📄 আবু দারদা ও ইবনে মাসউদ রাযি.-এর ভাষ্য
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ : لَأَنْ أَتَعَلَّمَ مَسْأَلَةً أَحَبُّ مِنْ قِيَامِ لَيْلَةٍ.
হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট একটি মাসআলা শিক্ষা করা রাত জেগে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ : أَنْتُمْ فِي زَمَنِ الْعَمَلُ فِيهِ خَيْرٌ مِنَ الْعِلْمِ وَسَيَأْتِي زَمَنٌ الْعِلْمُ فِيهِ خَيْرٌ مِنَ الْعَمَلِ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা এমন যুগে রয়েছো, যখন ইলমের চেয়ে আমল উত্তম। আর অচিরেই এমন যুগ আসবে, যখন আমলের চেয়ে ইল্ম হবে উত্তম।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : أَفْضَلُ الْأَعْمَالِ عَلَى ظَهْرِ الْأَرْضِ ثَلَاثَةٌ : طَلَبُ الْعِلْمِ، وَالْجِهَادُ، وَالْكَسْبُ، لِأَنَّ طالِبَ الْعِلْمِ حَبِيبُ اللهِ، وَالْغَازِي وَلِيُّ اللَّهِ، وَالْكَাসِبُ صَدِيقُ اللهِ.
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, পৃথিবীতে তিনটি আমল সর্বশ্রেষ্ঠ। ১. ইলম অর্জন করা। ২. জিহাদ করা। ৩. হালাল উপার্জন করা। কারণ, তালিবে ইলম আল্লাহ তা'আলার প্রিয় ব্যক্তি। মুজাহিদ আল্লাহ তা'আলার ওলী। আর হালাল উপার্জনকারী আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِغَيْرِ اللَّهِ لَمْ يَخْرُجْ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى يَأْتِيَ عَلَيْهِ الْعِلْمُ، فَيَكُونَ لِلَّهِ، وَمَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِلَّهِ، فَهُوَ كَالصَّائِمِ نَهَارِهِ وَالْقَائِمِ لَيْلِهِ، وَإِنَّ بَابًا مِنَ الْعِلْمِ يَتَعَلَّمُهُ الرَّجُلُ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَبُو قُبَيْسٍ ذَهَبًا، فَأَنْفَقَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى.
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইলম শিখবে, মৃত্যুর পূর্বেই ইলম তার প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে। তারপর তা আল্লাহর জন্য হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ইলম শিখবে, সে দিনে রোযা রাখা আর রাতে নামায পড়ার ফযীলত লাভ করবে। আর ইলমের একটি অধ্যায় শিখা, আবূ কুবাইস পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করার চেয়ে উত্তম।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষের জন্য কতক্ষণ পর্যন্ত ইলম অর্জন করা উচিত? তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত অজ্ঞ থাকাকে অপছন্দ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য ইলম অর্জন করা উচিত। বর্ণিত আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. মুমূর্ষু অবস্থায় ছিলেন। তখন তাঁর পাশে বসে এক ব্যক্তি তাকে কিছু ইলমী কথা লিখে দিচ্ছিল। তাঁকে বলা হলো, এই অবস্থায়ও ইলমী আলোচনা? তিনি বললেন, হয়তো যে কথাটি আমার উপকার করবে, তা এখনো আমার নিকট পৌঁছেনি।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা ইলম অর্জন কর। ইলম শিক্ষা করা নেক কাজ, অন্বেষণ করা ইবাদত, আলোচনা করা তাসবীহ, গবেষণা করা জিহাদ, মূর্খকে শিক্ষা দেওয়া সদকা। আর আলিমের নিকট আলোচনা করা আল্লাহর নৈকট্যলাভ। শুনে রাখ, ইলম জান্নাতীদের জান্নাতের পথ, নির্জনতার বন্ধু, সফরের সাথী, মানবহীন স্থানে আলাপকারী, সুখ শান্তির পথপ্রদর্শক, বিপদে সহায়ক, বন্ধুদের নিকট অলঙ্কার, আর শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বহু জাতিকে উন্নত করেছেন, কল্যাণের পথে তাদেরকে ইমাম বানিয়েছেন, নেতৃত্ব দান করেছেন। তারা অনুসৃত, অনুসারী নয়। তাদের কার্যাবলির অনুকরণ করা হয়। ফেরেশতাগণ তাদের সহায়তা করেন, তাদের জন্য পাখা মেলে ধরেন। শুকনো ও আর্দ্র সকল বস্তুই তাদের জন্য দোয়া করে। এমনকি সমুদ্রর মাছ, পৃথিবীর পোকা-মাকড়, জল ও স্থলের হিংস্র প্রাণী, গৃহপালিত পশু সব কিছু তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। কারণ, ইলম হলো হৃদয়ের প্রাণ, আঁধারের আলো, শরীরের শক্তি। ইলম দ্বারা মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে মহান ব্যক্তিদের স্তরে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ইলমী চিন্তা ফিকির করা, রোযা রাখার সমতুল্য, ইলমী আলোচনা রাতের ইবাদতের সমান। ইলমের মাধ্যমেই আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা হয়, আর এর দ্বারাই হালাল-হারাম চেনা যায়। ইলম হলো, ইমাম আর আমল হলো, মুক্তাদী। যারা সৌভাগ্যবান তারাই এর তাওফীক লাভ করে। আর যারা হতভাগা তারাই এর থেকে বঞ্চিত হয়।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, আমার জানা মতে ইলম অর্জন ছাড়া জিহাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো আমল নেই। যে ইলম অর্জনের জন্য আল্লাহর পথে বের হয়, ফেরেশতাগণ তাকে তাদের পাখা দ্বারা ঘিরে রাখেন। আকাশের পাখি, স্থলের হিংস্র প্রাণী, সমুদ্রের মাছেরা তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বাহাত্তর জন সিদ্দীকের সওয়াব দান করেন। সুতরাং তোমরা ইলম অর্জন কর। আর ইলমের জন্য ধ্যানমগ্নতা, সহনশীলতা ও গাম্ভীর্য ভাব অর্জন কর। যার থেকে ইলম শিখবে, আর যাকে ইলম শিক্ষা দান করবে, তাদের সাথে বিনম্র ব্যবহার কর। ইলম নিয়ে আলেমদের সাথে গর্ব কর না। ইলম দ্বারা নির্বোধ লোকদের সাথে ঝগড়া কর না। ইলমকে আমীর-উমারার নিকট গমনের হাতিয়ার বানিয়ো না। আল্লাহর বান্দাদের সাথে এ নিয়ে বড়াই কর না। তাহলে অহঙ্কারী আলিমদের মধ্যে গণ্য হবে। এ ধরনের আলেমদেরকে আল্লাহর গজব পাকড়াও করবে এবং তাদেরকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা এমন ইলম অর্জন কর যা আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের ক্ষেত্রে ক্ষতি করবে না। আল্লাহ তা'আলার এমন ইবাদত কর যা তোমাদের ইলম অর্জনে ক্ষতি করবে না। কারণ, ইলমহীন ইবাদত দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না। তোমরা ঐসব লোকের মতো হয়ো না, যারা ইলম অর্জন না করে ইবাদতে মগ্ন থাকে। তারপর তারা যখন শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে যায়, তখন তরবারী নিয়ে মানুষের উপর আক্রমণ করে। যদি তারা ইলম অর্জন করত, তাহলে ইলম তাদেরকে তাদের এ কাজ থেকে বাধা প্রদান করত। ইলমহীন আমলকারী আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী। সে যতই সাধনা করে, ততই দূরে সরে যায়। সে যা সংশোধন করে, তার চেয়ে বেশি নষ্ট করে। জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, হে আবূ সাঈদ! আপনি এগুলো কার নিকট থেকে শুনে বলছেন? তিনি বললেন, আমি সত্তর জন বদরী সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছি এবং চল্লিশ বছরে এ কথাগুলো অর্জন করেছি।
হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে লোক সকল! কী হল? আমি দেখছি তোমাদের আলিমগণ দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছে অথচ অজ্ঞরা তার ইলম অর্জন করছে না। ইলম উঠে যাওয়ার পূর্বেই তোমরা তা অর্জন কর। কারণ, আলিমগণ চলে যাওয়া মানেই ইলম উঠে যাওয়া।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمْ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : إِنَّ اللَّهَ لَا يَرْفَعُ الْعِلْمَ بِقَبْضٍ يَقْبِضُهُ، وَلَكِنِ الْعُلَمَاءَ بِعِلْمِهِمْ، حَتَّى إِذَا لَمْ يَبْقَ عَالِمُ اتَّخَذَ النَّاسُ رُؤَسَاءَ جُهَّالًا، فَيُسْأَلُونَ فَيُحَدِّثُونَ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, "নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা লোকদের নিকট থেকে ইলম ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে তা তুলে নিবেন না; বরং আলিম সম্প্রদায়কে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম তুলে নিবেন (অর্থাৎ, আলিম দুনিয়া থেকে শেষ হয়ে যাবে।) অবশেষে যখন কোনো আলিম বাকি থাকবে না, তখন জনগণ মূর্খ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে এবং তাদেরকে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হবে, আর তারা না জেনে ফতোয়া দেবে, ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অপরকেও পথভ্রষ্ট করবে।"
টিকাঃ
২৪১. হাফেজ ইরাকী বলেন, হাদীসটির সনদ জয়ীফ তবে শক্তিশালী শাওয়াহেদ বিদ্যমান [তাখরীজুল এহইয়া; আল-বায়েস হাদীস-২৭; আল-ইতহাফ: ১/২০৫]।
২৪২. হাদীসটির সনদ জয়ীফ।
২৪৩. জামে' বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী ১/৫৪; আত-তারগীব লি-মুনযিরী হাদীস-১০৭; হাদীসটিকে হাফেয মুনযিরী গরীব জিদ্দান ও শায়েখ আলবানী জাল বলেছেন।
২৪৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-১০০; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৬৭৩।
📄 ইলম সম্পর্কে বিদ্বানদের ভাষ্য
عَنِ ابْنِ الْمُبَارَكِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، أَنَّهُ قِيلَ لَهُ: لَوْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَيْكَ أَنَّكَ مَيِّتُ الْعَشِيَّةَ مَا أَنْتَ صَانِعُ الْيَوْمَ؟ قَالَ: أَطْلُبُ فِيهِ الْعِلْمَ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, যদি আল্লাহ তা'আলা আপনার নিকট এই ওহী প্রেরণ করেন যে, আজ সন্ধ্যায় আপনার মৃত্যু হবে, তাহলে সারাদিন আপনি কী করবেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি ইলম অর্জন করবো।
عَنْ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ، قَالَ: لَا يَسْتَاكُ الْفَقِيهُ فِي الصَّلَاةِ قِيلَ: وَكَيْفَ ذَلِكَ؟ قَالَ: لِأَنَّكَ لَا تَلْقَاهُ إِلَّا وَذِكْرُ اللَّهِ تَعَالَى عَلَى لِسَانِهِ، يَحِلُّ حَلَالًا وَيُحَرِّمُ حَرَامًا.
হযরত ইবরাহিম নাখাঈ রহ. বলেন, ফকীহ সবসময় নামাযে থাকে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, তুমি যখন তার সাক্ষাতে যাবে, দেখবে তার মুখ আল্লাহর যিকির করছে, হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম বলছে। বলা হয়, আলিমগণ স্বীয় যামানার জন্য আলোকবর্তিকা স্বরূপ। তার থেকে অন্যরা আলো গ্রহণ করে।
হযরত সালেম বিন আবুল জাঁদ রহ. বলেন, আমার মনিব আমাকে আযাদ করে দেওয়ার পর আমি মনে মনে ভাবলাম, কোন পেশা গ্রহণ করবো? অবশেষে ইলম অর্জনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিলাম। এর কিছুদিন পর খলিফা আমার দরবারে আসলে, তাকে আমি প্রবেশের অনুমতি দেইনি।
সালেহ মুররি রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি আমিরুল মুমিনের নিকট গেলেন। আমিরুল মুমিনীন তাকে নিজ আসনে বসালেন। তিনি বললেন, হাসান সত্যিই বলেছিলেন। আমিরুল মুমিনীন জিজ্ঞেস করলেন, হাসান কী বলেছিলেন? তিনি বললেন, হাসান বলেছিলেন, ইলম অভিজাত লোকদের আভিজাত্য বৃদ্ধি করে, আর গোলামদেরকে আজাদ ব্যক্তির মর্যাদায় উপনীত করে। তা নাহলে, সালেহ মুররির ইলম ছাড়া কিইবা আছে যে, খলিফা তাকে স্বীয় আসনে বসাবেন?
হযরত আনাস রাযি. বলেন, ইলম অর্জন কর, যদিও চিনে গিয়ে হয়। কারণ, ইলম তলব করা প্রত্যেকের উপর ফরয।
হযরত আওন ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি হযরত আবূ যর রাযি.-এর নিকট এসে বলল, আমি ইলম অর্জন করতে চাই। তবে ভয় হয় যে, আমি তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবো না এবং ইলম মোতাবেক আমল করতে পারব না। আবু যর গিফারী রাযি. তাকে বললেন, বেটা! মূর্খ ও জাহেল থাকার চেয়ে আলেম হওয়া অনেক ভালো। অতঃপর সে ব্যক্তি হযরত আবূ দারদা রাযি.-এর নিকট গেল এবং অনুরূপ কথাই বলল। আবু দারদা রাযি. তাকে বললেন, মানুষ যে অবস্থায় মারা যাবে সে অবস্থাতেই পুনরুত্থিত হবে। আলিম ব্যক্তি আলিম অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে, আর জাহেল ব্যক্তি জাহেল অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর লোকটি হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর নিকট গিয়ে অনুরূপ বলল। আবূ হুরায়রা রাযি. তাকে বললেন ইলম বর্জন করার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর আর কিছুই পাবে না।
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করার চেয়ে আল্লাহর নিকট উত্তম কিছু নেই। একজন ফিকাহবিদ শয়তানের সামনে হাজার আবেদের চেয়ে শক্তিশালী। প্রত্যেক বস্তুর একটি স্তম্ভ রয়েছে। দীনের স্তম্ভ হলো, ফিকাহ অর্থাৎ, দীনী বিধি-বিধানের স্তম্ভ হলো, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা।
বলা হয়, একদা বসরার লোকেরা মতবিরোধে লিপ্ত হলো। একদল বলল, ধন- সম্পদের চেয়ে ইলম উত্তম। আরেক দল বলল, ইলমের চেয়ে ধন-সম্পদ উত্তম। তারা ইবনে আব্বাস রাযি.-এর নিকট একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করল। প্রতিনিধি এসে ইবনে আব্বাস রাযি.-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, ইলমই উত্তম। প্রতিনিধি বলল, তারা আমার নিকট প্রমাণ চাইলে আমি কী বলব? ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, তাদের বলে দাও, এর প্রমাণ হলো- ১. ইলম নবীদের উত্তরাধিকার, আর ধন-সম্পদ ফেরআউনের উত্তরাধিকার। ২. ইলম তোমাকে হেফাজত করে আর ধন-সম্পদ তোমাকে হেফাজত করতে হয়। ৩. আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকেই ইলম দান করেন। আর ধন-সম্পদ যাকে ভালোবাসেন তাকেও দেন আর যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দান করেন। বরং যাকে ভালোবাসেন না তাকে বেশি দান করেন। তুমি কি আল্লাহর সে কথাটি চিন্তা করেছ, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন- وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ অর্থ: যদি সব মানুষ একই জাতিতে পরিণত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তবে যারা পরম করুণাময়ের প্রতি কুফরী করে আমি তাদের গৃহসমূহের জন্য রৌপ্যনির্মিত ছাদ ও ঊর্ধ্বে আরোহণের সিঁড়ি তৈরি করে দিতাম। ৪. জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে কমে না। পক্ষান্তরে ধন-সম্পদ বিতরণ করার দ্বারা কমে যায়। ৫. সম্পদশালী ব্যক্তি মারা গেলে সবাই তাকে ভুলে যায়। পক্ষান্তরে কোনো আলিম মারা গেলে মানুষ তাকে কখনো বিস্মৃত হয় না। ৬. সম্পদশালী ব্যক্তি হলো, মৃত পক্ষান্তরে আলিম জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। ৭. সম্পদশালীকে তার প্রত্যেকটি সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে- সে কোথা থেকে তা অর্জন করেছে এবং কোথায় খরচ করেছে। পক্ষান্তরে আলিমের প্রত্যেকটি হাদীসের বিনিময়ে জান্নাতে একটি মর্যাদা রয়েছে।
টিকাঃ
২৪৫. চীন সংক্রান্ত হাদীসটি জাল। যা রাসূল সা. এর বাণী হিসেবে বলা কোনভাবেই জায়েয নেই। ইবনে হিব্বান বলেন, এই হাদীসটি বাতিল যার কোন ভিত্তি নেই [আয-যুয়াফা লিল-উকাইলী: ২/২৩০; তানযীহুশ শারীয়াহ লি-ইবনে আররাক: ১/২৫৮]।
২৪৬. হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নেই। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে জয়ীফ সনদে হাদীসটি তার বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে [ত্ববারানী আওসাত: হাদীস-৬১৬৬; হিলইয়া: ২/১৯২; শুআবুল ঈমান ৪/৩৪১; আল-ইলালুল মুতানাহিয়া: ১/১২৭; আলমিফতাহ লি-ইবনেল কায়্যিম হাদীস-৬৯; তাখরীজুল এহইয়া হাদীস-২৯]।
২৪৭. সূরা যুখরুফ: আয়াত-৩৩।
📄 মানুষের প্রকারভেদ
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ كَرَّمَ اللهُ وَجْهَهُ، أَنَّهُ قَالَ: النَّاسُ ثَلَاثَةٌ عَالِمٌ رَبَّانِيُّ، وَمُتَعَلَّمٌ عَلَى سَبِيلِ النَّجَاةِ، وَسَائِرُ النَّاسِ هَمَجٌ رِعَاعٌ أَتْبَاعُ كُلِّ نَاعِقٍ، يَمِيلُونَ مَعَ كُلِّ رِيحٍ.
হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রাযি. বলেন, মানুষ তিন প্রকারে বিভক্ত। যথা- ১. আল্লাহভীরু আলেম। ২. নাজাত প্রত্যাশী তালিবে ইলম। এ দু'জন নাজাতের পথে আছে। ৩. এই দুই প্রকার ব্যতীত তৃতীয় পক্ষ। এরা সকলে ক্ষুধার্ত। সর্বদা নিম্নমানের দ্রব্য আহরণের প্রতি ছুটে চলেছে।
📄 ইলম ও সম্পদ হতে উত্তম
হযরত আলী রাযি. আরো বলেন, ইলম সম্পদের চেয়ে উত্তম। কারণ, ইলম তোমাকে পাহারা দেবে আর তুমি সম্পদকে পাহারা দিবে। ইলম দান করলে বৃদ্ধি পায় আর সম্পদ খরচ করলে কমে যায়। আর আলিমগণ মরেও অমর থাকে।
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ : الْعَالِمُ وَالْمُتَعَلَّمُ فِي الْأَجْرِ سَوَاءُ، وَإِنَّمَا النَّاسُ رَجُلَانِ : عَالِمٌ وَمُتَعَلَّمُ وَلَا خَيْرَ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ.
হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলিম আর তালিবে ইলম প্রতিদান লাভ ও সওয়াবের ক্ষেত্রে বরাবর। আর পৃথিবীতে ভালো মানুষ তো কেবল এ দুই শ্রেণীর মানুষ। এ ছাড়া বাকীদের মধ্যে কল্যাণ নেই।