্বে তাকে যেসব স্বর্ণমুদ্রা হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো একসঙ্গে ফেরত দিতে বললেন। বাদশা ভেবেছিল-এ ফরমান কাজি সাহেবকে বেশ জব্দ করে ছাড়বে; কিন্তু কাজি সাহেব এ নির্দেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্তে নিজ কক্ষে ঢুকলেন এবং আঠারোটি থলে নিয়ে আসলেন, যার প্রত্যেকটিতে একহাজার করে দিনার ছিল। বাদশা থলেগুলো ভালো করে হাতিয়ে দেখলেন যে, হুবহু সেই থলে যা তিনি কাজি সাহেবের নিকট প্রতি বছর পাঠাতেন। তার মুখে আঁটা সীলমোহর পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। বাদশা রীতিমতো থতমত খেয়ে গেলেন যে, কাজি সাহেব একটি থলেও খুলে দেখেন নি; যেভাবে পাঠানো হয়েছিল ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করে রেখেছেন!
পরবর্তী সময়ে জানা গেল যে, কাজি সাহেব থলেগুলো এই ভেবে খুলেন নি-আজ হয়তো আমার সঙ্গে বাদশার ভালো সম্পর্ক আছে, ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। তখন এগুলো তাকে ফেরত দেওয়া যাবে। বাদশা কাজি সাহেবের দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, আত্মপ্রত্যয় ও অমুখাপেক্ষীতার অত্যুজ্জ্বল নমুনা দেখে লজ্জায় মাথা নোয়াতে বাধ্য হলেন।
টিকাঃ
১২০ আন-নুজুমুয যাহেরা: ৩/১৯