📄 মুখবন্ধ
بسم الله الرحمن الرحيم, نحمده ونصلي على رسوله الكريم.
জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই বই কখনো আমার চোখের আড়াল হতো না। অধ্যয়নই ছিল সবচে' প্রিয় কাজ। সাধারণত অধ্যয়নের বিষয় ছিল কুরআন-হাদিস সংবলিত কোনো রচনা। তবে মাঝেমধ্যে রুচি পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের কিতাবাদিও পড়া হতো। অধ্যয়নের মাঝে কোনো আকর্ষণীয় বা শিক্ষণীয় ঘটনা কিংবা সূক্ষ্ম ও তথ্যসমৃদ্ধ বিষয় দৃষ্টিগোচর হলে তা নোট করে রাখার খুব ইচ্ছা হতো। অনেক ক্ষেত্রে এ জাতীয় লেখা প্রকাশযোগ্য করে লিখতে না পারলেও অন্তত মূল কিতাবের বরাত দিয়ে লিখে রাখতাম। এভাবে আমার নিকট তা অপ্রকাশিত একটি বিশাল পাণ্ডুলিপি আকারে রক্ষিত ছিল, যা মাঝে-মধ্যে যথেষ্ট কাজে আসত。
তবে যে সকল ঘটনাবলি ও সূক্ষ্ম বিষয়াদি রীতিমতো সুবিন্যস্তভাবে প্রকাশযোগ্য করে সংকলন করার সুযোগ হয়েছিল সেগুলোকে আমি 'তারাশে' শিরোনামে দীর্ঘদিন যাবৎ আমার মাসিক আল-বালাগ পত্রিকায় একটি স্বতন্ত্র কলাম হিসাবে প্রকাশ করে আসছিলাম; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমার ব্যস্ততা বেড়ে গেলে এর ধারাবাহিকতাও বন্ধ হয়ে যায়。
আল-বালাগের 'তারাশে' বিভাগটি পাঠকমহলে বেশ সাড়া পড়েছিল বিধায় পাঠকবৃন্দের সুবিধার্থে বিভিন্ন সংখ্যায় ছড়ানো-ছিটানো বিষয়গুলো একত্র করে কিতাবাকারে প্রকাশের ইচ্ছা হলো। এ কথা মাথায় রেখে আমার স্নেহধন্য পুত্র মাওলানা মুহাম্মদ ইমরান আশরাফ উসমানি-সাল্লামাহু-আল-বালাগের পুরাতন সংখ্যাগুলো জমা করে একটি মলাটে পেশ করেছে。
বক্ষ্যমাণ বইটি তারই সংকলিতরূপ। এ গ্রন্থে কোনো তারতিব বা সুবিন্যস্ততা খোঁজার প্রয়োজন নেই। কেউ খুঁজে না পেলে চিন্তিতও যেন না হন। কবির ভাষায়—
‘জীবনই যার বিষণ্ণতায় ভরা, তার গ্রন্থ কীভাবে হবে সুষমায় ভরা!’
আল্লাহ তাআলা এ গ্রন্থটিকে সকল পাঠকের জন্য কল্যাণকর হিসেবে কবুল করেন। আমিন।
বিনীত —মুহাম্মাদ তাকি উসমানি ১৪ জুমাদাল উলা ১৪১৪ হি.
📄 নবীজির রসিকতা
আবু উমামা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন— নবীজির মতো সদা হাস্যোজ্জ্বল ও কৌতুকপ্রিয় কেউ ছিল না।
আবু দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন— নবিজি সব সময় মুচকি হেসে কথা বলতেন। (তবে, কখনো তিনি অট্টহাসি হাসতেন না।)
জাবির ইবনু সামুরা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন— নবীজি কখনো আত্মহারা হয়ে হাসতেন না; বরং মুচকি হাসিই ছিল তাঁর চিরাচরিত অভ্যাস।
মুররা রাজিয়াল্লাহু আনহুর পিতা বলেন— প্রচণ্ড হাসি পেলে নবীজি মুখে নিজের পবিত্র হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতেন।
টিকাঃ
১ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
২ তবরানি: ৭৮৩৮
৩ মুসনাদে আহমাদ: ২১৭৩৫
৪ তিরমিজি: ৩৬৪৫
৫ কানযুল উম্মাল: ৪/২৭
📄 বৃদ্ধারা জান্নাতে যাবে না
হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
একবার এক বৃদ্ধা নবীজির খেদমতে এসে আরজ করল-ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার জন্য দুআ করেন, যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। উত্তরে নবীজি বললেন-শোনো, জান্নাতে কোনো বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না! এ কথা শুনে বৃদ্ধা নিরাশ হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে চলে যেতে লাগল। নবীজি তখন সাহাবিদের বললেন, তাকে বলে দাও-সে বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না (যুবতি হয়েই তবে জান্নাতে প্রবেশ করবে)।
টিকাঃ
৬ শামায়েলে তিরমিজি: পৃ.২০
📄 আল্লাহর কী কুদরত
ইমাম রাজি রহ. সূরা ফাতিহার [রাব্বুল আলামিন-'জগৎসমূহের প্রতিপালক]-এর তাফসির প্রসঙ্গে জুন্নুন মিসরি রহ.-এর একটি বিস্ময়কর ঘটনা উল্লেখ করেন:
তিনি একদিন কাপড় ধোয়ার জন্য নীলনদের তীরে গমন করেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন বড় একটি বিচ্ছু তীরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিচ্ছুটি নদীর কিনারায় পৌঁছামাত্র পানি থেকে একটি কচ্ছপ ভেসে উঠল। বিচ্ছু কচ্ছপটিকে দেখেই অতি দ্রুতবেগে গিয়ে তার পিঠে চড়ে বসল। অমনি কচ্ছপটি তাকে নিয়ে অপর প্রান্তে ছুটতে লাগল。
জুন্নুন মিসরি রহ. বলেন- তাদের কাণ্ড দেখার জন্য আমি পানিতে নেমে পড়লাম। কচ্ছপটি ওপারে পৌঁছামাত্র বিচ্ছু তার পিঠ থেকে নেমে পড়ল। আমিও নদী থেকে উঠে তার পিছু নিলাম。
একপর্যায়ে দেখতে পেলাম—অল্প বয়সী এক যুবক ঘন বৃক্ষ-ছায়ায় গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম-বিচ্ছুটি হয়তো নদীর ওপার থেকে যুবকছেলেটিকে দংশন করতে এসেছে। একথা ভাবতেই পথিমধ্যে দেখতে পেলাম-একটি বিষাক্ত সাপ ফণা তুলে যুবকের কাছে এগিয়ে আসছে। সাপটি যুবকের কাছে পৌঁছার আগেই বিচ্ছুটি বিদ্যুৎগতিতে তার মাথার ওপর চড়াও হয়ে দংশন করল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাপটি মারা গেল। এদিকে বিচ্ছু তার পূর্বের পথ ধরে নদীর তীরে ছুটল। সেখানে কচ্ছপটি ছিল তার প্রতীক্ষায়। অতঃপর তার পিঠে সওয়ার হয়ে পুনরায় সে তার গন্তব্যে চলে গেল। জুন্নুন মিসরি রহ. বলেন—এ অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আমি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলাম—
يا راقدا والجليل يحفظه * من كل سوء يكون في الظلم كيف تنام العين عن ملك * تأتيه منك فوائد النعم.
হে সুখ নিদ্রায় বিভোর ব্যক্তি, মহান স্রষ্টা তোমায় নিকষ আঁধারের যাবতীয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেছেন। কীভাবে তোমার চোখ সুখ নিদ্রায় বুঁদ হয়ে আছে সে প্রভুকে ভুলে, যাঁর অফুরন্ত নিয়ামতের ফল্গুধারা সদা প্রবাহিত হচ্ছে তোমার ওপর。
আমার কবিতা পাঠ শুনে যুবকের ঘুম ভেঙে গেল। আমি তাকে চাক্ষুষ ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ শুনালাম। ঘটনাটি তার হৃদয়জগতকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলল। ফলে সে বিগত জীবনের অভিশপ্ত গুনাহর পথ ছেড়ে দিয়ে বাকি দিনগুলো আল্লাহর পথেই কাটিয়ে দিল।
টিকাঃ
৭ ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি, তাফসিরে কাবির: ১/২৩৭