📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 নিজেকে জানা

📄 নিজেকে জানা


বর্ণিত আছে, বনী ইসরাইলের জনৈক যুবক সংসারের মায়া ও যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এক নির্জন স্থানে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়ে পড়ল। তার গোত্রের দু'জন বয়স্ক ব্যক্তি তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য তার নিকট গেল। তারা তাকে বলল, হে যুবক! তুমি তো কঠিন কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছ। তুমি একাজে ধৈর্যধারণ করে টিকে থাকতে পারবে না। যুবক বলল, মানুষের নির্জন স্থানে অবস্থান করার চেয়ে আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ানো অনেক কঠিন। তারা বলল, তোমার আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে তাদের মাঝে অবস্থান করে ইবাদত করাই তোমার জন্য উত্তম হবে। যুবক বলল, যদি আমার প্রতিপালক আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, তবে তিনি আমার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে সন্তুষ্ট করবেন। তারা বলল, তুমি যুবক মানুষ, বয়স তোমার অল্প, অভিজ্ঞতাও তোমার স্বল্প। আমরা এ বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখেছি। আমরা তোমার আত্মমুগ্ধতার ভয় করছি। যুবক বলল, যে তার নফসকে চিনতে পেরেছে, তাকে আত্মমুগ্ধতা ক্ষতি করতে পারবে না। তখন উক্ত ব্যক্তিদ্বয় ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বলল, নিশ্চয়ই যুবকটি জান্নাতের সুঘ্রাণ পেয়েছে! সে আমাদের কথা গ্রহণ করবে না।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 ইবাদতের সাথে আল্লাহর ভয়

📄 ইবাদতের সাথে আল্লাহর ভয়


বর্ণিত আছে, হযরত দাউদ আ. একদা সমুদ্র উপকূলে চলে গেলেন। সেখানে এক বছর আল্লাহর ইবাদত করলেন। বছর শেষে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে আমার রব! আমার পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে গেছে, অশ্রু শুকিয়ে গেছে। অথচ আমি এখনো জানতে পারিনি, আমার পরিণতি কী হবে? তখন আল্লাহ তা'আলা একটি ব্যাঙের নিকট এই মর্মে নির্দেশ পাঠালেন যে, তুমি দাউদের প্রশ্নের উত্তর দাও। ব্যাঙ বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি এক বছর ইবাদত করেই আপনার প্রতিপালককে খোঁটা দিতে আরম্ভ করলেন? সেই সত্তার শপথ আপনাকে যিনি নবীরূপে প্রেরণ করেছেন! আমি ত্রিশ বছর/ষাট বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদত করছি, তাঁর গুণকীর্তন করছি, তাসবীহ পাঠ করছি, অথচ এখনো আল্লাহর ভয়ে আমার শরীর কাঁপছে। ব্যাঙের এ কথা শুনে দাউদ আ. কেঁদে ফেললেন। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, উক্ত ঘটনা মূসা আ.-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 উজ্ব ও আত্মমুগ্ধতার ঔষধ

📄 উজ্ব ও আত্মমুগ্ধতার ঔষধ


ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. বলেন, যে আত্ম-অহমিকা ও আত্মমুগ্ধতা দূর করতে চায়, তাকে চারটি কাজ করতে হবে। যথা- ১. মনে করতে হবে যে, নেক কর্মের তাওফীক আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। ফলে মনে কৃতজ্ঞতার বোধ সৃষ্টি হবে এবং আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ২. আল্লাহর দেয়া নেয়ামত নিয়ে চিন্তা করা। তাহলে নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের চিন্তা জাগ্রত হবে এবং হৃদয়ে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ৩. নিজের আমল নিয়ে চিন্তা করা যে, হয়তো আল্লাহ তা'আলা আমার আমল গ্রহণ করবেন না। ফলে অন্তরে আমল কবুল না হওয়ার ভয় থাকবে। ফলে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ৪. অতীতের গুনাহসমূহের কথা চিন্তা করা। এভাবে সর্বদা নিজের গুনাহের চিন্তায় থাকলে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। তাছাড়াও এ কথা চিন্তা করা যে, মানুষ কী করে নিজের আমল নিয়ে আত্ম-অহমিকা করতে পারে অথচ সে জানেই না যে কিয়ামতের দিন তার আমলনামায় কী প্রকাশ পাবে? হাসি-আনন্দ তো আমলানামা হাতে আসার পর।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 সুপথে বা কুপথে পরিচালনাকারীর পরিণাম

📄 সুপথে বা কুপথে পরিচালনাকারীর পরিণাম


হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন- هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ 'এসো! তোমার আমলনামা পড়ো।'-এই আয়াত তো শুনতাম, কিন্তু জানতাম না, এই কথা কে কাকে বলবে? একদিন হযরত কা'ব রাযি. হযরত উমর রাযি.-এর নিকট এলেন। আমরাও সেখানে বসা ছিলাম। তিনি হযরত কা'বকে বললেন, কুরআনের সাথে সম্পর্কিত কিছু কথা শোনাও। হযরত কা'ব রাযি. বললেন, সকল মাখলুককে আল্লাহ তা'আলা একটি বিশাল মাঠে সমবেত করবেন। এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে। তার কথা সবাই শুনতে পারবে। দৃষ্টির আড়ালে কেউ থাকবে না। প্রত্যেক শ্রেণির লোকদেরকে তাদের নেতা সহকারে ডাকা হবে। সর্বপ্রথম হেদায়াতের পথপ্রদর্শককে তার অনুসারীদের আগে ডাকা হবে। সে আগে বাড়বে। তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে। তার পাপগুলো মানুষের চোখ থেকে আড়াল করে রাখা হবে। সেগুলো শুধুমাত্র সে-ই দেখতে পাবে। যেন নিজের আমলনামা দেখে তার জান্নাতে যাওয়ার ধারণা না হয়। আর তার ভালো কর্মগুলো এতটা দৃশ্যমান করা হবে যে, লোকজনও তা পড়তে পারবে। তারা বলবে, অমুকের জন্য সুসংবাদ। তার কত নেক কাজের কথা প্রকাশ পাচ্ছে। আর সে ব্যক্তি নিজে তার পাপগুলো পড়ে মনে মনে বলবে, আজ আমার কল্যাণ নেই। পড়তে পড়তে যখন আমলনামার শেষ প্রান্তে যাবে, তখন দেখতে পাবে, সেখানে লেখা আছে, 'আমি তোমাকে মাফ করে দিয়েছি' আর একটি নুরানী মুকুট তার মাথায় পরানো হবে। সেটার জ্যোতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। তাকে বলা হবে, তুমি গিয়ে তোমার সাথীদের সুসংবাদ শোনাও যে, তাদের সাথেও এইরূপ করা হবে। সে ফিরে গেলে হাশরের ময়দানে উপস্থিত সবাই তার দিকে তাকাবে। প্রত্যেকেই বলবে, হে আল্লাহ! এ যেন আমাদেরই নিকট আসে। হে আল্লাহ! তাকে আমাদের নিকট পাঠিয়ে দাও। সে তার সাথীদের নিকট গিয়ে বলবে, এসো! আমার আমলনামা পড়ো। আমাকে মাফ করা হয়েছে। আর তোমাদের জন্যও সুসংবাদ। তোমাদের সাথেও এরূপ করা হবে। কিন্তু যদি এই ব্যক্তি গোমরাহির নেতা হয়ে থাকে, তা হলে তাকে ডাকা হবে, দাঁড়ানো হবে, আর আমলনামা দেওয়া হবে। সে ডান হাতে তা নিতে চাইবে কিন্তু তা বেড়ির মতো হয়ে তার গলায় জড়িয়ে যাবে। তখন সে তা বাম হাত দিয়ে ধরবে। আর বাম হাতও কোমরের দিকে করে দেওয়া হবে। তা পড়ার জন্য তাকে ঘাড় বাঁকা করতে হবে। সে তার নেককর্মগুলো নিজেই পড়তে পারবে, যেন সে এ কথা বলতে না পারে যে, আমার বদকাজগুলোর কথাই লেখা হয়েছে, নেককাজগুলোর কথা লেখা হয়নি। আর তাকে বলা হবে, তুমি অমুক কাজটি করেছিলে, তার বিনিময়ে তুমি অমুক বদলাটি পেয়েছ। এভাবে তার একটিও নেকির বদলা বাকি থাকে না। আর তার পাপগুলোর কথা খুবই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেওয়া হবে। অন্যরাও তা পড়তে পারবে। তারা বলবে অমুক ব্যক্তি তো ধ্বংস হয়ে গেছে! দেখ, তার কত পাপের কথা প্রকাশ পাচ্ছে। আর তার আমলনামার শেষে লেখা থাকবে, 'তোমার জন্য আযাবের ফয়সালা করা হয়েছে।' এরপর তার মুখমণ্ডল অন্ধকার রাতের মত কালো করে দেওয়া হবে। আর আগুনের একটি মুকুট তার মাথায় বসিয়ে দেওয়া হবে, যার ধোঁয়া দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এরপর তাকে বলা হবে, তোমার সাথীদের নিকট যাও। তাদের এই সংবাদ শোনাও যে, তাদের সাথেও এরূপ করা হবে। এই ব্যক্তি ফিরে যাবে। হাশরে উপস্থিত সবাই তাকে দেখে বলবে, এ যেন আমাদের সাথী না হয়! হে আল্লাহ! একে আমাদের নিকট এনো না! যে দলের নিকট দিয়েই যাবে, সবাই তাকে অভিশাপ দেবে। তার প্রতি অসন্তুষ্ট প্রকাশ করবে। আর এ-ও তাদের অভিশাপ দিতে থাকবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ثُمَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَيَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا 'অতঃপর কিয়ামতের দিন একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরকে অভিশাপ দিতে থাকবে।' আর এই ব্যক্তি তাদের বলবে, তোমাদের জন্যও সুসংবাদ (!), তোমাদের সবার সাথে এইরূপ করা হবে।

عَنْ مَسْرُوقٍ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى، قَالَ : كَفَى بِالْمَرْءِ عِلْمًا أَنْ يَخْشَى اللَّهَ، وَكَفَى بِالْمَرْءِ جَهْلًا أَنْ يُعْجَبَ بِعَمَلِهِ।
হযরত মাসরূক রহ. বলেন, মানুষ জ্ঞানী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর তার অজ্ঞ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে নিজের আমল নিয়ে অহমিকা করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px