📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 মুমিনের বিচক্ষণতা

📄 মুমিনের বিচক্ষণতা


আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন কায়সারিয়া বিজয়ের পর গাজা এলাকায় ঘেরাও করলেন, তখন সেখানকার গভর্নর তার নিকট দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার জন্য কাউকে দূত হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব করলেন। আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু একজন সাধারণ সিপাহি বেশে নিজেই গেলেন এবং আলোচনা শুরু করলেন। গাজার গভর্নর তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, বর্ণনাশৈলী ও নির্ভীকতা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—তোমাদের সৈন্যদলে তোমার মতো আর কেউ আছে কি?
আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন—
এটা কী বলছেন! আমি তো তাদের মধ্যে সবচে' সাধারণ ও দুর্বল। সেজন্যেই তারা আমার মতো একজন সাধারণ লোককে এখানকার আশঙ্কাজনক স্থানে পাঠিয়েছে!
গাজার গভর্নর তার কথা শুনে ফেরার সময় তাকে কিছু উপঢৌকন দিয়ে দিলেন। এদিকে দারোয়ানকে নির্দেশ দিয়ে রাখলেন—
লোকটি গেট অতিক্রম করার সময় তার সবকিছু ছিনিয়ে নেবে এবং তাকে হত্যা করবে。
আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর গাসসান গোত্রের জনৈক খ্রিস্টানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সে তাকে চিনে ফেলল এবং বলল, আমর! এখানে প্রবেশের সময় যেমনি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, বেরোনোর সময়ও তেমনি বেরোবেন। এটা শুনে আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু থমকে গেলেন এবং পুনরায় পেছন দিকে রওনা করলেন। গভর্নরের নিকট গিয়ে বললেন—আমার দশজন চাচাতো ভাই আছে, আপনি আমাকে যে উপঢৌকন দিয়েছেন সেগুলো তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ভেবে দেখলাম, আমি তাদেরকে আপনার নিকট নিয়ে আসবো। আপনি তাদের মধ্যে সেগুলো বণ্টন করে দিলে আপনার দেওয়া উপঢৌকন একজনের কাছে পৌঁছার পরিবর্তে দশজনের নিকট পৌঁছে যাবে। এই ভেবে গভর্নর খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন যে, একজনের স্থলে দশজনকে হত্যা করার পথ সুগম হলো। তাই তিনি বললেন—
ঠিক আছে, তুমি শীঘ্র তাদের নিয়ে এসো。
এদিকে দ্বাররক্ষীকে বলে পাঠালেন, একে এখন যেতে দাও। আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু মহল থেকে বের হয়ে বহুদূর পর্যন্ত অতি সন্তর্পণে চলছিলেন। এবং বিপদসীমা পেরিয়ে বললেন—
ভবিষ্যতে এদের মতো প্রতারকদের নিকট আসবো না。
কিছুদিন পর গাজার গভর্নর শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হন। শান্তিচুক্তির জন্য গভর্নর নিজেই মুসলিমদের নিকট আসলেন। অতঃপর আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু র তাঁবুতে প্রবেশ করেই দেখলেন, তিনি সেনাপতির চেয়ারে বসে আছেন। তখন তিনি যারপরনাই বিস্মিত হলেন। এবং একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন—
আপনি কি সেই লোক?
উত্তরে আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন—
জি, আমি তোমাদের প্রতারণার স্বীকার হয়েও বেঁচে আছি。

টিকাঃ
৪৩ আল-ওয়াসায়াল খালেদাহ: পৃ.২৫৭

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 মূল্যবান উপদেশ

📄 মূল্যবান উপদেশ


আবু জাফর মনসুর ছিলেন খেলাফতে আব্বাসিয়ার প্রসিদ্ধ খলিফা। একদিন তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও প্রসিদ্ধ ফকিহ আবদুর রহমান ইবনু কাসেম রহ.-এর নিকট আবেদন জানালেন, আমাকে কিছু নসিহত করেন! আবদুর রহমান রহ. বলেন, আমি একটি ঘটনার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—
উমার ইবনু আবদুল আজিজ রহ. এগারো জন সন্তান রেখে মারা যান; কিন্তু তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল মাত্র সতেরো দিনার। তন্মধ্যে হতে পাঁচ দিনার ব্যয় হয়েছে কাফন-দাফনে। দুই দিনার ব্যয় হয়েছে কবরের জায়গা ক্রয়ে আর অবশিষ্ট অর্থ সকল সন্তান উনিশ দিরহাম করে পিতার ওয়ারিস হিসেবে পেয়েছে。

টিকাঃ
৪৪ আল-ইয়াওয়াকিতুল আসরিয়‍্যাহ পৃ.১০৯-১১০

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 নিজ কঠোরতা প্রসঙ্গে উমার ইবনুল খাত্তাব

📄 নিজ কঠোরতা প্রসঙ্গে উমার ইবনুল খাত্তাব


উমার রাজিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর জানতে পারেন যে, জনসাধারণ তার কঠোরতায় ভীত-সন্ত্রস্ত। তিনি সকলকে একত্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। তাতে হামদ ও সানার পর বলেন—
আমি জানতে পেরেছি, লোকজন আমার কঠোরতায় সদা শঙ্কিত। আমার রুক্ষ স্বভাবকে ভয় পায়। অনেকের উক্তি, উমার রাসুলুল্লাহর যুগেও কঠোর প্রকৃতির ছিল। যখন আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু খলিফা ছিলেন, তখনো ছিল অত্যন্ত কঠোর। আর এখন তো সব ক্ষমতা তার হাতেই রয়েছে। না জানি, এখন তার কঠোরতা কীরূপ ধারণ করে!
যা-হোক, শুনে রাখো, তাদের এ জাতীয় মন্তব্য ঠিক। আমি রাসুলুল্লাহর যুগে ছিলাম, তখন তাঁর খাদেম ও সহযোগী হিসেবে ছিলাম। এমনকি তিনি আমার ওপর সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে আমি অন্যান্যদের তুলনায় বেশি সৌভাগ্যবান। অতঃপর আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলে তখন আমি তার খাদেম ও সহযোগী ছিলাম। আমি আমার কঠোরতাকে তার কোমলতার সঙ্গে মিশিয়ে রাখতাম। আর ততক্ষণ পর্যন্ত নাঙ্গা তরবারি হয়ে থাকতাম যতক্ষণ না তিনি আমাকে খাপে না ঢোকাতেন। আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহ তাআলা তাঁকেও এমতাবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন যে, তিনিও আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আর এ ক্ষেত্রেও আমি অন্যদের চেয়ে বেশি সফল। এখন আমাকে তোমাদের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে। মনে রেখো! এখন সে কঠোরতায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা কেবল সেসব লোকদের জন্য প্রযোজ্য হবে—যারা মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও সীমালঙ্ঘনকে বৈধ মনে করে থাকে。
পক্ষান্তরে যারা দ্বীনদার, সত্যবাদী ও সুস্থ চিন্তার অধিকারী, তাদের প্রতি আমি তাদের নিজেদের চাইতেও বেশি কোমল ও দয়াশীল। আর যে ব্যক্তি কারও ওপর জুলুম করতে চায়, আমি তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বো না যতক্ষণ না তার এক গণ্ডদেশ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে আর অপর গণ্ডদেশের ওপর আমি পাড়া দেবো। এবং সে সত্যনিষ্ঠার ঘোষণা দেবে。
হে লোকসকল, আমার ওপর তোমাদের হক রয়েছে। আমি তোমাদের জাতীয় সম্পদে একটুও এদিক-সেদিক করবো না। আমি তোমাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবো না। আর যখন তোমরা মুসলিমদের জাতীয় স্বার্থে কোথাও বের হবে, তখন তোমাদের ফেরার আগ পর্যন্ত আমি তোমাদের সন্তানদের সঙ্গে পিতৃসুলভ আচরণ করবো। এ কয়েকটি কথা বলে শেষ করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকেই ক্ষমা করেন। আমিন。

টিকাঃ
৪৫ হায়াতুল হায়াওয়ান: ১/৪৬

📘 তারা ঝিকিমিকি জ্বলে > 📄 আল্লাহর পথে কুদরতি নুসরত

📄 আল্লাহর পথে কুদরতি নুসরত


আল্লামা ইবনুল আসির জাজরি রহ. বর্ণনা করেন, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন ইরানি অগ্নিপূজকদের সঙ্গে জিহাদের উদ্দেশ্যে কাদেসিয়া গমন করেন, তখন তিনি আসেম ইবনু আমর রহ.-কে বিশেষ কাজে 'মায়ান' নামক স্থানে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেনা অফিসার। আর 'মায়ান' হলো শত্রুদেশের ছোট্ট একটি শহর। আসেম রহ. এখানে পৌঁছার পর সকল রসদপত্র ফুরিয়ে গেল। সাথী-সঙ্গীদের কারও নিকট কোনো খাবার ছিল না। তারা চতুর্দিক যথেষ্ট খোজাখুঁজি করে দেখলেন, কোনো গরু-ছাগল কিংবা হালাল প্রাণীর সন্ধান মেলে কি-না; কিন্তু অনেক খোজাখুঁজির পরও কোনো পশুর সন্ধান মিলল না। হঠাৎ বাঁশের একটি ঝুপড়িতে একজন মানুষ দৃষ্টিগোচর হলো। কাছে গিয়ে তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—এখানে আশেপাশে কোনো গরু-ছাগল পাওয়া যাবে কি? লোকটি উত্তর করল—না。
আসেম রহ. সেখান থেকে ফেরার ইচ্ছা করছিলেন, অমনি ভেতর থেকে ভেসে এলো—
এ ব্যক্তি আল্লাহর দুশমন, সে মিথ্যা বলছে; আমরা এখানেই আছি!
আসেম রহ. ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে কতগুলো গরু দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু কোনো মানুষজন নেই বিধায় তিনি নিশ্চিত হলেন যে, আওয়াজটি কোনো গরুরই ছিল। আসেম রহ. সেখান থেকে গরুগুলো নিয়ে আসলেন এবং সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। এ ঘটনাটি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফকে জানানো হলে সে তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাই সে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের নিকট দূত পাঠিয়ে তাদের উপস্থিত করল। তারা সকলেই সাক্ষ্য দিলেন, ঘটনা সম্পূর্ণই বাস্তব। আমরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম。
হাজ্জাজ জিজ্ঞাসা করল—এ ঘটনা তখনকার লোকসমাজে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি?
তারা বললেন, এ ঘটনা হতে সকলেই নিশ্চিত হয়ে গেল, আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর সন্তুষ্ট। বিজয় আমাদের ভাগ্যেই রয়েছে। হাজ্জাজ বলল—অন্তরের অবস্থা তো আল্লাহই ভালো জানেন। তারা বললেন, তবে আমরা এতটুকু নিশ্চিত, পৃথিবীতে তাদের মতো অমুখাপেক্ষী জাতি আর অতিবাহিত হয় নি。

টিকাঃ
৪৬ স্মর্তব্য—এরূপ অলৌকিক ঘটনা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুত্তাকি ও পরহেজগার হবে。
৪৭ আল্লামা ইবনুল আসির, আল-কামেল: ২/১৭৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00