📄 একটি মজার গল্প
চার রাকাত-বিশিষ্ট নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে বসে শুধু আত্তাহিয়্যাতু পড়তে হবে। দরুদ শরিফ পড়া যাবে না।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মাজহাব হলো—
কেউ যদি দ্বিতীয় রাকাতে ভুলবশত আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর 'আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ' পর্যন্ত পড়ে ফেলে, তাহলে তার ওপর সেজদা সাহু ওয়াজিব।
এ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত আছে—
একবার ইমাম আবু হানিফা রহ. স্বপ্নযোগে নবীজির সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হন। নবীজি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর দরুদ পাঠ করে, তুমি কীভাবে তার ওপর সেজদা সাহু ওয়াজিব বলে থাকো? ইমাম সাহেব উত্তর করলেন—তার কারণ হলো, সে আপনার ওপর দরুদ পাঠ করেছে ভুলবশত [যা উদাসীনতার লক্ষণ]। নবীজির নিকট এ উত্তরটি বেশ মনঃপূত হলো。
টিকাঃ
১০০ আল-বাহরুর রায়েক: ২/১০৫
📄 এক হাদিসের জন্য এক বছর...!
আল্লামা ইবনু আবদিল বার রহ. স্বীয় সনদে গালেব কাত্তান রহ.- এর একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। এ ঘটনা হতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম ইলমে হাদিসের জন্য কত কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করেছেন। একেকটি হাদিসের জন্য কত দূর-দূরান্ত পথ পাড়ি দিয়েছেন। গালেব কাত্তান ছিলেন একজন তুলার ব্যবসায়ী। স্রেফ ব্যবসার উদ্দেশ্যেই একবার তিনি কুফা নগরীতে গমন করেন; কিন্তু কুফায় পৌঁছার পর ভাবলেন—এখানকার বিজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের কাছ থেকে কিছু হাদিসের জ্ঞান অর্জন করাও উচিত। সেখানে তখন হাদিসের দরস দান করতেন তৎকালীন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস সুলাইমান আল-আ'মাশ রহ.। গালেব তার দরসে রীতিমতো আসা- যাওয়া করতে লাগলেন। এবং তার কাছ থেকে ইলমে হাদিস আহরণ করলেন। পরিশেষে যখন ব্যবসার কাজ সেরে বসরায় সফর করার ইচ্ছা করলেন, তখন কুফার সর্বশেষ রাত কাটালেন ইমাম আ'মাশ রহ.-এর কাছে। শেষরাতে সুলাইমান আল-আ'মাশ তাহাজ্জুদের নামাজে নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন—
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ.
আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায় নিষ্ঠাবান জ্ঞানীগণও এ মর্মে সাক্ষ্য দেন。
উক্ত আয়াতের পাশাপাশি তিনি আরও কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করলেন। এতে গালেব কাত্তান রহ. ধারণা করলেন, সম্ভবত ইমাম আ'মাশ রহ.-এর এ আয়াত সংশ্লিষ্ট কোনো হাদিস জানা আছে। তাই সকালবেলা বিদায়ের মুহূর্তে তিনি ইমাম আ'মাশ রহ.-কে জিজ্ঞেস করলেন— আপনাকে রাত্রিবেলায় দেখলাম একটি আয়াত বারবার পড়ছেন, উক্ত আয়াত সম্পর্কে আপনার কোনো হাদিস জানা আছে? আমি সারাটা বছর আপনার সান্নিধ্যে ছিলাম, অথচ আপনি তো এ হাদিস আমাকে কখনো শোনান নি! অমনি ইমাম আ'মাশের মুখ হতে বের হয়ে গেল—
والله لا أحدثنك به سنة.
খোদার কসম, তোমাকে এ হাদিস আগামী এক বছরেও শোনাবো না。
গালেب ব্যবসায়ী মানুষ। তিনি এখানে নিছক ব্যবসার উদ্দেশ্যেই এসেছিলেন। এক বছরে যে পরিমাণ হাদিস তিনি অর্জন করেছেন, তা কোনো অংশে কম ছিল না। আর এখন কেবল একটি হাদিস বাকি আছে। তাও কোনো বিধান সম্পর্কিত নয়; বরং ফজিলত সংক্রান্ত; কিন্তু হাদিসের আগ্রহ-উদ্দীপনা এতই প্রবল ছিল যে, তিনি ইমাম আ'মাশ রহ.-এর এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার সফর মুলতবি করেন। এবং আরও এক বছর তার সোহবতে থাকার দৃঢ় সংকল্প করেন। গালেব কাত্তান নিজেই বলেন— আমি সেদিন হতে সেখানেই অবস্থান শুরু করলাম এবং বছর পূর্তির দিন-তারিখ লিখে ইমাম আ'মাশের দরজায় ঝুলিয়ে দিলাম। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর আমি তাকে বললাম, আবু মুহাম্মদ, বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন আমাকে সেই হাদিসটি শোনান! অতঃপর ইমাম আ'মাশ সে হাদিসটি শোনালেন—
حدثني أبو وائل عن عبدالله بن مسعود قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: يجاء بصا حبها يوم القيامة فيقول الله تعالى: عبدى عهد إلى وأنا أحق من وفى بالعهد أدخلوا عبدى إلى الجنة.
আমাকে আবু ওয়ায়েল আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাজিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিস শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন—যে ব্যক্তি সূরা আলে ইমরানে উল্লিখিত شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو ] الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ পাঠ করবে, তাকে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। সেদিন আল্লাহ তাআলা বলবেন—আমার বান্দা আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল। আর আমি অঙ্গীকারপূরণে সবচে' বড় হকদার। অতএব, হে ফেরেশতাসকল, তোমরা আমার বান্দাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দাও。
টিকাঃ
১০১ সূরা আলে ইমরান: ১৮
১০২ ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি : ১/৯৯
📄 রোগী সেবায় ইসলামি নীতিমালা
নবীজি রোগীর সেবা-শুশ্রূষাকে ইসলামি অধিকার বলে সাব্যস্ত করেছেন; কিন্তু অনেকেই রোগীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও তার সেবা-যত্ন করার নিয়ম-নীতি সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা রোগীর সান্ত্বনা ও স্বস্তির পরিবর্তে অশান্তি ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নবীজি স্বীয় বাণী ও কর্মের মাধ্যমে আমাদেরকে এর সঠিক নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন। প্রতিটি মুসলমানের উচিত, এগুলোর প্রতি সবিশেষ লক্ষ্য রাখা:
ক. আয়েশা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজির অভ্যাস ছিল—কেউ অসুস্থ হলে স্বীয় ডান হাত রোগীর শরীরের ওপর রেখে এই দুআ পাঠ করতেন—
رَبَّ النَّاسِ ، أَذْهِبِ البَأْسَ ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شفاؤك ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَماً.
খ. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রোগী দেখার সুন্নত তরিকা হলো—তার নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকবে। উচ্চ আওয়াজে কথা বলবে না。
গ. রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন—
العيادة فواق ناقة.
উটনির দুধ দোহনের মধ্যবর্তী সময়ের বিরতি পরিমাণ সামান্য সময় রোগীর নিকট বসবে。
ঘ. সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. বলেন, 'সবচে' উত্তম রোগী দেখা হলো—তার নিকট অতি অল্প সময় বসে দ্রুত উঠে যাওয়া।' এ সকল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছেন যে, রোগীর নিকট এত বেশি সময় না বসা চাই, যা তার বিরক্তি ও অস্বস্তিবোধের কারণ হয়。
মোল্লা আলি কারি রহ. জনৈক বুজুর্গের ঘটনা বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা একবার বিখ্যাত সুফি বুজুর্গ সিররি সাকতি রহ.-কে দেখতে গেলাম। তিনি ছিলেন অসুস্থ। আমরা দীর্ঘক্ষণ তার নিকট বসে ছিলাম। আর এদিকে তিনি পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। পরিশেষে আমরা তাকে বললাম, হুজুর, আমরা চলে যাচ্ছি, আমাদের জন্য দুআ করবেন। তখন সিররি সাকতি রহ. এই বলে দুআ করলেন—
اللهم علمهم كيف يعودون المرضى.
হে আল্লাহ, আপনি এদেরকে রোগী দেখার নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেন!
এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা:
এক ব্যক্তি রোগী দেখতে গিয়ে সেখানে গেড়ে বসে পড়ল। রোগী বেচারা রোগ-যন্ত্রণায় কাতর ছিল। সে যখন বুঝতে পারল যে, লোকটি উঠতে চাচ্ছে না, তখন বলল, যাতায়াতকারীরাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে; কিন্তু কিছুতেই আল্লাহর বান্দার বোধ হলো না। সে বলল, তাহলে কি দরজা বন্ধ করে দেবো? অগত্যা রোগী বলল, অবশ্যই। তবে বাহির থেকে বন্ধ করো। মোল্লা আলি কারি রহ. বলেন, কিন্তু কেউ যদি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে যে, তার বসার দ্বারা রোগী খুশি হচ্ছে, তবে তা ভিন্ন কথা。
টিকাঃ
১০০ বুখারি: ৫৭৪৫; মুসলিম: ২১৯৪
১০৪ মিশকাতুল মাসাবিহ: পৃ.১৩৮
১০৫ ইবনু আবিদদুনইয়া: ১৮৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ৯২২২
১০৬ ইবনু আবিদদুনইয়া: ৬৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ৯২২১
১০৭ মিরকাতুল মাফাতিহ: ২/৩১৮-৩১৯
📄 অস্ট্রেলিয়াতে খরগোশের উপদ্রব
'জন উইলিয়াম গালাস' স্বরচিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, 'যখন অস্ট্রেলিয়া মহাদেশটি আবিষ্কৃত হলো, সেখানে ইউরোপীয় বহু লোক বসতি স্থাপন শুরু করল। তারা লক্ষ্য করল যে, অস্ট্রেলিয়ার কোথাও খরগোশ নেই। এ সকল ইউরোপিয়ান খরগোশ শিকারে অভ্যস্ত ছিল। শিকারের সময় যেসব মজাদার ঘটনার সম্মুখীন হতো তা তাদের স্মৃতিপটে উদয় হতে লাগল। তাদেরই একজন ছিল 'টমাস অস্টিন'। তিনি সর্বপ্রথম ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়ার বন-জঙ্গলকে জীব-জন্তু দিয়ে সাজানোর প্রয়াস চালালেন। সে সুবাদে তিনি ইউরোপ থেকে বারো জোড়া খরগোশ এনে সেখানকার বনভূমিতে ছেড়ে দিলেন; কিন্তু খোদার লীলা বুঝা বড় দায়! ইউরোপের বন-জঙ্গলে খরগোশের পাশাপাশি এমন সব প্রাণীও আছে যেগুলো খরগোশের প্রাকৃতিক দুশমন। আর এসব প্রাণীর কারণেই সেখানকার খরগোশের প্রজনন স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করেছে; কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় সেসব প্রাণী ছিল না। ফলে বারো জোড়া খরগোশের বংশ বিস্তার হলো এবং ক্রমে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলল। একপর্যায়ে সমগ্র অস্ট্রেলিয়ায় খরগোশে ভরে গেল। এ অবাধ্য ও লাগামহীন প্রাণী খেত-খামার ও চারণভূমি উজাড় করতে লাগল। কোনো চারণভূমিতে একবার ঢুকতে পারলে তা সাবাড় করে ছাড়ত। এক কথায়—যে প্রাণীকে অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ-প্রকৃতি মনোরম করতে ইউরোপ থেকে আনা হয়েছিল, তা এখন পুরো উপমহাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলাম্বন করা হলো; কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো。
অতঃপর এক প্রকার বিষাক্ত খাবার প্রয়োগ করে খরগোশনিধন অভিযান শুরু হলো; কিন্তু ফলাফল জিরো। এতেও রেহাই মেলে নি। অবশেষে কয়েক বছর চেষ্টা-সাধনারপর এ সমাস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া গেল এক ধরনের ঔষধ আবিষ্কারের মাধ্যমে। যা প্রয়োগ করলেই খরগোশ এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ত এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। এতে খরগোশের বংশ বিস্তার হ্রাস পেতে লাগল। ফলে শুষ্ক মাঠ-ঘাট, পাহাড়- পর্বত ও বনাঞ্চল আবারো সবুজ-শ্যামল ও ফলে-ফুলে ভরে উঠল। এ ছাড়াও ছাগল পালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আয় কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ১৯৫২- ১৯৫৩ অর্থ বছরে এর মাধ্যমে বৃদ্ধি পাওয়া আয়ের পরিমাণ ছিল-৮৪ মিলিয়ন পর্যন্ত。
টিকাঃ
১০৮ জন কিলার মুসমা কর্তৃক রচিত The Evidence God The of Expanding Universe-এর আরবি অনুবাদ : পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৫১