📄 ধ্বংসকারী ও মুক্তকারী তিন বিষয়
عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: ثَلَاثُ مُنْجِيَاتٌ وَثَلَاثُ مُهْلِكَاتٌ. فَأَمَّا الْمُهْلِكَاتُ فَشُحٌّ مُطَاعٌ، وَهَوَى مُتَّبَعٌ، وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ، وَأَمَّا الْمُنْجِيَاتُ فَالْعَدْلُ فِي الرِّضَا وَالْغَضَبِ، وَالاقْتِصَادُ فِي الْفَاقَةِ وَالْغِنَى، وَخَشْيَةُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي السِّرِّ وَالْعَلَانِيَةِ.
হযরত হাসান রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তিনটি বিষয় ধ্বংসকারী ও তিনটি বিষয় মুক্তকারী। ধ্বংসকারী তিনটি হলো- ১. লোভের আনুগত্য। ২. প্রবৃত্তির অনুসরণ। ৩. আত্মমুগ্ধতা। মুক্তকারী তিনটি বিষয় হলো- ১. রাগ ও সন্তুষ্টি উভয় অবস্থাতেই ন্যায়ের উপর থাকা। ২. অভাব ও সচ্ছলতা উভয় অবস্থাতেই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। ৩. প্রকাশ্যে ও গোপনে উভয় অবস্থাতেই আল্লাহকে ভয় করা।
টিকাঃ
১৩০. শুআবুল ঈমান: হাদীস-৭৪৫; জামেউ বয়ানিল ইলম: ১/১৪২; হাদীসটি হাসান [সহীহুল জামে': হাদীস-৩০৩৯]।
📄 রবি' ইবনে খায়সামের ঘটনা
কথিত আছে, রবি' ইবনে খায়সাম সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতেন, রাতে ঘুমাতেন না। সারারাত কাঁদতেন। এই করুণ অবস্থা দেখে তাঁর মা তাঁকে বললেন, বাবা! তুমি কি কাউকে খুন করেছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মা বললেন, কে সে বল, যাতে আমরা তার অভিভাবকদের থেকে ক্ষমা নিতে পারি। আল্লাহর কসম! তোমার এই দশা দেখলে তারা অবশ্যই ক্ষমা করবেন। তিনি বললেন, মা! আমি আমার নিজেকেই হত্যা করেছি।
📄 আল্লাহভীতি প্রকাশের সাত পদ্ধতি
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আল্লাহর ভয় সাত জিনিস দ্বারা প্রকাশ পায়। যথা-
১. মুখ: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে মুখ মিথ্যা, গীবত, অর্থহীন আলোচনা থেকে বিরত থাকবে এবং সর্বদা আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং ইলমী আলোচনায় ব্যস্ত থাকবে।
২. উদর : অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে উদরে কোনো হালাল ভিন্ন হারাম খাবার ঢুকবে না। হালাল খাবারও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবে না।
৩. চোখ: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে চোখ হারাম জিনিসের দিকে তাকাবে না। লোভের দৃষ্টিতে দুনিয়ার দিকে তাকাবে না। দুনিয়ার দিকে আকর্ষণের দৃষ্টি দেবে না। যদি দেয় তাহলে শিক্ষাগ্রহণের জন্য দিবে।
৪. হাত: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে হাত কখনো হারামের দিকে প্রসারিত হবে না। আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া তার হাত বাড়াবে না।
৫. পা: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে পা কখনো আল্লাহর নাফরমানীর দিকে হাঁটবে না।
৬. মন: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে মনে অন্যের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ, শত্রুতা ইত্যাদি স্থান পাবে না। বরং ভালো, স্নেহ-মমতা ও সহমর্মিতা স্থান পাবে।
৭. চিন্তা: অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে তার চিন্তা হবে ইখলাসপূর্ণ। ইবাদত নেফাকী ও লৌকিকতা (লোকদেখানো) থেকে মুক্ত হবে।
কেউ যদি এসব মেনে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে, তাহলে সে নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণিত লোকদের অর্ন্তভুক্ত হবে-
وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ
অর্থ: আপনার রবের নিকট আখেরাত পাবে মুত্তাকীরা।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ
অর্থ: নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবেন নিরাপদ স্থানে।
অন্য এক আয়াতে এসেছে-
إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا
অর্থ: নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে সফলতা অর্থাৎ, নাজাত ও সৌভাগ্য।
এভাবে অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকীদের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ، ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
অর্থ: তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে। এটি তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকীগণকে উদ্ধার করব এবং জালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।
কাব আল-আহ্হ্বার রহ. বলেন, তোমরা কি জানো وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا -এর অর্থ কী? উপস্থিত লোকেরা বলল, না। তিনি বললেন, এর অর্থ হলো, জাহান্নামকে দুর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। সেটার উপর নেককার ও বদকার সবার পা স্থির হয়ে যাবে। তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ আসবে, তোমার যা নিয়ে নাও, আমার যা দিয়ে দাও। তখন জাহান্নামীদেরকে ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে। একজন পিতা তার সন্তানকে যেমন চেনে, জাহান্নাম জাহান্নামীদেরকে তার চেয়েও বেশি চেনে। আর ঈমানদার সেখান থেকে দ্রুত মুক্তি পেয়ে যাবে। একটা কাপড় ভিজতে যতটুকু সময় লাগে, জান্নাতিরা ততটুকু সময়ের মধ্যে সেখান থেকে মুক্তি পাবে। জাহান্নামের ফেরেশতাদের হাতে একটি লোহার হাতুড়ি থাকবে। তার এক আঘাতে সাত লক্ষ লোক উপুড় হয়ে জাহান্নামে যাবে।
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الْحُصَيْنِ، قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي مَسِيرَةٍ، فَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ (الحج : ১) ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَتَدْرُونَ أَيُّ يَوْمٍ ذَلِكَ؟ قَالُوا : اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ। قَالَ : ذَلِكَ الْيَوْمُ الَّذِي يَقُولُ اللَّهُ لِآدَمَ : قُمْ فَابْعَثْ بَعْثَ النَّارِ وَبَعْثَ الْجَنَّةِ فَيَقُولُ آدَمُ : أَيْ رَبِّ فَمَا بَعْثُ النَّارِ وَمَا بَعْثُ الْجَنَّةِ? فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: مِنْ كُلِّ أَلْفٍ تِسْعُ مِائَةٍ وَتِسْعُ وَتِسْعُونَ فِي النَّارِ، وَوَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ. فَأَنْشَأَ الْقَوْمُ يَبْكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنِّي لَأَرْجُو أَنْ تَكُونُوا ثُلُثَ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَكَبَّرُوا ثُمَّ قَالَ: لَمْ يَكُنْ نَبِيٌّ إِلَّا كَانَتْ قَبْلَهُ جَاهِلِيَّةٌ، فَيُؤْخَذُ الْعَدَدُ مِنَ الْجَاهِلِيَّةِ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ كَمَلَ الْعَدَدُ مِنَ الْجَاهِلِيَّةِ، فَيُؤْخَذُ مِنَ الْمُنَافِقِينَ، وَمَا مَثَلُكُمْ فِي الْأُمَمِ إِلَّا كَمَثَلِ الرَّقْمَةِ في ذِرَاعِ الدَّابَّةِ، أَوْ كَالشَّامَةِ فِي جَنْبِ الْبَعِيرِ، ثُمَّ قَالَ: إِنِّي لَأَرْجُو أَنْ تَكُونُوا ثُلُثَيْ أَهْلِ الْجَنَّةِ. إِنَّ مَعَكُمْ لَخَلِيقَتَيْنِ مَا كَانَتَا فِي شَيْءٍ إِلَّا كَثَّرَتَاهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ، وَمَنْ مَاتَ مِنْ كَفَرَةِ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ. قَالَ: ثُمَّ فَكَبَّرُوا.
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূল -এর সাথে সফরে ছিলাম। তখন নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ অর্থ: হে মানব! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন খুবই কঠিন।
আয়াতটি নাযিল হলে রাসূল আমাদেরকে বললেন, তোমরা কি জান, এটি কোন দিন? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল ইরশাদ করলেন, এটা ওই দিন যেদিন আল্লাহ হযরত আদম আ. কে বলবেন, ওঠ! জাহান্নামীদের জাহান্নামে এবং জান্নাতীদের জান্নাতে পাঠাও। আদম আরয করবেন, রব! কারা জান্নাতী আর কারা জাহান্নামী? তিনি বলবেন, প্রতি হাজারে নয় শত নিরানব্বই জন জাহান্নামী এবং একজন জান্নাতী। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম কাঁদতে লাগলেন। রাসূল ইরশাদ করলেন, আমি আশা করি, তোমরা জান্নাতীদের এক তৃতীয়াংশ হবে। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম তাকবীর দিয়ে উঠলেন। অতঃপর তিনি বললেন, প্রত্যেক নবী আগমনের পূর্বেই একটি জাহেলী যুগ ছিল। প্রথমে সে জাহেলী যুগের লোকদের দিয়ে এই সংখ্যা পূর্ণ করা হবে। এতে পূর্ণ না হলে নবীর যুগের মুনাফিকদের দিয়ে পূর্ণ করা হবে। অন্যান্য জাতির তুলনায় তোমাদের সংখ্যা হলো উটের পার্শ্ব দেশে একটি কালো তিলকের ন্যায়। তারপরও আমি আশা করি, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক তৃতীয়াংশ। একথা শুনে উপস্থিত সবাই আবার তাকবীর দিয়ে উঠলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমাদের সাথে এমন দু'টি জাতি রয়েছে, তারা যেখানেই যায় সেখানেই সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ১. ইয়াজুজ মা'জুজ এবং ২. কাফের অবস্থায় মৃত জিন-ইনসান অর্থাৎ, তারাও জাহান্নামীদের সংখ্যা বাড়াবে।
টিকাঃ
১৩৪. সূরা যুখরুফ: আয়াত-৩৫
১৩৫. সূরা তুর: আয়াত-১৭
১৩৬. সূরা নাবা: আয়াত-৩০
১৩৭. সূরা মারইয়াম: আয়াত-৭১-৭২
১৩৮. সূরা হজ: আয়াত-১
১৩৯. সুনানে তিরিমিযী : হাদীস-৩১৬৮; মুসনাদে আহমাদ : হাদীস-১৯৯০১; ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
📄 সাহচর্য লাভ করা
হযরত হাসান রহ. বলেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ 'যে যাকে ভালোবাসে পরকালে সে তার সাথে থাকবে।'
এ উক্তি যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে। কেননা নেক্কারদের অনুরূপ আমল না করে তাদের সাহচর্য লাভ হতে পারে না। ইহুদী নাসারা এবং বিদআতীদেরও তো তাদের নবীদের প্রতি ভালোবাসা আছে। তারা কি পরকালে তাদের সঙ্গী হতে পারবে?
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ: مَنِ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ، وَمَنْ كَانَ غَدُهُ شَرًّا مِنْ يَوْمِهِ، فَهُوَ مَلْعُونٌ، وَمَنْ لَمْ يَكُنْ فِي الزَّيَادَةِ، فَهُوَ فِي النُّقْصَانِ، وَمَنْ كَانَ فِي النُّقْصَانِ فَالْمَوْتُ خَيْرٌ لَهُ.
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তির দুই দিন (আজ ও আগামীকাল) বরাবর সে ক্ষতিগ্রস্ত। যার আগামীকাল আজকের চেয়ে মন্দ সে অভিশপ্ত। প্রতিদিন যার নেক আমল বৃদ্ধি পায় না সে লোকসানের মধ্যে আছে। আর যে লোকসানের মধ্যে আছে তার মরে যাওয়াই ভালো।
عَنْ كَعْبِ الْأَحْبَارِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى دَارًا مِنْ زُمُرُّدَةٍ، أَوْ مِنْ لُؤْلُؤَةٍ، فِيهَا سَبْعُونَ أَلْفَ دَارٍ، وَفِي كُلِّ دَارٍ سَبْعُونَ أَلْفَ بَيْتٍ لَا يَنْزِلُهَا إِلَّا نَبِيٌّ، أَوْ صِدِّيقٌ أَوْ شَهِيدٌ، أَوْ إِمَامٌ عَادِلٌ، أَوْ رَجُلٌ مُحَكَّمٌ فِي نَفْسِهِ. قِيلَ: وَمَا الْمُحَكَّمُ فِي نَفْسِهِ? قَالَ: الَّذِي يَعْرِضُ لَهُ الْحَرَامُ، فَيَتْرُكُهُ مَخَافَةَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
হযরত কা'ব আল-আহবার রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলার মণি-মুক্তার একটি বালাখানা আছে। তার ভেতর সত্তরটি ঘর আছে, প্রতিটি ঘরে সত্তরটি কক্ষ আছে। এই বালাখানায় স্থান পাবেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ, ন্যায়পরায়ণ শাসক কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আত্মনিয়ন্ত্রণকারী কে? তিনি বলেলেন, যার সামনে হারাম পরিবেশন করা হলে আল্লাহর ভয়ে সে তা বর্জন করে।
টিকাঃ
১৪০. দাইলামী রহ. হাদীসটি জয়ীফ সনদে বর্ণনা করেছেন [কাশফুল খফা লি-আজলুনী: ২/৩০৫; আল-মাকাসেদুল হাসানাহ লিস-সাখাবী: ৪৭১]।