📄 এক কালজয়ী বৃদ্ধের কাহিনি
আব্বাসি খেলাফতকালে দীর্ঘদিন যাবৎ মুতাজিলা সম্প্রদায়ের 'খলকে কুরআন' বিষয়ে হাঙ্গামা সরকারি ছত্রছায়ায় মদদপুষ্ট হচ্ছিল। তারা মুসলিম বিশ্বে এক অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করল। তারা দাবি ওঠালো-'কুরআন মাখলুক'। আর যেহেতু এ দাবি সরকারি ছত্রছায়ায় উত্থাপিত হয়েছিল। তাই যেসকল হকানি আলেম এর বিরোধিতা করেছিলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এই অমানবিক নির্যাতনে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ ও ওয়াসিক বিল্লাহ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। তারা মুতাজিলা সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য হকপন্থী উলামায়ে কেরামের ওপর জুলুম-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছিল। তাদের লিডার ছিল আহমদ ইবনু আবু দাউদ মুতাজিলা। সে সম্ভাব্য সকল পন্থায় উলামায়ে কেরামকে খলিফার মাধ্যমে শান্তি দিত। এরই ধারাবাহিকতায় ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহ.-এর মতো মহান ব্যক্তিত্বকে চাবুকাঘাত করা হয়েছে কেবল সরকারের তোষামোদ না করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে。
একপর্যায়ে খলকে কুরআনের ফিতনার আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়। আর সেই আগুনের লেলিহান শিখা নির্বাপিত হয়েছিল এক বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমের দ্বারা। তিনি তার ঈমানি চেতনা, দৃঢ় সংকল্প, স্থির পদক্ষেপ, আত্মবিশ্বাস ও একনিষ্ঠতার মাধ্যমে ওয়াসিক বিল্লার রাজদরবারের অবকাঠামো পাল্টে দিয়েছেন। ঘটনাটি মূলত ঘটেছিল খলিফা ওয়াসিকের শাসনামলে; কিন্তু ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন তার পুত্র খলিফা মুহতাদি বিল্লাহ তারই যুগের বিশিষ্ট আলেম শাইখ সালেহ ইবনু হাশিমির নিকট। শাইখ সালেহ ইবনু হাশমি বলেন, 'আমি একদিন খলিফা মুহতাদি বিল্লার দরবারে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম-খলিফা নিপীড়িত মানুষদের পক্ষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণসাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন। যেকোনো সাধারণ মানুষ অনায়াসে কোনো প্রকার বাধা-বিপত্তি ছাড়াই ঢুকে খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে। এবং নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরছে। আর যেসকল বিপন্ন মানুষ স্বশরীরে উপস্থিত হতে পারছে না, তারা পত্রমারফত নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশ করছে। খলিফা সকলের অভিযোগ-অনুযোগের কথা শুনে তা নিরসনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। রাজদরবারের এদৃশ্য আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করছিল। খলিফা যখন কারও কথা শুনতেন কিংবা কোনো চিঠি পড়তেন, তখন আমি অপলকনেত্রে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেলে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলতাম। খলিফা আমার এ অবস্থা টের পেলেন。
একপর্যায়ে তিনি বললেন, আমার ধারণা আপনি মনে মনে কিছু ভাবছেন, যা আমাকে বলতে চাচ্ছেন। আমি ইতিবাচক জবাব দিয়ে বললাম, হ্যাঁ। অতঃপর মজলিস শেষে যখন তিনি নামাজের বিছানায় গিয়ে বসলেন, আমাকে বললেন, সালেহ! আপনার মনের কথাটি আপনিই বলবেন নাকি আমি বলবো? আমি বললাম, আপনিই বলুন! খলিফা বললেন, আমার ধারণা আমার উক্ত মজলিসটি আপনার ভালো লেগেছে। আমি বললাম, আমাদের খলিফা খুবই ভালো মানুষ। তবে একটাই সমস্যা—তিনি তার বাবা ওয়াসিক বিল্লার মতো 'খলকে কুরআন'র প্রবক্তা। একথা শুনে খলিফা বললেন, আমি দীর্ঘদিন যাবৎ এ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে আসছিলাম। একপর্যায়ে আমার উক্ত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। অতঃপর খলিফা ওয়াসিক বিল্লার নিম্নোক্ত ঘটনা আমাদেরকে শোনালেন。
আহমদ ইবনু আবু দাউদ ছিলেন মুতাজিলা সম্প্রদায়ের বিজ্ঞ আলেম এবং খলিফার একান্ত আস্থাভাজন লোক। তিনি শাম দেশের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত 'আজনা' শহর হতে আহলুস সুন্নত ওয়াল জামাতের অনুসারী এক বয়োঃবৃদ্ধ আলেমকে 'কুরআন মাখলুক না' এ আকিদায় বিশ্বাসী হওয়ার অপরাধে (?) গ্রেফতার করিয়েছিলেন। এ বর্ষীয়ান আলেমকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় খলিফার দরবারে হাজির করা হলো। তিনি সুন্দর গঠন ও কান্তিময় চেহারার অধিকারী ছিলেন। তার চেহারায় পূর্ণ স্থিরতা, ভাবগাম্ভীর্য ও নির্ভীকতা ফুটে উঠছিল। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে খলিফাকে সালাম করলেন। খলিফা বুজুর্গের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার চেহারায় লজ্জা ও সঙ্কোচের রেখা প্রস্ফুটিত হলো। তিনি লজ্জায় মাথানত করে বুজুর্গ ব্যক্তিকে বললেন, হজরত, আপনি আহমদ ইবনু আবি দাউদের প্রশ্নের জবাব দেন! বুজুর্গ বললেন, জাঁহাপনা! যুক্তি-তর্কে আহমদ ইবনু আবি দাউদ অতি দুর্বল ও তুচ্ছ প্রমাণিত হয়ে থাকে। [খলিফা মুহতাদি বললেন]
আমি তখন দেখলাম আমার পিতার চেহারা রাগে-ক্ষোভে অগ্নি ঝরাচ্ছে। তিনি বললেন, কী বললেন! আবু আবদুল্লাহ [আহমদ ইবনু আবু দাউদের [উপনাম] আপনার সাথে যুক্তি-তর্কে দুর্বল ও তুচ্ছ প্রমাণিত হবে! বুজুর্গ বললেন, আমিরুল মুমিনিন, উত্তেজিত না হয়ে একটু ধীরে-সুস্থে কাজ করেন! আমাকে একটু অনুমতি দেন—আপনার সামনেই আমি তার সঙ্গে বহস করবো। ওয়াসিক বিল্লাহ বললেন, বেশ! অনুমতি দেওয়া হলো। বুজুর্গ জিজ্ঞাসা করলেন—আহমদ, তোমরা মানুষদের কোন আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি দাওয়াত দিয়ে থাকো? আহমদ বলল, আমরা মানুষকে ‘কুরআন মাখলুক’ হওয়ার আকিদার প্রতি দাওয়াত দিয়ে থাকি。
বুজুর্গ প্রশ্ন করলেন, এটা কি দ্বীনের এমন অংশ—যা ব্যতীত দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হবে না? আহমদ ইতিবাচক জবাব দিয়ে বলল, হ্যাঁ। বুজুর্গ জিজ্ঞাসা করলেন—রাসুলুল্লাহ কি এই আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন? আহমদ বলল, না, তিনি এর প্রতি দাওয়াত দেননি。
বুজুর্গ জিজ্ঞাসা করলেন—তবে কি তিনি এ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন? আহমদ বলল, অবশ্যই, তিনি এ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন。
বুজুর্গ বললেন, তাহলে তোমরা কেন এমন বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দিয়ে থাকো, যে বিষয়ের দাওয়াত স্বয়ং রাসুলুল্লাহও দেন নি?
আহমদ বুজুর্গের এ প্রশ্নের উত্তরে লা-জবাব হয়ে গেল। বুজুর্গ লোকটি তখন ওয়াসিক বিল্লাহকে সম্বোধন করে বললেন, আমিরুল মুমিনিন, এ হলো প্রথম পয়েন্ট। অতঃপর পুনরায় তিনি আহমদকে লক্ষ্য করে বললেন, এবার বলো, আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ.
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম。
অথচ তোমরা বলে থাকো, কুরআন মাখলুক হওয়ার আকিদা পোষণ না করলে দ্বীন পূর্ণ হবে না। এখন তোমাদের সত্যবাদী সাব্যস্ত করবো নাকি আল্লাহকে? আহমদ এরও কোনো উত্তর খুঁজে পেল না。
বুজুর্গ খলিফা ওয়াসিককে বললেন, আমিরুল মুমিনিন, এ হলো দ্বিতীয় পয়েন্ট। কিছুক্ষণ পরই বুজুর্গ লোকটি আহমদকে লক্ষ্য করে বললেন,
আহমদ! আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দাও দেখি! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَرِ سَالَتَه
হে রাসুল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আপনার নিকট অবতীর্ণ যাবতীয় বিষয়াদি পৌঁছে দেন; অন্যথায় ধরা হবে, আপনি আপনার রিসালাতের দায়িত্বই পালন করেন নি。
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-তোমরা যে আকিদার প্রতি মানুষকে আহ্বান করছ, নবীজি তা উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন কি-না? আহমদ আবারও নিরুত্তর ও নিশ্চুপ হয়ে গেল। বুজুর্গ এবারও ওয়াসিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমিরুল মুমিনিন, এটা হলো তৃতীয় পয়েন্ট。
কিছুক্ষণ পর বুজুর্গ আহমদকে জিজ্ঞাসা করলেন-আহমদ, বলো দেখি, নবীজি কুরআন মাখলুক হওয়ার বিষয়টি জানতেন, কিন্তু কাউকে এর প্রতি দাওয়াত দেন নি; এটা কি তার জন্য জায়েজ ছিল? আহমদ উত্তর করল-হ্যাঁ, এটা তাঁর জন্য জায়েজ ছিল。
বুজুর্গ জিজ্ঞাসা করলেন-এটা কি খুলাফায়ে রাশেদিন তথা হজরত আবু বকর, উমার, উসমান ও আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর জন্যও জায়েজ ছিল? উত্তরে আহমদ বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই।
এবার বুজুর্গ খলিফা ওয়াসিকের প্রতি মুখ করে বললেন, আমিরুল মুমিনিন, যে সুযোগ ডিম্মতের প্রতি খলকে কুরআনের দাওয়াত না পৌঁছানো] নবীজির জন্য ছিল, সাহাবায়ে কেরামের জন্য ছিল, তা আমাদের জন্য না থাকার অর্থ কি এই নয় যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যাবতীয় সুযোগ হতে বঞ্চিত করেছেন? এ কথা শুনে ওয়াসিক বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। কোনো সুযোগ নবীজি ও সাহাবিদের জন্য থাকলে আমাদের জন্য না থাকলে সুযোগ হতে বঞ্চিত হওয়া বৈ আর কী হতে পারে? এ কথা বলে খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ তার সচিবকে নির্দেশ দিলেন-বুজুর্গকে শৃঙ্খলমুক্ত করে দাও। নির্দেশ অনুযায়ী শিকলের বন্ধন খুলতে গেলে বুজুর্গ তা টেনে ধরলেন। শৃঙ্খলমুক্ত হতে চাচ্ছিলেন না。
ওয়াসিক জিজ্ঞাসা করলেন—কী হলো, শিকল ছাড়ছেন না কেন? বুজুর্গ বললেন, আমি মনস্থ করেছি এ শিকল সংরক্ষণ করবো এবং অসিয়ত করে যাবো, যেন আমার মৃত্যুর পর কাফনের সঙ্গে এটি বেঁধে দেওয়া হয়। অতঃপর আল্লাহর দরবারে বিচার দেবো যে, হে আল্লাহ, আপনার বান্দাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তারা কেন আমাকে অন্যায়ভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে আমার পরিবার-পরিজনকে পেরেশান করেছে!
বুজুর্গের কথা শুনে খলিফা অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। বুজুর্গও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। উপস্থিত সকলের চোখে অশ্রু ছলছল করছিল。
খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, শাইখ, আমাকে ক্ষমা করে দেন! বুজুর্গ বললেন, আমি তো আপনাকে তখনই ক্ষমা করে দিয়েছি, যখন আমি ঘর হতে বের হয়েছি। কারণ, আমি নবীজিকে মনে প্রাণে ভালোবাসি। আর আপনি হলেন তারই বংশধর。
বুজুর্গের কথা শুনে ওয়াসিকের চেহারা আনন্দে ভরে গেল। খলিফা আরজ করলেন—আপনি আমার এখানে থেকে যান, আমি আপনার সান্নিধ্যে ধন্য হবো! বুজুর্গ বললেন, আমার জন্য সীমান্ত অঞ্চলে বসবাস করাই উত্তম। কারণ, সেখানে আমার অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ওয়াসিক বললেন, আপনার যেকোনো প্রয়োজনের কথা আমাকে বলুন!
বুজুর্গ বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আমাকে শুধু সেখানে ফিরে যাবার অনুমতি দেন, যেখান থেকে নির্দয় আহমদ আমাকে গ্রেফতার করে এনেছিল। ওয়াসিক বুজুর্গকে অনুমতি দিলেন এবং সঙ্গে কিছু হাদিয়াও পেশ করলেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করলেন。
মুহতাদি বিল্লাহ এ ঘটনা বর্ণনা করে বলেন—এরপর হতে ‘খলকে কুরআন’ বিষয়ে আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করলাম। আমার ধারণা [আমার আব্বাজান] খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহও তাঁর অবস্থান থেকে ফিরে এসেছেন。
টিকাঃ
৯১ সূরা মায়েদা : ০৩
৯২ সূরা মায়েদা : ৬৭
৯৩ আল্লামা শাতিবি, আল-ই'তিসাম: ১/৩২৪-৩২৭
📄 স্বার্থত্যাগ
মালিকুদদার রহ. বলেন, একবার উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু চারশ' দিনার ভর্তি একটি থলে তার গোলামকে দিয়ে বললেন, এটা আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে যাও। তাকে এগুলো দিয়ে বলবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করতে। অতঃপর তুমি সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে এবং আড়াল থেকে চুপিসারে দেখবে যে, তিনি তা কোথায় ব্যয় করেন। পরে এসে আমাকে জানাবে। নির্দেশমতো গোলাম থলেটি আবু উবাইদা রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পৌঁছালো。
আবু উবাইদা রাজিয়াল্লাহু আনহু থলেটি গ্রহণ করে বললেন, আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেন! অতঃপর তার এক ক্রীতদাসীকে ডেকে বললেন, নাও, এখান থেকে অমুককে সাত দিনার, অমুককে অমুককে পাঁচ দিনার করে দেবে। এভাবে দিতে দিতে একপর্যায়ে সবগুলো দিনারই ফুরিয়ে ফেললেন。
গোলাম ফিরে এসে পুরো ঘটনা খুলে বলল। আর এরই মধ্যে উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু অনুরূপ আরেকটি দিনার ভর্তি থলে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এবং সেটি একইভাবে গোলামের হাতে দিয়ে বললেন, এটা মুআজ রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে যাও। তাকেও গিয়ে বলবে এগুলো আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের জন্য দেওয়া হয়েছে। তারপর লক্ষ্য রাখবে তিনি তা কোন খাতে ব্যয় করেন。
নির্দেশমতো গোলাম মুআজ রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে বলল, আমিরুল মুমিনিন, এগুলো আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতে বলেছেন। তিনিও থলেটি হাতে নিয়ে দুআ করলেন—আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেন! অতঃপর ক্রীতদাসীকে ডেকে বললেন, এগুলো হতে অমুককে এত, অমুককে এত দিয়ে দেবে। এদিকে মুআজ রাজিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী পর্দার আড়াল হতে অতি সংগোপনে বলে উঠলেন—খোদার কসম! আমরাও অভাবে আছি; আমাদেরও কিছু দেওয়া হোক!
অবশেষে মুআজ রাজিয়াল্লাহু আনহু থলে হাতিয়ে দেখলেন, তাতে স্রেফ দুটি দিনার অবশিষ্ট ছিল। সে দুই দিনার স্ত্রীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন। গোলাম উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ফিরে এলো এবং তাকে পুরো ঘটনা শোনালো। এতে উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বললেন, এরা সকলেই সহোদর ভাইয়ের মতো। পরস্পরের গুণাবলি একই রকম。
টিকাঃ
৯৪ আল্লামা মুনজিরি, আততারগিব ওয়াততারহিব: ২/৪১-৪২
📄 দামি কথা
উমার ইবনু আবদুল আজিজ রহ. খলিফাতুল মুসলিমিন উমার রাজিয়াল্লাহু আনহুর প্রপৌত্র সালেম ইবনু আবদুল্লাহ রহ.-কে লেখেন—আমার নিকট উমার ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহুর লেখা কয়েকটি চিঠি পাঠিয়ে দেন! উত্তরে সালেম রহ. লেখেন—
হে উমার, সেসকল রাজা-বাদশাদের কথা স্মরণ করো, যাদের সৌখিনতা ও বিলাসিতা কখনো শেষ হতো না। আজ তাদের চক্ষু গলে গেছে। যারা কখনো তৃপ্ত ও তুষ্ট হতো না। আজ তাদের পেট পচে গেছে। আজ মাটির নিচে তাদের শবদেহ পড়ে আছে। কোনো নগণ্য ফকিরও যদি তাদের পাশে বসে, তবে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে যাবে。
টিকাঃ
৯৫ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৯৪
📄 নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ করা চাই
একদিন ইমাম আবু হানিফা রহ. তার এক মজলিসে জনৈক ব্যক্তিকে ছেঁড়া-ফাঁড়া পুরনো কাপড় পরিহিতবস্থায় উপবিষ্ট দেখলেন। ইমাম সাহেব তাকে বললেন, এই জায়নামাজটি ওঠাও। এর নিচে কিছু দিরহাম রাখা আছে। লোকটি জায়নামাজ উঠিয়ে দেখল—তাতে এক হাজার দিরহাম রয়েছে। ইমাম সাহেব তাকে বললেন, এই দিরহামগুলো নিয়ে যাও। এগুলো দ্বারা নিজের দুঃখ-দুর্দশা দূর করো। লোকটি বলল, আমি তো বিত্তশালী ও স্বচ্ছল। আল্লাহ তাআলা আমাকে অনেক নিয়ামত দান করেছেন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। ইমাম আবু হানিফা রহ. বললেন, তুমি কি এ হাদিস শোনো নি যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের বহিঃপ্রকাশ অন্যের নিকট হওয়াকে পছন্দ করেন? তোমার উচিত ছিল তোমার দুরবস্থা দূর করা, যাতে তোমার কোনো হিতৈষী বন্ধু তোমাকে দেখে পেরেশান না হয়。
টিকাঃ
৯৬ তারিখে বাগদাদ: ১৩/৩৬১