📄 বিছানায় শোয়ার সময় চিন্তা-ফিকির
মাকহুল শামী রহ. বলেন- মানুষ যখন বিছানায় ঘুমোতে যায়, তখন তার উচিত সারাদিনের আমলের হিসাব কষা। যদি ভালো আমল করে থাকে, তাহলে এর জন্য আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করবে। আর যদি পাপ করে থাকে, তাহলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং পাপ থেকে ফিরে আসবে। যদি এরূপ না করে, তার দৃষ্টান্ত হলো এমন ব্যবসায়ী, যে ব্যয় করল, কিন্তু হিসাব রাখল না। ফলে এক সময় সে রিক্তহস্ত হয়ে গেল, অথচ কখন বা কীভাবে হলো তা টেরও পেল না।
📄 প্রজ্ঞা সৃষ্টি হয় চারটি জিনিস থেকে
জনৈক জ্ঞানী বলেছেন, ৪টি বিষয় থেকে হিকমত [প্রজ্ঞা] সৃষ্টি হয়। যথা- ১. পার্থিব কাজকর্ম থেকে অবসর দেহ। ২. পার্থিব খাবার থেকে খালি পেট। ৩. পার্থিব আসবাব থেকে খালি হাত; এবং ৪. দুনিয়ার পরিণতি নিয়ে চিন্তাভাবনা। অর্থাৎ, নিজের পরিণতি নিয়ে ভাবা যে, তার পরিণতি কী হবে, তা জানা নেই। জানা নেই, তার আমলগুলো আল্লাহর দরবারে কবুল হবে কি না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র পবিত্র আমলই কবুল করেন।
📄 আমলের ফেরেশতা অপবিত্র আমল আটকে দেয়
হযরত খালেদ বিন মেহরান রহ. বলেন, আমি হযরত মুআয বিন জাবাল রাযি. কে বললাম, আমাকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর থেকে শুনেছেন এবং স্মরণ রেখেছেন; আর প্রথম দিন থেকে প্রতিদিন তা বর্ণনা করেছেন। এ কথা শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। এতটা কাঁদলেন যে, আমি ভাবলাম, তিনি থামবেন না। অবশেষে থামলেন। এরপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পিছনে সওয়ার ছিলাম। আমি আরজ করলাম, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে কিছু বলুন। তিনি আসমানের দিকে মাথা উঠালেন। এরপর বললেন, সকল প্রশংসা সে সত্তার জন্য, যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যা পছন্দ করেন, ফয়সালা করেন। এরপর বললেন, হে মুআয! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কল্যাণের ইমাম ও রহমতের নবী! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন, আমি তোমাকে এমন এক কথা শোনাব, যা কোনো নবী তার উম্মতকে বলেননি। তা যদি স্মরণ রাখ, তোমার উপকার হবে। আর যদি শোনো, কিন্তু স্মরণ না রাখ, আল্লাহর নিকট তোমার কোনো উযর চলবে না। এরপর বললেন, আসমান সৃষ্টির আগে আল্লাহ তা'আলা সাতজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন- প্রত্যেক আসমানের জন্য একজন। আর প্রত্যেক দরজায় একজন পাহারাদার রেখেছেন। পাহারাদার ফেরেশতারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বান্দা যে আমল করে, তা লিখে রাখে। এরপর তা ওপরে উঠানো হয়। তা সূর্যের মতো আলোকিত থাকে।
যখন তা প্রথম আসমানে পৌঁছে, তখন ফেরেশতা বলে, দাঁড়াও! এই আমলটি নিয়ে আমলকারীর মুখের ওপর মারো। আর বলো, তোমার ক্ষমা নাই। আমি গীবতের ফেরেশতা। এই ব্যক্তি মুসলমানদের গীবত করত। তাই তার আমল সামনে যাওয়ার অনুমতি আমি দেবো না।
এরপর বললেন, বান্দার আমল নিয়ে পাহারাদার ফেরেশতা ওপরে উঠবে। সে আমল উজ্জ্বল ও আলোকিত থাকবে। দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলে ফেরেশতা বলবে, দাঁড়াও! এই আমল তার মুখের ওপর নিয়ে মারো! আর তাকে বলো, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ক্ষমা করবেন না। এই আমল দ্বারা সে পার্থিব লাভ চেয়েছিল। আমি হলাম দুনিয়ার আমলের ফেরেশতা। আমি এই আমল সামনে নেওয়ার অনুমতি দেবো না।
তিনি বললেন, মুহাফিজ ফেরেশতা বান্দার আমল নিয়ে ওপরে উঠবে। ওই আমল নিয়ে মুহাফিজ ফেরেশতার বেশ গর্ব থাকবে। অনেক নামায রোযা সদকা ইত্যাদির আমল। তৃতীয় আসমানে গেলে সেখানকার ফেরেশতা বলবে, দাঁড়াও! এই আমল আমলকারীর মুখের ওপর নিক্ষেপ কর। আর তাকে বলো, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ক্ষমা করবেন না। আমি হলাম অহংকারের ফেরেশতা। এই ব্যক্তি আমল করেছে এবং লোকদের মজলিসে গিয়ে অহংকার করেছে। আর আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, এই আমল আমাকে ডিঙ্গিয়ে যেন অন্য কোথাও না যায়।
তিনি বললেন, মুহাফিজ ফেরেশতা আরেক বান্দার আমল নিয়ে ওপরে উঠবে। তা তাসবিহ, রোযা ইত্যাদির আমল হবে। নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল ও আলোকময় থাকবে। যখন চতুর্থ আসমানে পৌঁছবে, তখন ফেরেশতা বলবে, দাঁড়াও! এই আমল আমলকারীর মুখের ওপর নিক্ষেপ কর। আর বলো, তোমার ক্ষমা নেই। আমি হলাম আত্মাভিমানের ফেরেশতা। এই ব্যক্তি আমল করেছে এবং আত্মাভিমানে লিপ্ত থেকেছে। আর আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তার আমল যেন সামনে বাড়তে না পারে। তখন তার আমল তার মুখের ওপর নিক্ষেপ করা হয়। ফলে তা তাকে তিন দিন পর্যন্ত অভিশাপ দিতে থাকে।
তিনি বললেন, মুহাফিজ ফেরেশতা আরেক ব্যক্তির আমল নিয়ে ওপরে উঠতে থাকবে। তার সাথে অন্য ফেরেশতাও থাকবে। নববধুকে যেভাবে জাঁকজমকের সাথে বিদায় দেওয়া হয়, সেভাবে জাঁকজমক সহকারে তার আমল বহন করা হবে। সেখানে থাকবে জিহাদ, নফল নামায ইত্যাদির সওয়াব। তখন ওই পঞ্চম আসমানের ফেরেশতা বলবে, দাঁড়াও! এই আমল আমলকারীর মুখের ওপর নিক্ষেপ কর। আর তা তার কাঁধে উঠিয়ে দাও। যারা দীন শিখত, আল্লাহর জন্য আমল করত, এই ব্যক্তি তাদের হিংসা করত। তাদের দোষ খুঁজে বেড়াত। তখন ফেরেশতা ওই আমলকারীর কাঁধের ওপর তা রেখে দেয় এবং সে যতদিন বাঁচে, ততদিন তাকে তার আমল লানত করতে থাকে।
তিনি বললেন, আরেক বান্দার আমল নিয়ে ফেরেশতা উপরে উঠতে থাকবে। তাতে পূর্ণাঙ্গ উযু, রাতের ইবাদত ও অনেক নামায থাকবে। তা নিয়ে ষষ্ঠ আসমানে গেলে ফেরেশতা বলবে দাঁড়াও! এই আমল আমলকারীর মুখের ওপর নিক্ষেপ কর। আমি হলাম রহমতের ফেরেশতা। এই আমলকারী কাউকে কখনও দয়া করেনি। যখন আল্লাহর কোনো বান্দা পাপ করত, বা কাউকে কষ্ট দিত, তখন এই ব্যক্তি খুশি হতো। আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তার আমল যেন সামনের দিকে না যায়।
তিনি বললেন, মুহাফিজ ফেরেশতা আরেক বান্দার আমল নিয়ে ওপরে উঠবে। সেখানে থাকবে সত্যবাদিতা, মুজাহাদা এবং তাকওয়ার সওয়াব। বিজলীর মত তা আলোকিত থাকবে। তা নিয়ে সপ্তম আসমানে গেলে ফেরেশতা বলবে, দাঁড়াও! এই আমলটি আমলকারীর মুখের ওপর নিক্ষেপ কর। আর তার অন্তরে তালা মেরে দাও। আমি হলাম বাধা প্রদানকারী ফেরেশতা। প্রত্যেক এমন আমল আমি বাধা দিয়ে আটকে রাখি, যা আল্লাহর জন্য নয়। আর এই ব্যক্তি এই আমল দ্বারা নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি চেয়েছিল; মানুষের মজলিসে আলোচিত হতে চেয়েছিল; তার নামের ডংকা বাজাতে চেয়েছিল। আর আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন এই আমল সামনে যেতে না দেই।
তিনি বললেন, ফেরেশতা আরেক ব্যক্তির আমল নিয়ে ওপরে যাবে, যা খুবই উত্তম হবে। তার মধ্যে উন্নত চরিত্র, নীরবতা, প্রচুর যিকির ইত্যাদি থাকবে। আসমানের ফেরেশতাও তার সাথে সাথে চলবে। যখন আরশের নিকট পৌঁছবে, ফেরেশতারা তার হয়ে সাক্ষ্য দেবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা আমার বান্দার আমল হেফাজত করেছ। আর আমি তার অন্তর পাহারা দিয়েছি। এই আমল দ্বারা সে আমাকে চায়নি। তাই তার ওপর আমার লা'নত। তখন সকল ফেরেশতা বলবে, তার ওপর তোমার ও আমাদের লা'নত। আসমানবাসীরা বলবে, তার ওপর আল্লাহর লা'নত, আসমান জমিনের লা'নত ও আমাদের লা'নত।
এরপর মুআয রাযি. কাঁদতে লাগলেন। বললেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কী আমল করব? তিনি বললেন, মুআয! তুমি তোমার নবীর অনুসরণ কর। পুরোপুরি বিশ্বাস রাখো, যদিও তোমার আমল কম হয়। তোমার ভাইদের থেকে জবান সংবরণ কর। তোমার পাপ যেন তোমারই থাকে; তোমার ভাইদের ওপর তা চাপিয়ো না। তোমার ভাইদের নিন্দা করে তোমার নিজের পবিত্রতা প্রকাশ কর না। তোমার ভাইদের নীচু করে তুমি নিজেকে উঁচু করতে চেষ্টা কর না। আর লোকদের দেখানোর জন্য আমল কর না।
টিকাঃ
৬১৩. হাদীসটি জাল [মাওযুয়াতে ইবনুল জাওযী: খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৪০৮; তারতীবুল মাওযুয়াত লি-যাহাবী: পৃষ্ঠা-২৭৪; তানযীহুশ শারীয়াহ : খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২৮৭; আল-লাআলী আল-মাসনুয়াহ: খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৯]।