📄 বিদুষী নারী
শাইখ আলাউদ্দিন সমরকান্দি রহ. তুহফাতুল ফুকাহা নামক একটি কিতাব রচনা করেন। যার ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন তারই প্রিয় ছাত্র ইমাম আবু বকর ইবনু মাসউদ কাসানি রহ.। যা বাদায়েউস সানায়ে নামে প্রসিদ্ধ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আজও তা আলোড়ন সৃষ্টিকারী যুগান্তকারী গ্রন্থ। আল্লামা শামি রহ.-এর বক্তব্য অনুযায়ী ফিকাহশাস্ত্রে এটি একটি অদ্বিতীয় কিতাব। যা-হোক, ইমাম কাসানি রহ. তার ব্যাখ্যাগ্রন্থটি রচনা করে শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদকে দেখালেন। উস্তাদ তা দেখে ভীষণ খুশি হয়েছেন। এবং নিজের কলিজার টুকরা প্রিয় কন্যা ফাতেমাকে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। যাকে বিয়ে করার জন্য অনেক রাজা-বাদশা পর্যন্ত প্রস্তাব করেছিল; কিন্তু শাইখ আলাউদ্দিন তাদের কারও প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। ফেকাহ ও ফতোয়াশাস্ত্রে এ মহীয়সী নারীর এতই বুৎপত্তি ছিল যে, রীতিমতো তিনি ফতোয়া লিখতেন। পরবর্তী সময়ে দেখা যেত কেউ কোনো ফতোয়া বা লিখিত সমাধান চাইলে উত্তরপত্রে তিন হাতের লেখা থাকত। কিছু অংশ শাইখ আলাউদ্দিনের, কিছু অংশ আল্লামা কাসানি রহ.-এর আর কিছু অংশ তার স্ত্রী ফাতেমার。
টিকাঃ
১১৩ ফাতাওয়া শামি: ১/১০০
📄 উম্মে সুলাইম রা.-এর ঈমানদীপ্ত ঘটনা
রাসুলুল্লাহ সা. যে সকল ভাগ্যবান ব্যক্তিদেরকে জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহা তাদের অন্যতম। তার মূল নাম ছিল রুমাইসা। জাবির রাজিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, আমি [স্বপ্নযোগে] জান্নাতে প্রবেশ করেছিলাম। হঠাৎ আমার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সেখানে অবস্থানরত আবু তালহার স্ত্রী রুমাইসার প্রতি। নবীজির যুগে তার এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল-যা তাকে সাহাবিদের মধ্যে অনুপম করে রেখেছে。
নিম্নে তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো:
ক. বিবাহ
উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহার বিবাহের ঘটনা ছিল অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও বিচিত্র। তিনি বিবাহের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু তার স্বামী আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু তখনো মুসলিম হন নি। আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু তাকে কাফের অবস্থায়ই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। উম্মে সুলাইম উত্তরে আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, আবু তালহা, তোমার জানা আছে কি, তুমি যেই কাঠ [মূর্তি]-এর পূজা করছ সেটি মূলত মাটি হতে উৎপন্ন এক তুচ্ছ জিনিস, যাকে অমুক গোত্রের হাবশি লোক মনগড়া উদ্ভাবন করেছে? আবু তালহা বললেন, হ্যাঁ! আমি জানি。
উম্মে সুলাইম বললেন, এরকম একটি কাঠকে মাবুদরূপে গ্রহণ করতে তোমার লজ্জা করে না? যা-হোক, তোমার মতো ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তবে সমাস্যা হলো-আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর তুমি এখনো কাফের। যদি তুমি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করো, তাহলে আমার মোহর দিতে হবে না। আবু তালহা বললেন, তাই বলে শুধু ইসলাম গ্রহণ তোমার মতো মহীয়সীর মোহর হতে পারে না। উম্মে সুলাইম বললেন, তাহলে আমার মোহর কী হতে পারে? আবু তালহা উত্তর করলেনড়কেন স্বর্ণ-রৌপ্য! উম্মে সুলাইম বললেন, আমার এসবের প্রয়োজন নেই। আমি কেবল তোমার ইসলামই কামনা করি。
এ কথা শুনে আবু তালহার হৃদয়াকাশে ইসলামের প্রতি অগাধ ভালোবাসা চমকে উঠল। তাই কালবিলম্ব না করে তিনি রাসুলুল্লাহর খেদমতে হাজির হলেন। নবীজি তখন সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহুকে দেখে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আবু তালহা তোমাদের নিকট এমতাবস্থায় এসেছে যে, তার চোখে-মুখে ইসলামের নুর ঝলমল করছে। অতঃপর আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করে উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে শুভ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন。
খ. বীরত্ব ও সাহসিকতা
এই উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কেই আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন-উহুদযুদ্ধে আমি আয়েশা ও উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহুমাকে সার্বক্ষণিক তৎপর ও উদ্দম দেখেছি। তারা পানির ভরাপাত্র পিঠে বহন করে মুজাহিদদের পান করাতেন। পাত্র খালি হলে পুনরায় আবার বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আসতেন। [তখনো পর্দার বিধান নাজিল হয় নি।]
হুনাইনের যুদ্ধে আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু তার স্ত্রীকে দেখেন, তিনি একটি খঞ্জর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আবু তালহা জিজ্ঞাসা করলেন-উম্মে সুলাইম, তোমার হাতে এটা কী? উম্মে সুলাইম বললেন, এটা খঞ্জর! কোনো মুশরিক আমার দিকে আসতে চাইলে এ খঞ্জরটি তার পেটে বসিয়ে দেবো। আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু স্ত্রীর বীরত্ব ও সাহসিকতায় যারপরনাই খুশি হলেন। এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট তা জানালেন। নবীজি বললেন, উম্মে সুলাইম, এখন আর তোমাদের এত মেহনতের প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট。
গ. ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা
একবার আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি ছেলেকে সে অবস্থায় রেখেই আপন কাজে চলে যান। বাড়িতে ছিলেন তার মা উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু। একদিন ছেলেটি হঠাৎ-ই মারা গেল। ইতোমধ্যে সেদিনই আবু তালহা বাড়ি ফিরলেন। উম্মে সুলাইম স্বামীকে কিছু না জানিয়ে যে কক্ষে ছেলেটি মারা গিয়েছিল সেখানে একটি কাপড় দ্বারা ছেলের মৃতদেহ আবৃত করে এসে আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খাবার প্রস্তুতে নিয়োজিত হলেন। আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সেদিন রোজাদার। উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন-ইফতারের পূর্বে তাকে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ দেওয়াটা ঠিক হবে না। যে কথা সে কাজ। আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলেন। বাড়িতে পা রেখেই ছেলের শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলেন এবং তাকে দেখার জন্য কক্ষের দিকে অগ্রসর হলেন; কিন্তু বুদ্ধিমতি স্ত্রী উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। তাকে দেখার প্রয়োজন নেই। এ কথা শুনে আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু নিশ্চিন্ত মনে ইফতার করতে লাগলেন। উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য অন্যান্য দিনের মতো সাজগোজ করলেন। এমনকি বাড়ির পরিবেশে কোনো প্রকার শোকের ছায়াও ফেলতে দেন নি। সারা রাত যথারীতি হাসি-খুশি ও আনন্দ-ফুর্তিতেই স্বামীকে মাতিয়ে রাখলেন。
তাহাজ্জুদের সময় উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু আবু তালহাকে বললেন, অমুক গোত্রের লোকদের একটি স্বভাব বড়ই অদ্ভুত! তারা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কোনো কিছু কর্জ আনার পর তা নিজের মনে করে বসে আছে। যখন প্রতিবেশীরা তা ফেরত চাইল, অমনি তারা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে গেল! আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এটা তো মহা অন্যায়। তারা খুবই নিন্দনীয় কাজ করেছে。
এবার উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনার ছেলেটিকেও আল্লাহ তাআলা আপনাকে কর্জস্বরূপ দিয়েছিলেন। এখন তিনি তাকে ফেরত নিয়ে গেছেন। তিনিই তার প্রকৃত মালিক। অতএব, আমাদের ধৈর্যধারণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই。
আবু তালহা রাজিয়াল্লাহু আনহু এ কথা শুনে একদম ভেঙে পড়লেন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর খেদমতে গিয়ে উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহুর এরূপ আচরণের অভিযোগ করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন- আবু তালহা, আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি গতরাতে বিরাট বরকত অবতীর্ণ করেছেন。
ঘ. নবিজির প্রতি মহব্বত
আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ স্বীয় বিবিগণের ঘর ব্যতীত মদিনার অন্য কারও ঘরে যেতেন না। কেবল মাঝে মধ্যে উম্মে সুলাইমের ঘরে তাশরিফ নিতেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তার প্রতি দয়া হয়। কারণ, তার ভাইকে আমার সামনেই শহিদ করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আনাস রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকেই অপর একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ আমাদের ঘরে তাশরিফ নিলেন। দুপুরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন। তীব্র গরমে তাঁর পবিত্র শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছিল। উম্মে সুলাইম রাজিয়াল্লাহু আনহু এ অবস্থা দেখে একটি শিশিতে তা সংগ্রহ করতে লাগলেন। হঠাৎ নবীজির ঘুম ভেঙে গেল। জিজ্ঞাসা করলেন—উম্মে সুলাইম, এ কী করছ তুমি! উম্মে সুলাইম উত্তর করলেন-ইয়া রাসুলাল্লাহ, এতে আপনার ঘাম। আমি একে আতরের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করবো। কারণ, এ ঘাম পৃথিবীর সকল আতরের তুলনায় অধিক সুগন্ধিময়。
টিকাঃ
১১৪ বিস্তারিত দেখুন—আবু নুআইম ইস্পাহানি কৃত ‘হিলইয়াতুল আউলিয়া’
১১৫ বুখারি: ৫৪৭০; মুসলিম: ২১১৯,২১৪৪
১১৬ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/৫৭-৬১
📄 দ্বীনপ্রচারে উদারতা ও বিচক্ষণতার গুরুত্ব
দাওয়াত ও তাবলিগ তথা দ্বীনের প্রচার-প্রসারকার্যে এমনিতেই বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা থাকা চাই। তবে সন্দিগ্ধ রোগীর চিকিৎসা করা তুলনামূলক কঠিন কাজ। এ ক্ষেত্রে একজন দ্বীনের দায়ির জন্য সীমাহীন ধৈর্য-সহ্য, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং কথাকে শ্রোতার অন্তরে বদ্ধমূল করার মতো যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি। আজ অধ্যয়নের ফাঁকে একটি হাদিস নজরে পড়েছে। এতে রাসুলুল্লাহ সা. সংশয়াকুল রোগীর চিকিৎসা কীভাবে করতেন, তা সহজেই অনুমেয়। আবু উমামা রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার নবীজির নিকট কুরাইশ বংশের এক যুবক এসে এক অদ্ভুত বিষয়ের আবেদন জানাল। বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে জিনা করার অনুমতি দেন। ভেবে দেখুন— কী ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক প্রস্তাব! যা পেশ করা হলো এমন পবিত্র সত্তার নিকট, যাঁর পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার সামনে ফেরেশতা পর্যন্ত তুচ্ছ ও অতি নগণ্য। তাও আবার সাধারণ গুনাহর আবেদন নয়; জিনার মতো জঘন্য কাজের আবেদন! যার নাম পর্যন্ত কোনো ভদ্র ও শালীন ব্যক্তি মুখে উচ্চারণ করতে পারে না। নবীজি ছাড়া অন্য কেউ হলে হয়তো তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। এজন্যই উপস্থিত জনতা যুবকটির প্রতি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল এবং ইচ্ছামতো শাসাতে লাগল; কিন্তু জীবন উৎসর্গ করতে হয় রহমত ও শান্তির ধারকবাহক এ মহান সত্তার জন্য। তিনি যুবকটির হাব-ভাব ও চাল-চলন দেখে সহজেই আঁচ করতে পারলেন যে, সে শঠ, ধূর্ত কিংবা ইসলামবিদ্বেষী নয়; বরং সে সন্দেহের রোগী ও দুর্বল ঈমানের অধিকারী। তাকে ঘৃণা-লাঞ্ছনার পরিবর্তে আদর-স্নেহ ও মায়াডোরে বন্দি করাই কাম্য। তাই তিনি সাহাবিদের শাসাতে বারণ করলেন এবং যুবককে বললেন, তুমি আমার কাছে এসো। সে কাছে এলে তাকে দরদভরা কন্ঠে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কি এ কাজটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে? যুবক উত্তরে বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক! কস্মিন কালেও না। তখন তিনি বললেন, তবে তো অন্যরাও তাদের মায়ের এ কাজটি পছন্দ করবে না。
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তোমার মেয়ে এ জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ুক, এটাকি তুমি কখনো চাইবে? যুবক বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক! কক্ষনো না। নবীজি বললেন, তাহলে অন্য কেউ নিজ মেয়ে এ কাজে লিপ্ত হোক, তা চাইবে না। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কি এ কাজ তোমার বোনের জন্য পছন্দ করবে? যুবক বলল, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার জীবন কুরবান হোক! কখনো না। নবীজি বললেন, তাহলে অন্যরাও তাদের বোনের জন্য এ কাজকে পছন্দ করবে না。
সবশেষে নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কি এ কাজ তোমার ফুফু বা খালার জন্য পছন্দ করবে? যুবক বলল, না, হে আল্লাহর রাসুল! খোদার কসম! আমি এ কাজ আমার ফুফু বা খালার জন্য কখনোই পছন্দ করবো না।
কথা শুনে নবীজি বললেন-তাহলে তো অন্য লোকেরাও তাদের ফুফু বা খালার জন্য এ কাজ পছন্দ করবে না। অতঃপর তিনি নিজ স্নেহ ও উদারতার হাত মোবারক তার মাথায় রেখে বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি এ যুবকের গুনাহ মাফ করে দেন! তার হৃদয়কে নির্মল ও স্বচ্ছ করে দেন!'
বর্ণনাকারী আবু উমামা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এরপর থেকে যুবকটি এত উত্তম চরিত্র ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হয়ে গেল যে, কখনো কারও দিকে ভ্রুক্ষেপই করত না। ইমাম হাইসামি রহ. হাদিসটির সনদ সহিহ বলে মন্তব্য করেন。
টিকাঃ
১১৭ মাজমাউয-যাওয়ায়েদ: ১/১২৯
📄 আলি রা.-এর অদ্ভুত ফয়সালা
একবার নবীজি আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমেনে পাঠালেন। সেখানকার লোকজন বাঘ শিকারে অভ্যস্ত ছিল। সে লক্ষ্যে তারা গর্ত খনন করে নানা কৌশলে বাঘকে গর্তে ফেলে শিকার করত। নিয়মানুযায়ী একদিন তারা একটি গর্ত খুঁড়ে বাঘকে তাতে ফেলে দিল। আর গর্তের চারপাশে লোকজন তামাশা দেখার জন্য ভিড় জমালো। প্রচণ্ড গাদাগাদি ও ভিড়ের কারণে এক ব্যক্তি তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে গর্তে পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বাঁচাতে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে ধরে ফেলল। তারও একই অবস্থা। সে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তার পাশের ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরলো। তৃতীয় ব্যক্তিরও অনুরূপ অবস্থা হলো। তখন পাশের ব্যক্তির হাত ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল। ফলে তাদের কেউই নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। চারজনই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে গর্তে পড়ে গেল。
এদিকে বাঘ তখনো জীবিত ছিল। সে এদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করল; একপর্যায়ে তারা সকলে সেখানেই প্রাণ হারাল। তাদের মৃত্যুর পর আত্মীয়- স্বজনদের মাঝে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো তাদের রক্তপণ নিয়ে। এমনকি একপর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিল। এহেন পরিস্থিতিতে আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু ফয়সালা করলেন-উক্ত চার ব্যক্তির রক্তপণ আদায়ের জিম্মাদারি গর্ত খননকারীর ওপর বর্তাবে। তবে প্রথম ব্যক্তি পাবে তার রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। দ্বিতীয় ব্যক্তি এক তৃতীয়াংশ। তৃতীয় ব্যক্তি এক অর্ধাংশ আর চতুর্থ ব্যক্তি পাবে পূর্ণ একটি রক্তপণ। এ ঘটনা নবীজির খেদমতে পেশ করা হলে তিনি একে সমর্থন করেন。
আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, এ ফয়সালার তাৎপর্য হলো-চার ব্যক্তি-ই অনিচ্ছাকৃত হত্যার শিকার হয়েছে। আর এর দায়-দায়িত্ব ছিল গর্ত খননকারীর ওপর। তবে প্রথম ব্যক্তি যেহেতু নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও তিনজনকে জড়িয়েছে, সেহেতু সে তিনজনের-ই হত্যাকারীরূপে বিবেচিত হবে। তাই তার রক্তপণের তিনটি অংশ প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির অংশে যোগ হবে। ফলে তার অংশে থাকবে স্রেফ রক্তপণের এক চতুর্থাংশ। অনুরূপ দ্বিতীয় ব্যক্তি নিজে নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও দুজনের হত্যাকারী হিসাবে সাব্যস্ত হয়েছে। তাই তার রক্তপণ হতে দুজনে দু'অংশ পাবে। আর সে পাবে এক তৃতীয়াংশ। আর তৃতীয় ব্যক্তি ছিল এক ব্যক্তি হত্যাকারী। অতএব, তার রক্তপণের একাংশ পাবে নিহত ব্যক্তি আর অপরাংশ পাবে সে নিজে। পক্ষান্তরে চতুর্থ ব্যক্তি কাউকে টানা-হেঁচড়া করেনি বিধায় কারও হত্যাকারী নয়। তাই সে পাবে পূর্ণ রক্তপণ。
টিকাঃ
১১৮ তাফসিরে কুরতুবি: ১৫/১৬৩