📄 উটের পথচলায় সংগীতের প্রভাব
উটের গতি বৃদ্ধির জন্য যে সুরেলা গীত গাওয়া হয়, তাকে আরবিতে 'হুদি' বলা হয়। এ প্রথার সূচনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোল্লা আলি কারি রহ. লেখেন-এক বেদুঈন কোনো কারণে তার গোলামকে প্রহার করল। এবং তার আঙুল কামড়ে থেতলে দিল। কিছুদিন পর তারা উভয়ে সফরে রওনা হলো। পথে গোলাম হাতের ব্যথায় 'উহু-উহু' বলে চিৎকার করছিল। গোলামের এ আওয়াজের তালে তালে অমনি উট তীব্র গতিতে দৌড়াতে লাগল। এ থেকেই সকলে বুঝতে পারে যে, উট সুরের মূর্ছনায় মত্ত হয়ে অতি দ্রুতবেগে দৌড়ায়। একপর্যায়ে এসে এটি একটি স্বতন্ত্র বিদ্যায় রূপ নেয়। উট চালনার গীতে রয়েছে অসাধারণ প্রভাব। এ প্রসঙ্গে সুপ্রসিদ্ধ বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে:
কথিত আছে-জনৈক ব্যক্তি এক বুদ্দুর মেহমান হলো। লোকটি বুদ্দুর বাড়িতে এক কালচে গোলামকে দেখল। সেএকটি উটের সামনে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থায় বসে আছে। গোলাম তাকে বলল, আপনি দয়া করে আমার মনিবের কাছে সুপারিশ করেন, যেন তিনি আমাকে ছেড়ে দেন। কারণ, তিনি মেহমান ব্যতীত অন্য কারও সুপারিশ গ্রহণ করেন না। মেহমান মেজবানের নিকট সুপারিশ করলে সে বলল, আপনার সুপারিশে আমি তাকে ছেড়ে দিচ্ছি। অন্যথায় সে জঘন্যতম অপরাধ করেছে। মূল ঘটনা হলো-আমার দশটি উট ছিল। এ গোলাম সেগুলোকে কোনো জায়গা থেকে নিয়ে আসছিল। পথিমধ্যে হঠাৎ সে গীত গাইতে আরম্ভ করল। আর অমনি সবকটি উট সুরের তালে মাতাল হয়ে এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করতে লাগল। এবং কয়েকদিনের পথ মাত্র একদিনে অতিক্রম করে বাড়িতে ফিরল। বাড়িতে পৌঁছার পর দেখা গেল, মাত্র একটি উট কোনো রকম প্রাণে বেঁচে আছে; বাকি সবগুলোই মারা গেছে! মেহমান উক্ত ঘটনা শুনে বেশ আশ্চর্যান্বিত হয়ে সেই গীতটি শুনাতে বলল। সে গীত শুরু না করতেই ওই উটটি একদম টানটান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মরুভূমির দিকে ছুটতে লাগল। এদিকে মেজবান বেচারাও উন্মাদের মতো এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করল !
টিকাঃ
৪১ মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/১৩২-১৩৩
📄 মৃত্যুর সময়ও কুরআন তিলাওয়াত
আবু মুহাম্মদ হারিরি বলেন, জুনায়েদ বাগদাদি রহ.-এর মৃত্যুর সময় আমি তার নিকটে ছিলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার। তিনি [মুমূর্ষু অবস্থায়ও] কুরআনে কারিম তিলাওয়াত করছিলেন। আমি তাকে বললাম, আবুল কাসেম! [জুনায়েদ বাগদাদির উপনাম] নিজের শরীরের প্রতি একটু লক্ষ্য করেন! উত্তরে তিনি বললেন, আবু মুহাম্মদ, এ মুহূর্তে আমার চেয়ে অধিক ইবাদতের মুখাপেক্ষী আর কেউ নেই। কারণ, আমার আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর পূর্বে জুনায়েদ বাগদাদি রহ. অসিয়ত করেছিলেন— যে সকল ইলমি বিষয়াদি আমার প্রতি সম্পৃক্ত কিংবা লোকজন আমার থেকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, সেগুলোকে আমার সঙ্গে দাফন করে দেবে。
লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি এর উত্তরে বললেন, আমি যখন দেখলাম, সকলের নিকট নবীজির হাদিস রয়েছে। তো, আমার তখন মনে হলো, আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ইলমি বিষয় যেন আমার মৃত্যুর পরে অবশিষ্ট না থাকে。
মুত্যুর পর তাকে জাফর খুলদি রহ. স্বপ্নযোগে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন-আল্লাহ তাআলা আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন? উত্তরে জুনায়েদ রহ. বললেন-
طاحت تلك الاشارات وغابت تلك العبارات : وفنيت تلك العلوم ونفدت تلك الرسوم : وما نفعنا الا ركعات كنا نركعها في الاسحار.
সেসব ইশারা-ইঙ্গিত শেষ হয়ে গেছে। সেসব ভাষা অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেসব জ্ঞান-বিদ্যা নিঃশেষ হয়ে গেছে। সেসব রেওয়াজ-রুসম খতম হয়ে গেছে। উপকারে এসেছে কেবল সে কয়েক রাকাত সালাত, যা আমি অতি প্রত্যুষে [তাহাজ্জুদের সময়] পড়তাম。
টিকাঃ
৪২ তারিখে বাগদাদ: ৭/২৪৮
📄 মুমিনের বিচক্ষণতা
আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন কায়সারিয়া বিজয়ের পর গাজা এলাকায় ঘেরাও করলেন, তখন সেখানকার গভর্নর তার নিকট দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার জন্য কাউকে দূত হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব করলেন। আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু একজন সাধারণ সিপাহি বেশে নিজেই গেলেন এবং আলোচনা শুরু করলেন। গাজার গভর্নর তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, বর্ণনাশৈলী ও নির্ভীকতা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—তোমাদের সৈন্যদলে তোমার মতো আর কেউ আছে কি?
আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন—
এটা কী বলছেন! আমি তো তাদের মধ্যে সবচে' সাধারণ ও দুর্বল। সেজন্যেই তারা আমার মতো একজন সাধারণ লোককে এখানকার আশঙ্কাজনক স্থানে পাঠিয়েছে!
গাজার গভর্নর তার কথা শুনে ফেরার সময় তাকে কিছু উপঢৌকন দিয়ে দিলেন। এদিকে দারোয়ানকে নির্দেশ দিয়ে রাখলেন—
লোকটি গেট অতিক্রম করার সময় তার সবকিছু ছিনিয়ে নেবে এবং তাকে হত্যা করবে。
আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর গাসসান গোত্রের জনৈক খ্রিস্টানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সে তাকে চিনে ফেলল এবং বলল, আমর! এখানে প্রবেশের সময় যেমনি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, বেরোনোর সময়ও তেমনি বেরোবেন। এটা শুনে আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু থমকে গেলেন এবং পুনরায় পেছন দিকে রওনা করলেন। গভর্নরের নিকট গিয়ে বললেন—আমার দশজন চাচাতো ভাই আছে, আপনি আমাকে যে উপঢৌকন দিয়েছেন সেগুলো তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ভেবে দেখলাম, আমি তাদেরকে আপনার নিকট নিয়ে আসবো। আপনি তাদের মধ্যে সেগুলো বণ্টন করে দিলে আপনার দেওয়া উপঢৌকন একজনের কাছে পৌঁছার পরিবর্তে দশজনের নিকট পৌঁছে যাবে। এই ভেবে গভর্নর খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন যে, একজনের স্থলে দশজনকে হত্যা করার পথ সুগম হলো। তাই তিনি বললেন—
ঠিক আছে, তুমি শীঘ্র তাদের নিয়ে এসো。
এদিকে দ্বাররক্ষীকে বলে পাঠালেন, একে এখন যেতে দাও। আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু মহল থেকে বের হয়ে বহুদূর পর্যন্ত অতি সন্তর্পণে চলছিলেন। এবং বিপদসীমা পেরিয়ে বললেন—
ভবিষ্যতে এদের মতো প্রতারকদের নিকট আসবো না。
কিছুদিন পর গাজার গভর্নর শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হন। শান্তিচুক্তির জন্য গভর্নর নিজেই মুসলিমদের নিকট আসলেন। অতঃপর আমর রাজিয়াল্লাহু আনহু র তাঁবুতে প্রবেশ করেই দেখলেন, তিনি সেনাপতির চেয়ারে বসে আছেন। তখন তিনি যারপরনাই বিস্মিত হলেন। এবং একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন—
আপনি কি সেই লোক?
উত্তরে আমর ইবনুল আস রাজিয়াল্লাহু আনহু বললেন—
জি, আমি তোমাদের প্রতারণার স্বীকার হয়েও বেঁচে আছি。
টিকাঃ
৪৩ আল-ওয়াসায়াল খালেদাহ: পৃ.২৫৭
📄 মূল্যবান উপদেশ
আবু জাফর মনসুর ছিলেন খেলাফতে আব্বাসিয়ার প্রসিদ্ধ খলিফা। একদিন তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও প্রসিদ্ধ ফকিহ আবদুর রহমান ইবনু কাসেম রহ.-এর নিকট আবেদন জানালেন, আমাকে কিছু নসিহত করেন! আবদুর রহমান রহ. বলেন, আমি একটি ঘটনার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—
উমার ইবনু আবদুল আজিজ রহ. এগারো জন সন্তান রেখে মারা যান; কিন্তু তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল মাত্র সতেরো দিনার। তন্মধ্যে হতে পাঁচ দিনার ব্যয় হয়েছে কাফন-দাফনে। দুই দিনার ব্যয় হয়েছে কবরের জায়গা ক্রয়ে আর অবশিষ্ট অর্থ সকল সন্তান উনিশ দিরহাম করে পিতার ওয়ারিস হিসেবে পেয়েছে。
টিকাঃ
৪৪ আল-ইয়াওয়াকিতুল আসরিয়্যাহ পৃ.১০৯-১১০