📄 বিবাহিত ও অবিবাহিতোদের যিনার বিধান
উল্লিখিত হাদীসে রাসূল ব্যভিচারের হুকুম বর্ণনা করেছেন। যিনাকারী সে পুরুষ হোক বা নারী যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তাদের শাস্তি হলো, একশত দোররা বা চাবুকের একশত আঘাত। যেমন, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
আয-জানিইয়াতু ওয়াজ্জানী ফাজলিদূ কুল্লা ওয়া-হিদিম মিনহুমা মিয়াতা জালদাতিও ওয়ালা তাখুযকুম বিহিমা রাফাতুন ফী দীনিল্লা-হ।
অর্থ: তোমরা যিনাকারী নারী ও পুরুষকে এক শত আঘাত কর। আল্লাহর দীনের ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে তোমাদের কারো মনে যেন দয়ার উদ্রেক না হয়।
এ আয়াতের মর্ম হলো, স্নেহ মমতা যেন আল্লাহর নির্ধারিত হদ কায়েমে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। দুনিয়াতে যাদের উপর যিনার হদ কায়েম না করা হবে। আখেরাতে তাকে আগুনের ছোরা দিয়ে মারা হবে। এরপর ইরশাদ করেন-
ইন কুনতুম তু'মিনূনা বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ওয়ালিয়াশহাদ আযাবাহুমা তওয়ায়িফাতুম মিনাল মু'মিনীন
যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষদিনের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে থাক। তাদের শাস্তির সময় যেন মুমিনদের একটি দল উপস্থিত থাকে।
শাস্তি প্রয়োগ করার সময় মুমিনদের উপস্থিতি কাম্য। কারণ, এতে তারা লজ্জিত হবে। ফলে তারা ব্যভিচার থেকে বিরত থাকবে। আর যিনাকারী যদি বিবাহিত নারী-পুরুষ হয় তাহলে শাস্তি হলো, রজম করা। যেমন বর্ণিত আছে, রাসূল মায়েজ আসলামী কে রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অপর হাদীসে এসেছে, এক মহিলা রাসূল ﷺ-এর নিকট যিনার স্বীকারোক্তি দিলে, মহিলা গর্ভবতী হওয়ায় রাসূল তাকে ফিরিয়ে দেন এবং তাকে সন্তান প্রসবের পর রজম করেন। আর যিনাকারী যদি একজন মুহসিনা (বিবাহিত) অপর একজন গাইরে মুহসিনা (অবিবাহিত) হয়, তাহেল তাদের শাস্তি হলো, বিবাহিত'র জন্য রজম। আর অবিবাহিত'র জন্য দোররা ও এক বছর দেশান্তর।
এগুলো হলো, যিনার পার্থিব শাস্তি। আখেরাতে এই অপরাধের আরো কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুতরাং যিনার মত জঘন্য পাপ থেকে বেঁচে থাকা একান্ত কর্তব্য।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- ওয়ালা তাক্বরাবুয যিনা ইন্নাহু কা-না ফাহিশাহ অর্থ: তোমরা যিনার নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দপন্থা। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন- ওয়ালা তাক্বরাবুল ফাওয়া-হিশা মা জোয়াহারা মিনহা ওয়ামা বাত্বোয়ালা অর্থ : তোমরা প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য অশ্লীলতার নিকটে যেও না। এখানে প্রকাশ্য অশ্লীলতার দ্বারা যিনা করাকে এবং অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা দ্বারা স্পর্শ চুম্বন ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। যেমন এক হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেন, হাত যিনা করে, চোখও যিনা করে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- ক্বুল লিলমু'মিনীনা ইয়াগুদ্বদ্বূ মিন আবসোয়ারিহিম ওয়ায়াহফায়ূ ফুরূজ্বাহুম যা-লিকা আযকা লাহুম ইন্নাল্লা-হা খবীয়রুম বিমা ইয়াস্নাঊনা ওয়াক্বুল লিলমু'মিনা-তি ইয়াগদ্বুদানা মিন আবসোয়ারিহিন্না ওয়ায়াহফাযনা ফুরূজ্বাহুন্না অর্থ: আপনি মুমিন পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আপনি মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হারাম জিনিসের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এবং লজ্জাস্থানকে হারাম কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখা ওয়াজিব করেছেন। বস্তুত যিনা এক জঘন্য গুনাহ। কুরআন তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর সর্বত্র যিনা হারাম করা হয়েছে।
টিকাঃ
৫৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৮২৭; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৯৭。
৫৮. সুরা নূর: আয়াত-২
৫৯. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৮২৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৯৩。
৬০. সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৯৫; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৪১৩。
৬১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৯০; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৪১৫。
৬২. সূরা ইসরা: আয়াত-৩২
৬৩. সূরা আনআম: আয়াত-১৫১
৬৪. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৩৯১২; মুসনাদে বায্যার: হাদীস-১৯৫৬; হাদীসটি সহীহ。
৬৫. সূরা নুর: আয়াত-৩০-৩১
📄 যিনার ছয়টি ক্ষতি
عَنْ بَعْضِ الصَّحَابَةِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمْ، أَنَّهُ قَالَ: إِيَّاكُمْ وَالزَّنَى فَإِنَّ فِيهِ سِتَّ خِصَالٍ : ثَلَاثَةً فِي الدُّنْيَا وَثَلَاثَةً فِي الْآخِرَةِ. فَأَمَّا الَّتِي فِي الدُّنْيَا، فَنُقْصَانُ الرِّزْقِ يَعْنِي تَذْهَبُ الْبَرَكَةُ مِنْ رَزْقِهِ، وَيَصِيرُ مَحْرُومًا مِنَ الْخَيْرَاتِ، وَيَصِيرُ بَغِيضًا فِي قُلُوبِ النَّاسِ، وَأَمَّا الَّتِي فِي الْآخِرَةِ فَغَضَبُ الرَّبِّ، وَشِدَّةُ الْحِسَابِ، وَالدُّخُولُ فِي النَّارِ، وَهِيَ الَّتِي سَمَّاهَا اللَّهُ تَعَالَى النَّارَ الْكُبْرَى.
জনৈক সাহাবী বলেন, তোমরা যিনা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, যিনার মধ্যে মানুষের ছয়টি ক্ষতি রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে আর তিনটি আখেরাতে। দুনিয়ার তিনটি ক্ষতি হলো- ১. রিযিকের বরকত চলে যায়। ২. যিনাকারী যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। ৩. যিনাকারী সমাজে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়। আখেরাতের তিনটি ক্ষতি হলো- ১. আল্লাহর ক্রোধ। ২. আখেরাতের হিসাব কঠিন। ৩. জাহান্নামে প্রবেশ।
জাহান্নামের শাস্তি হবে বড়ই কঠিন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : إِنَّ نَارَكُمْ هَذِهِ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءًا مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তোমাদের দুনিয়াতে এ আগুন হলো, জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ।
টিকাঃ
৬৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২৬৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৪৩।
📄 জিবরাঈল আ.-এর ভাষায় জাহান্নামের বিবরণ
হাদীসে এসেছে, একদা রাসূল ﷺ হযরত জিবরাঈল আ.-কে বললেন, আমাকে জাহান্নামের কিছু বিবরণ দিন। জিবরাঈল আ. বললেন, মুহাম্মাদ! জাহান্নাম হবে নিকষ কালো এবং অন্ধকার। তার আগুনের সুঁই পরিমাণ যদি পৃথিবীতে পড়ে তাহলে গোটা পৃথিবী পুড়ে যাবে। জাহান্নামীদের পরিধেয় পোশাকের একটি যদি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তার দুর্গন্ধে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী মারা যাবে। জাহান্নামের যাক্কুমের এক ফোঁটা রস যদি পৃথিবীতে পড়ে, তাহলে পৃথিবীর জীবনোপকরণ ধ্বংস হয়ে যাবে। কুরআনে বর্ণিত জাহান্নামের উনিশজন ফেরেশতাদের কেউ একজন যদি পৃথিবীতে আসে তাহলে তার বীভৎস রূপ দেখে পৃথিবীর সকল মানুষ মারা যাবে। কুরআনে বর্ণিত জাহান্নামের জিঞ্জিরের অগ্নি স্ফুলিঙ্গের সামান্য যদি পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে গোটা জমিন ধ্বসে যাবে।
রাসূল এই বর্ণনা শুনে বললেন, জিবরাঈল! যথেষ্ট হয়েছে, এবার থাম। এরপর রাসূল কাঁদতে লাগলেন। হযরত জিবরাঈল আ.ও কাঁদলেন। রাসূল বললেন, জিবরাঈল! আপনি কাঁদছেন কেন? আপনার তো আল্লাহর দরবারে বড় মর্যাদা। জিবরাঈল আ. বললেন, আল্লাহর দরবারে আমার এই অবস্থান যে টিকে থাকবে তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? হতে পারে যে হারূত, মারূত এবং অভিশপ্ত ইবলিসের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।
আল্লাহর দরবারে জিবরাঈলের এত উঁচু অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তিনি কাঁদেন, তাহলে যে গুনাহগার, তার অবস্থা কেমন হওয়া চাই!
📄 নসীহত
সুতরাং জীবন ও সুস্বাস্থ্য দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। কারণ, পৃথিবী এক দিন ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু গুনাহ থেকে যাবে, ফলে দীর্ঘ আযাব ভোগ করতে হবে। যিনা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, যিনা আল্লাহর ক্রোধ ও বেদনাদায়ক শাস্তি বয়ে আনে। আর সবচেয়ে বড় যিনা হলো, যা সর্বদা করা হয়। কোনো কোনো মানুষ তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে এরপরও তার সাথে থাকে, লজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করে না। কিন্তু কিয়ামতের দিন সে সবার সামনে লজ্জিত হবে। সুতরাং দুনিয়ার লজ্জার ভয় পরিহার করে যিনার জন্য তাওবা কর। কারণ, মৃত্যুর পর অনুতপ্ত হলে কোনো কাজে আসবে না। বরং জীবদ্দশার অনুতাপই কাজে আসবে। যে মুমিনগণ তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে আল্লাহ তাদের প্রশংসা করে বলেছেন-
ওয়াল্লাযীনা হুম লিফুরূজ্বিহিম হাফিজুন। ইল্লা আলা আযওয়া-জ্বিহিম আও মা মালাকাত আইমা-নুহুম ফাইন্নাহুম গইরু মালূমীন। ফামানিব তাগা ওয়ারা-আ যা-লিকা ফাউলা-ইকা হুমুল আদূনা।
অর্থ: আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, তাদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী।
অর্থাৎ, যারা উল্লিখিত বৈধপন্থা ছাড়া ভিন্ন পথ অবলম্বন করবে, তারা না- ফরমান। এ আয়াত থেকে এ কথাও বুঝা যায় যে, হস্তমৈথন করাও না জায়েয। হাদীসে এসেছে, হস্তমৈথুনকারীদের হাত কিয়ামতের দিন গর্ভবতী থাকবে। সেই সাথে একথা বুঝা গেল যে, পুংমৈথুনও না জায়েয।
সুতরাং প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য হলো, নিজেও যিনা থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্যদেরকে বাঁচানো। কারণ, যিনার কারণে আল্লাহর ব্যাপক গযব আসে, মহামারী দেখা দেয়。
عَنْ عِكْرِمَةَ، قَالَ: سَمِعْتُ كَعْبًا يَقُولُ لِابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا: إِذَا رَأَيْتُمُ السُّيُوفَ قَدْ أُعْرِيَتْ وَالدِّمَاءَ قَدْ أُهْرِقَتْ، فَاعْلَمُوا أَنَّ حُكْمَ اللَّهِ قَدْ ضُيِّعَ فِيهِمْ، فَانْتَقَمَ اللهُ بِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ، وَإِذَا رَأَيْتُمُ الْمَطَرَ قَدْ مُنِعَ، فَاعْلَمُوا أَنَّ النَّاسَ قَدْ مَنَعُوا الزَّكَاةَ، فَمَنَعَ اللَّهُ مَا عِنْدَهُ، وَإِذَا رَأَيْتُمُ الْوَبَاءَ قَدْ فَشَا فَاعْلَمُوا أَنَّ الزِّنَى قَدْ فَشَا.
ইকরিমা রাযি. বলেন, কাব রাযি. কে বলতে শুনেছি। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. কে বলেন, যখন তরবারী কোষমুক্ত দেখবে এবং চারদিকে খুন হতে দেখবে, তখন বুঝবে, সমাজ আল্লাহর বিধান মানছে না। তাই আল্লাহ তাদের পরস্পরকে লাগিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করছেন। আর যখন খরা দেখা দিবে, বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে তখন বুঝবে, মানুষ যাকাত দিচ্ছে না। আর যখন দেখবে, কোনো জাতিকে মহামারী আক্রান্ত করেছে, তখন বুঝবে, তাদের মাঝে যিনা ব্যাপক হয়ে গেছে।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ وَسَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ يَقُولُ إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي عَمَلُ قَوْمِ لُوطٍ
হযরত জাবের রাযি. বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় করি, কওমে লূতের আমলের।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, যাকে কওমে লূতের আমলরত পাবে, কৃত ও কর্তা উভয়কেই হত্যা করে দিবে।
টিকাঃ
৬৭. সূরা বাকারা: আয়াত-৬৮
৬৮. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৪৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-২০৯৩। হাদীসটি হাসান
৬৯. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৪৫৬; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৪৬২; হাদীসটি সহীহ。