📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সওয়াবের ফযীলত

📄 আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও সওয়াবের ফযীলত


عَنْ تَمِيمِ الدَّارِيَّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : أَلَا إِنَّمَا الدِّينُ النَّصِيحَةُ. قَالَهَا ثَلَاثًا، قَالُوا: لِمَنْ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: اللَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِكِتَابِهِ، وَلِأَئِمَّةِ الْمُؤْمِنِينَ، وَلِعَامَّتِهِمْ.

তামিম দারী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, শুনে রাখো! নিশ্চয় দীন হলো কল্যাণকামিতার নাম। প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কার কল্যাণকামিতা? রাসূল বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য।

النصيحة لله ولكتابه ولرسوله ولأئمة المسلمين وعامتهم ". نصيحة শব্দটি ইসমে মাসদার। এর আসল অর্থ হলো- ইখলাস। باب فتح থেকে نصحا ونصها । অর্থ : মুখলিস বা আন্তরিক হওয়া। النصيحة الله এর মর্ম : النصيحة لله তথা আল্লাহ তা'আলার জন্য নসীহত/কল্যাণ কামনার কোনো অর্থ হয় না। তাই মুহাদ্দিসগণ এর ব্যাখ্যা করেছেন। যথা- ১. আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ স্বীকার করা। ২. আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে শরীক না করা। ৩. আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য না হওয়া। ৪. আল্লাহ তা'আলার আদেশসমূহ পালন করা। ৫. আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসা এবং কারো সাথে শত্রুতা রাখা। ৬. বান্দা কর্তৃক নিজের কল্যাণ কামনা করা। ৭. তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে এর অর্থ হলো, আল্লাহর হকসমূহ আদায় করা। এ অর্থ গ্রহণ করলে উল্লিখিত প্রায় সকল ব্যাখ্যাই এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

النصيحة لكتاب الله এর মর্ম : আল্লাহর কিতাবের নসীহত/কল্যাণ কামনা করার বিভিন্ন ব্যাখ্যা ওলামায়ে কেরাম বর্ণনা করেন। যথা- ১. আল্লাহর কিতাবের নসীহত/কল্যাণ কামনা করার অর্থ হলো, এ কথায় বিশ্বাস করা যে, এটি আল্লাহর কালাম। কোনো সৃষ্টির কথা তার মতো নেই, কোনো মানবের কথা এর সমতুল্য হতে পারে না। ২. কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। ৩. কুরআনের যথার্থরূপে তিলাওয়াত করা। ৪. তিলাওয়াতকালে কুরআনের অর্থের প্রতি মনোযোগ দেয়া। ৫. অক্ষরগুলো সুন্দরভাবে উচ্চারণ করা। ৬. কুরআনকে বিকৃতিকারীদের ব্যাখ্যা-বিদ্রূপ থেকে হেফাজত করা। ৭. কুরআনের বিষয়াবলীর প্রতি বিশ্বাস রাখা। ৮. কুরআনের ব্যুৎপত্তি অর্জনের চেষ্টা করা। ৯. কুরআনের বিধি-বিধান সম্পর্কে জানা। ১০. কুরআনের দৃষ্টান্তাবলী সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা। ১১. কুরআনের উপদেশগুলো অনুধাবন করা। ১২. কুরআনের বিস্ময়কর বিষয় ও ঘটনাবলী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা। ১৩. কুরআনের বিধানসমূহ পালন করা। ১৪. কুরআনের মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট মর্মবিশিষ্ট আয়াতগুলোকে মেনে নেওয়া। ১৫. কুরআনের আম-খাস, নাসিখ-মানসূখ ইত্যাদি বিষয় জানা ও আলোচনা করা।

النصيحة لرسول الله এর মর্ম: রাসূল -এর নসীহত/কল্যাণ কামনার বিভিন্ন অর্থ ওলামায়ে কেরাম বর্ণনা করেছেন। যথা- ১. রাসূল -এর প্রতি ঈমান আনয়ন করা। ২. রাসূল -এর আনীত বিষয়গুলোর সত্যায়ন করা। ৩. রাসূল -এর নবুওয়াতের প্রতি স্বীকৃতি দেওয়া ও সর্বশেষ নবী মনে করা। ৪. রাসূল -এর আদেশ নিষেধ মেনে চলা। ৫. রাসূল -এর দীনী কাজে সহযোগিতা করা। ৬. রাসূল -এর বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা এবং শত্রুদের সাথে শত্রুতা রাখা। ৭. রাসূল -এর প্রতি সম্মান করা। ৮. রাসূল -এর হককে বড় মনে করা। ৯. রাসূল -এর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। ১০. রাসূল -এর দাওয়াতের প্রচার-প্রসার ঘটানো। ১১. উলূমে নববিয়ার বিকাশ ঘটানো ও তাতে পরিপক্কতা অর্জন করা। ১২. রাসূল -এর হাদীস অন্যকে শিক্ষাদানে কোমলতা অবলম্বন করা এবং এই ইলমকে অত্যন্ত মর্যাদাবান মনে করা ও বাহককে বড় মনে করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। ১৩. নবীজী -এর গুণে গুণান্বিত হওয়া। ১৪. রাসূল -এর আদর্শে আদর্শবান হওয়া। ১৫. রাসূল -এর পরিবার-পরিজনের প্রতি মুহাব্বাত রাখা। ১৬. যাঁরা সুন্নাতের মধ্যে বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটায়, তাদের বিরুদ্ধাচারণ করা। ১৭. রাসূল -এর সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং তাঁদের বিরোধীদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা। ১৮. নিজের সমস্ত খাহেশাতকে প্রিয়নবী -এর আনীত শরীআতের অনুগত করে দেয়া। ১৯. সর্বোপরি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল -এর অনুকরন করা।

النصيحة لأئمة المسلمين এর মর্ম: ইমাম দু'প্রকার। যথা- ১. ইলম ও হিদায়াতের ইমাম। ২. শাসক শ্রেণীর ইমাম। প্রথম প্রকার: প্রথম প্রকারের নসীহত/কল্যাণ কামনার অর্থ হলো, তাঁদের ইলম দ্বারা উপকৃত হওয়া। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। যদি তাঁদের অনুসারীও না হয় তারপরেও তাদের সামনে বেআদবী না করা। কারণ, তাঁদের শানে বেআদবীর পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে থাকে। হকের ব্যাপারে তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, তাঁদের অনুসরণ করা, তাঁদের বর্ণনা ও কথাবার্তা মেনে চলা, তাঁদের বর্ণিত বিধিবিধানের অনুসরণ করা, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা রাখা। দ্বিতীয় প্রকার: দ্বিতীয় প্রকারের নসীহত/কল্যাণ কামনার অর্থ হলো, হকের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য ও সহযোগিতা করা। আর যদি শরীআত পরিপন্থী কাজ করতে শুরু করে, তাহলে সুন্দর চেষ্টা ও সুন্দর পন্থায় বুঝানোর চেষ্টা করা। হকের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা এবং সে বিষয়ে তাদেরকে বিনয় ও নম্রতার সাথে বলা, সতর্ক করা, স্মরণ করিয়ে দেয়া। তারা যে বিষয়ে উদাসীন সে বিষয়ে অবগতি প্রদান করা, মুসলমানদের যেসব অধিকার সম্পর্কে তাদের জানা নেই, সে সম্পর্কে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া, তাদের বিরোধিতা না করা, তাদের অনুসরণের প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের পেছনে নামায পড়া, তাদের নেতৃত্বে জিহাদ করা, তাদের নিকট সদকা অর্জন করা, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করা, যদিও জুলুম প্রকাশ পাক না কেন। এরূপভাবে লৌকিকতাপূর্ণ প্রশংসা করে তাদেরকে ধোঁকা না দেয়া, তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করা।

النصيحة لعامة المسلمين: আর সাধারণ মুসলমানদের নসীহত/কল্যাণ কামনার বিভিন্ন অর্থ ওলামায়ে কেরাম বর্ণনা করেন। যথা- ১. সাধারণ মানুষদেরকে কল্যাণের প্রতি আহবান করা। ২. সাধারণ মানুষদের জন্য তাই পছন্দ করা যা নিজের জন্য পছন্দ। ৩. সাধারণ মানুষদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের কষ্টদায়ক জিনিস থেকে রক্ষা করা। ৪. সাধারণ মানুষদেরকে দীন-দুনিয়ার উপকারী বিষয়গুলো বলে দেওয়া। ৫. সাধারণ মানুষদের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা। ৬. সাধারণ মানুষদের প্রয়োজন পূর্ণ করা। ৭. সাধারণ মানুষদের কষ্ট লাঘব করা। ৮. সাধারণ মানুষদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা। ৯. সাধারণ মানুষদেরকে স্নেহ-মমতা ও কোমলতার সাথে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা। ১০. সাধারণ মানুষদের ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করা। ১১. রাসূল -এর গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। ১২. সাধারণ মানুষদেরকে আদর্শ চরিত্র গঠনের প্রতি উৎসাহিত করা। আল্লামা খাত্তাবী রহ. বলেছেন, মানুষের হিতকামনা আবশ্যকীয় বিষয় তথা ফরযে কেফায়া। যে কেউ করলে অন্যদের থেকে এ হুকুম আদায় হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন যে, হিতকামনা ও নসীহত নিজ সামর্থ্যানুযায়ী ফরয। যদি কেউ জানতে পারে যে, তার উপদেশ অন্য ব্যক্তি গ্রহণ করবে, তার কথা মেনে চলবে এবং নসীহত করলে নিজেও বিপদমুক্ত থাকবে, বিপদের আশঙ্কা করবে না। যদি নসীহত করলে কষ্ট পাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকার অবকাশ রয়েছে।

عَنْ أُمِّهِ أُمَّ كُلْثُومٍ بِنْتِ عُقْبَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : لَيْسَ بِالْكَاذِبِ مَنْ أَصْلَحَ بَيْنَ النَّاسِ فَقَالَ خَيْرًا، أَوْ نَمَّى خَيْرًا، وَأَمَّا الْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَشُعْبَةٌ مِنْ شُعَبِ النُّبُوَّةِ، وَالصَّرْمُ بَيْنَ النَّاسِ، شُعْبَةٌ مِنْ شُعَبِ السِّحْرِ.

উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী বলেন, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব মিটানোর জন্য নিজের পক্ষ থেকে বা কারো দিকে সম্পৃক্ত করে ভালো কথা বলে। মানুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করা নবুওয়াতের একটি গুণ। আর মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা জাদুকরের একটি গুণ।

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَفْضَلُ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَوَابًا، أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ فِي الدُّنْيَا، وَإِنَّ الْمُتَقَرَّبِينَ عِنْدَ اللَّهِ يَوْমَ الْقِيَامَةِ الْمُصْلِحُونَ بَيْنَ النَّاسِ.

হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ ঐ ব্যক্তি, যে দুনিয়াতে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করেছে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী ঐ ব্যক্তি যে মানুষের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দিয়েছে।

টিকাঃ
৪৩৮. সহীহ মুসলিম: হাদীস-৫৫।
৪৩৯. সহীহ বুখারী: হাদীস-২৬৯২; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৬০৫।
৪৪০. ত্ববারানী আওসাত: হাদীস-৫৭৮৭; হাদীসটি সহীহ [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৮/১৯১]।

ফন্ট সাইজ
15px
17px