📄 নামাযে শয়তানের প্ররোচনা
বলা হয়, নামাযের সময় হলে ইবলীস তার বাহিনী ও সাঙ্গ-পাঙ্গ চারদিকে পাঠিয়ে দেয়, যাতে তারা মানুষদেরকে নামায থেকে বিরত রাখে। তারা মানুষদেরকে নামায থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। এটা সম্ভব না হলে, চেষ্টা করে যেন রুকু, সেজদা, তাসবীহ ও দুআসমূহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে না পারে। এটাও সম্ভব না হলে, দুনিয়াবী ঝামেলায় ফেলে, তাদেরকে অন্যমনস্ক করতে চেষ্টা করে। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে ইবলীস তার ব্যর্থ বাহিনীকে শক্ত করে বেঁধে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। আর যারা সফল হয়, তাদেরকে সম্মানিত করে ও মর্যাদায় ভূষিত করে।
ইবলিসের প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন- قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْথَرَهُمْ شَاكِرِينَ অর্থ: ইবলীস বলল, আপনি আমাকে যেমন উদভ্রান্ত করেছেন আমিও অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। এরপর তাদের কাছে আসব, তাদের সামনের দিক থেকে, পশ্চাদদিক থেকে, ডানদিক থেকে এবং বামদিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।
অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْءَاتِهِمَا إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيْطَانَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ অর্থ: হে আদম সন্তান। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই বিভ্রান্ত না করে। যেমনিভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল এমন অবস্থায় যে, সে তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলে ফেলেছে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর লক্ষ্যে। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে আর তোমরা তাদের দেখ না। আমি শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَغْفِرَةً مِنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ. অর্থ: শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন- إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا অর্থ: নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ কর।
টিকাঃ
৬৬৬. সূরা আরাফ: আয়াত-২৭
৬৬৭. সূরা বাকারা: আয়াত-২৬৭
৬৬৮. সূরা ফাতির: আয়াত-৬
📄 শয়তান ব্যতীত অন্যান্য শত্রু
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : الْمُؤْمِنُ بَيْنَ خَمْسٍ شَدَائِدَ، مُؤْمِنٍ يَحْسُدُهُ، وَمُنَافِقٍ يُبْغِضُهُ، وَعَدُوٌّ يُقَاتِلُهُ، وَشَيْطَانٍ يُضِلُّهُ، وَنَفْسٍ تُغْوِيهِ. يَعْنِي أَنَّ النَّفْسَ مَائِلَةٌ إِلَى مَا هُوَ سَبَبُ ضَلَالَتِهِ وَإِغْوَائِهِ.
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী বলেন, মুমিন পাঁচ ধরনের শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত। যথা- ১. মুমিন, যে তাকে হিংসা করে। ২. মুনাফিক, যে তার ধ্বংস কামনা করে। ৩. শত্রু, যে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ৪. শয়তান, যে তাকে গোমরা করে। ৫. কুপ্রবৃত্তি, যা তাকে পথহারা করে।
তাই মুমিনের উচিত সকল শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা। যেন তিনি সকল শত্রুর উপর তাকে ক্ষমতা দান করেন।
টিকাঃ
৬৬৯ মুসনাদুল ফিরদাউদ হাদীস-৬৫৬০; কানযুল উম্মাল: হাদীস-৮০৯।
📄 মূসা আ.-এর মজলিসে ইবলীস
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ زِيَادِ بْنِ أَنْعَمَ، قَالَ : بَيْنَمَا مُوسَى جَالِسٌ فِي بَعْضِ مَجَالِسِهِ إِذْ جَاءَهُ إِبْلِيسُ وَعَلَيْهِ بُرْنُس مُتَلَوِّنُ يَعْنِي فَلَنْسُوَةً ذَاتَ أَلْوَانِ، فَلَمَّا دَنَا مِنْهُ خَلَعَ الْبُرْنُسَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ أَقْبَلَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ ، فَقَالَ : مَنْ أَنْتَ؟ قَالَ : أَنَا إِبْلِيسُ قَالَ: فَمَا جَاءَ بِكَ? قَالَ: جِئْتُ لِأُسَلَّمَ عَلَيْكَ لِمَكَانِكَ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ، قَالَ : فَمَا الْبُرْنُسَ الَّذِي كَانَ عَلَيْكَ? قَالَ : بِهِ أَخْتَطِفُ قُلُوبَ بَنِي آدَمَ قَالَ : أَخْبِرْنِي مَا الذَّنْبُ الَّذِي إِذَا أَذْنَبَ ابْنُ آدَمَ اسْتَحْوَذْتَ عَلَيْهِ، يَعْنِي غَلَبْتَ عَلَيْهِ? قَالَ: إِذَا أَعْجَبَتْهُ نَفْسُهُ وَاسْتَكْثَرَ عَمَلَهُ وَنَسِيَ ذَنْبَهُ اسْتَحْوَذْتُ عَلَيْهِ.
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ ইবনে আনআম রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা মূসা আ. মজলিসে বসা ছিলেন। ইবলীস তখন একটি রঙিন টুপি পরে তার নিকট উপস্থিত হলো। কাছে এসে টুপিটি খুলে ফেলল এবং সালাম দিল। মূসা আ. বললেন, তুমি কে? সে বলল, আমি ইবলীস। মূসা আ. বললেন, কেন এসেছ? ইবলীস বলল, আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার বিশেষ মর্যাদার কারণে আপনাকে সালাম দিতে এসেছি। মূসা আ. বললেন, তোমার মাথার যে টুপিটি ছিল সেটা দিয়ে কী কর? ইবলীস বলল, আমি এর দ্বারা বনী আদমের হৃদয় ছিনিয়ে নিই। মূসা আ. বললেন, আদম সন্তান কোন পাপ করলে তুমি তাকে পরাভূত করতে পার? শয়তান বলল, যখন আদম সন্তান আত্মমুগ্ধতায় লিপ্ত হয়, নিজের কৃত আমলকে বেশি মনে করে এবং নিজের পাপের কথা ভুলে যায়, তখন আমি তাকে পরাভূত করতে পারি।
📄 উম্মতে মুহাম্মদীতে ইবলিসের বন্ধু ও দুশমন
عَنْ وَهْبِ بْنِ مُنَبِّةٍ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى ، قَالَ : أَمَرَ اللهُ تَعَالَى إِبْلِيسَ أَنْ يَأْتِيَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَيُجِيبُهُ عَنْ كُلِّ مَا يَسْأَلُهُ فَجَاءَهُ عَلَى صُورَةِ شَيْءٍ وَبِيَدِهِ عُكَازُ فَقَالَ لَهُ مَنْ أَنْتَ ؟ قَالَ : أَنَا إِبْلِيسُ ، فَقَالَ : لِمَا جِئْتَ؟ قَالَ : إِنَّ اللهَ أَمَرَنِي أَنْ آتِيَكَ، وَأُجِيبَكَ عَنْ كُلَّ مَا تَسْأَلُنِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا مَلْعُونُ كَمْ أَعْدَاؤُكَ مِنْ أُمَّتِي؟ قَالَ : خَمْسَةُ عَشَرَ أَوَّلُهُمْ: أَنْتَ، وَالثَّانِي : إِمَامٌ عَادِلُ، وَالثَّالِثُ: غَنِيٌّ مُتَوَاضِعُ، وَالرَّابِعُ: تَاجِرُ صَادِقُ وَالْخَامِسُ : عَالِمٌ تَخَشَّعَ، وَالسَّادِسُ : مُؤْمِنٌ نَاصِحٌ، وَالسَّابِعُ : مُؤْمِنٌ رَحِيمُ الْقَلْبِ وَالثَّامِنُ : تَائِبُ ثَابِتٌ عَلَى التَّوْبَةِ، وَالتَّاسِعُ : مُتَوَرِّعُ عَنِ الْحَرَامِ، وَالْعَاشِرُ : مُؤْمِنٌ حَسِنُ الْخُلُقِ، وَالْحَادِي عَشَرَ : مُؤْمِنٌ كَثِيرُ الصَّدَقَةِ، وَالثَّانِي عَشَرَ : مُؤْمِنٌ يُدِيمُ عَلَى الطَّهَارَةِ مَعَ النَّاسِ، وَالثَّالِثُ عَشَرَ : مُؤْمِنٌ يَنْفَعُ النَّاسَ، وَالرَّابِعُ عَشَرَ: حَامِلُ الْقُرْآنِ يُدِيمُ عَلَى تِلَاوَتِهِ، وَالْخَامِسُ عَشَرَ : قَائِمُ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ ، ثُمَّ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ : وَمَنْ رُفَقَاؤُكَ مِنْ أُمَّتِي ؟ قَالَ : عَشَرَةٌ : أَوَّلُهَا : سُلْطَانٌ جَائِرٌ، وَالثَّانِي : غَنِيٌّ مُتَكَبِّرُ، وَالثَّالِثُ : تَاجِرُ خَائِنُ، وَالرَّابِعُ : شَارِبُ الْخَمْرِ، وَالْخَامِسُ : الْقَتَّاتُ، وَالسَّادِسُ : صَاحِبُ الزِّنَاء وَالسَّابِعُ : آكِلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالثَّالِثُ : الْمُتَهَاوِنُ بِالصَّلَاةِ، وَالتَّاسِعُ: مَانِعُ الزَّكَاةِ، وَالْعَاشِرُ : الَّذِي يُطِيلُ الْأَمَلَ فَهَؤُلَاءِ أَصْحَابِي وَإِخْوَانِي
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত। একদা আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে নির্দেশ দিলেন, মুহাম্মদ ﷺ-এর নিকট গিয়ে তাঁর সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। ইবলীস একজন বৃদ্ধের আকৃতি ধারণ করে হাতে একটি লাঠি নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট উপস্থিত হলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, তুমি কে? ইবলীস বলল, আমি ইবলীস! রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, কেন এসেছ? ইবলীস বলল, আল্লাহ তা'আলা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন এবং আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
নবী করীম ﷺ ইবলীসকে লক্ষ্য করে বললেন, হে অভিশপ্ত ইবলীস! আমার উম্মতের মাঝে তোর শত্রু কতজন? ইবলীস বলল, পনেরো জন। যথা- ১. আপনি। ২. ন্যায়পরায়ণ শাসক। ৩. বিনয়ী ধনী ব্যক্তি। ৪. সত্যবাদী ব্যবসায়ী। ৫. আল্লাহর ভয়ে ভীত জ্ঞানী। ৬. কল্যাণকামী মুমিন ব্যক্তি। ৭. দয়ালু মুমিন ব্যক্তি। ৮. তওবায় অবিচল ব্যক্তি। ৯. হারাম বর্জনকারী ব্যক্তি। ১০. সর্বদা উযূ অবস্থায় থাকে এমন মুমিন ব্যক্তি। ১১. অধিক দানশীল মুমিন ব্যক্তি। ১২. উত্তম চরিত্রের অধিকারী মুমিন ব্যক্তি। ১৩. মানুষের উপকারকারী মুমিন ব্যক্তি। ১৪. সর্বদা কুরআন তিলাওয়াতকারী কুরআনের হাফেজ। ১৫. মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামায আদায়কারী। এরা সকলে আমার শত্রু, চরম দুশমন।
এরপর নবী বললেন, আমার উম্মতের মাঝে তোর বন্ধু কতজন? ইবলীস বলল দশজন। যথা- ১. অত্যাচারী শাসক। ২. অহংকারী ধনী ব্যক্তি। ৩. বিশ্বাসঘাতক ব্যবসায়ী। ৪. মদ্যপ ব্যক্তি। ৫. চোগলখোর। ৬. ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিনী। ৭. এতীমের সম্পদ ভক্ষণকারী। ৮. নামাযে উদাসীন ব্যক্তি। ৯. যাকাত দেয় না এমন ব্যক্তি। ১০. দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী ব্যক্তি। এরা সকলে আমার সঙ্গী-সাথি, আমার পরম বন্ধু ও ভাই।