📄 ষষ্ঠ ঘটনা
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনাটি একজন মুজাহিদের। কিতাবে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে। আমরা ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করলাম।
মদীনায় আবূ কুদামা শামী নামক এক ব্যক্তি ছিল। জিহাদের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা। জিহাদ যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য- উদ্দেশ্য। তাই আল্লাহর রাহে জিহাদ করার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় যুদ্ধের ময়দানে অতিবাহিত করেন।
একদা মসজিদে নববীতে বসা ছিলেন তিনি। লোকদের সাথে বিভিন্ন কথা-বার্তা বলছিলেন। জিহাদ বিষয়েও কথা বললেন। উপস্থিত জনতার কেউ বলল, হুজুর! আপনি দীর্ঘ দিন হলো জিহাদ করেছেন। আর জিহাদের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গ করেছেন। জিহাদের ময়দানের বিভিন্ন অবস্থা আপনি অবলোকন করেছেন। জিহাদের ময়দানে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনাও স্বচক্ষে দেখেছেন। আজ আমাদেরকে আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা শুনান।
শায়খ আবু কুদামা বললেন, তাহলে এবার শোন! কোনো একদিন ফোরাত নদীর তীরে বসা ছিলাম। হঠাৎ অচেনা এক মহিলা এসে বলল, হে শায়খ আবূ কুদামা! আমি আপনার সম্পর্কে জেনেছি, শুনেছি। আপনি জিহাদের উপর বয়ান করেন। লোকদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করেন। মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে আল্লাহর শত্রুদের সাথে জিহাদ করেন। আল্লাহ তা'আলা আমাকে লম্বা লম্বা চুল দান করেছেন। সে চুল আমার রূপ সৌন্দর্য বর্ধন করা ছাড়া কোনো কাজেই আসে না। আমি এক স্বামী হারা ঘরণী, সন্তান হারা জননী। আমার স্বামী জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়ে যান। আমার সন্তান-সন্তুতিও শহীদ যায়। জিহাদকে আমি খুব বেশি ভালোবাসি। যদি আমার উপর জিহাদ ফরজ হতো তাহলে আমি নিজেই জিহাদী কাফেলায় শরীক হতাম। কিন্তু দুঃখ, আমার সে খোশ নসীব হলো না।
আমি আমার মাথার চুল দিয়ে একটি রশি তৈরি করেছি। পর্দা লংঘন না হয় এ জন্য আবার মাটির প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আপনি কি জানেন কেন এমনটি করেছি? না, জানেন না। জানার কথাও না। আমি এই রশি যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দিব। কোনো না কোনো মুজাহিদ আমার এ রশি জিহাদের ময়দানে ব্যবহার করবে। জিহাদের ময়দানের ধূলি-বালিতে আমার চুলের এ রশি ধূলিমলিন হবে। আল্লাহর কাছে বলতে পারব, আল্লাহ! নিজে জিহাদের ময়দানে যেতে পারিনি, নিজেকে তোমার রাস্তায় কুরবানী করতে পারিনি, তবে আমার শরীরের একটি অংশ তোমার রাস্তায় পাঠিয়ে দিয়ে মুজাহিদদের কাতারে নিজের নাম লিখাতে চেষ্টা করেছি। হতে পারে, এটা আমার নাজাতের ওসিলা হবে। আপনার নিকট মিনতিকারী বান্দীর সবিনয় নিবেদন, আপনি এই রশি যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যান। যখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হবে, তলোয়ারের ঝনঝনানিতে মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ হতে থাকবে তখন আপনার ঘোড়ার লাগাম হিসাবে আমার এ রশি ব্যবহার করবেন। যদি আপনার প্রয়োজন না হয়, তাহলে মোহতাজ ব্যক্তিকে দিয়ে দিবেন। আমি চাই যে, যুদ্ধের ময়দানের ধূলিকণাতে আমার চুল ধূলিমলিন হোক।
এরপর মহিলা বলল, শায়খ! আমার জীবনের কাহিনী শুনুন! আমার স্বামী একজন জানবাজ মুজাহিদ ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় তিনি শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তা'আলা তার শাহাদত কবুল করুন। যখন তিনি শহীদ হয়ে যান, তখন সুন্দর ফুটফুটে এক ছেলে রেখে যান। সে এখন দক্ষ মুজাহিদ, হাফেজে কুরআন, রাত ভর তাহাজ্জুদ গুজার। সারাদিন ইবাদত বন্দেগীকারী। এখন সে টগবগে যুবক। বয়স তার পনেরো। কাজের সন্ধানে সে বাহিরে গেছে। আপনি এখানে থাকাকালীন যদি সে এসে যায়, তাহলে আপনার সাথে তাকে জিহাদে পাঠিয়ে দিব, ইনশাআল্লাহ। আমি চাই সে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী হোক, জিহাদের ময়দানে শহীদ হোক। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
আমি মহিলার আবদার রক্ষা করলাম। তার হাত থেকে রশি নিয়ে নিলাম। এতে সে বেশ খুশি হলো। সে আমাকে রশিটা হেফাজতে রাখতে বলল। আমি হেফাজতে রাখলাম। এরপর তার সাথে সালাম বিনিময় শেষে। অতঃপর পথ চলতে শুরু করলাম। সাথিদের নিয়ে মহিলার নিকট থেকে প্রস্থান করলাম। যুদ্ধের জন্য রওনা হলাম। মাঝপথে পৌঁছতেই দেখি পিছন দিক থেকে আওয়াজ আসছে। তাকিয়ে দেখি, এক অশ্বারোহী চিৎকার করে ডেকে বলছে, হে জিহাদী কাফেলা! আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে বলছি, একটু দাঁড়ান। আমরা দাঁড়ালাম। মুখ ঢেকে সে আমাদের নিকট আসল। কাফেলার সাথিদের জিজ্ঞাসা করল, শায়খ আবূ কুদামা কে? লোকেরা আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ইতিই শাইখ আবূ কুদামা! এরপর সে প্রথমে আমার নিকট এসে সালাম করল, এরপর মুআনাকা করে বলল, আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে আপনার সফর সঙ্গী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনার সাহচর্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করেননি। এরপর সে আমাদের সাথে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তখনো তার চেহারা কাপড়ে ঢাকা ছিল। আমি বললাম, হে মুসাফির! তোমার চেহারা প্রকাশ কর, আমি দেখব তুমি কে? কী তোমার পরিচয়?
এরপর সে চেহারা থেকে কাপড় সরালো। কাপড় সরাতেই পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারা বেরিয়ে এলো। সে এক তরুণ যুবক। সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করেছে। আমি তাকে বললাম, হে বৎস! তোমার পিতা-মাতা বেঁচে আছে? সে বলল, না- পিতা বেঁচে নেই। তবে মা বেঁচে আছে। পিতা আমার আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলা যেন আমাকেও শাহাদাত নসীব করেন, দ্রুত তার সাথে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
এরপর সে তার আসল পরিচয় তুলে ধরে বলল, আমি তো সেই মহিয়সী মহিলার সন্তান, যিনি আপনার নিকট তার অগ্রপাথেয় পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজের চুল দিয়ে রশি বানিয়ে আপনার হাতে তুলে দিয়েছেন। আপনি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন! আপনি দেখবেন, আমি শহীদ ইবনে শহীদ হব। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে জিহাদে যেতে বারণ করবেন না। ছোট মনে করে আমাকে ছেড়ে যাবেন না।
এরপর ছেলেটি তার দক্ষতার বর্ণনা দিয়ে বললেন, আমি তিরান্দাজীতে খুবই পারদর্শী, অশ্বারোহীতে দক্ষ অশ্বারোহী, জিহাদের ময়দানে আমি বিপ্লবী, আমার এলাকায় আমি অদ্বিতীয় জিহাদী। এ তো আমার দক্ষতার কথা আমি বললাম। আমার মা আমাকে কী বলেছেন, তা তো আপনাকে এখনো বলিনি। আমার মা আল্লাহর শপথ করে বলেছেন, আমি যেন জীবিত অবস্থায় তার সাথে দেখা না করি। আমার মা বলেছেন, ছেলে আমার! জিহাদের ময়দানে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহ তা'আলার জীবন আল্লাহ তা'আলাকেই দিয়ে দিবে। এর বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে জান্নাত ক্রয় করে নিবে এবং অতিশীঘ্রই তোমার পিতার সাথে মিলিত হবে। শাহাদতের জন্য সর্বদা তুমি মহান রবের দরবারে দোয়া করবে। তুমি যখন শহীদ হবে আমাকে সুপারিশ করবে। আর তোমাকে সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হবে। আল্লাহর রাসূল হাদীস শরীফে বলেছেন, শহীদ তার পরিবারের সত্তরজনকে সুপারিশ করবে। তাই আমি তোমার সুপারিশের আশায় থাকব। এ কথা বলে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! আমার এই ছেলে, আমার কলিজার টুকরা, আমি তাকে তোমার খেদমতে পেশ করলাম, এবার তুমি তা কবুল কর।
শায়েখ আবু কুদামা বলেন, আমি ছেলেটির কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। দীনের প্রতি তার ও তার মায়ের দরদ দেখে নিজের অজান্তেই নয়ন ভরে কাঁদলাম। তখন আমার গাল বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। আমার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে সে বলল, চাচা! আপনি কাঁদছেন কেন? আমার অল্পবয়সের কারণে যদি কাঁদেন, তাহলে শুনে রাখুন! আমার চেয়ে ছোটকেও আল্লাহ তা'আলা নাফরমানির কারণে শাস্তি দিবেন, আল্লাহর শাস্তি সহ্য করার দুঃসাধ্য আমার নেই, পৃথিবীর কারোই নেই। আমি চাইনা, আল্লাহর শাস্তির পাত্র হতে, চাই রহমতের পাত্র হতে।
শায়েখ আবূ কুদামা বলেন, আমি তো এমনিতেই অবাক। তার কথা শুনে এবার হলাম হতবাক। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, না, তোমার কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি তোমার দুঃখিনী মায়ের জন্য। তুমি শহীদ হয়ে গেলে তোমার মায়ের অবস্থা কি? সে কথা মনে করে আমি কাঁদছিলাম। এভাবে তাকে সান্ত্বনা দিলাম।
শায়েখ আবু কুদামা বলেন, এরপর আমরা সামনে অগ্রসর হলাম। সারা রাত পথ চললাম। চলার পথে লক্ষ্য করে দেখলাম, ছেলেটি যিকিরে মশগুল। আরো লক্ষ্য করলাম, সে অশ্বারোহীতে খুবই পারদর্শী। আমরা দুশমনের যতই নিকটবর্তী হতে ছিলাম, ছেলেটির মনোবল ততই মযবুত দেখলাম। এভাবে রাতের পথ চলা শেষ হলো। পরের দিন সারা দিন সফর হলো। সূর্যাস্তের সময় আমরা শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করলাম। আমরা সকলেই তখন রোযাদার ছিলাম। এমনিতেই সফরের কষ্ট, সেই সাথে রোযা রাখার ক্লান্তি। ক্লান্ত শরীরে গা এলিয়ে দিতেই ছেলেটির চোখে ঘুম এসে যায়। তাকিয়ে দেখি, সে ঘুমের ঘরে হাসছে। সাথিদেরকে বললাম, দেখো! ছেলেটি কিভাবে হাসছে। তারাও দেখল এবং হাসল। আমিও হাসলাম। ঘুম থেকে জাগ্রত হলে জিজ্ঞাসা করলাম, হে বৎস! ঘুমের ঘরে হাসলে কেন? ছেলেটি বলল, আমি বিস্ময়কর এক স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নের দৃশ্য দেখে আমার বড্ড হাসি পেয়েছিল। তাই না হেসে উপায় ছিল না আমার। আমি বললাম তাহলে আমাদেরকে তা শুনাও।
সে বলল, স্বপ্নে দেখি, মনোমুগ্ধকর আকর্ষণীয় সবুজ শ্যামল মনোরম বাগানে আমি খেলা করছি। হঠাৎ দৃষ্টিনন্দন আলিশান এক প্রাসাদ দৃষ্টিগোচর হলো, যা স্বর্ণ-রৌপ্য, মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত। প্রাসাদটি খুবই নয়নাভিরাম। তার দরজার উপর আভিজাত্যের পর্দা ঝুলানো। আমি সেগুলো অবাক পলকে তাকিয়ে দেখছিলাম। এমন সময় কতিপয় মেয়ে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এবং দরজা থেকে আভিজাত্যের পর্দা সরিয়ে দিলো। তাদের চেহারা এত সুন্দর যে, তার বর্ণনা দেয়ার সাধ্য আমার নেই। এমন সুন্দর চেহারার মানুষ না কোনো চোখ দেখেছে, না কোনো কান তাদের বর্ণনা শুনেছে, না কোনো অন্তর তার কল্পনা করেছে। আর কল্পনা করার সুযোগও হবে না এত সুন্দর তাদের চেহারা। আমাকে দেখামাত্র তারা স্বাগত জানাল। আমি তাদের একজনের দিকে হাত বাড়ালাম। সে বলল না, এখনো সময় হয়নি। অপেক্ষা কর, সময় হলে কাছে আসব। আমি শুনতে পেলাম তারা পরস্পর বলাবলি করছে, এ যুবক মারযিয়ার স্বামী হবে। অতঃপর তারা আমাকে বলল, আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর রহম করুক। একটু সামনে এসো। আমি সামনে গেলাম। তারা আমাকে প্রাসাদটির উপরে দৃষ্টিনন্দন একটি কামরায় নিয়ে গেল। সেটি খাঁটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। তাতে মনোরম পালঙ্কের উপর সবুজ বিছানা বিছানো। তার উপর বসে আছে সুন্দরী এক মেয়ে, যার চেহারা জগৎ উজালাকারী সূর্যের ন্যায় ঝলমলে। আল্লাহ তা'আলা যদি আমার দৃষ্টি হেফাজত না করতেন, তাহলে তার চেহারার উজ্জ্বলতার কারণে আমার দৃষ্টিশক্তি বিলীন হয়ে যেত, আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যেত। আমি পাগল হয়ে যেতাম। পূর্বের মেয়েদের ন্যায় সেও আমাকে দেখে স্বাগতম জানাল এবং বলতে লাগল, হে প্রিয়! এসো, তুমি আমার জন্য আর আমি তোমার জন্য। আমি তার নিকটবর্তী হতে চাইলাম। সে আমাকে বলল, না, এখনো সময় হয়নি, সময় হলে কাছে আসবে, আমিও তোমার কাছে যাবো। আগামীকাল দুপুরে তোমার সাথে...। এতক্ষণ তুমি অপেক্ষা করতে থাকো। এরপর মুবারকবাদ জানিয়ে সে আমাকে বিদায় জানালো।
শায়খ আবু কুদামা বলেন, আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, তুমি খুব ভালো স্বপ্ন দেখেছো। রাতভর আমরা তার স্বপ্নের উপর আশ্চর্যবোধ করছিলাম। এভাবেই ভোরের সূর্যোদয় হলো। আমরা ঘোড়ায় আরোহণ করলাম। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এমন সময় কে যেন ডেকে বলছে, হে আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারীগণ! দলে দলে যুদ্ধের ময়দানে চলো। দ্রুত জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও। গায়েবী এ আওয়াজ শেষ হতে না হতেই কাফেরদের দেখা মিললো। (আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করুক)। চতুর্দিকে শত্রু ছেয়ে গেল। আমাদের মধ্য হতে এ তরুণ যুবক সর্ব প্রথম হামলা শুরু করল। শত্রুদলের লোক সমাগম ভেদ করে তাদের মাঝে ঢুকে পড়লো। বড় দূরদর্শীতার সাথে যুদ্ধ করে শত্রু দলের অনেককেই জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলো। আমি ছেলেটির আশ্চর্যজনক আক্রমণ দেখে তার নিকট গেলাম। তার ঘোড়ার লাগাম ধরে বললাম, হে প্রিয় বৎস! তুমি ফিরে যাও। যুদ্ধের ময়দানে তুমি নতুন। যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তোমার বেশি নেই। সে তখন বিস্ময়কর এক উত্তর দিয়ে বলল, চাচা! আপনি কোরআনের এ আয়াত শুনেননি? يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ مَن يُوَلِّهِمْ يَوْমَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ বَاء بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কাফেরদের সাথে মুখোমুখি হবে, তখন পশ্চাদপসরণ করবে না। আর যে লোক সেদিন তাদের থেকে পশ্চাদপসরণ করবে, অবশ্য যে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তনকল্পে কিংবা যে নিজ সৈন্যদের নিকট আশ্রয় নিতে আসে সে ব্যতীত অন্যরা, আল্লাহর গযব সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। আর তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। বস্তুত সেটা হলো নিকৃষ্ট অবস্থান।) এ আয়াত তিলাওয়াত করে সে বলল, আপনি কি চান আমি জাহান্নামে যাই। এভাবে আমাদের মাঝে কথোপকথন হচ্ছিল। এমন সময় শত্রুপক্ষ অতর্কিতভাবে আমাদের উপর আক্রমণ করে বসে। এরপর আমরা একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যাই। এটাই ছিলো তার সাথে আমার জীবিত অবস্থায় শেষ সাক্ষাৎ ও শেষ কথোপকথন।
যুদ্ধ শেষে শহীদানের লাশ ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। রক্তমাখা ধূলি-বালি মিশ্রিত শহীদানের মৃত দেহ পড়ে আছে। প্রবাহিত হচ্ছে তাদের রক্তের স্রোতধারা, এ যেন বর্ষাকালের ঝর্ণাধারা। রক্ত ও ধূলা-বালির কারণে শহীদদের লাশ চেনা দুঃসাধ্য ছিল। হঠাৎ একটি গর্ত থেকে আওয়াজ আসছিল। দিক নির্ণয় করে আমি সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি সেই যুবকটি ধূলিমলিন অবস্থায় পড়ে আছে। প্রাণবায়ু বের হবে হবে ভাব, এমন সময় সে বেহুঁশ অবস্থায় ডেকে বলল- হে মুসলমানগণ! আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ! আমার চাচা আবূ কুদামাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। তার সাথে আমার কথা আছে। তার কণ্ঠের আওয়াজ শুনে আমি তার নিকট গিয়ে বললাম, আমি আবূ কুদামা। এরপর ছেলেটি বলল রব্বে কাবার শপথ! আমার স্বপ্ন সত্য হয়েছে। স্বপ্নে যাকে দেখছি আমি, সে এখন আমার সামনে দাঁড়ানো, আমার জন্য সে অপেক্ষমান, প্রাণবায়ু বের হওয়ার সাথে সাথে আমি তার সাথে মিলিত হব। এখন সে আমাকে স্বাগতম জানাচ্ছে আর বলছে, আমি তোমার সাক্ষাতে আগ্রহী, তাড়াতাড়ি এসে যাও।
আবূ কুদামা বলেন, আমি তাকে বললাম, প্রিয় বৎস! কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবে, আমাকে কিন্তু ভুলে যেও না। সে বলল, আপনার মতো অনুগ্রহকারীকে ভুলে যাওয়া যায় না। এরপর আমি তার দিকে ঝুকে কপালে চুমু দিলাম। নিজ চাদর দিয়ে তার চেহারা থেকে রক্ত ও মাটি মুছে দিলাম। কিন্তু সে আমাকে বারণ করে বলল, রক্ত মুছে আপনার ভালো কাপড় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমি আমার রক্তমাখা শরীর নিয়েই আল্লাহর দরবারে হাযির হবো। এরপর সে বলল, ওহে চাচাজান! আমার জীবনের শেষ একটি আবদার আপনি পূর্ণ করবেন। আল্লাহ তা'আলা যদি আপনাকে সহীহ সালামতে ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমার রক্তমাখা এ জামা-কাপড় আমার দুঃখীনী মায়ের নিকট পৌঁছে দিবেন, যাতে তিনি জানতে পারেন যে, আমি তার ওসিয়ত পূর্ণ করেছি, পূর্ণ করেছি তার মনের আশা। যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করিনি। তাকে আমার শেষ ছালাম জানাবেন এবং বলবেন, আল্লাহ তা'আলা কুরবানীদাতার কুরবানী কবুল করেছেন।
এরপর সে বলল, চাচাজান! আপনি হয় তো জানেন না, আমার এক ছোট বোন আছে। তার জন্য এখন আমার খুব মায়া লাগছে, তার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। তার বয়স মাত্র দশ। সে ছোট হলেও আমাকে খুব বেশি আদর করত। আমি যখন বাহিরে যখন যেতাম সে আমার সামান প্রস্তুত করে বিদায় দিতো। কখন ফিরে আসব সে আমার অপেক্ষায় থাকত। যখন ফিরে আসতাম প্রথম সাক্ষাৎ সে আমার সাথে করত। এবার যখন আমি বাড়ি থেকে আসছিলাম, বিদায় দিতে গিয়ে সে বলল, ভাই আমার! দ্রুত ফিরে আসবেন কিন্তু, দেরি করবেন না। এখন তার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। তার সাথে যদি আপনার সাক্ষাৎ হয়, তাহলে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, তোমার ভাই বলেছে, এটাই তার শেষ সালাম। কিয়ামতের দিন আবার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ। এ বলে কালিমায়ে শাহাদত পড়তে পড়তে ছেলেটি শাহাদত বরণ করল। আমরা তাকে তার পরণের কাপড় দিয়েই দাফন করলাম।
যুদ্ধ শেষে আমরা ফিরে এলাম। ফেরার পথে যুবকের বাড়ীতে গেলাম। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেই দেখি তার ছোট বোন তার অপেক্ষায় দাঁড়ানো। জিহাদ থেকে ফিরে আসা লোকদেরকে সে জিজ্ঞাসা করছে, আপনারা আমার ভাইকে দেখেছেন? আমার ভাইকে আপনারা চেনেন? আর লোকেরা বলছে, আমরা তোমার ভাইকে চিনি না, তোমার ভাইকে দেখিনি।
শাইখ আবু কুদামা বলেন, আমি তার নিকটে গেলাম। সে আমাকে দেখামাত্র বলে উঠলো, চাচা! কোথেকে আসছেন? আমি বললাম জিহাদ থেকে। সে বলল, আমার ভাই আসেনি? সকলেই ফিরে আসে আমার ভাই আসে না কেন? এ কথা বলে সে কাঁদতে লাগল। আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। সে শান্ত হলো। এরপর তাকে বললাম, তোমার মাকে গিয়ে বলো, আবূ কুদামা নামক এক ব্যক্তি এসেছে। তার সাথে আমার কথা আছে। আমার কথা শুনে সে বেরিয়ে এলো। আমি তাকে সালাম দিলাম। অস্থির মনে সে উত্তর দিয়ে বলল, হে শায়খ! আপনি সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন, না দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন? আমি বললাম সুসংবাদ বলতে আপনি কী বুঝাতে চান আর দুঃসংবাদ বলতে কী বুঝাতে চান? সে বলল, আমার ছেলে শহীদ না হয়ে ফিরে আসাটা আমার নিকট দুঃসংবাদ আর শহীদ হওয়াটা সুসংবাদ। আমি বললাম, মুবারকবাদ, সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। আপনার ছেলে শহীদ হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কুরবানীদাতার কুরবানী কবুল করেছেন। এরপর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আল্লাহর গুণকীর্তন করে বলল, এটাই আমার আখেরাতের পাথেয়, যা অগ্রে প্রেরণ করলাম।
এরপর তার ছোট্ট মেয়েটিকে তার শহীদ হওয়ার সংবাদ জানালাম। মেয়েটি সংবাদ শুনে বেহুঁশ হয়ে জমিনে পড়ে যায়। আমি উঠাতে গিয়ে দেখি সে রফিকে আলার ডাকে সাড়া দিয়েছে। আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। তাই ছেলেটির ওসিয়ত অনুযায়ী রক্তমাখা জামা-কাপড় তার মহিয়সী মায়ের নিকট দিয়েই ব্যথিত হৃদয়ে সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করলাম। আজও সে মহিলাটির ধৈর্য্যের উপর আমি আশ্চর্যবোধ করি।
টিকাঃ
৬৮১. সূরা আনফাল : আয়াত-১৫ ও ১৬
📄 সপ্তম ঘটনা
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত নবী ﷺ বলেছেন, (নবজাত শিশুদের মধ্যে) দোলনায় তিনজনই মাত্র কথা বলেছে; মারয়ামের পুত্র ঈসা, আর (বনী ইসরাঈলের) জুরাইজের (পবিত্রতার সাক্ষী) শিশু। জুরাইজ ইবাদতগুযার মানুষ ছিল এবং সে একটি উপাসনালয় (আশ্রম) বানিয়েছিল। একদা সে সেখানে নামায পড়ছিল। এমন সময় তার মা তার নিকট এসে তাকে ডাকলে সে (মনে মনে) বলল, 'হে প্রভু! আমার মা ও আমার নামায (দু'টিই গুরুত্বপূর্ণ; কোনটিকে প্রাধান্য দিব?)।' সুতরাং সে নামাযে মশগুল থাকল। আর তার মা ফিরে গেল। পরবর্তী দিনে সে নামাযে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় আবার তার মা এসে ডাক দিলো, 'জুরাইজ!' সে (মনে মনে) বলল, 'হে প্রভু! আমার মা ও আমার নামায (এখন কী করি?)' সুতরাং সে নামাযে মশগুল থাকল। তার পরবর্তী দিনে সে নামাযে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় আবার তার মা এসে ডাক দিল, 'জুরাইজ!' সে (মনে মনে) বলল, 'হে প্রভু! আমার মা ও আমার নামায (এখন কী করি?)' সুতরাং সে নামাযে মশগুল থাকল। তখন (তিন তিন দিন সাড়া না পেয়ে তার মা তাকে বদদোয়া দিয়ে) বলল, 'হে আল্লাহ! বেশ্যাদের মুখ না দেখা পর্যন্ত তুমি ওর মরণ দিও না।'
বনী ইসরাঈল জুরাইজ ও তার ইবাদতের কথা চর্চা করতে লাগল। এক বেশ্যা মহিলা ছিল, যার দৃষ্টান্তমূলক রূপ-সৌন্দর্য ছিল। সে বলল, 'তোমরা চাইলে আমি ওকে ফিতনায় ফেলতে পারি।' সুতরাং সে নিজেকে তার কাছে পেশ করল। কিন্তু জুরাইজ তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করল না। পরিশেষে সে এক রাখালের কাছে এল, যে জুরাইজের আশ্রয়ে আশ্রয় নিত। সে দেহ সমর্পণ করলে রাখাল তার সাথে ব্যভিচার করল এবং বেশ্যা তাতে গর্ভবতী হয়ে গেল। অতঃপর সে যখন সন্তান ভূমিষ্ঠ করল, তখন (লোকদের জিজ্ঞাসার উত্তরে) বলল, 'এটি জুরাইজের সন্তান।'
সুতরাং লোকেরা জুরাইজের কাছে এসে তাকে আশ্রম হতে বেরিয়ে আসতে বলল। (সে বেরিয়ে এলে) তারা তার আশ্রম ভেঙ্গে দিল এবং তাকে মারতে লাগল। জুরাইজ বলল, 'কী ব্যাপার তোমাদের? (এ শান্তি কিসের?)' লোকেরা বলল, 'তুমি এই বেশ্যার সাথে ব্যভিচার করেছ এবং তার ফলে সে সন্তান জন্ম দিয়েছে।' সে বলল, 'সন্তানটি কোথায়?' অতঃপর লোকেরা শিশুটিকে নিয়ে এলে সে বলল, 'আমাকে নামায পড়তে দাও।' সুতরাং সে নামায পড়ে শিশুটির কাছে এসে তার পেটে খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করল, 'ওহে শিশু! তোমার পিতা কে?' সে জবাব দিল, 'অমুক রাখাল।'
অতএব লোকেরা (তাদের ভুল বুঝে এবং এই অলৌকিক ঘটনা দেখে) জুরাইজের কাছে এসে তাকে চুমু দিতে ও স্পর্শ করতে লাগল। তারা বলল, 'আমরা তোমার আশ্রমকে স্বর্ণ দিয়ে বানিয়ে দেব।' সে বলল, 'না, মাটি দিয়েই তৈরি করে দাও, যেমন পূর্বে ছিল।' সুতরাং তারা তাই করল।
তৃতীয় শিশুর ঘটনা হয়েছে (বনী ইসরাঈলের) এক শিশু তার মায়ের দুধ পান করছিল। এমন সময় তার পাশ দিয়ে উৎকৃষ্ট সওয়ারীতে আরোহী এক সুদর্শন পুরুষ গেল। তার মা দোয়া করে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে ওর মত কর।' শিশুটি তখনি মায়ের দুধ ছেড়ে দিয়ে সেই আরোহীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ আমাকে ওর মত কর না।' তারপর মায়ের দুধের দিকে ফিরে দুধ চুষতে লাগল।
আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের তর্জনী আঙ্গুলকে নিজ মুখে চুষে শিশুটির দুধ পান দেখাতে লাগলেন। আমি যেন তা এখনো দেখতে পাচ্ছি। পুনরায় (তাদের) পাশ দিয়ে একটি দাসীকে লোকেরা মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা বলছিল, 'তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস!' আর দাসীটি বলছিল, 'হাসবিয়াল্লাহু অনি'মাল অকীল।' (আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট ও তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।)
তা দেখে মহিলাটি দোয়া করল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত কর না।' ছেলেটি সাথে সাথে মায়ের দুধ ছেড়ে দাসীটির দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মতো কর।' অতঃপর মা-বেটায় কথোপকথন করল। মা বলল, 'একটি সুন্দর আকৃতির লোক পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মত কর। তখন তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত কর না। আবার ওরা ঐ দাসীকে নিয়ে পার হলে আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে ওর মতো কর না। কিন্তু তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মত কর! (এর কারণ কী?)'
শিশুটি বলল, '(তুমি বাহির দেখে বলেছ, আর আমি ভিতর দেখে বলেছি।) ঐ লোকটি স্বৈরাচারী, তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মতো কর না। আর ঐ দাসীটির জন্য ওরা বলছে, তুই ব্যভিচার করেছিস, চুরি করেছিস, অথচ ও এ সব কিছুই করেনি। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ওর মতো কর।'
টিকাঃ
৬৮২. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩৪৩৬।
৬৮৩. জুরাইজের ঘটনা দেখুন [সহীহ বুখারী হাদীস-৩৪৩৬, ২৪৮২, ৩৪৬৬; সহীহ মুসলিম: হাদীস- ২৫৫০]।