📄 লোভী আশআব
আশআব নামক এক ব্যক্তি লোভী হিসেবে বেশ খ্যাত ছিল। একপর্যায়ে তার উপাধিই হয়ে যায় ‘লোভী’। উক্ত বিশেষণের দরুন সে প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়। কারও লোভের কথা বলতে গিয়ে বলা হতো—'এ তো দেখি যুগের আশআব, অথবা, এ তো দেখি আশআবকে হার মানিয়েছে।' এখনো আরবে এ প্রবাদ চালু আছে। তারিখে বাগদাদগ্রন্থ অধ্যয়ন করতে গিয়ে তার কয়েকটি ঘটনা নজরে পড়ল :
১. আসমায়ি রহ. বলেন—
একবার কিছু চঞ্চল কিশোর আশআবকে ক্ষিপ্ত ও তিক্ত করার জন্য তার পেছনে লাগল। নানাভাবে তারা তাকে উত্ত্যক্ত করে তুলল। অগত্যা আশআব তাদের থেকে মুক্তি পেতে মিছামিছি বলল—আরে, তোমরা কি জানো, সালেম ইবনু আবদিল্লাহ খেজুর বিতরণ করছে! কিশোররা এ কথা শোনামাত্রই সালেমের বাড়ির দিকে ছুটল। কিছুক্ষণ পর আশআব কিশোরদের দৌড়াদৌড়ি দেখে ভাবল, বাস্তবেই তো সালেম খেজুর বিতরণ করতে পারে। অতঃপর সেও তাদের সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করল。
২. জাহহাক বলেন—
লোভী আশআব কিছু লোককে দেখল, তারা বিক্রির জন্য খাবারের পাত্র তৈরি করছে। সে তাদের উদ্দেশ্য করে বলল, ভাই, একটু বড় বড় করে তৈরি করেন! তারা জিজ্ঞেস করল, কেন? উত্তরে আশআব বলল—হতে পারে কেউ কোনোদিন এখান থেকে পাত্র কিনে নেবে আর সে পাত্রে আমাকে কিছু দান করবে。
৩. আশআব নিজেই তার অভ্যাসের বিবরণ দিতে গিয়ে বলল—
আমি কোনো জায়গায় শরিক হলে কাউকে কানাঘুষা করতে দেখলে ভাবতাম—মৃতব্যক্তি বোধহয় আমার জন্য কোনো কিছুর অসিয়ত করে গেছে। আর তা নিয়েই হয়তো আলাপ-আলোচনা চলছে。
টিকাঃ
৩৯ তারিখে বাগদাদ : ৭১/৪২-৪৩
📄 পিতা সন্তানকে কীভাবে নির্দেশ দেবেন
আল্লামা তাহের ইবনু আবদির রশিদ বুখারি রহ. উল্লেখ করেন, প্রত্যেক পিতার জন্য উচিত, নিজ সন্তানদের কোনো ব্যাপারে সরাসরি হুকুম না করে এভাবে বলা-'শোনো বাবা, তুমি অমুক কাজটি করলে খুব ভালো হতো।' কারণ, পিতা যদি পুত্রকে স্পষ্ট ভাষায় কোনো কাজের নির্দেশ দেন, আর পুত্র উক্ত নির্দেশ কোনো কারণে মানতে না পারে, তবে সে পিতার অবাধ্য হওয়ায় কবিরা গুনাহে লিপ্ত হবে। আর প্রথমোক্ত পন্থা অবলম্বন করলে এর আশঙ্কা থাকে না。
টিকাঃ
৪০ খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ৪/৩৪০
📄 উটের পথচলায় সংগীতের প্রভাব
উটের গতি বৃদ্ধির জন্য যে সুরেলা গীত গাওয়া হয়, তাকে আরবিতে 'হুদি' বলা হয়। এ প্রথার সূচনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোল্লা আলি কারি রহ. লেখেন-এক বেদুঈন কোনো কারণে তার গোলামকে প্রহার করল। এবং তার আঙুল কামড়ে থেতলে দিল। কিছুদিন পর তারা উভয়ে সফরে রওনা হলো। পথে গোলাম হাতের ব্যথায় 'উহু-উহু' বলে চিৎকার করছিল। গোলামের এ আওয়াজের তালে তালে অমনি উট তীব্র গতিতে দৌড়াতে লাগল। এ থেকেই সকলে বুঝতে পারে যে, উট সুরের মূর্ছনায় মত্ত হয়ে অতি দ্রুতবেগে দৌড়ায়। একপর্যায়ে এসে এটি একটি স্বতন্ত্র বিদ্যায় রূপ নেয়। উট চালনার গীতে রয়েছে অসাধারণ প্রভাব। এ প্রসঙ্গে সুপ্রসিদ্ধ বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে:
কথিত আছে-জনৈক ব্যক্তি এক বুদ্দুর মেহমান হলো। লোকটি বুদ্দুর বাড়িতে এক কালচে গোলামকে দেখল। সেএকটি উটের সামনে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থায় বসে আছে। গোলাম তাকে বলল, আপনি দয়া করে আমার মনিবের কাছে সুপারিশ করেন, যেন তিনি আমাকে ছেড়ে দেন। কারণ, তিনি মেহমান ব্যতীত অন্য কারও সুপারিশ গ্রহণ করেন না। মেহমান মেজবানের নিকট সুপারিশ করলে সে বলল, আপনার সুপারিশে আমি তাকে ছেড়ে দিচ্ছি। অন্যথায় সে জঘন্যতম অপরাধ করেছে। মূল ঘটনা হলো-আমার দশটি উট ছিল। এ গোলাম সেগুলোকে কোনো জায়গা থেকে নিয়ে আসছিল। পথিমধ্যে হঠাৎ সে গীত গাইতে আরম্ভ করল। আর অমনি সবকটি উট সুরের তালে মাতাল হয়ে এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করতে লাগল। এবং কয়েকদিনের পথ মাত্র একদিনে অতিক্রম করে বাড়িতে ফিরল। বাড়িতে পৌঁছার পর দেখা গেল, মাত্র একটি উট কোনো রকম প্রাণে বেঁচে আছে; বাকি সবগুলোই মারা গেছে! মেহমান উক্ত ঘটনা শুনে বেশ আশ্চর্যান্বিত হয়ে সেই গীতটি শুনাতে বলল। সে গীত শুরু না করতেই ওই উটটি একদম টানটান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মরুভূমির দিকে ছুটতে লাগল। এদিকে মেজবান বেচারাও উন্মাদের মতো এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করল !
টিকাঃ
৪১ মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/১৩২-১৩৩
📄 মৃত্যুর সময়ও কুরআন তিলাওয়াত
আবু মুহাম্মদ হারিরি বলেন, জুনায়েদ বাগদাদি রহ.-এর মৃত্যুর সময় আমি তার নিকটে ছিলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার। তিনি [মুমূর্ষু অবস্থায়ও] কুরআনে কারিম তিলাওয়াত করছিলেন। আমি তাকে বললাম, আবুল কাসেম! [জুনায়েদ বাগদাদির উপনাম] নিজের শরীরের প্রতি একটু লক্ষ্য করেন! উত্তরে তিনি বললেন, আবু মুহাম্মদ, এ মুহূর্তে আমার চেয়ে অধিক ইবাদতের মুখাপেক্ষী আর কেউ নেই। কারণ, আমার আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর পূর্বে জুনায়েদ বাগদাদি রহ. অসিয়ত করেছিলেন— যে সকল ইলমি বিষয়াদি আমার প্রতি সম্পৃক্ত কিংবা লোকজন আমার থেকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, সেগুলোকে আমার সঙ্গে দাফন করে দেবে。
লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি এর উত্তরে বললেন, আমি যখন দেখলাম, সকলের নিকট নবীজির হাদিস রয়েছে। তো, আমার তখন মনে হলো, আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ইলমি বিষয় যেন আমার মৃত্যুর পরে অবশিষ্ট না থাকে。
মুত্যুর পর তাকে জাফর খুলদি রহ. স্বপ্নযোগে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন-আল্লাহ তাআলা আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন? উত্তরে জুনায়েদ রহ. বললেন-
طاحت تلك الاشارات وغابت تلك العبارات : وفنيت تلك العلوم ونفدت تلك الرسوم : وما نفعنا الا ركعات كنا نركعها في الاسحار.
সেসব ইশারা-ইঙ্গিত শেষ হয়ে গেছে। সেসব ভাষা অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেসব জ্ঞান-বিদ্যা নিঃশেষ হয়ে গেছে। সেসব রেওয়াজ-রুসম খতম হয়ে গেছে। উপকারে এসেছে কেবল সে কয়েক রাকাত সালাত, যা আমি অতি প্রত্যুষে [তাহাজ্জুদের সময়] পড়তাম。
টিকাঃ
৪২ তারিখে বাগদাদ: ৭/২৪৮