📄 তৃতীয় ঘটনা
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. উল্লেখ করেন, বনী ইসরাইলের একজন আবেদ ছিলেন। তিনি গঠনাকৃতিতে ছিলেন সুশ্রী ও আকর্ষণীয়। নিজ হাতে খেজুর পাতার ডালি তৈরি করে তিনি বাজারে বিক্রি করতেন। একদিন তিনি রাজ প্রাসাদের সম্মুখ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তখন রাণীর এক দাসী তাকে দেখতে পেয়ে রাণীকে গিয়ে বলল, এখানে এক অপূর্ব ও অসাধারণ সুন্দর লোককে দেখলাম, তার মতো সুন্দর আর কাউকে কখনো দেখিনি। সে ঘুরে ঘুরে ডালি বিক্রয় করছে। রাণী বলল, লোকটিকে আমার নিকট নিয়ে এসো। বাঁদী গিয়ে তাকে নিয়ে আসল। রাণী তাকে দেখেই বিমুগ্ধ হয়ে গেল। তাকে নির্দেশ দিল, ডালিগুলো ফেলে দাও, আমার এই চাদরটি পরে নাও। বাঁদীকে বলল, তৈল, সুগন্ধি নিয়ে এসো। তাকে দিয়ে আমি আমার যৌবনের ক্ষুধা মিটিয়ে নিবো। আর সেও তার ক্ষুধা মিটিয়ে নিবে। রাণী বলল, তোমার ডালি বিক্রয়ের প্রয়োজন হবে না। আবেদ বারবার রাণীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। রাণী বলল, আমার ক্ষুধা মিটানোর পূর্বে তুমি এখান থেকে বের হতে পারবে না। রাণী প্রাসাদের সমস্ত ফটক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিল। আবেদ এ অবস্থা দেখে বললেন, এ প্রাসাদের উপরে কি হাত মুখ ধোয়ার কোনো জায়গা আছে? রাণী বলল, হ্যাঁ আছে। তারপর রাণী তার দাসীকে ছাদের উপর পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করার হুকুম দিল।
ছাদে উঠে আবেদ এক কোণে গেলেন। দেখলেন, যে প্রাসাদটি অনেক উঁচু। এমন কিছু নেই যার সাহায্যে নিচে নামা যাবে। তাই তিনি নিজেকে তিরস্কার করে বলতে লাগলেন, হে নফস! তুমি সত্তর বছর যাবত তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনায় দিন-রাত ইবাদত করে যাচ্ছ। আর এখন এক বিকালে এসে তোমার সব কিছুকে ধ্বংস করে দিতে হচ্ছে। আল্লাহর কসম, তুমি যদি নিজেকে আজ রক্ষা করতে না পার, তাহলে তুমি গাদ্দার হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি এই বিকালে তুমি তোমার সকল সাধনাকে ধ্বংস করে দাও, তাহলে তুমি কী নিয়ে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে?
এভাবে, মনে মনে তিনি নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলেন। রাসূল বলেন, যখন সে প্রাসাদের উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম হলো, তখন আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আ. কে ডাকলেন। জিবরাঈল আ. বললেন, আমি উপস্থিত হে আল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার বান্দা আমার গজব ও আমার অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে চায়। তাই তুমি তাকে তোমার ডানা দ্বারা নিচে নামিয়ে দাও যেন তার কোনো কষ্ট না হয়। জিবরাঈল আ. তার ডানা প্রসারিত করে তাকে ধরে এমনভাবে নিচে নামিয়ে দিলেন, যেমন দয়ার্দ্র পিতা তার সন্তানকে মাটিতে নামিয়ে দেন।
আবেদ সন্ধ্যায় তার স্ত্রীর কাছে ফিরে এলেন। স্ত্রী বলল, ডালি বেচার টাকা কোথায়? আবেদ বললেন, আজ কোনো টাকা পাইনি। স্ত্রী বলল, আজ রাতে খাবেন কী? আবেদ বললেন, আজ ধৈর্যধারণ করব। তারপর আবেদ বললেন, যাও। চুলায় আগুন জ্বালিয়ে দাও। কারণ, প্রতিপ্রতিবেশীরা চুলা জ্বলতে না দেখলে আমাদের দৈন্যতা আলোচনা করবে, এটি আমার পছন্দ হবে না। স্ত্রী গিয়ে চুলায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে আবেদের পাশে বসে রইলো। ইতোমধ্যে তাদের এক প্রতিবেশী মহিলা এসে বলল, তোমাদের চুলায় আগুন আছে? স্ত্রী বলল, গিয়ে দেখো চুলায় আগুন আছে। প্রতিবেশী মহিলাটি গিয়ে আগুন নিয়ে ফিরে এসে বলল, আরে! তুমি এখানে বসে আছো, আর ওদিকে তোমার চুলায় তন্দুর পুড়ে যাচ্ছে। জলদি যাও! আবেদের স্ত্রী গিয়ে দেখে গোটা চুলা তন্দুরে পরিপূর্ণ। তন্দুরগুলো সে একটি পাত্রে নিয়ে স্বামীর নিকট হাজির হলো। অতঃপর বলল, আপনার সাথে প্রতিপালকের এমন আচরণ, নিশ্চয়ই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হওয়ার আলামত। আপনি দোয়া করুন, যেন তিনি আমাদের বাকি জীবনে সচ্ছলতা দান করেন। আবেদ বললেন, এ অবস্থার উপর ধৈর্যধারণ কর। কিন্তু স্ত্রী তা শুনল না। বারবার পীড়াপীড়ি করার কারণে আবেদ বললেন, আচ্ছা আমি দোয়া করব। আবেদ গভীর রাতে নামায আদায় করে আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার স্ত্রী সচ্ছল যিন্দেগী প্রার্থনা করছে। সুতরাং আপনি তাকে বাকি জীবনে সচ্ছলতা দান করুন।
এ সময় ছাদ বিদীর্ণ হয়ে একটি পেয়ালা নেমে এলো, যা ইয়াকুত পাথর ও মতি ভর্তি ছিল। এর আলোতে সূর্যের ন্যায় ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। আবেদ তখন তার ঘুমন্ত স্ত্রীর পায়ে খোঁচা দিয়ে বললেন, ওঠো, যা চেয়েছো, তা পেয়েছো। স্ত্রী বলল, তাড়াহুড়া করেন না। এজন্যই কি আমাকে জাগালেন? আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একটি ইয়াকুত পাথরে সজ্জিত স্বর্ণের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে আছি। তাতে একটি ভাঙ্গা জায়গা দেখলাম। বললাম, এ চেয়ারটি কার? তারা বলল, এটা তোমার স্বামীর। আমি এটা ভাঙ্গার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তারা বলল, তোমার স্বামী তা দুনিয়াতে চেয়ে নিয়েছেন, এই ভাঙ্গা সে কারণেই। তারপর স্ত্রী বলল, এমন বস্তুর আমার কোনো প্রয়োজন নেই, যার কারণে আপনার চেয়ারটি ভাঙ্গা থাকবে। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। আবেদ তখন আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, পেয়ালাটি উঠে গেল এবং ছাদটি পূর্বের ন্যায় জোড়া লেগে গেল।
📄 চতুর্থ ঘটনা
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনাটি বাদশাহ হারুনুর রশীদের ছেলের। কিতাবে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে। আমরা ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করলাম।
বাদশাহ হারুনুর রশীদের এক ছেলে ছিল। বয়স তার প্রায় ষোল হবে। বিশেষ দু'টি অভ্যাস ছিল তার- ১. দুনিয়া বিমুখ, আল্লাহ ওয়ালা, দরবেশ বুযুর্গদের মজলিসে বেশি বেশি যাতায়াত করা। ২. বেশি বেশি কবর যিয়ারত করা। কবরস্থানে গিয়ে সে কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বলত, হে কবরবাসী! তোমরা আমাদের পূর্বে দুনিয়াতে এসেছিলে, দুনিয়ার সাথে তোমাদের সখ্যতা গড়ে উঠে ছিল, তোমরা মন-প্রাণ দিয়ে দুনিয়াকে ভালোবাসতে। দুনিয়ায় এসে ভেবেছিলে, সে তোমাদেরকে তার বুকে ঠাঁই দেবে না, তোমাদেরকে বিদায় জানাবে না। তোমরাও তার থেকে বিদায় নিবে না। তার বুকেই তোমাদের স্থায়ী বসবাস। কিন্তু তোমাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুনিয়া তোমাদেরকে তার বুকে ঠাঁই দেয়নি, থাকার অনুমতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত দুনিয়া তোমাদেরকে বিদায় জানিয়েছে। তোমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তার বুক থেকে লাথি মেরে তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়েছে। হস্তান্তর করেছে মাটির কাছে। তোমরা এখন কবরস্থ। দুনিয়ার সবার সাথে তোমাদের সম্পর্ক ছিন্ন। দুনিয়া এখন তোমাদের খবর নেয় না। তোমাদের কেউ তার খবর দেয় না।
কবরবাসীকে লক্ষ্য করে সে আরো বলত, হে কবরবাসী! আমি জানি, প্রতিটি মুরদাকে প্রশ্ন করা হয়। তোমাদেরকেও প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তোমাদেরকে কী প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং তার উত্তর কী দিয়েছিলে? কবরের অবস্থা সম্পর্কে পৃথিবীর কেউ জানে না, আল্লাহ ছাড়া। তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হয়, তারা কী অবস্থায় থাকে? এ সব বিষয় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানতে পারি না। যদি জানতে পারতাম তাহলে তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতাম। নিজেকে সংশোধন করতাম। এভাবে সে কবরবাসীকে নানান প্রশ্ন করত। আর নিজের কবরে কী অবস্থা হবে তা নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকত। নিজেকে মহাঅপরাধী গোলাম মনে করে ব্যাকুল হয়ে করে কাঁদতো।
অধিকাংশ সময় সে এ কবিতা পাঠ করতো- توز عنى الجنائز كل يوم ويحزنني بكاء النائحات (জানাযাগুলো প্রতিদিন আমাকে ভয় দেখায়, মৃতদের স্বজনদের আহাজারী আমাকে বিচলিত করে।)
একদিনের ঘটনা। বাদশাহ হারুনুর রশীদ মজলিসে বসে আছেন। চারপাশে বসে আছেন আমীর-উমারা। এমন সময় তার ছেলে মজলিসে উপস্থিত হয়। পরণে ছিল তার অতি সাধারণ পোশাক। রাজপুত্রের জন্য রাজদরবারে তা শোভা পায় না। এ অবস্থা দেখে রাজদরবারের সকলেই বিরক্তিবোধ করল এবং পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, পাগল ছেলের আচরণে বাদশাহর মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বাদশাহর নিকট তারা আবেদন জানাল, আপনার ছেলেকে এ অবস্থা থেকে ফিরে আসতে বলুন।
তাদের পরামর্শ তিনি গ্রহণ করলেন। ছেলেকে ডেকে বললেন, বৎস আমার! মানুষের দৃষ্টিতে তুমি আমাকে অপমানিত করছো। তোমার বেশ-ভূষা আমাকে মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণিত করে তুলছে। এ অবস্থা থেকে তুমি ফিরে আসো। আর নতুন আমেজে নতুন দিনের জন্য নতুন জীবন শুরু কর। তোমার থেকে এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
এতক্ষণ সে পিতার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কথা শেষে পিতার দিকে চোখ তুলে তাকাল। কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর করল না। ঘটনাক্রমে বাদশাহর শাহী প্রাসাদের গুম্বুজে একটি পাখি বসা ছিল। পাখিটাকে লক্ষ্য করে সে বলল, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন সেই সত্তার শপথ করে বলছি, তুমি আমার হাতে এসে যাও। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি তার হাতে এসে বসল। এরপর পাখিকে সে লক্ষ্য করে বলল, এবার তুমি আপন ঠিকানায় চলে যাও। সাবধান! বাদশাহর হাতে বসবে না। পাখিটা সেখান থেকে উঠে চলে গেল।
সভাপরিষদকে এই ক্ষমতা দেখানোর পর পিতাকে লক্ষ করে বলল- হে আব্বাজান! আমার প্রাণপ্রিয় পিতা! আপনাদের ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। আর পৃথিবীর কারোই এ সাধ্য নেই। তবে একটি কথা আপনাকে না বলে পারছি না। দুনিয়ার প্রতি আপনার ভালোবাসা আমাকে খুবই লজ্জিত করে। দুনিয়ার কারণে আপনি এদের সামনে আমাকে আরো লজ্জিত করলেন। আপনার কারণে আমি লজ্জিত হতে চাই না। আর আপনাকেও আমি লজ্জিত করতে চাই না। আমি জঙ্গলে চললাম, আপনি রাজপ্রাসাদে থাকেন। একথা বলে, সে রাজদরবার থেকে প্রস্থান করল। সাথে তার সর্বক্ষণের সাথী একটি কুরআন শরীফ, উযূ করার একটি বদনা, সাথে থাকা পরিধেয় বস্ত্র। এছাড়া কোনো সম্বল তার নেই। রিক্ত হস্তে ছুটে চলল আপন গন্তব্যস্থলের দিকে।
প্রয়োজনে খরচ করার জন্য তার মা একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে দিল। এক সময় সে বসরাতে এসে পৌঁছে। রাজপুত্র রাজদরবার ছেড়ে এখন বসরার শ্রমিকদের সাথে কাজ করে। কিন্তু কাজ করাটা তার নিত্যদিনের রুটিন নয়। বরং সে সপ্তাহে একদিন কাজ করে আর বাকি ছয় দিন ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকে। তার প্রতিদিনের খরচ ছিল এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) পরিমাণ। তাই সে এক দিরহাম ও এক দানেক পারিশ্রমিক নিয়ে সপ্তাহে একদিন কাজ করতো। আর এ টাকা দিয়ে তার এক সপ্তাহের প্রয়োজন পূর্ণ করতো। এভাবেই ফকীর বেশে রাজপুত্রের জীবন কাটছিল।
বসরায় আবূ আমের বসরী নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেন, কোনো এক সময় আমার বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে যায়। আমি শ্রমিকের সন্ধানে বের হলাম। বাজারে গিয়ে দেখি শ্রমিকদের মাঝে খুব সুন্দর একটি ছেলে বসে আছে। ছেলেটি দেখতে খুবই সুন্দর। হাতে তার কুরআন শরীফ। বসে বসে সে কুরআন তিলাওয়াত করছে। তার প্রতি আমার মনে আগ্রহ জন্মালো। আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম, কাজ করবে? সে বলল, হ্যাঁ, করবো। কাজ করার জন্যই তো দুনিয়াতে এসেছি। এখন বলুন, কী কাজ করতে হবে? আমি বললাম, মাটির কাজ। সে বলল, উত্তম কাজ। কোনো অসুবিধা নেই। তবে আমার দু'টি শর্ত। ১. আমার পারিশ্রমিক হবে এক দিরহাম ও এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) এরচে' কম হলেও কাজ করব না, এর বেশিও আমি নিব না। ২. নামাযের সময় আমাকে ছুটি দিতে হবে। আযান হয়ে গেলে আমি আপনার কাজ করতে পারব না। তখন কাজ বন্ধ করে আমি আমার মালিকের ডাকে সাড়া দিব। তার কদমে সেজদা করব। আল্লাহকে ডাকা-ডাকি করব।
আবু আমের বলেন, আমি তার শর্ত মেনে নিলাম। তাকে কাজে লাগিয়ে আমি বাহিরে গেলাম। মাগরিবের সময় এসে দেখি সে এক বিস্ময়কর কাণ্ড। সে একাই দশ জনের কাজ করে ফেলেছে। আমি খুব খুশি হলাম। খুশি হয়ে তার দাবীকৃত মজুরির চেয়ে দুই দিরহাম বেশি দিলাম। কিন্তু সে নিতে অস্বীকৃতি জানালো এবং আমাকে বলল, হে জনাব! অতিরিক্ত এই দুই দিরহাম নিয়ে আমি কী করব! আমার প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক তো আপনার নিকট থেকে চেয়েই নিয়েছি। তাতেই আমার প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। অবশেষে তাকে দাবীকৃত পারিশ্রমিক দিয়েই বিদায় করলাম।
আবু আমের বলেন, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাই পরের দিন পুনরায় বাজারে গেলাম। তাকে তালাশ করলাম। কিন্তু পেলাম না। লোকদেরকে তার বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সেই ছেলেটি আজ কোথায় গেছে? তারা বলল, সে আজ আসেনি। সপ্তাহে এক দিন সে কাজ করে। তাকে শুধু হাটের দিন পাবেন। তাকে না পেয়ে আমি কাজ বন্ধ রাখলাম এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম, হাটের দিন আবার আসব। তাকে দিয়েই কাজ করাবো। কারণ, তার কাজে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
দেখতে দেখতেই হাটের দিনে উপনীত হলাম। আমি তার তালাশে বের হলাম। পূর্বের অবস্থাতেই তাকে পেলাম। বসে বসে সে কুরআন তিলাওয়াত করছে। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে সালামের উত্তর দিলো। এরপর কাজ করানোর কথা ব্যক্ত করলাম। সে পূর্বের ন্যায় আমাকে শর্ত দিলো। আমি তার শর্ত মেনে নিয়ে তাকে কাজে লাগিয়ে দিলাম। কিভাবে সে একাই দশ জনের কাজ করে, বিষয়টি জানার জন্য কৌতূহল সৃষ্টি হলো। তাই আড়ালে বসে তার কাজের গতিবিধি লক্ষ্য করলাম। সেখানে এক বিস্ময়কর কাণ্ড দেখলাম। খামিরা দেয়ালের ওপর রাখতেই ইট-পাথরগুলো আপনা আপনি একটি অপরটির সাথে জোড়া লেগে যায়। তখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল, নিশ্চয় সে আল্লাহর ওলী হবে। আল্লাহ ওয়ালাদেরকেই আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেন। এভাবে সে সারাদিন কাজ করল। কাজ শেষে তাকে আমি তিন দিরহাম দিতে চাইলাম। সে নিতে অস্বীকৃতি জানালো এবং এক দিরহাম ও এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) নিয়েই চলে গেল।
এক সপ্তাহ পর পুনরায় তার সন্ধানে বের হলাম। কিন্তু তাকে পেলাম না। লোকদেরকে তার বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সে ছেলেটি কোথায়? তাদের এক ব্যক্তি বলল, সে আজ তিন দিন ধরে অসুস্থ। বিরান জঙ্গলে পড়ে আছে। তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তার পাশে কেউ নেই। একথা শুনে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করলাম। তাকে দেখার জন্য ছুটে গেলাম। কিন্তু অজানা পথ। কিভাবে যাব? অগত্যা লোকটিকে বখশিস দিয়ে বললাম, ভাই! সেখানে নিয়ে চলো আমাকে। সে আমাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গেল। সেখানে কোনো ঘর বাড়ি নেই। শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। গিয়ে দেখি, অসহায় অবস্থায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে বালকটি। তার মাথার নিচে একটি ইটের টুকরা। এটাই তার বালিশ। এতক্ষণে সে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে সালামের উত্তর দিলো। চক্ষু বন্ধ করে ইটের বালিশ থেকে মাথা উঠালো। পুনরায় সালাম দিলে চক্ষু মেলে তাকাল। দেখামাত্র আমাকে চিনে ফেলল। আমি তার মাথার নিচের ইট সরিয়ে ফেললাম। তাকে কোলে তুলে নিলাম। কিন্তু সে এমনটি করতে বারণ করল। এসময় সে একটি কবিতা আবৃত্তি করল, যার অর্থ নিম্নরূপ- "হে বন্ধু! দুনিয়ার ভোগবিলাস ও সচ্ছলতা যেন তোমাকে ধোঁকা না দেয়। এই জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে জীবনের সকল আরাম আয়েশ। তাই দুনিয়ার পিছে না ছুটে আখেরাতের পিছে ছুটে চল। মনে রেখ! আখেরাতই তোমার চিরস্থায়ী জীবন, যা কখনো শেষ হবে না। তুমি লক্ষ্য করবে জানাযাগুলোর প্রতি, কিভাবে তা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তোমাকেও একদিন এভাবে কবরস্থানে নেওয়া হবে।" অতঃপর সে আমাকে বলল, আবু আমের! তোমার প্রতি আমার কয়েকটি ওসিয়ত।
প্রথম ওসিয়ত: যখন আমার প্রাণপাখি দেহপিঞ্জর ছেড়ে উড়ে যাবে, তুমি আমাকে গোসল দেবে এবং আমার পরণের কাপড়েই দাফন দিবে। তার কথা শেষে আমি বললাম, হে বন্ধু! তোমার জন্য আমি নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করব? তখন সে হযরত আবু কবর রাযি.-এর মতো উত্তর দিলো। হযরত আবূ বকর রাযি. মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, আমাকে তোমরা আমার চাদরেই দাফন করবে। নতুন কাপড়ে দাফন করার জন্য তার নিকট অনুমতি চাওয়া হলে, তিনি বললেন, জীবিত ব্যক্তিরাই নতুন কাপড়ের বেশি উপযুক্ত মৃত ব্যক্তিদের চেয়ে। আর কাফনের কাপড় নতুন হোক বা পুরাতন হোক এক সময় তা পচেই যাবে। মৃত ব্যক্তির সাথে থাকে শুধু আমল। বালকটিও একথা বলল, জীবিতরাই নতুন কাপড়ের বেশি উপযুক্ত মৃত ব্যক্তিদের চেয়ে। আমার গোটা জীবনই তো এভাবে কাটিয়ে দিলাম। এখন আর নতুন কাপড় দিয়ে কী করব! নতুন হলেও তা মাটি হয়ে যাবে। পুরনো হলেও মাটি হয়ে যাবে। এর কোনো কিছুই আমার সাথে থাকবে না। সাথে থাকবে শুধু আমার আমল। আমল ভালো হলে প্রতিদানও ভালো হবে। পরিণামে জান্নাত পাব। আর আমল মন্দ হলে প্রতিদানও মন্দ হবে। পরিণামে আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে। তবে আমি আল্লাহর নিকট জান্নাতের আশাবাদী।
দ্বিতীয় ওসিয়ত আমার মাথার লুঙ্গি ও বদনাটা কবর খননকারীকে দিয়ে দিবে। আমার নিকট একখানা কুরআন শরীফ ও একটি আংটি আছে। এদু'টি জিনিস তুমি নিজ হাতে বাদশাহ হারুনুর রশীদের নিকট পৌঁছে দিবে। তাকে দেয়ার সময় একথা বলে দেবে যে, এক পরদেশী ছেলের আমানত এগুলো। আমার নিকট তা রাখা ছিল। সেই সাথে বাদশাহকে বলবে, ছেলেটি আপনাকে হুঁশিয়ার হতে বলেছে। ধোঁকা ও গাফলতের মধ্যে মৃত্যু যেন আপনার দুয়ারে হানা না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক হতে বলেছে। একথা বলতে বলতেই সে রফীকে আলার নিকট চলে গেল। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আবূ আমের বলেন, ইতঃপূর্বে ছেলেটিকে আমি রাজমিস্ত্রী হিসাবেই জানতাম। এখন বুঝতে পারলাম, খলিফার কলিজার টুকরা ছেলে সে।
ওসিয়ত অনুযায়ী তাকে দাফন করলাম। তার লুঙ্গি ও উযূর বদনা কবর খননকারীকে দিয়ে দিলাম। আংটি ও কুরআন নিয়ে আমি বাগদাদে আসলাম। বাদশাহর দরবারের দিকে রওনা হলাম। পথিমধ্যে একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে দেখি সৈন্যবাহিনীর বিশাল বহর। তাতে এক হাজার সৈন্য হবে প্রায়। তাদের পিছনে আরো নয়-দশটি সৈন্যদল আসছে। প্রত্যেক দলে অন্তত এক হাজার সৈন্য হবে। দশম বাহিনীতে আমিরুল মুমিনীন হারুনু রশীদও ছিলেন। আমি চিৎকার করে বললাম- হে আমিরুল মুমিনীন! মান্যবর খলীফা! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শপথ! আপনি একটু দাঁড়ান। তারা আমার কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল। আমি দ্রুত সামনে অগ্রসর হলাম। বাদশাহর নিকট গিয়ে সালাম করলাম। ছেলেটির ওসিয়ত অনুযায়ী কুরআন শরীফ ও আংটিটা তার নিকট হস্তান্তর করলাম। তার ছেলে আমাকে যা কিছু বলতে বলেছিল, আমি সব কিছু তাকে বললাম।
আমার কথা শুনে তিনি ব্যথিত হলেন। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। নয়ন ভরে কাঁদলেন। অবশেষে খাদেমকে ডেকে বললেন, তাকে তোমার সাথে রেখো। আমি সফর থেকে ফিরে আসলে তাকে আমার নিকট নিয়ে আসবে। সফর শেষে বাদশাহ আমাকে তার খাস কামরায় ডাকলেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মুসাফির! আমার নিকট এসে বসো। আমি তার নিকটবর্তী হলাম। এরপর তিনি আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন- হে মুসাফির! তুমি আমার ছেলেকে চিনতে? -বাদশাহ। মৃত্যুর আগে চিনতাম না, তবে মৃত্যুর পর জেনেছি, সে আপনার সন্তান। -আবু আমের। তুমি কি জানো সে কী কাজ করতো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, সে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতো। -আবূ আমের। তুমিও কি তাকে দিয়ে কাজ নিয়েছো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, আমিও কাজ নিয়েছি। আবূ আমের। তার থেকে কাজ নিতে তোমার কি লজ্জা হলো না? রাসূল ﷺ-এর আত্মীয়তার প্রতিও তুমি সম্মান প্রদর্শন করলে না? তুমি কি জানতে না তার রক্তের সাথে নবীজীর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে? সে হযরত আব্বাস রাযি.-এর বংশধর। -বাদশাহ। প্রথমে আল্লাহর আলীশান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এরপর আপনার নিকট মাফ চাই, আমাকে মাফ করবেন। আমি জানতাম না, সে আপনার সন্তান। তার মৃত্যুর পর জেনেছি খলিফাতুল মুসলিমীনের প্রাণপ্রিয় পুত্র সে। -আবূ আমের। তুমি কি তাকে নিজ হাতে গোসল দিয়েছো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, আমি তাকে নিজ হাতে গোসল দিয়েছি। -আবূ আমের। তোমার হাত দু'টো সামনে বাড়িয়ে দাও। -বাদশাহ। হাত বাড়িয়ে দিলাম। -আবু আমের। হাত দু'টি নিয়ে তিনি তার সিনার উপর রাখলেন এবং অঝোর ধারায় কাঁদলেন। অতঃপর বললেন, কিভাবে তুমি এই নিঃসম্বল, অসহায়কে কাফন পরিয়েছ। কিভাবে তাকে দাফন দিয়েছ? মাটিচাপা দিয়েছ তার উপর কিভাবে তুমি? একথা বলে তিনি স্বীয় পুত্র সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, যার অর্থ নিম্নরূপ- "ওহে পরদেশী! তোমার জন্য আমার দিল পাগলপারা, আমার নয়নাশ্রু তোমার জন্য। হে মুসাফির! যার কবর অনেক দূর। কিন্তু তার চিন্তা-চেতনা আমার অতি নিকটে। নিশ্চয় মৃত্যু ভালো থেকে ভালো জীবনকে বিপন্ন করে দেয়। সে মুসাফির একটি চাঁদের টুকরা ছিল।" এভাবে বাদশাহ হারুন তার ছেলের শোকগাঁথা গাচ্ছিলেন।
এরপর তিনি পুত্রের কবর যিয়ারত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। আবূ আমের বলেন, আমি তাকে বসরাতে নিয়ে গেলাম। তিনি বসরায় পৌঁছে কবরের সামনে দাঁড়ালেন। দাঁড়াতেই তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। অনেকক্ষণ পর তার হুঁশ ফিরে আসে। এসময় তিনি কয়েকটি দুঃখের কবিতা আবৃত্তি করেন, আমি চেয়ে দেখলাম তখনও তিনি কাঁদছিলেন সেই সাথে কাঁদছিল উপস্থিত জনতাও। তার আবৃত কবিতার অর্থ নিম্নরূপ- "ওহে মুসাফির! যে নিজ কবর থেকে আর কখনো ফিরে আসবে না। চলে গেছে সে না ফেরার দেশে। অল্প বয়সে মৃত্যু তাকে তাড়াতাড়ি তুলে নিলো। ওহে মুসাফির! ছোট বড় রাতে তুমি মৃত্যুর ওই পেয়ালা পান করলে, যা বার্ধক্যে পান করবে তোমার বুড়ো পিতা। দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ তা পান করবে। চাই সে জঙ্গলের বাসিন্দা হোক বা শহরের বাসিন্দা। সুতরাং প্রশংসা ঐ একক সত্ত্বার যার কোনো শরীক নেই, যার লেখা তাকদীরের এই কারিশমা।"
আবু আমের বলেন, এরপর বাদশাহ তার নিজ ঠিকানায় চলে যান। আমিও বাড়ী ফিরে আসি। রাতে আমি আমার ওযীফা আদায় করে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে একটি আলোর মিনার দেখলাম। তার উপর নূরের আবরণ রয়েছে। হঠাৎ নূরের আবরণ সরে গেল। তার অভ্যন্তর হতে সেই ছেলেটি বেরিয়ে এলো। আমাকে লক্ষ করে সে বলল, হে আবূ আমের তোমাকে আল্লাহ তা'আলা উত্তম প্রতিদান দান করুন। তুমি আমার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করেছো। আমার ওসিয়ত যথাযথ পূর্ণ করেছো। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে প্রিয় বন্ধু! তোমার কী অবস্থা? তোমার ঠিকানা কোথায় হয়েছে? সে বলল, আমি আমার অতিশয় দয়ালু ও মেহেরবান প্রভুর নিকট আছি। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন। তিনি আমাকে এমন নিয়ামত দান করেছেন, কোনো চক্ষু তা দেখেনি, কোনো কর্ণ তার বিবরণ শ্রবণ করেনি, কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি, আর কল্পনা করার কপালও হবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন তাওরাতে লেখা আছে, যে ব্যক্তি নিজের বাহুকে রাতের ঘুম হতে দূরে রাখে অর্থাৎ, তাহাজ্জুদ নামায পড়ে তার জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রাখা হয়েছে, যা না কোনো চোখ দেখেছে, না কোনো কর্ণ শ্রবণ করেছে, না কোনো মানুষের অন্তর কল্পনা করছে, না নিকটস্থ কোনো ফেরেশতা সেগুলো সম্পর্কে জেনেছে, না কোনো নবী রাসূল এ সম্পর্কে জেনেছে। এ বিষয়ে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- فَلا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (অর্থ: কোনো মানুষেরই জানা নেই তাদের চক্ষুশীতলের জন্য যে সব আসবাব গোপন ভাণ্ডারে জমা করে রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের কারণে।)
এরপর ছেলেটি বলল, আল্লাহ তা'আলার কসম করে বলছি, যে কেউ এভাবে দুনিয়া থেকে আসবে, যেভাবে আমি এসেছি, আমার জন্য যে পুরস্কার ও মর্যাদা, ঠিক তার জন্যও সে মর্যাদা-সম্মান রয়েছে। অতঃপর যখন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তার সুসংবাদের কথা শুনে আমার অন্তর প্রশান্ত হলো।
অপর বর্ণনায় আছে, জনৈক ব্যক্তি বাদশাহ হারুনুর রশীদকে তার ছেলে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল, আপনার ছেলে কেমন ছিল? তিনি বললেন, আমার বাদশাহীর পূর্বে তার জন্ম হয়েছে। দীনী পরিবেশে বড় হয়েছে। তার কাজ ছিল দুনিয়া বিমুখ দরবেশ-বুযুর্গদের দরবারে বেশি বেশি যাওয়া আসা করা, কবর যিয়ারত করা ও কুরআন তিলাওয়াত করা। সে আমার এই রাজত্ব হতে সামান্য উপকারও ভোগ করেনি। বরং আমি যখন বাদশাহ হলাম, তখন সে আমাকে ছেড়ে আমার রাজত্ব থেকে চলে যায়। সে চলে যাওয়ার সময় আমি তার মাকে একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটাও কোনো কাজে সে ব্যবহার করেনি। বরং মৃত্যুর সময় সেটা আমার নিকট ফেরত পাঠিয়েছে। ছেলে আমার, পিতা-মাতার বড় আনুগত্যশীল ছিল।
টিকাঃ
৬৭৯. সূরা সিজদা: আয়াত-১৭
📄 পঞ্চম ঘটনা
হযরত আলী রাযি. বর্ণনা করেন, হুযুর ﷺ যখন মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন, তখন সাঈদ বিন আব্দুর রহমান এবং সা'লাবা আনসারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। তাবুকের যুদ্ধের সময় তাদের মধ্য হতে হযরত সাঈদ বিন আবদুর রহমান যুদ্ধে গেলেন এবং পরিবারের পানি ও জ্বালানী সংগ্রহের জন্য সা'লাবা রাযি. থেকে গেলেন। তিনি কাঠ সংগ্রহ করতেন; পিঠে বহন করে পানি আনতেন। সবই করতেন আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়ার আশায়। একদিন সা'লাবা ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান তাকে ফুসলিয়ে পর্দার ভিতর কী আছে, তা দেখতে উদ্বুদ্ধ করল। শয়তানের ফাঁদে পড়ে তিনি ভিতরে তাকালেন। তার ভাইয়ের স্ত্রীর দিকে তার চোখ পড়ল। তিনি ছিলেন খুবই সুন্দরী। তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ভিতরে ঢুকে পাপে জড়িয়ে পড়লেন। হযরত সাঈদ বিন আব্দুর রহমান রাযি.-এর স্ত্রী বললেন, হে সা'লাবা! আল্লাহ রাস্তায় যুদ্ধে যাওয়া তোমার ভাইয়ের ইজ্জত তুমি রক্ষা করলে না! তখন সা'লাবা অনুতপ্ত হলো। নিজের ধ্বংসের কথা বলতে বলতে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যেতে লাগলেন। আর উঁচু আওয়াজে বলছিলেন, হে খোদা! তুমি তুমি; আর আমি আমি। ক্ষমা করতে তুমি অভ্যস্ত; আর আমি বার বার পাপ করি। নবীজী ﷺ যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে প্রত্যেকের ভাই তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে গেলেন; কিন্তু সাঈদ বিন আব্দুর রহমানের ভাই সা'লাবা গেলেন না। হযরত সাঈদ ঘরে এসে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যার সাথে আমার ভ্রাতৃত্ব হয়েছিল, তার কী হয়েছে? স্ত্রী বললেন, সে নিজেকে পাপসমুদ্রে ডুবিয়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেছে। হযরত সাঈদ তার ভাইয়ের খোঁজে বের হলেন। অবশেষে তাকে খুঁজে পেলেন। দেখলেন, উপুড় হয়ে মাথায় হাত দিয়ে পড়ে আছেন, আর কেঁদে কেঁদে বলছেন, হায় আমার লাঞ্ছনা! যে তার প্রভুর নাফরমানি করেছে। হযরত সাঈদ রাযি. তাকে বললেন, ওঠো ভাই! তোমার এই অবস্থা দেখছি কেন? তোমার কী হয়েছে? সা'লাবা রাযি. বললেন, আমি তোমার সাথে উঠব না, যে পর্যন্ত না তুমি আমার ঘাড়ের সাথে আমার হাত বেঁধে নাও এবং আমাকে মনিবের দরবারে উপস্থিত করা এক লাঞ্ছিত গোলামের মত টেনে নাও। তিনি তা-ই করলেন।
তার এক মেয়ে ছিল; নাম খামছানা। সে তার পিতাকে টেনে উমর রাযি.-এর নিকট উপস্থিত করল। তিনি হযরত উমর রাযি.কে বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যাওয়া আমার এক ভায়ের স্ত্রীর সাথে আমি পাপ করে ফেলেছি। আমার তাওবার কি কোনো সুযোগ আছে? হযরত উমর রাযি. বললেন, বের হও এখান থেকে! মন চাইছে উঠে গিয়ে তোমার চুল টানি! আমার কাছে থেকে চলে যাও! তোমার কোনো তাওবা নেই।
সেখান থেকে বেরিয়ে হযরত আবু বকর রাযি.-এর নিকট গিয়ে একই কথা বললেন। জবাবে তিনি বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার আগুনে আমাকে পুড়িয়ো না। তোমার তাওবা কখনও কবুল হবে না।
সেখান থেকে বেরিয়ে হযরত আলী রাযি.-এর নিকট গেলেন এবং নিজের পাপের কথা বললেন। জানতে চাইলেন, এর থেকে মুক্তির কোনো পথ আছে কিনা। জবাবে তিনিও বললেন, আমার কাছ থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার কোনো তাওবা নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি বললেন, হে আমার ভাই! হে আমার মেয়ে! এরা তো আমাকে নিরাশ করেছে। আশা করি, আল্লাহর রাসূল আমাকে নিরাশ করবেন না। তার মেয়ে তাকে নিয়ে রাসূল-এর দরবারে উপস্থিত হলো। রাসূল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো আমাকে জাহান্নামের বেড়ি আর জিঞ্জিরের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যাওয়া আমার ভায়ের স্ত্রীর সাথে আমি পাপ করে ফেলেছি। আমার তাওবার কি কোনো সুযোগ আছে? এতে রাসূল বললেন, আমার নিকট থেকে চলে যাও! আমার ধারণায় তোমার কোনো তাওবা নেই। এ কথা শুনে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
তখন তার মেয়ে বলল, বাবা! মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা যতক্ষণ না তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমিও আমার পিতা নও, আর আমি তোমার মেয়ে নই।
সা'লাবা রাযি. পাহাড়ের দিকে দৌড় দিলেন এবং উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহ! আমি উমরের নিকট গিয়েছিলাম। সে আমাকে মারতে চেয়েছে। আবূ বকরের নিকট গিয়েছি, সে আমাকে ধমকিয়েছে। আলীর নিকট গিয়েছি। সে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নবীজী-এর নিকট গিয়েছি। তিনি আমাকে নিরাশ করেছেন। এখন তুমি আমার দুআর ব্যাপারে কী বল? হ্যাঁ, নাকি না। যদি বল, না, তাহলে হায় আমার ধ্বংস! হায় আমার লজ্জা! হায় আমার দুর্ভাগ্য! আর যদি বল, হ্যাঁ, তাহলে কতই না সৌভাগ্যবান আমি!
বর্ণনাকারী বলেন, আসমান থেকে এক ফেরেশতা নবীজীর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, সৃষ্টি কে করেছে? আমি, না তুমি? নবীজী বললেন, বরং তুমিই সৃষ্টি করেছ। তখন ফেরেশতা বলল, প্রতাপশালী প্রভু বলেছেন, আমার বান্দাকে সুসংবাদ দাও! আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন নবীজী বললেন, সা'লাবাকে কে নিয়ে আসবে? তখন হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাকে নিয়ে আসব। হযরত আলী ও সালমান রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাকে নিয়ে আসব। নবীজী হযরত আলী রাযি. এবং হযরত সালমান রাযি.কে অনুমতি দিলেন। তারা দুজন তার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। মদিনার এক রাখালকে দেখতে পেয়ে হযরত আলী রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি নবীজীর কোনো সঙ্গীকে দেখেছ? রাখাল বলল, তোমরা সম্ভবত জাহান্নাম থেকে পলায়নপর লোকটাকে খুঁজছ? তারা বললেন, হ্যাঁ। রাখাল তার জায়গা দেখিয়ে বলল, রাত হলে সে এই উপত্যকায় আসে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, হায় লাঞ্ছনা! যে তার প্রভুর নাফরমানি করেছে।
তারা দুজন সেখানে অপেক্ষা করতে থাকলেন। রাত হলে সা'লাবা এলেন। একটি গাছের নিচে এসে সেজদায় পতিত হলেন এবং কাঁদতে লাগলেন, তার কান্নার আওয়াজ শুনে সালমান রাযি. তার নিকট গেলেন। তাকে বললেন, হে সা'লাবা! ওঠো! প্রভু তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সা'লাবা বললেন, তোমরা দুজন আমার হাবিবকে কীভাবে রেখে এসেছ? হযরত সালমান রাযি. বললেন, যেভাবে আল্লাহ ভালোবাসেন এবং তুমি ভালোবাসো। হযরত বেলাল রাযি. যখন ইশার নামাযের ইকামত বললেন, তখন তারা তাকে নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হলেন। তাকে নিয়ে নামাযের শেষ কাতারে দাঁড় করালেন। নবীজী নামাযে পড়লেন- اَلْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ। এতে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। যখন নবীজী পরের আয়াত পড়লেন- حَتّٰى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ তখন তিনি আরেকটি চিৎকার দিয়ে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। নামায শেষে নবীজী সা'লাবা রাযি. নিকট এসে বললেন, হে সালমান! তার ওপর পানি ছিটিয়ে দাও। হযরত সালমান রাযি. ডেকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।
তার মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমার বাবার কী হয়েছে? তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আমি আগ্রহী। নবীজী বললেন, তুমি মসজিদে যাও। মসজিদে প্রবেশ করতে দেখতে পেল, তার পিতা মৃত; কাপড়ে ঢাকা। সে তার পিতার মাথায় হাত রেখে বলতে লাগল, হায় আক্ষেপ! হে পিতা! তোমার পর আমার আর কে আছে? তখন নবীজী বললেন, হে খামছানা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমি তোমার পিতা হই? আর ফাতেমা তোমার বোন? সে বলল, কেন নয়? অবশ্যই আমি এতে সন্তুষ্ট।
হযরত সা'লাবা রাযি.-এর লাশ উঠানো হলে নবীজী তার জানাযার পিছনে পিছনে এলেন। কবরের নিকট পৌঁছে তিনি পায়ের অগ্রভাগের ওপর ভর করে চলতে লাগলেন। সেখান থেকে ফিরে গেলে হযরত উমর রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আমি আঙ্গুলের ওপর ভর করে চলতে দেখেছি। তিনি বললেন, উমর! ফেরেশতাদের কারণে আমি মাটিতে পা রাখার জায়গা পাচ্ছিলাম না।
[ফকীহ রহ. বলেন,] এই রেওয়ায়াতটি শব্দের পরিবর্তনসহ বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়, এই ঘটনা সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনের এই আয়াত নাযিল হয়েছে- وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ * أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ (অর্থ: আর যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িয়ে পড়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? আর তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা করতে থাকে না। তাদের প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহর, যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমৎকার প্রতিদান!)
টিকাঃ
৬৮০ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৯/৩৩০; হাদীসটি জয়ীফ [তানযীহুশ শারীয়াহ ২/২৮৫; আল-ইসাবাহ লি-ইবনে হাজার: হাদীস-৯৪৪]।
📄 ষষ্ঠ ঘটনা
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনাটি একজন মুজাহিদের। কিতাবে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে। আমরা ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করলাম।
মদীনায় আবূ কুদামা শামী নামক এক ব্যক্তি ছিল। জিহাদের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা। জিহাদ যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য- উদ্দেশ্য। তাই আল্লাহর রাহে জিহাদ করার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় যুদ্ধের ময়দানে অতিবাহিত করেন।
একদা মসজিদে নববীতে বসা ছিলেন তিনি। লোকদের সাথে বিভিন্ন কথা-বার্তা বলছিলেন। জিহাদ বিষয়েও কথা বললেন। উপস্থিত জনতার কেউ বলল, হুজুর! আপনি দীর্ঘ দিন হলো জিহাদ করেছেন। আর জিহাদের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গ করেছেন। জিহাদের ময়দানের বিভিন্ন অবস্থা আপনি অবলোকন করেছেন। জিহাদের ময়দানে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনাও স্বচক্ষে দেখেছেন। আজ আমাদেরকে আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা শুনান।
শায়খ আবু কুদামা বললেন, তাহলে এবার শোন! কোনো একদিন ফোরাত নদীর তীরে বসা ছিলাম। হঠাৎ অচেনা এক মহিলা এসে বলল, হে শায়খ আবূ কুদামা! আমি আপনার সম্পর্কে জেনেছি, শুনেছি। আপনি জিহাদের উপর বয়ান করেন। লোকদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করেন। মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে আল্লাহর শত্রুদের সাথে জিহাদ করেন। আল্লাহ তা'আলা আমাকে লম্বা লম্বা চুল দান করেছেন। সে চুল আমার রূপ সৌন্দর্য বর্ধন করা ছাড়া কোনো কাজেই আসে না। আমি এক স্বামী হারা ঘরণী, সন্তান হারা জননী। আমার স্বামী জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়ে যান। আমার সন্তান-সন্তুতিও শহীদ যায়। জিহাদকে আমি খুব বেশি ভালোবাসি। যদি আমার উপর জিহাদ ফরজ হতো তাহলে আমি নিজেই জিহাদী কাফেলায় শরীক হতাম। কিন্তু দুঃখ, আমার সে খোশ নসীব হলো না।
আমি আমার মাথার চুল দিয়ে একটি রশি তৈরি করেছি। পর্দা লংঘন না হয় এ জন্য আবার মাটির প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আপনি কি জানেন কেন এমনটি করেছি? না, জানেন না। জানার কথাও না। আমি এই রশি যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দিব। কোনো না কোনো মুজাহিদ আমার এ রশি জিহাদের ময়দানে ব্যবহার করবে। জিহাদের ময়দানের ধূলি-বালিতে আমার চুলের এ রশি ধূলিমলিন হবে। আল্লাহর কাছে বলতে পারব, আল্লাহ! নিজে জিহাদের ময়দানে যেতে পারিনি, নিজেকে তোমার রাস্তায় কুরবানী করতে পারিনি, তবে আমার শরীরের একটি অংশ তোমার রাস্তায় পাঠিয়ে দিয়ে মুজাহিদদের কাতারে নিজের নাম লিখাতে চেষ্টা করেছি। হতে পারে, এটা আমার নাজাতের ওসিলা হবে। আপনার নিকট মিনতিকারী বান্দীর সবিনয় নিবেদন, আপনি এই রশি যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যান। যখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হবে, তলোয়ারের ঝনঝনানিতে মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ হতে থাকবে তখন আপনার ঘোড়ার লাগাম হিসাবে আমার এ রশি ব্যবহার করবেন। যদি আপনার প্রয়োজন না হয়, তাহলে মোহতাজ ব্যক্তিকে দিয়ে দিবেন। আমি চাই যে, যুদ্ধের ময়দানের ধূলিকণাতে আমার চুল ধূলিমলিন হোক।
এরপর মহিলা বলল, শায়খ! আমার জীবনের কাহিনী শুনুন! আমার স্বামী একজন জানবাজ মুজাহিদ ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় তিনি শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তা'আলা তার শাহাদত কবুল করুন। যখন তিনি শহীদ হয়ে যান, তখন সুন্দর ফুটফুটে এক ছেলে রেখে যান। সে এখন দক্ষ মুজাহিদ, হাফেজে কুরআন, রাত ভর তাহাজ্জুদ গুজার। সারাদিন ইবাদত বন্দেগীকারী। এখন সে টগবগে যুবক। বয়স তার পনেরো। কাজের সন্ধানে সে বাহিরে গেছে। আপনি এখানে থাকাকালীন যদি সে এসে যায়, তাহলে আপনার সাথে তাকে জিহাদে পাঠিয়ে দিব, ইনশাআল্লাহ। আমি চাই সে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী হোক, জিহাদের ময়দানে শহীদ হোক। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে বঞ্চিত করবেন না।
আমি মহিলার আবদার রক্ষা করলাম। তার হাত থেকে রশি নিয়ে নিলাম। এতে সে বেশ খুশি হলো। সে আমাকে রশিটা হেফাজতে রাখতে বলল। আমি হেফাজতে রাখলাম। এরপর তার সাথে সালাম বিনিময় শেষে। অতঃপর পথ চলতে শুরু করলাম। সাথিদের নিয়ে মহিলার নিকট থেকে প্রস্থান করলাম। যুদ্ধের জন্য রওনা হলাম। মাঝপথে পৌঁছতেই দেখি পিছন দিক থেকে আওয়াজ আসছে। তাকিয়ে দেখি, এক অশ্বারোহী চিৎকার করে ডেকে বলছে, হে জিহাদী কাফেলা! আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে বলছি, একটু দাঁড়ান। আমরা দাঁড়ালাম। মুখ ঢেকে সে আমাদের নিকট আসল। কাফেলার সাথিদের জিজ্ঞাসা করল, শায়খ আবূ কুদামা কে? লোকেরা আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ইতিই শাইখ আবূ কুদামা! এরপর সে প্রথমে আমার নিকট এসে সালাম করল, এরপর মুআনাকা করে বলল, আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে আপনার সফর সঙ্গী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনার সাহচর্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করেননি। এরপর সে আমাদের সাথে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তখনো তার চেহারা কাপড়ে ঢাকা ছিল। আমি বললাম, হে মুসাফির! তোমার চেহারা প্রকাশ কর, আমি দেখব তুমি কে? কী তোমার পরিচয়?
এরপর সে চেহারা থেকে কাপড় সরালো। কাপড় সরাতেই পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারা বেরিয়ে এলো। সে এক তরুণ যুবক। সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করেছে। আমি তাকে বললাম, হে বৎস! তোমার পিতা-মাতা বেঁচে আছে? সে বলল, না- পিতা বেঁচে নেই। তবে মা বেঁচে আছে। পিতা আমার আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলা যেন আমাকেও শাহাদাত নসীব করেন, দ্রুত তার সাথে মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
এরপর সে তার আসল পরিচয় তুলে ধরে বলল, আমি তো সেই মহিয়সী মহিলার সন্তান, যিনি আপনার নিকট তার অগ্রপাথেয় পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজের চুল দিয়ে রশি বানিয়ে আপনার হাতে তুলে দিয়েছেন। আপনি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন! আপনি দেখবেন, আমি শহীদ ইবনে শহীদ হব। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে জিহাদে যেতে বারণ করবেন না। ছোট মনে করে আমাকে ছেড়ে যাবেন না।
এরপর ছেলেটি তার দক্ষতার বর্ণনা দিয়ে বললেন, আমি তিরান্দাজীতে খুবই পারদর্শী, অশ্বারোহীতে দক্ষ অশ্বারোহী, জিহাদের ময়দানে আমি বিপ্লবী, আমার এলাকায় আমি অদ্বিতীয় জিহাদী। এ তো আমার দক্ষতার কথা আমি বললাম। আমার মা আমাকে কী বলেছেন, তা তো আপনাকে এখনো বলিনি। আমার মা আল্লাহর শপথ করে বলেছেন, আমি যেন জীবিত অবস্থায় তার সাথে দেখা না করি। আমার মা বলেছেন, ছেলে আমার! জিহাদের ময়দানে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহ তা'আলার জীবন আল্লাহ তা'আলাকেই দিয়ে দিবে। এর বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে জান্নাত ক্রয় করে নিবে এবং অতিশীঘ্রই তোমার পিতার সাথে মিলিত হবে। শাহাদতের জন্য সর্বদা তুমি মহান রবের দরবারে দোয়া করবে। তুমি যখন শহীদ হবে আমাকে সুপারিশ করবে। আর তোমাকে সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হবে। আল্লাহর রাসূল হাদীস শরীফে বলেছেন, শহীদ তার পরিবারের সত্তরজনকে সুপারিশ করবে। তাই আমি তোমার সুপারিশের আশায় থাকব। এ কথা বলে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! আমার এই ছেলে, আমার কলিজার টুকরা, আমি তাকে তোমার খেদমতে পেশ করলাম, এবার তুমি তা কবুল কর।
শায়েখ আবু কুদামা বলেন, আমি ছেলেটির কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। দীনের প্রতি তার ও তার মায়ের দরদ দেখে নিজের অজান্তেই নয়ন ভরে কাঁদলাম। তখন আমার গাল বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। আমার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে সে বলল, চাচা! আপনি কাঁদছেন কেন? আমার অল্পবয়সের কারণে যদি কাঁদেন, তাহলে শুনে রাখুন! আমার চেয়ে ছোটকেও আল্লাহ তা'আলা নাফরমানির কারণে শাস্তি দিবেন, আল্লাহর শাস্তি সহ্য করার দুঃসাধ্য আমার নেই, পৃথিবীর কারোই নেই। আমি চাইনা, আল্লাহর শাস্তির পাত্র হতে, চাই রহমতের পাত্র হতে।
শায়েখ আবূ কুদামা বলেন, আমি তো এমনিতেই অবাক। তার কথা শুনে এবার হলাম হতবাক। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, না, তোমার কারণে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি তোমার দুঃখিনী মায়ের জন্য। তুমি শহীদ হয়ে গেলে তোমার মায়ের অবস্থা কি? সে কথা মনে করে আমি কাঁদছিলাম। এভাবে তাকে সান্ত্বনা দিলাম।
শায়েখ আবু কুদামা বলেন, এরপর আমরা সামনে অগ্রসর হলাম। সারা রাত পথ চললাম। চলার পথে লক্ষ্য করে দেখলাম, ছেলেটি যিকিরে মশগুল। আরো লক্ষ্য করলাম, সে অশ্বারোহীতে খুবই পারদর্শী। আমরা দুশমনের যতই নিকটবর্তী হতে ছিলাম, ছেলেটির মনোবল ততই মযবুত দেখলাম। এভাবে রাতের পথ চলা শেষ হলো। পরের দিন সারা দিন সফর হলো। সূর্যাস্তের সময় আমরা শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করলাম। আমরা সকলেই তখন রোযাদার ছিলাম। এমনিতেই সফরের কষ্ট, সেই সাথে রোযা রাখার ক্লান্তি। ক্লান্ত শরীরে গা এলিয়ে দিতেই ছেলেটির চোখে ঘুম এসে যায়। তাকিয়ে দেখি, সে ঘুমের ঘরে হাসছে। সাথিদেরকে বললাম, দেখো! ছেলেটি কিভাবে হাসছে। তারাও দেখল এবং হাসল। আমিও হাসলাম। ঘুম থেকে জাগ্রত হলে জিজ্ঞাসা করলাম, হে বৎস! ঘুমের ঘরে হাসলে কেন? ছেলেটি বলল, আমি বিস্ময়কর এক স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নের দৃশ্য দেখে আমার বড্ড হাসি পেয়েছিল। তাই না হেসে উপায় ছিল না আমার। আমি বললাম তাহলে আমাদেরকে তা শুনাও।
সে বলল, স্বপ্নে দেখি, মনোমুগ্ধকর আকর্ষণীয় সবুজ শ্যামল মনোরম বাগানে আমি খেলা করছি। হঠাৎ দৃষ্টিনন্দন আলিশান এক প্রাসাদ দৃষ্টিগোচর হলো, যা স্বর্ণ-রৌপ্য, মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত। প্রাসাদটি খুবই নয়নাভিরাম। তার দরজার উপর আভিজাত্যের পর্দা ঝুলানো। আমি সেগুলো অবাক পলকে তাকিয়ে দেখছিলাম। এমন সময় কতিপয় মেয়ে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো এবং দরজা থেকে আভিজাত্যের পর্দা সরিয়ে দিলো। তাদের চেহারা এত সুন্দর যে, তার বর্ণনা দেয়ার সাধ্য আমার নেই। এমন সুন্দর চেহারার মানুষ না কোনো চোখ দেখেছে, না কোনো কান তাদের বর্ণনা শুনেছে, না কোনো অন্তর তার কল্পনা করেছে। আর কল্পনা করার সুযোগও হবে না এত সুন্দর তাদের চেহারা। আমাকে দেখামাত্র তারা স্বাগত জানাল। আমি তাদের একজনের দিকে হাত বাড়ালাম। সে বলল না, এখনো সময় হয়নি। অপেক্ষা কর, সময় হলে কাছে আসব। আমি শুনতে পেলাম তারা পরস্পর বলাবলি করছে, এ যুবক মারযিয়ার স্বামী হবে। অতঃপর তারা আমাকে বলল, আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর রহম করুক। একটু সামনে এসো। আমি সামনে গেলাম। তারা আমাকে প্রাসাদটির উপরে দৃষ্টিনন্দন একটি কামরায় নিয়ে গেল। সেটি খাঁটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। তাতে মনোরম পালঙ্কের উপর সবুজ বিছানা বিছানো। তার উপর বসে আছে সুন্দরী এক মেয়ে, যার চেহারা জগৎ উজালাকারী সূর্যের ন্যায় ঝলমলে। আল্লাহ তা'আলা যদি আমার দৃষ্টি হেফাজত না করতেন, তাহলে তার চেহারার উজ্জ্বলতার কারণে আমার দৃষ্টিশক্তি বিলীন হয়ে যেত, আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যেত। আমি পাগল হয়ে যেতাম। পূর্বের মেয়েদের ন্যায় সেও আমাকে দেখে স্বাগতম জানাল এবং বলতে লাগল, হে প্রিয়! এসো, তুমি আমার জন্য আর আমি তোমার জন্য। আমি তার নিকটবর্তী হতে চাইলাম। সে আমাকে বলল, না, এখনো সময় হয়নি, সময় হলে কাছে আসবে, আমিও তোমার কাছে যাবো। আগামীকাল দুপুরে তোমার সাথে...। এতক্ষণ তুমি অপেক্ষা করতে থাকো। এরপর মুবারকবাদ জানিয়ে সে আমাকে বিদায় জানালো।
শায়খ আবু কুদামা বলেন, আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, তুমি খুব ভালো স্বপ্ন দেখেছো। রাতভর আমরা তার স্বপ্নের উপর আশ্চর্যবোধ করছিলাম। এভাবেই ভোরের সূর্যোদয় হলো। আমরা ঘোড়ায় আরোহণ করলাম। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এমন সময় কে যেন ডেকে বলছে, হে আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারীগণ! দলে দলে যুদ্ধের ময়দানে চলো। দ্রুত জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও। গায়েবী এ আওয়াজ শেষ হতে না হতেই কাফেরদের দেখা মিললো। (আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করুক)। চতুর্দিকে শত্রু ছেয়ে গেল। আমাদের মধ্য হতে এ তরুণ যুবক সর্ব প্রথম হামলা শুরু করল। শত্রুদলের লোক সমাগম ভেদ করে তাদের মাঝে ঢুকে পড়লো। বড় দূরদর্শীতার সাথে যুদ্ধ করে শত্রু দলের অনেককেই জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলো। আমি ছেলেটির আশ্চর্যজনক আক্রমণ দেখে তার নিকট গেলাম। তার ঘোড়ার লাগাম ধরে বললাম, হে প্রিয় বৎস! তুমি ফিরে যাও। যুদ্ধের ময়দানে তুমি নতুন। যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তোমার বেশি নেই। সে তখন বিস্ময়কর এক উত্তর দিয়ে বলল, চাচা! আপনি কোরআনের এ আয়াত শুনেননি? يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ مَن يُوَلِّهِمْ يَوْমَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ বَاء بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কাফেরদের সাথে মুখোমুখি হবে, তখন পশ্চাদপসরণ করবে না। আর যে লোক সেদিন তাদের থেকে পশ্চাদপসরণ করবে, অবশ্য যে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তনকল্পে কিংবা যে নিজ সৈন্যদের নিকট আশ্রয় নিতে আসে সে ব্যতীত অন্যরা, আল্লাহর গযব সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। আর তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। বস্তুত সেটা হলো নিকৃষ্ট অবস্থান।) এ আয়াত তিলাওয়াত করে সে বলল, আপনি কি চান আমি জাহান্নামে যাই। এভাবে আমাদের মাঝে কথোপকথন হচ্ছিল। এমন সময় শত্রুপক্ষ অতর্কিতভাবে আমাদের উপর আক্রমণ করে বসে। এরপর আমরা একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যাই। এটাই ছিলো তার সাথে আমার জীবিত অবস্থায় শেষ সাক্ষাৎ ও শেষ কথোপকথন।
যুদ্ধ শেষে শহীদানের লাশ ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। রক্তমাখা ধূলি-বালি মিশ্রিত শহীদানের মৃত দেহ পড়ে আছে। প্রবাহিত হচ্ছে তাদের রক্তের স্রোতধারা, এ যেন বর্ষাকালের ঝর্ণাধারা। রক্ত ও ধূলা-বালির কারণে শহীদদের লাশ চেনা দুঃসাধ্য ছিল। হঠাৎ একটি গর্ত থেকে আওয়াজ আসছিল। দিক নির্ণয় করে আমি সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি সেই যুবকটি ধূলিমলিন অবস্থায় পড়ে আছে। প্রাণবায়ু বের হবে হবে ভাব, এমন সময় সে বেহুঁশ অবস্থায় ডেকে বলল- হে মুসলমানগণ! আল্লাহর পথের মুজাহিদগণ! আমার চাচা আবূ কুদামাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। তার সাথে আমার কথা আছে। তার কণ্ঠের আওয়াজ শুনে আমি তার নিকট গিয়ে বললাম, আমি আবূ কুদামা। এরপর ছেলেটি বলল রব্বে কাবার শপথ! আমার স্বপ্ন সত্য হয়েছে। স্বপ্নে যাকে দেখছি আমি, সে এখন আমার সামনে দাঁড়ানো, আমার জন্য সে অপেক্ষমান, প্রাণবায়ু বের হওয়ার সাথে সাথে আমি তার সাথে মিলিত হব। এখন সে আমাকে স্বাগতম জানাচ্ছে আর বলছে, আমি তোমার সাক্ষাতে আগ্রহী, তাড়াতাড়ি এসে যাও।
আবূ কুদামা বলেন, আমি তাকে বললাম, প্রিয় বৎস! কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবে, আমাকে কিন্তু ভুলে যেও না। সে বলল, আপনার মতো অনুগ্রহকারীকে ভুলে যাওয়া যায় না। এরপর আমি তার দিকে ঝুকে কপালে চুমু দিলাম। নিজ চাদর দিয়ে তার চেহারা থেকে রক্ত ও মাটি মুছে দিলাম। কিন্তু সে আমাকে বারণ করে বলল, রক্ত মুছে আপনার ভালো কাপড় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমি আমার রক্তমাখা শরীর নিয়েই আল্লাহর দরবারে হাযির হবো। এরপর সে বলল, ওহে চাচাজান! আমার জীবনের শেষ একটি আবদার আপনি পূর্ণ করবেন। আল্লাহ তা'আলা যদি আপনাকে সহীহ সালামতে ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমার রক্তমাখা এ জামা-কাপড় আমার দুঃখীনী মায়ের নিকট পৌঁছে দিবেন, যাতে তিনি জানতে পারেন যে, আমি তার ওসিয়ত পূর্ণ করেছি, পূর্ণ করেছি তার মনের আশা। যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করিনি। তাকে আমার শেষ ছালাম জানাবেন এবং বলবেন, আল্লাহ তা'আলা কুরবানীদাতার কুরবানী কবুল করেছেন।
এরপর সে বলল, চাচাজান! আপনি হয় তো জানেন না, আমার এক ছোট বোন আছে। তার জন্য এখন আমার খুব মায়া লাগছে, তার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। তার বয়স মাত্র দশ। সে ছোট হলেও আমাকে খুব বেশি আদর করত। আমি যখন বাহিরে যখন যেতাম সে আমার সামান প্রস্তুত করে বিদায় দিতো। কখন ফিরে আসব সে আমার অপেক্ষায় থাকত। যখন ফিরে আসতাম প্রথম সাক্ষাৎ সে আমার সাথে করত। এবার যখন আমি বাড়ি থেকে আসছিলাম, বিদায় দিতে গিয়ে সে বলল, ভাই আমার! দ্রুত ফিরে আসবেন কিন্তু, দেরি করবেন না। এখন তার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। তার সাথে যদি আপনার সাক্ষাৎ হয়, তাহলে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, তোমার ভাই বলেছে, এটাই তার শেষ সালাম। কিয়ামতের দিন আবার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ। এ বলে কালিমায়ে শাহাদত পড়তে পড়তে ছেলেটি শাহাদত বরণ করল। আমরা তাকে তার পরণের কাপড় দিয়েই দাফন করলাম।
যুদ্ধ শেষে আমরা ফিরে এলাম। ফেরার পথে যুবকের বাড়ীতে গেলাম। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেই দেখি তার ছোট বোন তার অপেক্ষায় দাঁড়ানো। জিহাদ থেকে ফিরে আসা লোকদেরকে সে জিজ্ঞাসা করছে, আপনারা আমার ভাইকে দেখেছেন? আমার ভাইকে আপনারা চেনেন? আর লোকেরা বলছে, আমরা তোমার ভাইকে চিনি না, তোমার ভাইকে দেখিনি।
শাইখ আবু কুদামা বলেন, আমি তার নিকটে গেলাম। সে আমাকে দেখামাত্র বলে উঠলো, চাচা! কোথেকে আসছেন? আমি বললাম জিহাদ থেকে। সে বলল, আমার ভাই আসেনি? সকলেই ফিরে আসে আমার ভাই আসে না কেন? এ কথা বলে সে কাঁদতে লাগল। আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। সে শান্ত হলো। এরপর তাকে বললাম, তোমার মাকে গিয়ে বলো, আবূ কুদামা নামক এক ব্যক্তি এসেছে। তার সাথে আমার কথা আছে। আমার কথা শুনে সে বেরিয়ে এলো। আমি তাকে সালাম দিলাম। অস্থির মনে সে উত্তর দিয়ে বলল, হে শায়খ! আপনি সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন, না দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন? আমি বললাম সুসংবাদ বলতে আপনি কী বুঝাতে চান আর দুঃসংবাদ বলতে কী বুঝাতে চান? সে বলল, আমার ছেলে শহীদ না হয়ে ফিরে আসাটা আমার নিকট দুঃসংবাদ আর শহীদ হওয়াটা সুসংবাদ। আমি বললাম, মুবারকবাদ, সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। আপনার ছেলে শহীদ হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কুরবানীদাতার কুরবানী কবুল করেছেন। এরপর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আল্লাহর গুণকীর্তন করে বলল, এটাই আমার আখেরাতের পাথেয়, যা অগ্রে প্রেরণ করলাম।
এরপর তার ছোট্ট মেয়েটিকে তার শহীদ হওয়ার সংবাদ জানালাম। মেয়েটি সংবাদ শুনে বেহুঁশ হয়ে জমিনে পড়ে যায়। আমি উঠাতে গিয়ে দেখি সে রফিকে আলার ডাকে সাড়া দিয়েছে। আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। তাই ছেলেটির ওসিয়ত অনুযায়ী রক্তমাখা জামা-কাপড় তার মহিয়সী মায়ের নিকট দিয়েই ব্যথিত হৃদয়ে সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করলাম। আজও সে মহিলাটির ধৈর্য্যের উপর আমি আশ্চর্যবোধ করি।
টিকাঃ
৬৮১. সূরা আনফাল : আয়াত-১৫ ও ১৬