📄 আত্মমুগ্ধতা থেকে বেঁচে থাকা
হযরত শা'বী রহ. বলেন, জনৈক আবেদ যখন হাঁটতেন, মেঘখণ্ড তাকে ছায়া দিত। এরূপ দেখে এক ব্যক্তি বলল, আমিও তার ছায়ায় হাঁটব। কিন্তু সে আবেদ আত্ম-অহমিকা দেখিয়ে বলল, এর মত লোক আমার ছায়ায় হাঁটবে। কিছু দূর পথ চলার পর যখন তারা একে অপর থেকে পৃথক হয়ে গেল তখন ওই ছায়াটি অপর ব্যক্তির সাথে চলে গেল।
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: إِنَّ مِنْ صَلَاحِ تَوْبَتِكَ أَنْ تَعْرِفَ ذَنْبَكَ وَإِنَّ مِنْ صَلَاحِ عَمَلِكَ أَنْ تَرْفُضَ عُجْبَكَ، وَإِنَّ مِنْ صَلَاحِ شُكْرِكَ أَنْ تَعْرِفَ تَقْصِيرَكَ.
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমার তাওবা বিশুদ্ধ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হওয়ার আলামত হলো, তুমি তোমার গুনাহগুলো চিনবে। নেক আমল বিশুদ্ধ ও ফলাফলসমৃদ্ধ হওয়ার আলামত হলো, আত্ম-অহমিকা থেকে মুক্ত হওয়া। আর কৃতজ্ঞতা সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়ার আলামত হলো, নিজের ত্রুটি বিচ্যুতি সম্পর্কে জানা থাকা।
عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ كَانَ إِذَا خَطَبَ فَخَافَ الْعُجْبَ قَطَعَ وَإِذَا كَتَبَ فَخَافَ الْعُجْبَ مَزَّقَ، وَقَالَ : اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي.
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. খুতবা দেয়ার সময় যদি আত্ম-অহমিকা ও আত্মমুগ্ধতার ভয় করতেন, তাহলে খুতবা প্রদান বন্ধ করে দিতেন। যখন কিছু লিখতেন এবং আত্মমুগ্ধতার আশঙ্কা করতেন, তখন তা ছিঁড়ে ফেলতেন এবং বলতেন- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي অর্থ: হে আল্লাহ! নফসের অনিষ্ট থেকে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
عَنْ مُطَرِّفِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: لَأَنْ أَبِيتَ نَائِمًا وَأُصْبِحَ نَادِمًا، أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَبِيتَ قَائِمًا، وَأُصْبِحَ مُعْجَبًا.
মু'তাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. বলতেন, রাতভর ঘুমিয়ে অনুশোচনা নিয়ে ঘুম থেকে উঠা, সারারাত একনিষ্ঠভাবে নামায আদায় করার চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهَا، أَنَّهُ سَأَلَهَا رَجُلٌ فَقَالَ: مَتَى أَعْلَمُ أَنِّي مُحْسِنُ? قَالَتْ: إِذَا عَلِمْتَ أَنَّكَ مُسِيءٌ ، قَالَ: مَتَى أَعْلَمُ أَنِّي مُسِيءٌ? قَالَتْ: إِذَا عَلِمْتَ أَنَّكَ مُحْسِنٌ.
হযরত আয়েশা রাযি. কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, কখন বুঝতে পারব যে, আমি ভালো কাজ করছি? তিনি বললেন, যখন তোমার মাঝে এই অনুভূতি আসবে যে, মনে হয়, তুমি মন্দ লোক। লোকটি বলল, আমি কখন বুঝব যে মন্দ কাজ করছি? তিনি বললেন, যখন তোমার মাঝে এই অনুভূতি আসবে যে, মনে হয়, তুমি ভালো লোক। অর্থাৎ, নিজেকে ভালো মনে করাই মন্দ হওয়ার আলামত।
📄 নিজেকে জানা
বর্ণিত আছে, বনী ইসরাইলের জনৈক যুবক সংসারের মায়া ও যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে এক নির্জন স্থানে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়ে পড়ল। তার গোত্রের দু'জন বয়স্ক ব্যক্তি তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য তার নিকট গেল। তারা তাকে বলল, হে যুবক! তুমি তো কঠিন কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছ। তুমি একাজে ধৈর্যধারণ করে টিকে থাকতে পারবে না। যুবক বলল, মানুষের নির্জন স্থানে অবস্থান করার চেয়ে আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ানো অনেক কঠিন। তারা বলল, তোমার আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে তাদের মাঝে অবস্থান করে ইবাদত করাই তোমার জন্য উত্তম হবে। যুবক বলল, যদি আমার প্রতিপালক আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, তবে তিনি আমার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে সন্তুষ্ট করবেন। তারা বলল, তুমি যুবক মানুষ, বয়স তোমার অল্প, অভিজ্ঞতাও তোমার স্বল্প। আমরা এ বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখেছি। আমরা তোমার আত্মমুগ্ধতার ভয় করছি। যুবক বলল, যে তার নফসকে চিনতে পেরেছে, তাকে আত্মমুগ্ধতা ক্ষতি করতে পারবে না। তখন উক্ত ব্যক্তিদ্বয় ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বলল, নিশ্চয়ই যুবকটি জান্নাতের সুঘ্রাণ পেয়েছে! সে আমাদের কথা গ্রহণ করবে না।
📄 ইবাদতের সাথে আল্লাহর ভয়
বর্ণিত আছে, হযরত দাউদ আ. একদা সমুদ্র উপকূলে চলে গেলেন। সেখানে এক বছর আল্লাহর ইবাদত করলেন। বছর শেষে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে আমার রব! আমার পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে গেছে, অশ্রু শুকিয়ে গেছে। অথচ আমি এখনো জানতে পারিনি, আমার পরিণতি কী হবে? তখন আল্লাহ তা'আলা একটি ব্যাঙের নিকট এই মর্মে নির্দেশ পাঠালেন যে, তুমি দাউদের প্রশ্নের উত্তর দাও। ব্যাঙ বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি কি এক বছর ইবাদত করেই আপনার প্রতিপালককে খোঁটা দিতে আরম্ভ করলেন? সেই সত্তার শপথ আপনাকে যিনি নবীরূপে প্রেরণ করেছেন! আমি ত্রিশ বছর/ষাট বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদত করছি, তাঁর গুণকীর্তন করছি, তাসবীহ পাঠ করছি, অথচ এখনো আল্লাহর ভয়ে আমার শরীর কাঁপছে। ব্যাঙের এ কথা শুনে দাউদ আ. কেঁদে ফেললেন। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, উক্ত ঘটনা মূসা আ.-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
📄 উজ্ব ও আত্মমুগ্ধতার ঔষধ
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. বলেন, যে আত্ম-অহমিকা ও আত্মমুগ্ধতা দূর করতে চায়, তাকে চারটি কাজ করতে হবে। যথা- ১. মনে করতে হবে যে, নেক কর্মের তাওফীক আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। ফলে মনে কৃতজ্ঞতার বোধ সৃষ্টি হবে এবং আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ২. আল্লাহর দেয়া নেয়ামত নিয়ে চিন্তা করা। তাহলে নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের চিন্তা জাগ্রত হবে এবং হৃদয়ে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ৩. নিজের আমল নিয়ে চিন্তা করা যে, হয়তো আল্লাহ তা'আলা আমার আমল গ্রহণ করবেন না। ফলে অন্তরে আমল কবুল না হওয়ার ভয় থাকবে। ফলে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। ৪. অতীতের গুনাহসমূহের কথা চিন্তা করা। এভাবে সর্বদা নিজের গুনাহের চিন্তায় থাকলে আত্মম্ভরিতা ও আত্মমুগ্ধতা থাকবে না। তাছাড়াও এ কথা চিন্তা করা যে, মানুষ কী করে নিজের আমল নিয়ে আত্ম-অহমিকা করতে পারে অথচ সে জানেই না যে কিয়ামতের দিন তার আমলনামায় কী প্রকাশ পাবে? হাসি-আনন্দ তো আমলানামা হাতে আসার পর।