📄 মূল্যবান উপদেশ
আবু জাফর মনসুর ছিলেন খেলাফতে আব্বাসিয়ার প্রসিদ্ধ খলিফা। একদিন তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও প্রসিদ্ধ ফকিহ আবদুর রহমান ইবনু কাসেম রহ.-এর নিকট আবেদন জানালেন, আমাকে কিছু নসিহত করেন! আবদুর রহমান রহ. বলেন, আমি একটি ঘটনার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—
উমার ইবনু আবদুল আজিজ রহ. এগারো জন সন্তান রেখে মারা যান; কিন্তু তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল মাত্র সতেরো দিনার। তন্মধ্যে হতে পাঁচ দিনার ব্যয় হয়েছে কাফন-দাফনে। দুই দিনার ব্যয় হয়েছে কবরের জায়গা ক্রয়ে আর অবশিষ্ট অর্থ সকল সন্তান উনিশ দিরহাম করে পিতার ওয়ারিস হিসেবে পেয়েছে。
টিকাঃ
৪৪ আল-ইয়াওয়াকিতুল আসরিয়্যাহ পৃ.১০৯-১১০
📄 নিজ কঠোরতা প্রসঙ্গে উমার ইবনুল খাত্তাব
উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর জানতে পারেন যে, জনসাধারণ তার কঠোরতায় ভীত-সন্ত্রস্ত। তিনি সকলকে একত্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। তাতে হামদ ও সানার পর বলেন—
আমি জানতে পেরেছি, লোকজন আমার কঠোরতায় সদা শঙ্কিত। আমার রুক্ষ স্বভাবকে ভয় পায়। অনেকের উক্তি, উমার রাসুলুল্লাহর যুগেও কঠোর প্রকৃতির ছিল। যখন আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু খলিফা ছিলেন, তখনো ছিল অত্যন্ত কঠোর। আর এখন তো সব ক্ষমতা তার হাতেই রয়েছে। না জানি, এখন তার কঠোরতা কীরূপ ধারণ করে!
যা-হোক, শুনে রাখো, তাদের এ জাতীয় মন্তব্য ঠিক। আমি রাসুলুল্লাহর যুগে ছিলাম, তখন তাঁর খাদেম ও সহযোগী হিসেবে ছিলাম। এমনকি তিনি আমার ওপর সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে আমি অন্যান্যদের তুলনায় বেশি সৌভাগ্যবান। অতঃপর আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলে তখন আমি তার খাদেম ও সহযোগী ছিলাম। আমি আমার কঠোরতাকে তার কোমলতার সঙ্গে মিশিয়ে রাখতাম। আর ততক্ষণ পর্যন্ত নাঙ্গা তরবারি হয়ে থাকতাম যতক্ষণ না তিনি আমাকে খাপে না ঢোকাতেন। আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহ তাআলা তাঁকেও এমতাবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন যে, তিনিও আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আর এ ক্ষেত্রেও আমি অন্যদের চেয়ে বেশি সফল। এখন আমাকে তোমাদের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে। মনে রেখো! এখন সে কঠোরতায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা কেবল সেসব লোকদের জন্য প্রযোজ্য হবে—যারা মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও সীমালঙ্ঘনকে বৈধ মনে করে থাকে。
পক্ষান্তরে যারা দ্বীনদার, সত্যবাদী ও সুস্থ চিন্তার অধিকারী, তাদের প্রতি আমি তাদের নিজেদের চাইতেও বেশি কোমল ও দয়াশীল। আর যে ব্যক্তি কারও ওপর জুলুম করতে চায়, আমি তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বো না যতক্ষণ না তার এক গণ্ডদেশ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে আর অপর গণ্ডদেশের ওপর আমি পাড়া দেবো। এবং সে সত্যনিষ্ঠার ঘোষণা দেবে。
হে লোকসকল, আমার ওপর তোমাদের হক রয়েছে। আমি তোমাদের জাতীয় সম্পদে একটুও এদিক-সেদিক করবো না। আমি তোমাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবো না। আর যখন তোমরা মুসলিমদের জাতীয় স্বার্থে কোথাও বের হবে, তখন তোমাদের ফেরার আগ পর্যন্ত আমি তোমাদের সন্তানদের সঙ্গে পিতৃসুলভ আচরণ করবো। এ কয়েকটি কথা বলে শেষ করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকেই ক্ষমা করেন। আমিন。
টিকাঃ
৪৫ হায়াতুল হায়াওয়ান: ১/৪৬
📄 আল্লাহর পথে কুদরতি নুসরত
আল্লামা ইবনুল আসির জাজরি রহ. বর্ণনা করেন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন ইরানি অগ্নিপূজকদের সঙ্গে জিহাদের উদ্দেশ্যে কাদেসিয়া গমন করেন, তখন তিনি আসেম ইবনু আমর রহ.-কে বিশেষ কাজে 'মায়ান' নামক স্থানে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেনা অফিসার। আর 'মায়ান' হলো শত্রুদেশের ছোট্ট একটি শহর। আসেম রহ. এখানে পৌঁছার পর সকল রসদপত্র ফুরিয়ে গেল। সাথী-সঙ্গীদের কারও নিকট কোনো খাবার ছিল না। তারা চতুর্দিক যথেষ্ট খোজাখুঁজি করে দেখলেন, কোনো গরু-ছাগল কিংবা হালাল প্রাণীর সন্ধান মেলে কি-না; কিন্তু অনেক খোজাখুঁজির পরও কোনো পশুর সন্ধান মিলল না। হঠাৎ বাঁশের একটি ঝুপড়িতে একজন মানুষ দৃষ্টিগোচর হলো। কাছে গিয়ে তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—এখানে আশেপাশে কোনো গরু-ছাগল পাওয়া যাবে কি? লোকটি উত্তর করল—না。
আসেম রহ. সেখান থেকে ফেরার ইচ্ছা করছিলেন, অমনি ভেতর থেকে ভেসে এলো—
এ ব্যক্তি আল্লাহর দুশমন, সে মিথ্যা বলছে; আমরা এখানেই আছি!
আসেম রহ. ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে কতগুলো গরু দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু কোনো মানুষজন নেই বিধায় তিনি নিশ্চিত হলেন যে, আওয়াজটি কোনো গরুরই ছিল। আসেম রহ. সেখান থেকে গরুগুলো নিয়ে আসলেন এবং সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। এ ঘটনাটি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফকে জানানো হলে সে তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাই সে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের নিকট দূত পাঠিয়ে তাদের উপস্থিত করল। তারা সকলেই সাক্ষ্য দিলেন, ঘটনা সম্পূর্ণই বাস্তব। আমরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম。
হাজ্জাজ জিজ্ঞাসা করল—এ ঘটনা তখনকার লোকসমাজে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি?
তারা বললেন, এ ঘটনা হতে সকলেই নিশ্চিত হয়ে গেল, আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর সন্তুষ্ট। বিজয় আমাদের ভাগ্যেই রয়েছে। হাজ্জাজ বলল—অন্তরের অবস্থা তো আল্লাহই ভালো জানেন। তারা বললেন, তবে আমরা এতটুকু নিশ্চিত, পৃথিবীতে তাদের মতো অমুখাপেক্ষী জাতি আর অতিবাহিত হয় নি。
টিকাঃ
৪৬ স্মর্তব্য—এরূপ অলৌকিক ঘটনা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুত্তাকি ও পরহেজগার হবে。
৪৭ আল্লামা ইবনুল আসির, আল-কামেল: ২/১৭৫
📄 আত্মার পরিশুদ্ধি
আল্লামা ইবনু খালদুন রহ. ইমাম তাবারি প্রমুখ উলামায়ে কেরামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, জামাল ও সিফিফনের যুদ্ধে মৃতব্যক্তিদের পরিণতি কী হবে? আলি রাজিয়াল্লাহু আনহু উভয় পক্ষের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন-
لا يموتن أحد من هؤلاء وقلبه نقي إلا دخل الجنة.
'তাঁদের মধ্যে যেই স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী, সে-ই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
টিকাঃ
৪৮ মুকাদ্দিমায়ে ইবনে খালদুন: পৃ.৩৮۵