📄 দ্বিতীয় ঘটনা
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের একটি ঘটনা। তাদের তিন ব্যক্তি একদিন কোথাও যাচ্ছিল। পথেই কেঁপে বৃষ্টি এলে তারা একটি পাহাড়ী গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করল। এরই মাঝে পাহাড় থেকে একটি পাথর খসে পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। এ দেখে তারা বলল, 'এহেন বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে এই যে, তোমরা তোমাদের নেক আমলসমূহকে ওসিলা বানিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কর।' সুতরাং তারা সব সৎ আমলের ওসিলায় (আল্লাহর কাছে) দোয়া করতে লাগল।
তাদের মধ্যে একজন বলল, "হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, আমার অত্যন্ত বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল এবং (এও জানো যে,) আমি সন্ধ্যা বেলায় সবার আগে তাদেরকে দুধ পান করাতাম। তাদের পূর্বে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও কৃতদাস-দাসী কাউকে পান করাতাম না। একদিন আমি ঘাসের খোঁজে দূরে চলে গেলাম এবং বাড়ি ফিরে দেখতে পেলাম যে, পিতা-মাতা ঘুমিয়ে গেছে। আমি সন্ধ্যার দুধ দহন করে তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, তারা ঘুমিয়ে আছে। আমি তাদেরকে জাগানো পছন্দ করলাম না এবং পছন্দ করলাম না যে, তাদের পূর্বে সন্তান-সন্ততি এবং কৃতদাস-দাসীকে দুধ পান করাই। তাই আমি দুধের বাটি নিয়ে তাদের ঘুম থেকে জাগার অপেক্ষায় তাদের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অথচ শিশুরা ক্ষুধার তাড়নায় আমার পায়ের কাছে চেঁচামেচি করছিল। এভাবে ফজর উদয় হয়ে গেল এবং তারা জেগে উঠল। তারপর তারা নৈশদুধ পান করল। হে আল্লাহ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য করে থাকি, তাহলে পাথরের কারণে আমরা যে গুহায় বন্দী হয়ে আছি এ থেকে তুমি আমাদেরকে উদ্ধার কর।" এই দুআর ফলস্বরূপ পাথর একটু সরে গেল। কিন্তু তাতে তারা বের হতে সক্ষম ছিল না।
দ্বিতীয় জন দোয়া করল, "হে আল্লাহ! আমার একটি চাচাতো বোন ছিল। সে আমার নিকট সকল মানুষের চেয়ে প্রিয়তমা ছিল। (একাধিক বর্ণনা অনুযায়ী) আমি তাকে এত বেশি ভালোবাসতাম, পুরুষরা নারীদেরকে যত বেশি ভালোবাসতে পারে। একবার আমি তার সঙ্গে যৌন মিলন করার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু সে অস্বীকার করল। পরিশেষে সে যখন এক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ল, তখন সে আমার কাছে এল। আমি তাকে এই শর্তে ১২০ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিলাম, যেন সে আমার সঙ্গে যৌন-মিলন করে। সুতরাং সে (অভাবের তাড়নায়) রাজি হয়ে গেল। যখন আমি তাকে আয়ত্তে পেলাম। (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী) যখন আমি তার দু'পায়ের মাঝে বসলাম, তখন সে বলল, তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং অবৈধভাবে (বিনা বিবাহে) আমার পবিত্রতা নষ্ট কর না। সুতরাং আমি তার কাছ থেকে দূরে সরে গেলাম; যদিও সে আমার একান্ত প্রিয়তমা ছিল এবং যে স্বর্ণমুদ্রা আমি তাকে দিয়েছিলাম তাও পরিত্যাগ করলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহলে তুমি আমাদের উপর পতিত মুসীবতকে দূরীভূত কর।"
সুতরাং পাথর আরো কিছুটা সরে গেল। কিন্তু তাতেও তারা বের হতে সক্ষম ছিল না।
তৃতীয় জন দোয়া করল, 'হে আল্লাহ! আমি কিছু লোককে মজুর রেখেছিলাম। (কাজ সুসম্পন্ন হলে) আমি তাদের সকলকে মজুরী দিয়ে দিলাম। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন মজুরী না নিয়ে চলে গেল। আমি তার মজুরীর টাকা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলাম। (কিছুদিন পর) তা থেকে প্রচুর অর্থ জমে গেল। কিছুকাল পর একদিন সে এসে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার মজুরী দিয়ে দাও।' 'আমি বললাম, 'এসব উট, গাভী, ছাগল এবং গোলাম (বাঁদী) যা তুমি দেখছ তা সবই তোমার মজুরীর ফল।' সে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার সঙ্গে উপহাস করবে না।' আমি বললাম, 'আমি তোমার সঙ্গে উপহাস করিনি (সত্য ঘটনাই বর্ণনা করছি)।' সুতরাং আমার কথা শুনে সে তার সমস্ত মাল নিয়ে চলে গেল এবং কিছুই ছেড়ে গেল না। হে আল্লাহ! যদি আমি এ কাজ একমাত্র তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য করে থাকি, তাহলে যে বিপদে আমরা পড়েছি তা তুমি দূরীভূত কর।' এর ফলে পাথর সম্পূর্ণ সরে গেল এবং সকলেই (গুহা থেকে) বের হয়ে এলো।
টিকাঃ
৬৭৮. সহীহ বুখারী: হাদীস-২২১৫, ৩৪৬৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৭৪৩।
📄 তৃতীয় ঘটনা
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. উল্লেখ করেন, বনী ইসরাইলের একজন আবেদ ছিলেন। তিনি গঠনাকৃতিতে ছিলেন সুশ্রী ও আকর্ষণীয়। নিজ হাতে খেজুর পাতার ডালি তৈরি করে তিনি বাজারে বিক্রি করতেন। একদিন তিনি রাজ প্রাসাদের সম্মুখ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তখন রাণীর এক দাসী তাকে দেখতে পেয়ে রাণীকে গিয়ে বলল, এখানে এক অপূর্ব ও অসাধারণ সুন্দর লোককে দেখলাম, তার মতো সুন্দর আর কাউকে কখনো দেখিনি। সে ঘুরে ঘুরে ডালি বিক্রয় করছে। রাণী বলল, লোকটিকে আমার নিকট নিয়ে এসো। বাঁদী গিয়ে তাকে নিয়ে আসল। রাণী তাকে দেখেই বিমুগ্ধ হয়ে গেল। তাকে নির্দেশ দিল, ডালিগুলো ফেলে দাও, আমার এই চাদরটি পরে নাও। বাঁদীকে বলল, তৈল, সুগন্ধি নিয়ে এসো। তাকে দিয়ে আমি আমার যৌবনের ক্ষুধা মিটিয়ে নিবো। আর সেও তার ক্ষুধা মিটিয়ে নিবে। রাণী বলল, তোমার ডালি বিক্রয়ের প্রয়োজন হবে না। আবেদ বারবার রাণীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। রাণী বলল, আমার ক্ষুধা মিটানোর পূর্বে তুমি এখান থেকে বের হতে পারবে না। রাণী প্রাসাদের সমস্ত ফটক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিল। আবেদ এ অবস্থা দেখে বললেন, এ প্রাসাদের উপরে কি হাত মুখ ধোয়ার কোনো জায়গা আছে? রাণী বলল, হ্যাঁ আছে। তারপর রাণী তার দাসীকে ছাদের উপর পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করার হুকুম দিল।
ছাদে উঠে আবেদ এক কোণে গেলেন। দেখলেন, যে প্রাসাদটি অনেক উঁচু। এমন কিছু নেই যার সাহায্যে নিচে নামা যাবে। তাই তিনি নিজেকে তিরস্কার করে বলতে লাগলেন, হে নফস! তুমি সত্তর বছর যাবত তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি কামনায় দিন-রাত ইবাদত করে যাচ্ছ। আর এখন এক বিকালে এসে তোমার সব কিছুকে ধ্বংস করে দিতে হচ্ছে। আল্লাহর কসম, তুমি যদি নিজেকে আজ রক্ষা করতে না পার, তাহলে তুমি গাদ্দার হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি এই বিকালে তুমি তোমার সকল সাধনাকে ধ্বংস করে দাও, তাহলে তুমি কী নিয়ে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে?
এভাবে, মনে মনে তিনি নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলেন। রাসূল বলেন, যখন সে প্রাসাদের উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম হলো, তখন আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আ. কে ডাকলেন। জিবরাঈল আ. বললেন, আমি উপস্থিত হে আল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার বান্দা আমার গজব ও আমার অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে চায়। তাই তুমি তাকে তোমার ডানা দ্বারা নিচে নামিয়ে দাও যেন তার কোনো কষ্ট না হয়। জিবরাঈল আ. তার ডানা প্রসারিত করে তাকে ধরে এমনভাবে নিচে নামিয়ে দিলেন, যেমন দয়ার্দ্র পিতা তার সন্তানকে মাটিতে নামিয়ে দেন।
আবেদ সন্ধ্যায় তার স্ত্রীর কাছে ফিরে এলেন। স্ত্রী বলল, ডালি বেচার টাকা কোথায়? আবেদ বললেন, আজ কোনো টাকা পাইনি। স্ত্রী বলল, আজ রাতে খাবেন কী? আবেদ বললেন, আজ ধৈর্যধারণ করব। তারপর আবেদ বললেন, যাও। চুলায় আগুন জ্বালিয়ে দাও। কারণ, প্রতিপ্রতিবেশীরা চুলা জ্বলতে না দেখলে আমাদের দৈন্যতা আলোচনা করবে, এটি আমার পছন্দ হবে না। স্ত্রী গিয়ে চুলায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে আবেদের পাশে বসে রইলো। ইতোমধ্যে তাদের এক প্রতিবেশী মহিলা এসে বলল, তোমাদের চুলায় আগুন আছে? স্ত্রী বলল, গিয়ে দেখো চুলায় আগুন আছে। প্রতিবেশী মহিলাটি গিয়ে আগুন নিয়ে ফিরে এসে বলল, আরে! তুমি এখানে বসে আছো, আর ওদিকে তোমার চুলায় তন্দুর পুড়ে যাচ্ছে। জলদি যাও! আবেদের স্ত্রী গিয়ে দেখে গোটা চুলা তন্দুরে পরিপূর্ণ। তন্দুরগুলো সে একটি পাত্রে নিয়ে স্বামীর নিকট হাজির হলো। অতঃপর বলল, আপনার সাথে প্রতিপালকের এমন আচরণ, নিশ্চয়ই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হওয়ার আলামত। আপনি দোয়া করুন, যেন তিনি আমাদের বাকি জীবনে সচ্ছলতা দান করেন। আবেদ বললেন, এ অবস্থার উপর ধৈর্যধারণ কর। কিন্তু স্ত্রী তা শুনল না। বারবার পীড়াপীড়ি করার কারণে আবেদ বললেন, আচ্ছা আমি দোয়া করব। আবেদ গভীর রাতে নামায আদায় করে আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার স্ত্রী সচ্ছল যিন্দেগী প্রার্থনা করছে। সুতরাং আপনি তাকে বাকি জীবনে সচ্ছলতা দান করুন।
এ সময় ছাদ বিদীর্ণ হয়ে একটি পেয়ালা নেমে এলো, যা ইয়াকুত পাথর ও মতি ভর্তি ছিল। এর আলোতে সূর্যের ন্যায় ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। আবেদ তখন তার ঘুমন্ত স্ত্রীর পায়ে খোঁচা দিয়ে বললেন, ওঠো, যা চেয়েছো, তা পেয়েছো। স্ত্রী বলল, তাড়াহুড়া করেন না। এজন্যই কি আমাকে জাগালেন? আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একটি ইয়াকুত পাথরে সজ্জিত স্বর্ণের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে আছি। তাতে একটি ভাঙ্গা জায়গা দেখলাম। বললাম, এ চেয়ারটি কার? তারা বলল, এটা তোমার স্বামীর। আমি এটা ভাঙ্গার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তারা বলল, তোমার স্বামী তা দুনিয়াতে চেয়ে নিয়েছেন, এই ভাঙ্গা সে কারণেই। তারপর স্ত্রী বলল, এমন বস্তুর আমার কোনো প্রয়োজন নেই, যার কারণে আপনার চেয়ারটি ভাঙ্গা থাকবে। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। আবেদ তখন আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন, পেয়ালাটি উঠে গেল এবং ছাদটি পূর্বের ন্যায় জোড়া লেগে গেল।
📄 চতুর্থ ঘটনা
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনাটি বাদশাহ হারুনুর রশীদের ছেলের। কিতাবে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে। আমরা ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করলাম।
বাদশাহ হারুনুর রশীদের এক ছেলে ছিল। বয়স তার প্রায় ষোল হবে। বিশেষ দু'টি অভ্যাস ছিল তার- ১. দুনিয়া বিমুখ, আল্লাহ ওয়ালা, দরবেশ বুযুর্গদের মজলিসে বেশি বেশি যাতায়াত করা। ২. বেশি বেশি কবর যিয়ারত করা। কবরস্থানে গিয়ে সে কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বলত, হে কবরবাসী! তোমরা আমাদের পূর্বে দুনিয়াতে এসেছিলে, দুনিয়ার সাথে তোমাদের সখ্যতা গড়ে উঠে ছিল, তোমরা মন-প্রাণ দিয়ে দুনিয়াকে ভালোবাসতে। দুনিয়ায় এসে ভেবেছিলে, সে তোমাদেরকে তার বুকে ঠাঁই দেবে না, তোমাদেরকে বিদায় জানাবে না। তোমরাও তার থেকে বিদায় নিবে না। তার বুকেই তোমাদের স্থায়ী বসবাস। কিন্তু তোমাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুনিয়া তোমাদেরকে তার বুকে ঠাঁই দেয়নি, থাকার অনুমতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত দুনিয়া তোমাদেরকে বিদায় জানিয়েছে। তোমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তার বুক থেকে লাথি মেরে তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়েছে। হস্তান্তর করেছে মাটির কাছে। তোমরা এখন কবরস্থ। দুনিয়ার সবার সাথে তোমাদের সম্পর্ক ছিন্ন। দুনিয়া এখন তোমাদের খবর নেয় না। তোমাদের কেউ তার খবর দেয় না।
কবরবাসীকে লক্ষ্য করে সে আরো বলত, হে কবরবাসী! আমি জানি, প্রতিটি মুরদাকে প্রশ্ন করা হয়। তোমাদেরকেও প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তোমাদেরকে কী প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং তার উত্তর কী দিয়েছিলে? কবরের অবস্থা সম্পর্কে পৃথিবীর কেউ জানে না, আল্লাহ ছাড়া। তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হয়, তারা কী অবস্থায় থাকে? এ সব বিষয় আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানতে পারি না। যদি জানতে পারতাম তাহলে তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতাম। নিজেকে সংশোধন করতাম। এভাবে সে কবরবাসীকে নানান প্রশ্ন করত। আর নিজের কবরে কী অবস্থা হবে তা নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকত। নিজেকে মহাঅপরাধী গোলাম মনে করে ব্যাকুল হয়ে করে কাঁদতো।
অধিকাংশ সময় সে এ কবিতা পাঠ করতো- توز عنى الجنائز كل يوم ويحزنني بكاء النائحات (জানাযাগুলো প্রতিদিন আমাকে ভয় দেখায়, মৃতদের স্বজনদের আহাজারী আমাকে বিচলিত করে।)
একদিনের ঘটনা। বাদশাহ হারুনুর রশীদ মজলিসে বসে আছেন। চারপাশে বসে আছেন আমীর-উমারা। এমন সময় তার ছেলে মজলিসে উপস্থিত হয়। পরণে ছিল তার অতি সাধারণ পোশাক। রাজপুত্রের জন্য রাজদরবারে তা শোভা পায় না। এ অবস্থা দেখে রাজদরবারের সকলেই বিরক্তিবোধ করল এবং পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, পাগল ছেলের আচরণে বাদশাহর মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বাদশাহর নিকট তারা আবেদন জানাল, আপনার ছেলেকে এ অবস্থা থেকে ফিরে আসতে বলুন।
তাদের পরামর্শ তিনি গ্রহণ করলেন। ছেলেকে ডেকে বললেন, বৎস আমার! মানুষের দৃষ্টিতে তুমি আমাকে অপমানিত করছো। তোমার বেশ-ভূষা আমাকে মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণিত করে তুলছে। এ অবস্থা থেকে তুমি ফিরে আসো। আর নতুন আমেজে নতুন দিনের জন্য নতুন জীবন শুরু কর। তোমার থেকে এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
এতক্ষণ সে পিতার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কথা শেষে পিতার দিকে চোখ তুলে তাকাল। কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর করল না। ঘটনাক্রমে বাদশাহর শাহী প্রাসাদের গুম্বুজে একটি পাখি বসা ছিল। পাখিটাকে লক্ষ্য করে সে বলল, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন সেই সত্তার শপথ করে বলছি, তুমি আমার হাতে এসে যাও। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি তার হাতে এসে বসল। এরপর পাখিকে সে লক্ষ্য করে বলল, এবার তুমি আপন ঠিকানায় চলে যাও। সাবধান! বাদশাহর হাতে বসবে না। পাখিটা সেখান থেকে উঠে চলে গেল।
সভাপরিষদকে এই ক্ষমতা দেখানোর পর পিতাকে লক্ষ করে বলল- হে আব্বাজান! আমার প্রাণপ্রিয় পিতা! আপনাদের ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। আর পৃথিবীর কারোই এ সাধ্য নেই। তবে একটি কথা আপনাকে না বলে পারছি না। দুনিয়ার প্রতি আপনার ভালোবাসা আমাকে খুবই লজ্জিত করে। দুনিয়ার কারণে আপনি এদের সামনে আমাকে আরো লজ্জিত করলেন। আপনার কারণে আমি লজ্জিত হতে চাই না। আর আপনাকেও আমি লজ্জিত করতে চাই না। আমি জঙ্গলে চললাম, আপনি রাজপ্রাসাদে থাকেন। একথা বলে, সে রাজদরবার থেকে প্রস্থান করল। সাথে তার সর্বক্ষণের সাথী একটি কুরআন শরীফ, উযূ করার একটি বদনা, সাথে থাকা পরিধেয় বস্ত্র। এছাড়া কোনো সম্বল তার নেই। রিক্ত হস্তে ছুটে চলল আপন গন্তব্যস্থলের দিকে।
প্রয়োজনে খরচ করার জন্য তার মা একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে দিল। এক সময় সে বসরাতে এসে পৌঁছে। রাজপুত্র রাজদরবার ছেড়ে এখন বসরার শ্রমিকদের সাথে কাজ করে। কিন্তু কাজ করাটা তার নিত্যদিনের রুটিন নয়। বরং সে সপ্তাহে একদিন কাজ করে আর বাকি ছয় দিন ইবাদত বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকে। তার প্রতিদিনের খরচ ছিল এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) পরিমাণ। তাই সে এক দিরহাম ও এক দানেক পারিশ্রমিক নিয়ে সপ্তাহে একদিন কাজ করতো। আর এ টাকা দিয়ে তার এক সপ্তাহের প্রয়োজন পূর্ণ করতো। এভাবেই ফকীর বেশে রাজপুত্রের জীবন কাটছিল।
বসরায় আবূ আমের বসরী নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেন, কোনো এক সময় আমার বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে যায়। আমি শ্রমিকের সন্ধানে বের হলাম। বাজারে গিয়ে দেখি শ্রমিকদের মাঝে খুব সুন্দর একটি ছেলে বসে আছে। ছেলেটি দেখতে খুবই সুন্দর। হাতে তার কুরআন শরীফ। বসে বসে সে কুরআন তিলাওয়াত করছে। তার প্রতি আমার মনে আগ্রহ জন্মালো। আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম, কাজ করবে? সে বলল, হ্যাঁ, করবো। কাজ করার জন্যই তো দুনিয়াতে এসেছি। এখন বলুন, কী কাজ করতে হবে? আমি বললাম, মাটির কাজ। সে বলল, উত্তম কাজ। কোনো অসুবিধা নেই। তবে আমার দু'টি শর্ত। ১. আমার পারিশ্রমিক হবে এক দিরহাম ও এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) এরচে' কম হলেও কাজ করব না, এর বেশিও আমি নিব না। ২. নামাযের সময় আমাকে ছুটি দিতে হবে। আযান হয়ে গেলে আমি আপনার কাজ করতে পারব না। তখন কাজ বন্ধ করে আমি আমার মালিকের ডাকে সাড়া দিব। তার কদমে সেজদা করব। আল্লাহকে ডাকা-ডাকি করব।
আবু আমের বলেন, আমি তার শর্ত মেনে নিলাম। তাকে কাজে লাগিয়ে আমি বাহিরে গেলাম। মাগরিবের সময় এসে দেখি সে এক বিস্ময়কর কাণ্ড। সে একাই দশ জনের কাজ করে ফেলেছে। আমি খুব খুশি হলাম। খুশি হয়ে তার দাবীকৃত মজুরির চেয়ে দুই দিরহাম বেশি দিলাম। কিন্তু সে নিতে অস্বীকৃতি জানালো এবং আমাকে বলল, হে জনাব! অতিরিক্ত এই দুই দিরহাম নিয়ে আমি কী করব! আমার প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক তো আপনার নিকট থেকে চেয়েই নিয়েছি। তাতেই আমার প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। অবশেষে তাকে দাবীকৃত পারিশ্রমিক দিয়েই বিদায় করলাম।
আবু আমের বলেন, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাই পরের দিন পুনরায় বাজারে গেলাম। তাকে তালাশ করলাম। কিন্তু পেলাম না। লোকদেরকে তার বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সেই ছেলেটি আজ কোথায় গেছে? তারা বলল, সে আজ আসেনি। সপ্তাহে এক দিন সে কাজ করে। তাকে শুধু হাটের দিন পাবেন। তাকে না পেয়ে আমি কাজ বন্ধ রাখলাম এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম, হাটের দিন আবার আসব। তাকে দিয়েই কাজ করাবো। কারণ, তার কাজে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
দেখতে দেখতেই হাটের দিনে উপনীত হলাম। আমি তার তালাশে বের হলাম। পূর্বের অবস্থাতেই তাকে পেলাম। বসে বসে সে কুরআন তিলাওয়াত করছে। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে সালামের উত্তর দিলো। এরপর কাজ করানোর কথা ব্যক্ত করলাম। সে পূর্বের ন্যায় আমাকে শর্ত দিলো। আমি তার শর্ত মেনে নিয়ে তাকে কাজে লাগিয়ে দিলাম। কিভাবে সে একাই দশ জনের কাজ করে, বিষয়টি জানার জন্য কৌতূহল সৃষ্টি হলো। তাই আড়ালে বসে তার কাজের গতিবিধি লক্ষ্য করলাম। সেখানে এক বিস্ময়কর কাণ্ড দেখলাম। খামিরা দেয়ালের ওপর রাখতেই ইট-পাথরগুলো আপনা আপনি একটি অপরটির সাথে জোড়া লেগে যায়। তখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল, নিশ্চয় সে আল্লাহর ওলী হবে। আল্লাহ ওয়ালাদেরকেই আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেন। এভাবে সে সারাদিন কাজ করল। কাজ শেষে তাকে আমি তিন দিরহাম দিতে চাইলাম। সে নিতে অস্বীকৃতি জানালো এবং এক দিরহাম ও এক দানেক (এক দিরহামের এক ষষ্ঠাংশ) নিয়েই চলে গেল।
এক সপ্তাহ পর পুনরায় তার সন্ধানে বের হলাম। কিন্তু তাকে পেলাম না। লোকদেরকে তার বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সে ছেলেটি কোথায়? তাদের এক ব্যক্তি বলল, সে আজ তিন দিন ধরে অসুস্থ। বিরান জঙ্গলে পড়ে আছে। তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তার পাশে কেউ নেই। একথা শুনে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করলাম। তাকে দেখার জন্য ছুটে গেলাম। কিন্তু অজানা পথ। কিভাবে যাব? অগত্যা লোকটিকে বখশিস দিয়ে বললাম, ভাই! সেখানে নিয়ে চলো আমাকে। সে আমাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গেল। সেখানে কোনো ঘর বাড়ি নেই। শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। গিয়ে দেখি, অসহায় অবস্থায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে বালকটি। তার মাথার নিচে একটি ইটের টুকরা। এটাই তার বালিশ। এতক্ষণে সে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে সালামের উত্তর দিলো। চক্ষু বন্ধ করে ইটের বালিশ থেকে মাথা উঠালো। পুনরায় সালাম দিলে চক্ষু মেলে তাকাল। দেখামাত্র আমাকে চিনে ফেলল। আমি তার মাথার নিচের ইট সরিয়ে ফেললাম। তাকে কোলে তুলে নিলাম। কিন্তু সে এমনটি করতে বারণ করল। এসময় সে একটি কবিতা আবৃত্তি করল, যার অর্থ নিম্নরূপ- "হে বন্ধু! দুনিয়ার ভোগবিলাস ও সচ্ছলতা যেন তোমাকে ধোঁকা না দেয়। এই জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে জীবনের সকল আরাম আয়েশ। তাই দুনিয়ার পিছে না ছুটে আখেরাতের পিছে ছুটে চল। মনে রেখ! আখেরাতই তোমার চিরস্থায়ী জীবন, যা কখনো শেষ হবে না। তুমি লক্ষ্য করবে জানাযাগুলোর প্রতি, কিভাবে তা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তোমাকেও একদিন এভাবে কবরস্থানে নেওয়া হবে।" অতঃপর সে আমাকে বলল, আবু আমের! তোমার প্রতি আমার কয়েকটি ওসিয়ত।
প্রথম ওসিয়ত: যখন আমার প্রাণপাখি দেহপিঞ্জর ছেড়ে উড়ে যাবে, তুমি আমাকে গোসল দেবে এবং আমার পরণের কাপড়েই দাফন দিবে। তার কথা শেষে আমি বললাম, হে বন্ধু! তোমার জন্য আমি নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করব? তখন সে হযরত আবু কবর রাযি.-এর মতো উত্তর দিলো। হযরত আবূ বকর রাযি. মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, আমাকে তোমরা আমার চাদরেই দাফন করবে। নতুন কাপড়ে দাফন করার জন্য তার নিকট অনুমতি চাওয়া হলে, তিনি বললেন, জীবিত ব্যক্তিরাই নতুন কাপড়ের বেশি উপযুক্ত মৃত ব্যক্তিদের চেয়ে। আর কাফনের কাপড় নতুন হোক বা পুরাতন হোক এক সময় তা পচেই যাবে। মৃত ব্যক্তির সাথে থাকে শুধু আমল। বালকটিও একথা বলল, জীবিতরাই নতুন কাপড়ের বেশি উপযুক্ত মৃত ব্যক্তিদের চেয়ে। আমার গোটা জীবনই তো এভাবে কাটিয়ে দিলাম। এখন আর নতুন কাপড় দিয়ে কী করব! নতুন হলেও তা মাটি হয়ে যাবে। পুরনো হলেও মাটি হয়ে যাবে। এর কোনো কিছুই আমার সাথে থাকবে না। সাথে থাকবে শুধু আমার আমল। আমল ভালো হলে প্রতিদানও ভালো হবে। পরিণামে জান্নাত পাব। আর আমল মন্দ হলে প্রতিদানও মন্দ হবে। পরিণামে আমাকে জাহান্নামে যেতে হবে। তবে আমি আল্লাহর নিকট জান্নাতের আশাবাদী।
দ্বিতীয় ওসিয়ত আমার মাথার লুঙ্গি ও বদনাটা কবর খননকারীকে দিয়ে দিবে। আমার নিকট একখানা কুরআন শরীফ ও একটি আংটি আছে। এদু'টি জিনিস তুমি নিজ হাতে বাদশাহ হারুনুর রশীদের নিকট পৌঁছে দিবে। তাকে দেয়ার সময় একথা বলে দেবে যে, এক পরদেশী ছেলের আমানত এগুলো। আমার নিকট তা রাখা ছিল। সেই সাথে বাদশাহকে বলবে, ছেলেটি আপনাকে হুঁশিয়ার হতে বলেছে। ধোঁকা ও গাফলতের মধ্যে মৃত্যু যেন আপনার দুয়ারে হানা না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক হতে বলেছে। একথা বলতে বলতেই সে রফীকে আলার নিকট চলে গেল। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আবূ আমের বলেন, ইতঃপূর্বে ছেলেটিকে আমি রাজমিস্ত্রী হিসাবেই জানতাম। এখন বুঝতে পারলাম, খলিফার কলিজার টুকরা ছেলে সে।
ওসিয়ত অনুযায়ী তাকে দাফন করলাম। তার লুঙ্গি ও উযূর বদনা কবর খননকারীকে দিয়ে দিলাম। আংটি ও কুরআন নিয়ে আমি বাগদাদে আসলাম। বাদশাহর দরবারের দিকে রওনা হলাম। পথিমধ্যে একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে দেখি সৈন্যবাহিনীর বিশাল বহর। তাতে এক হাজার সৈন্য হবে প্রায়। তাদের পিছনে আরো নয়-দশটি সৈন্যদল আসছে। প্রত্যেক দলে অন্তত এক হাজার সৈন্য হবে। দশম বাহিনীতে আমিরুল মুমিনীন হারুনু রশীদও ছিলেন। আমি চিৎকার করে বললাম- হে আমিরুল মুমিনীন! মান্যবর খলীফা! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শপথ! আপনি একটু দাঁড়ান। তারা আমার কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল। আমি দ্রুত সামনে অগ্রসর হলাম। বাদশাহর নিকট গিয়ে সালাম করলাম। ছেলেটির ওসিয়ত অনুযায়ী কুরআন শরীফ ও আংটিটা তার নিকট হস্তান্তর করলাম। তার ছেলে আমাকে যা কিছু বলতে বলেছিল, আমি সব কিছু তাকে বললাম।
আমার কথা শুনে তিনি ব্যথিত হলেন। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। নয়ন ভরে কাঁদলেন। অবশেষে খাদেমকে ডেকে বললেন, তাকে তোমার সাথে রেখো। আমি সফর থেকে ফিরে আসলে তাকে আমার নিকট নিয়ে আসবে। সফর শেষে বাদশাহ আমাকে তার খাস কামরায় ডাকলেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মুসাফির! আমার নিকট এসে বসো। আমি তার নিকটবর্তী হলাম। এরপর তিনি আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন- হে মুসাফির! তুমি আমার ছেলেকে চিনতে? -বাদশাহ। মৃত্যুর আগে চিনতাম না, তবে মৃত্যুর পর জেনেছি, সে আপনার সন্তান। -আবু আমের। তুমি কি জানো সে কী কাজ করতো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, সে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতো। -আবূ আমের। তুমিও কি তাকে দিয়ে কাজ নিয়েছো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, আমিও কাজ নিয়েছি। আবূ আমের। তার থেকে কাজ নিতে তোমার কি লজ্জা হলো না? রাসূল ﷺ-এর আত্মীয়তার প্রতিও তুমি সম্মান প্রদর্শন করলে না? তুমি কি জানতে না তার রক্তের সাথে নবীজীর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে? সে হযরত আব্বাস রাযি.-এর বংশধর। -বাদশাহ। প্রথমে আল্লাহর আলীশান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এরপর আপনার নিকট মাফ চাই, আমাকে মাফ করবেন। আমি জানতাম না, সে আপনার সন্তান। তার মৃত্যুর পর জেনেছি খলিফাতুল মুসলিমীনের প্রাণপ্রিয় পুত্র সে। -আবূ আমের। তুমি কি তাকে নিজ হাতে গোসল দিয়েছো? -বাদশাহ। হ্যাঁ, আমি তাকে নিজ হাতে গোসল দিয়েছি। -আবূ আমের। তোমার হাত দু'টো সামনে বাড়িয়ে দাও। -বাদশাহ। হাত বাড়িয়ে দিলাম। -আবু আমের। হাত দু'টি নিয়ে তিনি তার সিনার উপর রাখলেন এবং অঝোর ধারায় কাঁদলেন। অতঃপর বললেন, কিভাবে তুমি এই নিঃসম্বল, অসহায়কে কাফন পরিয়েছ। কিভাবে তাকে দাফন দিয়েছ? মাটিচাপা দিয়েছ তার উপর কিভাবে তুমি? একথা বলে তিনি স্বীয় পুত্র সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, যার অর্থ নিম্নরূপ- "ওহে পরদেশী! তোমার জন্য আমার দিল পাগলপারা, আমার নয়নাশ্রু তোমার জন্য। হে মুসাফির! যার কবর অনেক দূর। কিন্তু তার চিন্তা-চেতনা আমার অতি নিকটে। নিশ্চয় মৃত্যু ভালো থেকে ভালো জীবনকে বিপন্ন করে দেয়। সে মুসাফির একটি চাঁদের টুকরা ছিল।" এভাবে বাদশাহ হারুন তার ছেলের শোকগাঁথা গাচ্ছিলেন।
এরপর তিনি পুত্রের কবর যিয়ারত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। আবূ আমের বলেন, আমি তাকে বসরাতে নিয়ে গেলাম। তিনি বসরায় পৌঁছে কবরের সামনে দাঁড়ালেন। দাঁড়াতেই তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। অনেকক্ষণ পর তার হুঁশ ফিরে আসে। এসময় তিনি কয়েকটি দুঃখের কবিতা আবৃত্তি করেন, আমি চেয়ে দেখলাম তখনও তিনি কাঁদছিলেন সেই সাথে কাঁদছিল উপস্থিত জনতাও। তার আবৃত কবিতার অর্থ নিম্নরূপ- "ওহে মুসাফির! যে নিজ কবর থেকে আর কখনো ফিরে আসবে না। চলে গেছে সে না ফেরার দেশে। অল্প বয়সে মৃত্যু তাকে তাড়াতাড়ি তুলে নিলো। ওহে মুসাফির! ছোট বড় রাতে তুমি মৃত্যুর ওই পেয়ালা পান করলে, যা বার্ধক্যে পান করবে তোমার বুড়ো পিতা। দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ তা পান করবে। চাই সে জঙ্গলের বাসিন্দা হোক বা শহরের বাসিন্দা। সুতরাং প্রশংসা ঐ একক সত্ত্বার যার কোনো শরীক নেই, যার লেখা তাকদীরের এই কারিশমা।"
আবু আমের বলেন, এরপর বাদশাহ তার নিজ ঠিকানায় চলে যান। আমিও বাড়ী ফিরে আসি। রাতে আমি আমার ওযীফা আদায় করে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে একটি আলোর মিনার দেখলাম। তার উপর নূরের আবরণ রয়েছে। হঠাৎ নূরের আবরণ সরে গেল। তার অভ্যন্তর হতে সেই ছেলেটি বেরিয়ে এলো। আমাকে লক্ষ করে সে বলল, হে আবূ আমের তোমাকে আল্লাহ তা'আলা উত্তম প্রতিদান দান করুন। তুমি আমার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করেছো। আমার ওসিয়ত যথাযথ পূর্ণ করেছো। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে প্রিয় বন্ধু! তোমার কী অবস্থা? তোমার ঠিকানা কোথায় হয়েছে? সে বলল, আমি আমার অতিশয় দয়ালু ও মেহেরবান প্রভুর নিকট আছি। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন। তিনি আমাকে এমন নিয়ামত দান করেছেন, কোনো চক্ষু তা দেখেনি, কোনো কর্ণ তার বিবরণ শ্রবণ করেনি, কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি, আর কল্পনা করার কপালও হবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন তাওরাতে লেখা আছে, যে ব্যক্তি নিজের বাহুকে রাতের ঘুম হতে দূরে রাখে অর্থাৎ, তাহাজ্জুদ নামায পড়ে তার জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রাখা হয়েছে, যা না কোনো চোখ দেখেছে, না কোনো কর্ণ শ্রবণ করেছে, না কোনো মানুষের অন্তর কল্পনা করছে, না নিকটস্থ কোনো ফেরেশতা সেগুলো সম্পর্কে জেনেছে, না কোনো নবী রাসূল এ সম্পর্কে জেনেছে। এ বিষয়ে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- فَلا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (অর্থ: কোনো মানুষেরই জানা নেই তাদের চক্ষুশীতলের জন্য যে সব আসবাব গোপন ভাণ্ডারে জমা করে রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের কারণে।)
এরপর ছেলেটি বলল, আল্লাহ তা'আলার কসম করে বলছি, যে কেউ এভাবে দুনিয়া থেকে আসবে, যেভাবে আমি এসেছি, আমার জন্য যে পুরস্কার ও মর্যাদা, ঠিক তার জন্যও সে মর্যাদা-সম্মান রয়েছে। অতঃপর যখন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তার সুসংবাদের কথা শুনে আমার অন্তর প্রশান্ত হলো।
অপর বর্ণনায় আছে, জনৈক ব্যক্তি বাদশাহ হারুনুর রশীদকে তার ছেলে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল, আপনার ছেলে কেমন ছিল? তিনি বললেন, আমার বাদশাহীর পূর্বে তার জন্ম হয়েছে। দীনী পরিবেশে বড় হয়েছে। তার কাজ ছিল দুনিয়া বিমুখ দরবেশ-বুযুর্গদের দরবারে বেশি বেশি যাওয়া আসা করা, কবর যিয়ারত করা ও কুরআন তিলাওয়াত করা। সে আমার এই রাজত্ব হতে সামান্য উপকারও ভোগ করেনি। বরং আমি যখন বাদশাহ হলাম, তখন সে আমাকে ছেড়ে আমার রাজত্ব থেকে চলে যায়। সে চলে যাওয়ার সময় আমি তার মাকে একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটাও কোনো কাজে সে ব্যবহার করেনি। বরং মৃত্যুর সময় সেটা আমার নিকট ফেরত পাঠিয়েছে। ছেলে আমার, পিতা-মাতার বড় আনুগত্যশীল ছিল।
টিকাঃ
৬৭৯. সূরা সিজদা: আয়াত-১৭
📄 পঞ্চম ঘটনা
হযরত আলী রাযি. বর্ণনা করেন, হুযুর ﷺ যখন মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন, তখন সাঈদ বিন আব্দুর রহমান এবং সা'লাবা আনসারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। তাবুকের যুদ্ধের সময় তাদের মধ্য হতে হযরত সাঈদ বিন আবদুর রহমান যুদ্ধে গেলেন এবং পরিবারের পানি ও জ্বালানী সংগ্রহের জন্য সা'লাবা রাযি. থেকে গেলেন। তিনি কাঠ সংগ্রহ করতেন; পিঠে বহন করে পানি আনতেন। সবই করতেন আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়ার আশায়। একদিন সা'লাবা ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান তাকে ফুসলিয়ে পর্দার ভিতর কী আছে, তা দেখতে উদ্বুদ্ধ করল। শয়তানের ফাঁদে পড়ে তিনি ভিতরে তাকালেন। তার ভাইয়ের স্ত্রীর দিকে তার চোখ পড়ল। তিনি ছিলেন খুবই সুন্দরী। তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ভিতরে ঢুকে পাপে জড়িয়ে পড়লেন। হযরত সাঈদ বিন আব্দুর রহমান রাযি.-এর স্ত্রী বললেন, হে সা'লাবা! আল্লাহ রাস্তায় যুদ্ধে যাওয়া তোমার ভাইয়ের ইজ্জত তুমি রক্ষা করলে না! তখন সা'লাবা অনুতপ্ত হলো। নিজের ধ্বংসের কথা বলতে বলতে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যেতে লাগলেন। আর উঁচু আওয়াজে বলছিলেন, হে খোদা! তুমি তুমি; আর আমি আমি। ক্ষমা করতে তুমি অভ্যস্ত; আর আমি বার বার পাপ করি। নবীজী ﷺ যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে প্রত্যেকের ভাই তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে গেলেন; কিন্তু সাঈদ বিন আব্দুর রহমানের ভাই সা'লাবা গেলেন না। হযরত সাঈদ ঘরে এসে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যার সাথে আমার ভ্রাতৃত্ব হয়েছিল, তার কী হয়েছে? স্ত্রী বললেন, সে নিজেকে পাপসমুদ্রে ডুবিয়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেছে। হযরত সাঈদ তার ভাইয়ের খোঁজে বের হলেন। অবশেষে তাকে খুঁজে পেলেন। দেখলেন, উপুড় হয়ে মাথায় হাত দিয়ে পড়ে আছেন, আর কেঁদে কেঁদে বলছেন, হায় আমার লাঞ্ছনা! যে তার প্রভুর নাফরমানি করেছে। হযরত সাঈদ রাযি. তাকে বললেন, ওঠো ভাই! তোমার এই অবস্থা দেখছি কেন? তোমার কী হয়েছে? সা'লাবা রাযি. বললেন, আমি তোমার সাথে উঠব না, যে পর্যন্ত না তুমি আমার ঘাড়ের সাথে আমার হাত বেঁধে নাও এবং আমাকে মনিবের দরবারে উপস্থিত করা এক লাঞ্ছিত গোলামের মত টেনে নাও। তিনি তা-ই করলেন।
তার এক মেয়ে ছিল; নাম খামছানা। সে তার পিতাকে টেনে উমর রাযি.-এর নিকট উপস্থিত করল। তিনি হযরত উমর রাযি.কে বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যাওয়া আমার এক ভায়ের স্ত্রীর সাথে আমি পাপ করে ফেলেছি। আমার তাওবার কি কোনো সুযোগ আছে? হযরত উমর রাযি. বললেন, বের হও এখান থেকে! মন চাইছে উঠে গিয়ে তোমার চুল টানি! আমার কাছে থেকে চলে যাও! তোমার কোনো তাওবা নেই।
সেখান থেকে বেরিয়ে হযরত আবু বকর রাযি.-এর নিকট গিয়ে একই কথা বললেন। জবাবে তিনি বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার আগুনে আমাকে পুড়িয়ো না। তোমার তাওবা কখনও কবুল হবে না।
সেখান থেকে বেরিয়ে হযরত আলী রাযি.-এর নিকট গেলেন এবং নিজের পাপের কথা বললেন। জানতে চাইলেন, এর থেকে মুক্তির কোনো পথ আছে কিনা। জবাবে তিনিও বললেন, আমার কাছ থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার কোনো তাওবা নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি বললেন, হে আমার ভাই! হে আমার মেয়ে! এরা তো আমাকে নিরাশ করেছে। আশা করি, আল্লাহর রাসূল আমাকে নিরাশ করবেন না। তার মেয়ে তাকে নিয়ে রাসূল-এর দরবারে উপস্থিত হলো। রাসূল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো আমাকে জাহান্নামের বেড়ি আর জিঞ্জিরের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যাওয়া আমার ভায়ের স্ত্রীর সাথে আমি পাপ করে ফেলেছি। আমার তাওবার কি কোনো সুযোগ আছে? এতে রাসূল বললেন, আমার নিকট থেকে চলে যাও! আমার ধারণায় তোমার কোনো তাওবা নেই। এ কথা শুনে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
তখন তার মেয়ে বলল, বাবা! মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা যতক্ষণ না তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমিও আমার পিতা নও, আর আমি তোমার মেয়ে নই।
সা'লাবা রাযি. পাহাড়ের দিকে দৌড় দিলেন এবং উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহ! আমি উমরের নিকট গিয়েছিলাম। সে আমাকে মারতে চেয়েছে। আবূ বকরের নিকট গিয়েছি, সে আমাকে ধমকিয়েছে। আলীর নিকট গিয়েছি। সে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নবীজী-এর নিকট গিয়েছি। তিনি আমাকে নিরাশ করেছেন। এখন তুমি আমার দুআর ব্যাপারে কী বল? হ্যাঁ, নাকি না। যদি বল, না, তাহলে হায় আমার ধ্বংস! হায় আমার লজ্জা! হায় আমার দুর্ভাগ্য! আর যদি বল, হ্যাঁ, তাহলে কতই না সৌভাগ্যবান আমি!
বর্ণনাকারী বলেন, আসমান থেকে এক ফেরেশতা নবীজীর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, সৃষ্টি কে করেছে? আমি, না তুমি? নবীজী বললেন, বরং তুমিই সৃষ্টি করেছ। তখন ফেরেশতা বলল, প্রতাপশালী প্রভু বলেছেন, আমার বান্দাকে সুসংবাদ দাও! আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন নবীজী বললেন, সা'লাবাকে কে নিয়ে আসবে? তখন হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাকে নিয়ে আসব। হযরত আলী ও সালমান রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাকে নিয়ে আসব। নবীজী হযরত আলী রাযি. এবং হযরত সালমান রাযি.কে অনুমতি দিলেন। তারা দুজন তার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। মদিনার এক রাখালকে দেখতে পেয়ে হযরত আলী রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি নবীজীর কোনো সঙ্গীকে দেখেছ? রাখাল বলল, তোমরা সম্ভবত জাহান্নাম থেকে পলায়নপর লোকটাকে খুঁজছ? তারা বললেন, হ্যাঁ। রাখাল তার জায়গা দেখিয়ে বলল, রাত হলে সে এই উপত্যকায় আসে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, হায় লাঞ্ছনা! যে তার প্রভুর নাফরমানি করেছে।
তারা দুজন সেখানে অপেক্ষা করতে থাকলেন। রাত হলে সা'লাবা এলেন। একটি গাছের নিচে এসে সেজদায় পতিত হলেন এবং কাঁদতে লাগলেন, তার কান্নার আওয়াজ শুনে সালমান রাযি. তার নিকট গেলেন। তাকে বললেন, হে সা'লাবা! ওঠো! প্রভু তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সা'লাবা বললেন, তোমরা দুজন আমার হাবিবকে কীভাবে রেখে এসেছ? হযরত সালমান রাযি. বললেন, যেভাবে আল্লাহ ভালোবাসেন এবং তুমি ভালোবাসো। হযরত বেলাল রাযি. যখন ইশার নামাযের ইকামত বললেন, তখন তারা তাকে নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হলেন। তাকে নিয়ে নামাযের শেষ কাতারে দাঁড় করালেন। নবীজী নামাযে পড়লেন- اَلْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ। এতে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। যখন নবীজী পরের আয়াত পড়লেন- حَتّٰى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ তখন তিনি আরেকটি চিৎকার দিয়ে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। নামায শেষে নবীজী সা'লাবা রাযি. নিকট এসে বললেন, হে সালমান! তার ওপর পানি ছিটিয়ে দাও। হযরত সালমান রাযি. ডেকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।
তার মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমার বাবার কী হয়েছে? তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আমি আগ্রহী। নবীজী বললেন, তুমি মসজিদে যাও। মসজিদে প্রবেশ করতে দেখতে পেল, তার পিতা মৃত; কাপড়ে ঢাকা। সে তার পিতার মাথায় হাত রেখে বলতে লাগল, হায় আক্ষেপ! হে পিতা! তোমার পর আমার আর কে আছে? তখন নবীজী বললেন, হে খামছানা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমি তোমার পিতা হই? আর ফাতেমা তোমার বোন? সে বলল, কেন নয়? অবশ্যই আমি এতে সন্তুষ্ট।
হযরত সা'লাবা রাযি.-এর লাশ উঠানো হলে নবীজী তার জানাযার পিছনে পিছনে এলেন। কবরের নিকট পৌঁছে তিনি পায়ের অগ্রভাগের ওপর ভর করে চলতে লাগলেন। সেখান থেকে ফিরে গেলে হযরত উমর রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আমি আঙ্গুলের ওপর ভর করে চলতে দেখেছি। তিনি বললেন, উমর! ফেরেশতাদের কারণে আমি মাটিতে পা রাখার জায়গা পাচ্ছিলাম না।
[ফকীহ রহ. বলেন,] এই রেওয়ায়াতটি শব্দের পরিবর্তনসহ বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়, এই ঘটনা সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনের এই আয়াত নাযিল হয়েছে- وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ * أُولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ (অর্থ: আর যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িয়ে পড়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? আর তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তা করতে থাকে না। তাদের প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহর, যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমৎকার প্রতিদান!)
টিকাঃ
৬৮০ হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৯/৩৩০; হাদীসটি জয়ীফ [তানযীহুশ শারীয়াহ ২/২৮৫; আল-ইসাবাহ লি-ইবনে হাজার: হাদীস-৯৪৪]।