📄 কিয়ামত সংঘটনের কাল
হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? রাসূল বললেন, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে ভালো জানে না। তবে কিয়ামতের কিছু নিদর্শন রয়েছে। যথা- বাজার মন্দ হবে, বৃষ্টি সত্ত্বেও উদ্ভিদ হবে না, সুদের প্রচলন হয়ে পড়বে, জারজ সন্তান বৃদ্ধি পাবে, সম্পদশালীকে সম্মান করা হবে, মসজিদে ফাসেক লোকের আওয়াজ উঁচু হয়ে যাবে এবং সত্যবাদীদের উপর পাপাচারীদের শক্তি প্রবল হবে। হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ অবস্থায় আমাকে কী নির্দেশ করেন? তিনি বললেন, দীন নিয়ে পালিয়ে যাবে বা ঘরে অবস্থানকারীদের একজন হয়ে যাবে।
হযরত ঈসা ইবনে আবু ঈসা ইসফাহানী রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? রাসূল বললেন, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে ভালো জানে না। তবে কিয়ামতের দশটি আলামত রয়েছে। যথা-
১. ঝগড়াটে লোক সমাজে জনপ্রিয় হয়ে যাবে।
২. পাপাচারীদের রাজত্ব কায়েম হবে।
৩. ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি অক্ষম ও অসহায় হয়ে যাবে।
৪. নামায এমনভাবে আদায় করা হবে, যেন এহসান করা হচ্ছে।
৫. যাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে।
৬. আমানতকে গনীমতের মাল মনে করা হবে।
৭. ক্বারীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
৮. বাচ্চাদের রাজত্ব চলবে।
৯. নারীদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পাবে।
১০. বাঁদীরা পরামর্শদাতা হবে।
হযরত আবূ যুরআ হযরত ওমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, মদীনায় মারওয়ানের পাশে তিন ব্যক্তি বসা ছিল। কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে তারা মারওয়ানকে একথা বলতে শুনলো যে, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ। তখন তারা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে, তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের সর্বপ্রথম আলামত হলো, পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় কিংবা দাব্বাতুল আরদ এর আত্মপ্রকাশ হওয়া। আর এ দু'টির আত্মপ্রকাশ কাছাকাছি সময়ে হবে। এরপর আলোচনা হতে লাগল। তিনি বললেন, সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন সে আরশের নিচে গিয়ে সেজদা করে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। তখন তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। যখন আল্লাহ তা'আলা পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয় করতে চাইবেন, সূর্য আরশের নিচে এসে পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। সে আবার অনুমতি চাইবে তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। সে আবার অনুমতি চাইবে তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তখন সূর্য বুঝতে পারবে তাকে অনুমতি দিলেও সে আর পূর্ব দিগন্তে উদিত হতে পারবে না। তখন সে বলবে, কোন জিনিস লোকদের থেকে আমাকে দূর রাখলো? পরবর্তী রাতের সামান্য সময় বাকী থাকতে সে অনুমতি চাইবে, তখন তাকে বলা হবে, তুমি আপন জায়গায় অর্থাৎ, সেখানে অস্ত গিয়েছো সেখান থেকে উদয় হও।
হযরত উবায়দ ইবনে উমায়র রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল সকালে এক সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হবে। তারা বলবে, আমরা নিশ্চিত জানি যে, সে মিথ্যাবাদী। তবে আমরা খাবারের জন্য এবং চারণভূমিতে পশু চরানোর জন্য তার সাহচর্য গ্রহণ করব। সুতরাং আল্লাহর গযব যখন অবতীর্ণ হবে, তাদের সকলের উপর অবতীর্ণ হবে।
হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। তার ডান চক্ষু অন্ধ হবে। সে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করবে এবং মৃতকে জীবিত করবে। আর মানুষকে বলবে, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন যে বলবে, আপনি আমার প্রতিপালক, সেই ফেতনায় নিপতিত হবে। আর যে বলবে, আমার প্রতিপালক হলো আল্লাহ এবং মৃত্যু পর্যন্ত এ বিশ্বাসে থাকবে সে ফেতনা থেকে রক্ষা পাবে। এরপর যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা হবে ততদিন সে দুনিয়াতে থাকবে। তারপর পশ্চিম দিক থেকে ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. আসবেন। তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান আনবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তা কিয়ামতের পূর্বাভাস।
টিকাঃ
৬১৪. কিতাবুল ফিতান ২/৬৪২; সুনানে তিরমিযী : হাদীস-২২১০ (শাব্দিক তারতম্যসহ); হাদীস যঈফ মুরসাল [যঈফুত তারগীব : হাদীস-১৬৩৫]।
৬১৫. প্রাগুক্ত।
৬১৬. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৪১; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৩১০।
৬১৭. সূরা আনআম: আয়াত-১৫৮
৬১৮. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: হাদীস-৭৫৩৭; কিতাবুল ফিতান: ২/৫৪৭।
৬১৯. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২০১৫১; হাদীসটি সহীহ [মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৭/৩৩৯]।
📄 দাব্বাতুল আরদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না পরিবারের লোকেরা একই দস্তরখানে একত্রিত হবে এবং তারা চিনবে তাদের কে কাফের আর কে মুমিন। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, এটা কিভাবে সম্ভব? তিনি বললেন, দাব্বাতুল আরদ আত্মপ্রকাশ করবে এবং প্রত্যেক মানুষের সেজদার স্থান ছুঁয়ে দিবে। এতে মুমিনের সেজদার স্থানটি উজ্জ্বল হয়ে যাবে এবং তা গোটা চেহারায় ছড়িয়ে পড়বে। ফলে তার চেহারা উজ্জ্বল ঝলমল করতে থাকবে। আর কাফেরের সেজদার স্থানটি ছুঁয়ে দিলে, কালো দাগে রূপান্তরিত হবে এবং তারপর তা গোটা চেহারায় ছড়িয়ে পড়বে। ফলে তার চেহারা কালো হয়ে যাবে। তখন তারা বাজারে বেচাকেনা করবে এবং বলবে, হে মুমিন! কত দিয়ে বিক্রয় করবে? হে কাফের! কত দিয়ে ক্রয় করবে? তারা একে অপরের কথার উত্তর দেবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, দাব্বাতুল আরদের চারটি পা হবে। পাখির মতো পশম বিশিষ্ট হবে। তিহামার এক উপত্যকা থেকে আত্মপ্রকাশ করবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন- "যখন প্রতিশ্রুতি (কিয়ামত) সমাগত হবে, তখন আমি তাদের সামনে ভূগর্ভ থেকে একটি প্রাণী নির্গত করব। সে মানুষের সাথে কথা বলবে। এ কারণে যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করত না।"
এ আয়াতে الناس দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সেসব লোক যারা ভালোকাজের আদেশ করতো না বা মন্দকাজের নিষেধ করতো না।
টিকাঃ
৬২০. কিতাবুল ফিতান লি-আবী আমর আদ-দানী: ৬/১২৫৪।
৬২১. সূরা নামল: আয়াত-৮২
📄 সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পশ্চিমাকাশ থেকে সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। আর পশ্চিমাকাশ থেকে সূর্যোদয় হলে সকল মানুষ ঈমান আনবে। সে দিন যারা পূর্বে ঈমান আনেনি বা ঈমান দ্বারা কল্যাণকর কিছু করেনি, তাদের ঈমান তাদের কোনো কাজে আসবে না।
হযরত ইবনে আবী আওফা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতিসত্ত্বর তোমাদের নিকট এমন এক রাত আসবে, যা তোমাদের এই রাতগুলোর তিন রাতের সমপরিমাণ হবে। সে রাত এলে তাহাজ্জুদের নামায আদায়কারীরা চিনে ফেলবে। তারা ঘুম থেকে উঠে ওযীফা পাঠ করবে, তারপর ঘুমিয়ে যাবে এবং উঠে ওযীফা পাঠ করবে। এমনি অবস্থায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। আর বলবে, এ কী ব্যাপার! তারপর ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় মসজিদে ছুটে আসবে। তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য উদিত হবে। সূর্যটি মধ্য আকাশে পৌঁছে ফিরে আসবে। তারপর পূর্বদিক থেকে উদিত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
"যেদিন আপনার পালনকর্তার কিছু নিদর্শন প্রকাশিত হবে, সেদিন এমন ব্যক্তির ঈমান আনয়ন তার জন্য ফলপ্রসূ হবে না, যে পূর্ব থেকে ঈমান আনেনি কিংবা স্বীয় ঈমান অনুযায়ী কোনোরূপ সৎকর্ম করেনি। বলুন, তোমরা অপেক্ষা কর। আমিও অপেক্ষা করছি।"
টিকাঃ
৬২২. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৬৩৫, ৪৬৩৬; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৫৭।
৬২৩. হাদীসটির সনদ যঈফ [ইতিহাফুল খিয়ারাত: ৮/১০৯]।
৬২৪. সূরা আনআম: আয়াত-১৫৮
📄 ঈসা আ.-এর অবতরণ
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নবীগণ পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই। তাদের মা ভিন্ন ভিন্ন হলেও, ধর্ম এক ও অভিন্ন। আমি তাদের মাঝে ঈসা ইবনে মারইয়াম আ.-এর অধিক নিকটতর। আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই। তিনি আমার উম্মতের মাঝে আমার প্রতিনিধি হিসাবে আগমন করবেন। তিনি এসে শুকর হত্যা করবেন, ক্রুশ ধ্বংস করবেন, ট্যাক্স উঠিয়ে দিবেন, যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন, জুলুম ও অত্যাচারে ভরপুর পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন। ফলে সিংহ উটের সাথে, বাঘ গরুর সাথে এবং নেকড়ে মেষের সাথে চরে বেড়াবে। আর শিশুরা সাপ নিয়ে খেলা করবে।
টিকাঃ
৬২৫. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৯২৭০; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস-৬৮১৪; হাদীসটি সহীহ [শুয়াইব আরনাউত]।