📄 আমল হতে নিয়ত উত্তম
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : نِيَّةُ الْمُؤْمِنِ خَيْرٌ مِنْ عَمَلِهِ.
আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ইরশাদ করেন, মুমিনের নিয়ত তার আমল অপেক্ষা উত্তম।
হাদীসের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো আহলে ইলম বলেন, উত্তম হওয়ার কারণ হলো, আমল না করলেও নিয়ত করার ফলে তাকে সওয়াব প্রদান করা হয়। আর নিয়ত না করে আমল করলেও সওয়াব প্রদান করা হয় না। কেউ কেউ বলেন, মুমিনের নিয়ত তার আমল অপেক্ষা উত্তম। কারণ, তার নিয়ত দীর্ঘ ও বিস্তৃত, কিন্তু আমল সংক্ষিপ্ত। সে যতদিন জীবিত থাকে, কল্যাণকর্মের নিয়ত অব্যাহত রাখে। কিন্তু জীবিত অবস্থায় তা আমলে পরিণত করা তার পক্ষে সম্ভব হতেও পারে, আবার নাও পারে। কেউ বলেন, নিয়ত উত্তম হওয়ার কারণ হলো, নিয়ত কলবের আমল। কলব মারেফাতের উৎস। যা মারেফাতের উৎস থেকে উৎসারিত, তা অন্য সবকিছু থেকে শ্রেষ্ঠতর।
হাদীসে এসেছে, রাসূল ইরশাদ করেন, জনৈক বান্দাকে কিয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। তার সাথে থাকবে পাহাড়সম নেক আমল। তখন এক ঘোষক ঘোষণা করবে, অমুক যদি কারো উপর জুলুম করে থাকে, তবে সে যেন এসে তা নিয়ে যায়। তখন অনেক লোক এসে তার পাহাড়সম নেকি থেকে তাদের উপর করা জুলুমের বিনিময় নিতে থাকবে। এমনকি তার নেককাজের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। বান্দা তখন দিশেহারা হয়ে যাবে। তখন তার আল্লাহ বলবেন, আমার কাছে তোমার একটি খাযানা বা ধন-ভাণ্ডার লুকানো আছে, যার সম্পর্কে আমি ফেরেশতা কিংবা কোনো মাখলুককেই জানাইনি। বান্দা বলবে, হে রব! কী সে ধন-ভাণ্ডার? আল্লাহ বলবেন, তা হলো, তোমার নিয়ত, যে নিয়ত তুমি কল্যাণের জন্য করেছিলে, আমি তাকে সত্তর গুণ বৃদ্ধি করে লিখে রেখেছি।
বর্ণিত আছে, বনী ইসরাইলের জনৈক আবেদ বালুর টিলার পাশ দিয়ে গমন করছিল। তার অন্তরে এ আকাঙ্ক্ষা জন্মাল যে, এগুলো যদি আটায় পরিণত হতো, তাহলে বনী ইসরাইলকে তৃপ্তিভরে আহার করাতে পারতাম। আর এতে তাদের উপর চেপে বসা ক্ষুধা দূর হয়ে যেত। তখন আল্লাহ তাদের নবীর নিকট ওহী পাঠালেন, আমার এ বান্দাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহ বলেছেন, সব বালু আটায় পরিণত হওয়ার পর সদকা করলে যে সওয়াব পাওয়া যেত, আমি তার জন্য সে পরিমাণ সওয়াব লিখে দিয়েছি।
বর্ণিত আছে, জনৈক বান্দাকে কিয়ামতের দিন তার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। সে তাতে হজ, উমরা, জেহাদ, যাকাত, সদকা ইত্যাদি আমল দেখতে পাবে। সে ভাববে, আমি তো এই আমল করিনি। হয়তো এ আমলনামা আমার নয়। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, এ আমলনামা তোমারই। তুমি জীবনভর এ আকাঙ্ক্ষা করতে যে, যদি আমার সম্পদ থাকত, তবে হজ্ব করতাম, জিহাদ করতাম। আমি তোমার নিয়তকে খাঁটি পেয়ে তোমাকে তার সওয়াব দান করেছি।
টিকাঃ
৩৫২. শুআবুল ঈমান: হাদীস-৬৮৬০; জামে সগীর: হাদীস-৯২৭৬; সনদ জয়ীফ তবে শাওয়াহেদ বিদ্যমান [শুয়াইব আরনাউত, তাখরীজে শরহে সুন্নাহ: ৬/২২৪] তবে মুল্লা আলী কারী বলেছেন, হাদীসটির কোন ভিত্তি নেই [আল-আসরারুল মারফুয়াহ হাদীস-৩৫৯]
📄 নিয়তের শুদ্ধতার আলামত
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, বান্দার নিয়ত তখনই খাঁটি বলে প্রমাণিত হবে, যখন সে তার নিকট রক্ষিত স্বল্প সম্পদেও কৃপণতা করবে না। উদাহরণত যদি কোনো ব্যক্তি হজের কাফেলা দেখে বলে, আমার সম্পদ থাকলে আমি হজ্ব করতাম। যেহেত আমার সামর্থ্য নেই, তাই আমার নিকট থাকা টাকা দু'টি হজের উদ্দেশ্যে গমনকারী ব্যক্তিকে দিয়ে দিলাম। তদ্রূপ যদি কেউ মুজাহিদকে দেখে বলে, আমার যদি সম্পদ থাকত, তাহলে আমিও জিহাদে যেতাম। যেহেত আমার সামর্থ্য নেই, তাহলে আমার নিকট থাকা টাকা দু'টি জিহাদের উদ্দেশ্যে গমনকারী ব্যক্তিকে দিয়ে দিলাম। এভাবে সে মুজাহিদকে দিয়ে দেয়, তাহলে বুঝা যাবে, তাঁর নিয়ত সঠিক ও বিশুদ্ধ। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রসমূহও। সুতরাং কেউ যদি এ সামান্য সম্পদে কৃপণতা করে, তাহলে তার নিকট অধিক সম্পদ থাকলেও সে কৃপণতাই করত। তাই তাকে নিয়তের এটির কারণে পুণ্যের সওয়াব দেওয়া হয় না।
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نِيَّةُ الْمُؤْمِنِ خَيْرٌ مِنْ عَمَلِهِ وَعَمَلُ الْمُنَافِقِ خَيْرٌ مِنْ نِيَّتِهِ، وَكُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى نِيَّتِهِ.
আবূ মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, মুমিনের নিয়ত আমল থেকে উত্তম। আর মুনাফিকের আমল নিয়ত থেকে উত্তম। প্রত্যেকে নিয়ত অনুসারে কাজ করে।
📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও বিদ্বেষ পোষণ করা
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَليَّ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : مَنْ أَحَبَّ رَجُلًا فِي اللَّهِ لِعَدْلٍ ظَهَرَ مِنْهُ، وَهُوَ فِي عِلْمِ اللهِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ آجَرَهُ اللَّهُ عَلَى حُبِّهِ إِيَّاهُ، كَمَا لَوْ أَحَبَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ وَمَنْ أَبْغَضَ رَجُلًا فِي اللهِ لِجَوْرٍ ظَهَرَ مِنْهُ، وَهُوَ فِي عِلْمِ اللَّهِ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، أَجَرَهُ اللهُ عَلَى بُغْضِهِ إِيَّاهُ، كَمَا لَوْ كَانَ يُبْغِضُ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ النَّارِ.
মুহাম্মাদ ইবনে আলী রাসূল থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল ইরশাদ করেছে, কেউ যদি কাউকে তার ভালো গুণের কারণে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসে, অথচ সে আল্লাহর ইলম অনুযায়ী জাহান্নামী, তবুও আল্লাহ একজন জান্নাতী মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে যে সওয়াব সে সওয়াব দান করবেন। অনুরূপ কেউ যদি কাউকে তার মন্দ গুণের কারণে আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা কারে, অথচ সে আল্লাহর ইলম অনুসারে জাহান্নামী, তাহলে একজন জাহান্নামীর সাথে বিদ্বেষ রাখলে যে সওয়াব আল্লাহ তাকে সে সওয়াব দান করবেন।
টিকাঃ
৩৫৩. প্রাগুক্ত।
৩৫৪. আল-মুজামুল কাবীর, তুবারানী: ৫/৯৭;
📄 মূসা আ.-এর একটি ঘটনা
বর্ণিত আছে, একদা আল্লাহ তা'আলা মূসা আ. কে জিজ্ঞেস করলেন, হে মূসা! আমার জন্য কখনো কি কোনো আমল করেছ? মূসা আ. বললেন, হে আমার ইলাহ! আপনার জন্য নামায আদায় করেছি, রোযা রেখেছি, সদকা করেছি, যিকির করেছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, নামায তো তোমার সপক্ষে দলীল, রোযা তোমার ঢাল, সদকা তোমার জন্য ছায়া, আর যিকির তোমার জন্য আলো। তাহলে আমার জন্য কী আমল করলে? মূসা আ. বললেন, হে আমার ইলাহ! কোন্ আমল শুধুমাত্র আপনার জন্য, তা আমাকে বলে দিন। আমি তাই করব। আল্লাহ তা'আলা বললেন, হে মুসা! তুমি কি আমার কোনো প্রিয় বান্দার সাথে বন্ধুত্ব করেছ বা আমার শত্রুর সাথে শত্রুতা পোষণ করেছ? তখন মূসা আ. বুঝতে পারলেন যে, সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করা।