📄 সাহচর্য লাভ করা
হযরত হাসান রহ. বলেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ 'যে যাকে ভালোবাসে পরকালে সে তার সাথে থাকবে।'
এ উক্তি যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে। কেননা নেক্কারদের অনুরূপ আমল না করে তাদের সাহচর্য লাভ হতে পারে না। ইহুদী নাসারা এবং বিদআতীদেরও তো তাদের নবীদের প্রতি ভালোবাসা আছে। তারা কি পরকালে তাদের সঙ্গী হতে পারবে?
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ: مَنِ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ، وَمَنْ كَانَ غَدُهُ شَرًّا مِنْ يَوْمِهِ، فَهُوَ مَلْعُونٌ، وَمَنْ لَمْ يَكُنْ فِي الزَّيَادَةِ، فَهُوَ فِي النُّقْصَانِ، وَمَنْ كَانَ فِي النُّقْصَانِ فَالْمَوْتُ خَيْرٌ لَهُ.
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তির দুই দিন (আজ ও আগামীকাল) বরাবর সে ক্ষতিগ্রস্ত। যার আগামীকাল আজকের চেয়ে মন্দ সে অভিশপ্ত। প্রতিদিন যার নেক আমল বৃদ্ধি পায় না সে লোকসানের মধ্যে আছে। আর যে লোকসানের মধ্যে আছে তার মরে যাওয়াই ভালো।
عَنْ كَعْبِ الْأَحْبَارِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى دَارًا مِنْ زُمُرُّدَةٍ، أَوْ مِنْ لُؤْلُؤَةٍ، فِيهَا سَبْعُونَ أَلْفَ دَارٍ، وَفِي كُلِّ دَارٍ سَبْعُونَ أَلْفَ بَيْتٍ لَا يَنْزِلُهَا إِلَّا نَبِيٌّ، أَوْ صِدِّيقٌ أَوْ شَهِيدٌ، أَوْ إِمَامٌ عَادِلٌ، أَوْ رَجُلٌ مُحَكَّمٌ فِي نَفْسِهِ. قِيلَ: وَمَا الْمُحَكَّمُ فِي نَفْسِهِ? قَالَ: الَّذِي يَعْرِضُ لَهُ الْحَرَامُ، فَيَتْرُكُهُ مَخَافَةَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
হযরত কা'ব আল-আহবার রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলার মণি-মুক্তার একটি বালাখানা আছে। তার ভেতর সত্তরটি ঘর আছে, প্রতিটি ঘরে সত্তরটি কক্ষ আছে। এই বালাখানায় স্থান পাবেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ, ন্যায়পরায়ণ শাসক কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আত্মনিয়ন্ত্রণকারী কে? তিনি বলেলেন, যার সামনে হারাম পরিবেশন করা হলে আল্লাহর ভয়ে সে তা বর্জন করে।
টিকাঃ
১৪০. দাইলামী রহ. হাদীসটি জয়ীফ সনদে বর্ণনা করেছেন [কাশফুল খফা লি-আজলুনী: ২/৩০৫; আল-মাকাসেদুল হাসানাহ লিস-সাখাবী: ৪৭১]।
📄 হযরত হানযালা রাযি.-এর ঘটনা
عَنْ حَنْظَلَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً رَقَّتْ لَهَا الْقُلُوبُ، وَذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ، وَعَرَّفَتْنَا أَنْفُسَنَا. فَدَنَتْ مِنِّي الْمَرْأَةُ وَجَرَى بَيْنَنَا مِنْ حَدِيثِ الدُّنْيَا، فَنَسِيتُ مَا كُنَّا عَلَيْهِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَأَخَذْنَا فِي حَدِيثِ الدُّنْيَا، ثُمَّ تَذَكَّرْتُ مَا كُنْتُ فِيهِ فَقُلْتُ فِي نَفْسِي: قَدْ نَافَقْتُ حِينَ تَحَوَّلَ عَنِّي مَا كُنْتُ فِيهِ مِنَ الْخَوْفِ وَالرِّقَةِ وَالْحُزْنِ، فَخَرَجْتُ فَجَعَلْتُ أُنَادِي نَافَقَ حَنْظَلَةُ. فَاسْتَقْبَلَنِي أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ فَقَالَ : كَلَّا لَمْ تُنَافِقْ يَا حَنْظَلَةُ فَدَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ وَأَنَا أَقُولُ: نَافَقَ حَنْظَلَةُ، نَافَقَ حَنْظَلَةُ فَقَالَ: كَلَّا لَمْ تُنَافِقْ يَا حَنْظَلَةُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ: كُنَّا عِنْدَكَ، فَوَعَظْتَنَا مَوْعِظَةً، وَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ، وَذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَعَرَّفَتْنَا أَنْفُسَنَا، فَرَجَعْتُ إِلَى أَهْلِي، فَأَخَذْنَا فِي حَدِيثِ الدُّنْيَا، وَنَسِيتُ مَا كُنَّا عِنْدَكَ عَلَيْهِ فَقَالَ: يَا حَنْظَلَةُ إِنَّكُمْ لَوْ كُنْتُمْ عَلَى تِلْكَ الْحَالَةِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ فِي الطَّرِيقِ وَلَزَارَتْكُمْ فِي دُورِكُمْ، وَ عَلَى فِرَاشِكُمْ، وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً فَسَاعَةً.
হযরত হানযালা রাযি. বলেন, একদা আমরা কয়েকজন রাসূল -এর দরবারে বসা ছিলাম। তিনি আমাদেরকে নসীহত করলেন। ফলে আমাদের অন্তরগুলো বিনম্র হলো, চোখ অশ্রুসিক্ত হলো এবং আমরা আমাদের নিজেদের স্বরূপ উপলব্ধি করলাম। কিছুক্ষণ পর রাসূলের দরবার থেকে উঠে বাড়িতে এলাম। স্ত্রী আমার কাছে এলো। আমরা সংসারের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হয়ে গেলাম। তখন রাসূলের দরবারে থাকাকালে মনের যে ভাব হয়েছিল তা কেটে গেল। বিষয়টি উপলব্ধি করে ভাবলাম, আমি তো মুনাফিক হয়ে গেছি। সাথে সাথে ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার করতে লাগলাম, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। পথে আবু বকরের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে বললেন, না, হানযালা! তুমি কিছুতেই মুনাফিক হওনি। আমি রাসূলের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসূল বললেন, না, হানযালা তুমি মুনাফিক হওনি। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার মজলিসে উপস্থিত থাকি, তখন আপনি আমাদেরকে উপদেশ দেন আর আমাদের হৃদয়গুলো নরম হয়ে যায়, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। কিন্তু যখন আপনার নিকট থেকে উঠে বাড়িতে যাই এবং দুনিয়ার আলোচনা শুরু করি তখন আপনার দরবারে মনের যে ভাব থাকে তা হারিয়ে যায়। রাসূল ইরশাদ করলেন, হানযালা! তোমরা যদি সর্বক্ষণ সে অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা পথে পথে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত, বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করত। হানযালা! আস্তে আস্তে হবে।
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল -এর নিকট এই আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলাম-
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ
অর্থ: তারা তাদের কর্ম করে আর তাদের অন্তরগুলো ভয়ে কাঁপতে থাকে। এ আয়াতে কি ওই সমস্ত গুনাহগারদের কথা বলা হয়েছে, যারা গুনাহ করে আল্লাহর ভয়ে কাঁপতে থাকে? রাসূল ইরশাদ করলেন, না, বরং এখানে পরহেজগারদের কথা বলা হয়েছে। নেক আমল করেও তাঁদের অন্তরে এ ভয় থাকে যে, হয়ত আল্লাহর দরবারে তাঁদের আমল কবুল হবে না।
টিকাঃ
১৪১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৭৫০; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৫১৪।
১৪২. সূরা মুমিনুন: আয়াত-৬০
১৪৩. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-৩১৭৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪১৯৮; মুসনাদে আহমাদ: ৪২/৪৬৫। হাদীসটি সহীহ।
📄 নেককাজের ব্যাপারে ভয়
ফকীহ সমরকন্দী রহ বলেন, নেক্কারের মনে চারটি বিষয়ের ভয় থাকা উচিত।
১. খাউফুল ক্ববুল অর্থাৎ, তার আমল কবুল না হওয়ার ভয়। কারণ, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
অর্থ : আল্লাহ শুধু মুত্তাকীদের আমল কবুল করে থাকেন।
২. খাউফুর রিয়া অর্থাৎ, লৌকিকতার (লোক দেখানোর) ভয়। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
অর্থ: একনিষ্ঠ হয়ে সকল নবীকে আল্লাহর ইবাদতের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. খাউফুত তাসলীম ওয়াল হিফজ অর্থাৎ, আমল হেফাজতের ভয়। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
অর্থ: যে ব্যক্তি একটি নেক আমল নিয়ে আসবে সে তার দশগুন প্রতিদান দেওয়া হবে। এ আয়াতে একটি নেকি করলে তার দশগুন প্রতিদান পাওয়া যাবে এমন বলা হয়নি। বরং শর্তযুক্ত করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন একটি নেকি নিয়ে হাজির হতে পারবে সে একটি নেকির সওয়াব দশগুন পাবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন নেকি নিয়ে হাজির হওয়া অনেক কঠিন। তাই যে আমল সংরক্ষণ করতে পারবে এবং কিয়ামতের দিন তা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারবে, তাকেই আমলের প্রতিদান দেওয়া হবে।
৪. খাউফুল খিজলান ফীত তওয়াআত অর্থাৎ, আল্লাহর তাওফীক না হওয়ার ভয়। কারণ, আল্লাহ যে তাকে অব্যাহতভাবে নেক আমল করার তাওফীক দিবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِليْهِ أُنِيبُ
অর্থ: আমার তাওফীকের একমাত্র উৎস আল্লাহ্ আমি তার উপরই ভরসা করেছি এবং আমি তারই অভিমুখী।
টিকাঃ
১৪৪. সূরা মায়েদা: আয়াত-২৭
১৪৫. সূরা বাইয়িনা: আয়াত-৫
১৪৬. আনআম: আয়াত-১৬০
১৪৭. সূরা হুদ: আয়াত-৮৮