📄 জুলুমের শাস্তি
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُملِي لِلظَّالِمِ، فَإِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ. يَعْنِي لَا يَنْجُو، ثُمَّ قَرَأَ : وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ (هود : ১০২)
হযরত আবূ মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা জালেমকে অবকাশ দিতে থাকেন। আর যখন পাকড়াও করেন তখন তার আর বাঁচার উপায় থাকে না। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন—
وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
অর্থ: আপনার রব যখন কোনো জালেম জনপদবাসীদেরকে পাকড়াও করেন, তখন তার পাকড়াও এমনই হয়ে থাকে। নিশ্চয় তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ، أَنَّهُ قَالَ : مَنْ كَانَتْ لِأَخِيهِ عِنْدَهُ مَظْلَمَةٌ مِنْ عَرَضٍ أَوْ مَالٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ يُؤْخَذَ مِنْهُ، يَوْمَ لَا دِينَارَ وَلَا دِرْهَمَ، فَإِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ عَمَلِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ عَمَلٌ ، أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِهِ، فَحُمِلَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ يُلْقِي فِي النَّارِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, কেউ যদি তার ভাইয়ের উপর জুলুম করে থাকে, সম্পদে হোক বা সম্মানে, তাহলে সে যেন তার মীমাংসা করে নেয়। অন্যথায় এমন একদিন আসবে যেদিন কোনো দিরহাম-দীনার কাজে আসবে না। যদি তার নেক আমল থাকে, তাহলে তার জুলুমের বদলায় তা নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি নেক আমল না থাকে, তাহলে মজলুমের গুনাহ নিয়ে জালেমের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
টিকাঃ
১০০. সূরা হুদ: আয়াত-১০২। সহীহ বুখারী হাদীস-৪৬৮৬, মুসলিম হাদীস-২৫৮৩।
১০১. সহীহ বুখারী: হাদীস-২৪৪৯; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪১৯।
📄 প্রকৃত দেউলিয়া
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسِ? قَالُوا لَهُ : الْمُفْلِسُ مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا دِينَارَ وَلَا مَتَاعَ. قَالَ: فَإِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي الَّذِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاتِهِ، وَزَكَاتِهِ، وَصِيَامِهِ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هُذَا، وَقَذَفَ هُذَا، وَأَكَلَ مَالَ هُذَا، وَسَفَكَ دَمَ هُذَا ، وَضَرَبَ هُذَا، فَيُعْطِي هُذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَ هُذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْضِيَ مَا عَلَيْهِ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ، وَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ.
আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে? তাঁরা বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ঐ ব্যক্তি, যার কাছে কোনো দিরহাম এবং কোনো আসবাবপত্র নেই। তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাতের (নেকি) নিয়ে হাযির হবে। (কিন্তু এর সাথে সাথে সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে। কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, কারো মাল অবৈধরূপে ভক্ষণ করেছে। কারো রক্তপাত করেছে এবং কাউকে মেরেছে। অতঃপর এ (অত্যাচারিত) কে তার নেকি দেওয়া হবে, এ (অত্যাচারিত) কে তার নেকি দেওয়া হবে। পরিশেষে যদি তার নেকিরাশি অন্যান্যদের দাবি পূরণ করার পূর্বেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের পাপরাশি নিয়ে তার উপর চাপিয়ে হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
টিকাঃ
১০২. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৬৮৬, মুসলিম: হাদীস-২৫৮৩।
📄 মজলুমকে সাহায্য না করার পরিণতি
হযরত আবূ মায়সারা রহ. বলেন, এক ব্যক্তিকে দাফন করার পর মুনকার-নাকীর তার কবরে চাবুক হাতে হাজির হলেন। তারা বললেন, আমরা এক শত আঘাত করব। মৃতব্যক্তি নিজের কিছু ভালো গুণের কথা উল্লেখ করে বলল, আমি তো দুনিয়াতে এমন ছিলাম। অতঃপর সে তাদের নিকট ওজর পেশ করতে লাগল। তার সুপারিশ মেনে নিয়ে তারা তার দশটি আঘাত কমিয়ে দিলেন। তারপরও সে ওজর পেশ করতে লাগল। এভাবে কমাতে কমাতে শুধু একটি আঘাত বাকি থাকল। তখন ফেরেশতাদ্বয় বললেন, এখন আমরা তোমাকে একটি আঘাত করব। তারা তাকে একটি আঘাত করলেন এবং আঘাতের ফলে গোটা কবরে আগুন জ্বলে উঠল। এরপর লোকটি ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করলেন, কোন অপরাধের কারণে তোমরা আমাকে মারলে? তারা বললেন, একবার তুমি এক মজলুমের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলে, সে তোমার নিকট সাহায্য চাইলে তুমি তাকে সাহায্য করনি।
এই হলো, মজলুমকে সাহায্য না করার শাস্তি। তাহলে জালিমের অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।
📄 জুলুমের পরিণাম
হযরত মাইমুন ইবনে মেহরান রহ. বলেন, অনেক লোক কুরআন পাঠ করে আর নিজের উপর অভিশাপ দেয়। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, তা কিভাবে? তিনি বললেন, সে কুরআনে পাঠ করে— أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ অর্থ: নিশ্চয় জালেমদের উপর রয়েছে আল্লাহর লানত। অথচ সে নিজেই জালেম। তাহলে সে নিজের উপর অভিশাপ দিল না।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, জুলুম হলো, সবচেয়ে বড় গুনাহ। কারণ, যে সব গুনাহের সম্পর্ক আল্লাহ ও বান্দার সাথে আশা করা যায় যে, সেগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু যে সব গুনাহের সম্পর্ক মানুষের সাথে, তা উক্ত ব্যক্তির থেকে ক্ষমা না নিলে আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা পাওয়া যাবে না। সুতরাং কেউ যদি কারো উপর জুলুম করে থাকে, সে যেন দুনিয়াতেই মজলুমের সাথে তার মীমাংসা করে নেয়। আর তা সম্ভব না হলে তার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া ও ক্ষমা চাওয়া। হতে পারে এর ফলে সে মুক্তি পাবে।
হযরত মাইমূন ইবনে মেহরান রহ. বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি কারো উপর জুলুম করে এবং মজলুমের সাথে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করেও কোনো কারণে সফল না হয়, তাহলে সে যেন প্রতি নামাযের পর আল্লাহর নিকট তার জন্য ইস্তিগফার করে। তাহলে আশা করা যায়, সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ : قَالَ : مَنْ أَعَانَ ظَالِمًا عَلَى ظُلْمِهِ، أَوْ لَقَنَهُ حُجَّةً يَدْحَضُ بِهَا حَقَّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، فَقَدْ جَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى وَعَلَيْهِ وِزْرُهَا.
হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি অত্যাচারীকে তার অত্যাচারে সাহায্য করে, কিংবা কাউকে এমন যুক্তি শিখিয়ে দেয়, যার মাধ্যমে অন্যের হক নষ্ট করা যায়, তাহলে তাকেও এর গুনাহের বোঝা বহন করতে হবে এবং তার উপর আল্লাহর গজব নাযিল হবে।
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ لِلْأَحْنَفِ بْنِ قَيْسٍ: مَنْ أَجْهَلُ النَّاسِ? قَالَ الْأَحْنَفُ: مَنْ بَاعَ آخِرَتَهُ بِدُنْيَاهُ. وَقَالَ عُمَرُ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ : أَلَا أُنَبِّئُكَ بِأَجْهَلَ مِنْ هُذَا? قَالَ : بَلَى يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ قَالَ: مَنْ بَاعَ آخِرَتَهُ بِدُنْيَا غَيْرِهِ.
হযরত উমর রাযি. একদা হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. কে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বড় মূর্খ? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নিজের দুনিয়ার বিনিময়ে নিজের আখেরাত বিক্রি করে দেয়। হযরত উমর বললেন, তুমি কি জানতে চাও এর চেয়েও বড় মূর্খ আছে? তিনি বললেন, অবশ্যই, হে আমীরুল মুমিনীন! উমর রাযি. বললেন, যে ব্যক্তি অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে নিজের আখেরাত বিক্রি করে দেয়, সে ব্যক্তি এর চেয়েও বড় মূর্খ।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ أَنْصُرُهُ إِذَا كَانَ مَظْلُومًا أَفَرَأَيْتَ إِذَا كَانَ ظَالِمًا كَيْفَ أَنْصُرُهُ قَالَ تَحْجُرُهُ أَوْ تَمْنَعُهُ مِنْ الظُّلْمِ فَإِنَّ ذَلِكَ نَصْرُهُ.
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত। তিনি (আনাস রাযি.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অত্যাচারিতকে সাহায্য করার বিষয়টি তো বুঝলাম; কিন্তু অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বাধা দেবে, তাহলেই তাকে সাহায্য করা হবে।
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، مَا أَحْسَنْتُ إِلَى أَحَدٍ، وَلَا أَسَأْتُ إِلَيْهِ لِأَنَّ اللهَ تَعَالَى يَقُولُ : مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا (فصلت : ৪৬) يَعْنِي إِنْ أَحْسَنْتُ إِلَى أَحَدٍ، فَقَدْ أَحْسَنْتُ إِلَى نَفْسِي، وَإِنْ أَسَأْتُ إِلَى أَحَدٍ فَقَدْ أَسَأْتُ إِلَى نَفْسِي.
হযরত আলী রাযি. বলেন, আমি কারো সাথে ভালো ব্যবহার করিনি এবং কারো সাথে দুর্ব্যবহারও করিনি। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا অর্থ: যে ব্যক্তি সৎ কাজ করে সে তা তার নিজের জন্য করে, আর খারাপ কাজ করলে তা তার জন্যই থাকবে। সুতরাং কোনো ভালো কাজ করলে তার ফল আমি ভোগ করব আর খারাপ কাজ করলে তার শাস্তি আমাকেই ভোগ করতে হবে।
টিকাঃ
১০৩. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৯৫২; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২২৫৫।
১০৪. সূরা হা-মীম: আয়াত-৪৬