📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনের চিন্তা-ভাবনা

📄 আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনের চিন্তা-ভাবনা


হযরত আতা বিন আবি রাবাহ রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনে উমর ও উবাইদ বিন উমায়ের-সহ আমি হযরত আয়েশা রাযি. এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম জানালাম। তিনি বললেন, কে? বললাম, আব্দুল্লাহ বিন উমর, উবাইদ বিন উমায়ের। তিনি বললেন, স্বাগতম হে উবাইদ বিন উমায়ের! কী ব্যাপার, তুমি আমাদের সাথে দেখা করতে আসো না কেন? উবাইদ বলল, মাঝে-মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ করলে মহব্বত বৃদ্ধি পায়। ইবনে উমর বললেন, আমাদের এ সব কথা ছাড়ুন! রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সবচেয়ে যে বিস্ময়কর বিষয়টি দেখেছেন, তা আমাদেরকে বলুন।

তিনি বললেন, তাঁর সবকিছুই তো বিস্ময়। তবে একরাতে আমার নিকট এলেন। আমার সাথে বিছানায় গেলেন। তাঁর দেহ আমার দেহের সাথে মিলে গেল। এরপর বললেন, আয়েশা! তুমি আমাকে আমার প্রভুর ইবাদত করার অনুমতি দিবে? আমি বললাম, খোদার কসম! আমি আপনার নৈকট্য খুবই ভালোবাসি। তবে আপনার ইচ্ছা তার থেকেও অধিক প্রিয়। তিনি একটি মশকের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে পানি নিয়ে উযূ করলেন। এরপর তিনি দাঁড়ালেন এবং দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর অশ্রুতে কোল পর্যন্ত ভিজে গেল। এরপর ডান পাশে টেক লাগিয়ে শুলেন। ডান হাত ডান গালের নিচে রাখলেন। এরপর কাঁদতে লাগলেন। চোখের পানি গড়িয়ে মাটি পর্যন্ত পৌঁছল। ফজরের আযান দেয়ার পর বেলাল এল। তাকে কাঁদতে দেখে বলল, হে রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ তা'আলা তো আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, বেলাল! আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? আমার তো ক্রন্দন করার কোনো কারণ নেই। কারণ, আমার ওপর আজ রাতে 'ইন্না ফী খালকিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি...' হতে 'ফাকিনা আযাবান্নার' পর্যন্ত আয়াত নাযিল হয়েছে। এরপর বললেন, ধ্বংস তাদের জন্য, যারা এ আয়াত পাঠ করে কিন্তু তার মর্ম নিয়ে ভাবে না।

এক হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি নভোমণ্ডলের দিকে তাকায় এবং তার বিস্ময় ও আল্লাহর কুদরত নিয়ে ভাবে এবং 'ইন্না ফী খালকিস সামাওয়াতি...' হতে 'ফাকিনা আযাবান্নার' পর্যন্ত আয়াত পাঠ করে, তার জন্য প্রতিদিন নক্ষত্রের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব লেখা হয়।

টিকাঃ
৬০৮. সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস-৬২০; হাদীসটি সহীহ [তারগীব মুনযিরী: খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩২৯]।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 চিন্তা-গবেষণার ফল

📄 চিন্তা-গবেষণার ফল


হযরত আমের বিন কায়স রহ. বলেন, আখেরাতের সবচেয়ে আনন্দে তারাই থাকবে, যারা দুনিয়ায় সর্বাধিক সময় চিন্তিত থাকে। আখেরাতে সবচেয়ে বেশি হাসবে তারা, যারা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্রন্দন করে। আর কিয়ামতের ময়দানে ঈমানে সবচেয়ে বেশি ইখলাস তারই থাকবে, যে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি চিন্তা ফিকির করে।

হযরত আবু দারদা রাযি.-এর বর্ণিত হাদীসে আছে। কোনো কোনো সনদে রাসূল ﷺ থেকেও বর্ণিত। তিনি বলেন, কতক লোক কল্যাণের বিস্তার করে এবং মন্দের দমন করে। তারা তার সওয়াব পাবে। আবার কতক লোক মন্দের বিস্তার ঘটায় এবং কল্যাণ সঙ্কুচিত করে। তারা এর পাপ পাবে। সৌভাগ্যবান সে, যে কল্যাণের বিস্তার ঘটায় এবং মন্দের দমন করে। আর এক মুহূর্ত চিন্তা-ফিকির করা রাতের ইবাদত হতে উত্তম।

হযরত আমর বিন মুররা রাযি. বলেন, নবীজী কতক লোকের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা চিন্তা-ফিকির করছিল। ইরশাদ করলেন, তোমরা সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ফিকির কর; স্রষ্টা নিয়ে চিন্তা-ফিকির কর না।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে, নবীজী ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কারও নিকট শয়তান আসে। এসে প্রশ্ন করে, আসমানসমূহকে কে সৃষ্টি করেছেন? সে বলে, আল্লাহ তায়ালা। শয়তান প্রশ্ন করে, জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? সে বলে, আল্লাহ তায়ালা। তখন শয়তান প্রশ্ন করে, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? তোমাদের কারো মনে যদি এরূপ কিছু জাগে, তাহলে বলো, আমি আল্লাহর ওপর ও আল্লাহর রাসূলের ওপর ঈমান এনেছি।

এক হাদীসে আছে, এক মুহূর্ত চিন্তা-ফিকির করা এক বছরের ইবাদত হতে উত্তম।

টিকাঃ
৬০৯. আয-যুহদ লি-ইবনে মুবারক : হাদীস-৪৪; তারগীব আসবাহানী: ৬৫০; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-২৩৭; হাদীসটি হাসান সহীহ [জামে সগীর হাদীস-২২২৩; আলবানী]।
৬১০. আল-ফিরদাউস : হাদীস-২৩১৮; আসমা ওয়াস সিফাত লিল-বাইহাকী হাদীস-৮৮৭; সনদটি জয়ীফ তবে সামষ্টিকভাবে সহীহ [কাশফুল খফা: ১/৩৭১; সহীহুল জামে: ২৯৭৫]।
৬১১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২৭৬; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৩৪।
৬১২. হাদীসটি জাল [আল-আসরারুল মারফুয়াহ লি-মুল্লা আলী কারী: হাদীস-১৭৫]।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পাঁচটি বিষয়ে ফিকির করবে

📄 পাঁচটি বিষয়ে ফিকির করবে


কেউ যদি চিন্তা-গবেষণার ফযীলত লাভ করতে চায়, তাহলে সে এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে ফিকির করবে- ১. নিদর্শন ও আলামতসমূহে। ২. আল্লাহর নিয়ামতসমূহে। ৩. আল্লাহ তা'আলার সওয়াবে। ৪. আল্লাহ তা'আলার শাস্তিতে এবং ৫. আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন এবং সে যে বেপরোয়াভাবে চলেছে, তা নিয়ে।

আলামত ও নিদর্শনে চিন্তা-ফিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তা'আলা ও তার কুদরত নিয়ে ভাবা। তিনি আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন; পূর্ব দিকে সূর্য উদয় হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়; দিনের পর রাত আসে; তাকে সৃষ্টির কলাকৌশল ইত্যাদি নিয়ে ভাবা। যেমন ইরশাদ হয়েছে- 'আর বিশ্বাসীদের জন্য জমিনে অনেক নিদর্শন রয়েছে। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও; তোমরা তা দেখো না?' তাই যখন বান্দা আলামত ও নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে, তখন তার বিশ্বাস ও ইয়াকিন বৃদ্ধি পায়।

নিয়ামতের মধ্যে চিন্তা-ফিকির হলো, আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকে লক্ষ করা এবং তার মাধ্যমে নিয়ামত দানকারী পর্যন্ত পৌঁছনোর চেষ্টা করা। জনৈক জ্ঞানীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, الآلاء এবং النعماء এর মধ্যে পার্থক্য কী? তিনি বললেন, যে নিয়ামত প্রকাশ্য, তা হলো الآلاء; আর যা অপ্রকাশ্য, তা হলো النعماء। যেমন হাত হলো الآلاء। আর হাতের শক্তি হলো النعماء। চেহারা হলো الآلاء; আর তার সৌন্দর্য হলো النعماء। মুখ হলো الآلاء; আর মুখের স্বাদ অনুভবের শক্তি হলো النعماء। পা- দু'টি হলো الآلاء। আর চলার শক্তি হলো النعماء। কোনো বান্দার যদি পা- দু'টো থাকে, কিন্তু চলতে অক্ষম হয়, তা হলে তার الآلاء আছে, কিন্তু النعماء নেই। মানুষের হাড়-মজ্জা হলো الآلاء; তার সুস্থতা ও স্থিরতা হলো النعماء। কারো কারো মতে, الآلاء হলো নিয়ামত দান; আর النعماء হলো বিপদ হতে মুক্ত রাখা। আবার কারও বক্তব্য ঠিক এর বিপরীত। আর কেউ কেউ বলেন, দু'টো অর্থ এক। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- 'তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে থাকো, তাহলে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।' বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহ নিয়ে ভাবতে থাকবে, তখন তার মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।

আর সওয়াব নিয়ে ভাবার অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার প্রিয় বান্দাদের জন্য জান্নাতে যেসব নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেগুলো নিয়ে ভাবা। কারণ, এগুলো নিয়ে ভাবলে এগুলোর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে; এগুলো পাওয়ার জন্য চেষ্টা বৃদ্ধি পাবে এবং আল্লাহর ইবাদতে শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

আর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে ভাবার অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা তার নাফরমান বান্দাদের জন্য যেসব শাস্তি ও লাঞ্ছনা প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেগুলো নিয়ে ভাবা। এতে সেগুলোর প্রতি ভয় বৃদ্ধি পাবে এবং পাপকর্ম থেকে বিরত থাকার শক্তি পাওয়া যাবে।

আর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহে চিন্তা-ফিকিরের অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার ওপর যেসব অনুগ্রহ করেছেন, তার দোষ গোপন রেখেছেন, পাপ করা সত্ত্বেও পাপের শাস্তি এখনও দেননি এবং তাকে তাওবার প্রতি আহ্বান করছেন, আর সে যে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে পাপে লিপ্ত হয়েছে, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এগুলো নিয়ে ভাবলে লজ্জা ও অনুতাপ বৃদ্ধি পাবে। কেউ যদি এগুলো নিয়ে ভাবে, তবেই তা হাদীসে বর্ণিত চিন্তা-ফিকিরের অন্তর্ভুক্ত হবে, যেখানে বলা হয়েছে, এক মুহূর্ত চিন্তা-ফিকির করা এক বছরের ইবাদত হতে উত্তম। আর এগুলোর বাইরে চিন্তা-ফিকির করবে না। কারণ, এগুলোর বাইরের চিন্তা-ফিকির হলো প্ররোচনা মাত্র।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 তিন জিনিসের দিকে ধ্যান দেবে না

📄 তিন জিনিসের দিকে ধ্যান দেবে না


জনৈক জ্ঞানী বলেছেন, তিনটি বিষয় নিয়ে ভাববে না।
১. দারিদ্র্য নিয়ে ভাববে না। এতে দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবে; দুনিয়ার প্রতি লোভ বৃদ্ধি পাবে।
২. তোমার ওপর যে জুলুম করা হয়েছে, তা নিয়ে ভাববে না। ভাবলে, তোমার অন্তর কঠোর হয়ে যাবে; জালেমের প্রতি বিদ্বেষ বেড়ে যাবে এবং ক্রোধ স্থায়িত্ব পাবে।
৩. দুনিয়ায় দীর্ঘদিন বাঁচার কথা ভাববে না। ভাবলে, সম্পদ সঞ্চয় করার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে; আয়ু শেষ হয়ে যাবে, অথচ আমল করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية