📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মুজাহাদায় ভারসাম্য বজায় রাখা

📄 মুজাহাদায় ভারসাম্য বজায় রাখা


হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাযি. বলেন, নবী ﷺ কে আমার ব্যাপারে সংবাদ দেওয়া হলো যে, আমি বলছি, আল্লহর কসম! আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন দিনে রোযা রাখব এবং রাতে নফল নামায পড়ব। সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, তুমি এ কথা বলছ? আমি তাঁকে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! নিঃসন্দেহে আমি এ কথা বলেছি, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। তিনি বললেন, তুমি এর সাধ্য রাখ না। অতএব তুমি রোযা রাখ এবং (কখনো) ছেড়েও দাও। অনুরূপ (রাতের কিছু অংশে) ঘুমাও এবং (কিছু অংশে) নফল নামায পড় ও মাসে তিন দিন রোযা রাখ। কারণ, নেকির প্রতিদান দশগুণ রয়েছে। তোমার এই রোযা জীবনভর রোযা রাখার মত হয়ে যাবে। আমি বললাম, 'আমি এর অধিক করার শক্তি রাখি। তিনি বললেন, তাহলে তুমি একদিন রোযা রাখ, আর দু'দিন রোযা ত্যাগ কর। আমি বললাম, 'আমি এর বেশি করার শক্তি রাখি।' তিনি বললেন, তাহলে একদিন রোযা রাখ, আর একদিন রোযা ছাড়। এ হলো দাউদ 'আলাইহিস সালাম-এর রোযা। আর এ হলো ভারসাম্যপূর্ণ রোযা। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কয় দিনে কুরআন খতম কর? বললাম, দুই দিন দুই রাতে। তিনি বললেন, প্রতি পনেরো দিনে এক খতম দিবে। আমি বললাম, রাসূল! আমার তো এর চেয়ে বেশি আমলের শক্তি আছে। তিনি বললেন, প্রতি সাত দিনে এক খতম দিবে। এরপর তিনি বললেন, প্রতি আমলেরই উদ্দীপনার সময় থাকে, এরপর অলসতা আসে। যে ব্যক্তি অলসতার সময়ও আমার তরীকা মতো আমল করবে, সে আমার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরলো। আর যে অলসতার সময় আমল ছেড়ে দিলো, সে ধ্বংস হলো।

আব্দুল্লাহ বলেন, যদি আমি রাসূল-এর নির্দেশ অনুযায়ী (প্রত্যেক মাসে) তিন দিন রোযা রাখার পদ্ধতি গ্রহণ করতাম, তাহলে তা আমার নিকট আমার পরিবার ও সম্পদ অপেক্ষা প্রিয় হতো। এখন আমি বয়স্ক ও দুর্বল। রাসূল-এর নির্দেশ ছেড়ে দেওয়া আমার জন্য শোভনীয় নয়।

টিকাঃ
২১. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৯৭৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১১৫৯।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 রোযায় বিভিন্ন আমল

📄 রোযায় বিভিন্ন আমল


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَيْهِ فَسَأَلَهُ عَنِ الصِّيَامِ فَقَالَ : أَلَا أُحَدِّثُكَ بِحَدِيثٍ كَانَ عِنْدِي مِنَ التَّحَفِ الْمَخْرُونَةِ، إِنْ كُنْتَ تُرِيدُ صَوْمَ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمًا، وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ صَوْمَ ابْنِهِ سُلَيْمَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ أَوَّلِ كُلِّ شَهْرٍ، وَثَلَاثَةٌ مِنْ أَوْسَطِهِ وَثَلَاثَةٌ مِنْ آخِرِهِ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ صَوْمَ ابْنِ الْعَذْرَاءِ الْبَتُولِ يَعْنِي عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِمَا السَّلَامُ فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ الدَّهْرَ كُلَّهُ وَيَأْكُلُ الشَّعِيرَ، وَيَلْبَسُ الشَّعْرَ الْخَشِنَ، وَكَانَ حَيْثُمَا أَدْرَكَهُ اللَّيْلُ صَفَّ قَدَمَيْهِ يُصَلِّي حَتَّى يَرَى عَلَامَةَ الْفَجْرِ قَدْ طَلَعَتْ، وَكَانَ لَا يَقُومُ مَقَامًا إِلَّا صَلَّى رَكْعَتَيْنِ فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ صَوْمَ أُمِّهِ فَإِنَّهَا كَانَتْ تَصُومُ يَوْمَيْنِ وَتُفْطِرُ يَوْمَيْنِ، وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ صَوْمَ خَيْرِ الْبَشَرِ النَّبِيِّ الْعَرَبِيِّ الْقُرَشِيِّ، أَبِي الْقَاسِمِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ يَعْنِي صَوْمَ أَيَّامِ الْبِيضِ الثَّالِثَ عَشَرَ، وَالرَّابِعَ عَشَرَ، وَالْخَامِسَ عَشَرَ وَيَقُولُ : هُنَّ صِيَامُ الدَّهْرِ

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর নিকট এসে রোযা সম্পর্কে জানতে চাইলো। তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে এমন এক হাদীস শুনাবো না, যা আমার নিকট মূল্যবান উপহারের মত সংরক্ষিত আছে? তিনি বললেন, যদি হযরত দাউদ আ.-এর পদ্ধতিতে রোযা রাখতে চাও, তাহলে এক দিন পর পর রোযা রাখো। যদি তার পুত্র হযরত সুলায়মান আ.-এর মত রোযা রাখতে চাও, তাহলে শোন, তিনি প্রতি মাসের শুরুতে তিন দিন মাঝে তিন দিন এবং শেষে তিন দিন রোযা রাখতেন। যদি পবিত্র কুমারী মারইয়াম আ.-এর পুত্র হযরত ঈসা আ.-এর পদ্ধতিতে রোযা রাখতে চাও, তাহলে শোন, তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন, যবের রুটি খেতেন এবং মোটা পোশাক পরিধান করতেন, রাত হলেই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং ভোর হওয়া পর্যন্ত নামায পড়তেন। আর যেখানেই তিনি অবস্থান করতেন দুই রাকআত নামায পড়তেন। যদি তার মায়ের পদ্ধতিতে রোজা রাখতে চাও, তাহলে শোন, তিনি দুই দিন পর পর রোযা রাখতেন। আর যদি তুমি শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর পদ্ধতিতে রোযা রাখতে চাও, তাহলে শোন, তিনি প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ এই তিন দিন রোযা রাখতেন এবং তিনি বলতেন, এই রোযা সারা বছর রোযা রাখার ন্যায়।

টিকাঃ
২২. মুসনাদে আহমাদ: ৩৫/২৯২; মুসনাদে ত্বয়ালিসী : হাদীস-৪৮২; সনদটি সহীহ [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৩/১৯৬]।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 শাওয়ালের রোযা

📄 শাওয়ালের রোযা


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: مَنْ صَامَ شَهْرَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ بِسِتٍّ مِنْ شَوَّالٍ، فَكَأَنَّمَا صَامَ الدَّهْرَ كُلَّهُ.

قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ : حَتَّى أَحْسِبَ لَكُمْ، فَصَوْمُ رَمَضَانَ يَكُونُ ثَلَاثَ مِائَةِ يَوْمٍ وَسِتَّةَ أَيَّامٍ وَسِتِّينَ يَوْمًا، لِأَنَّ اللهَ تَعَالَى قَالَ : مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا (الأنعام : ১৬০) وَكُلُّ يَوْمٍ يَقُومُ مَقَامَ عَشْرَةِ أَيَّامٍ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখল অতঃপর শাওয়াল মাসের ছয় রোযা রাখলো, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি তোমাদের হিসাব করে দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-
মাজ্ব জ্বা-আ বিলহাসানাতি ফালাহূ আশরু আমছা-লিহা
অর্থ: যে ব্যক্তি একটি নেক আমল করবে তাকে তার দশ গুন সওয়াব দান করা হবে।

সুতরাং রমযান মাসের ত্রিশ রোযা হবে তিন শত দিনের রোযা। আর শাওয়ালের ছয় রোযা ষাট রোযা। এই দুই রোযা মিলে হলো তিন শত ষাট দিন অর্থাৎ, সারা বছরের রোযা। এই কারণে রমযানের রোযা ও শাওয়ালের ছয় রোযাকে সারা বছরের রোযা বলা হয়েছে।

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, এই ছয় রোযা রাখাকে কেউ কেউ মাকরূহ বলেছেন। কারণ, এতে নাসারা বা খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য তৈরি হয়। হযরত ইবরাহীম নাখাঈ রহ. কে এই ছয় রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোযা ঋতুমতী নারীদের জন্য। (কারণ, তারা মাসিকের কারণে সারা মাস রোযা রাখতে পারে না) আবার কেউ বলেন, এই ছয় রোযা বিরতি দিয়ে রাখা উত্তম। তাহলে খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য থাকবে না। তবে আমার মতে, এই ছয় রোযা সুন্নাত। পৃথক পৃথক বা লাগাতার রাখাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, ঈদের মাধ্যমে উভয় রোযার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।

টিকাঃ
২৩. কাশফুল আস্তার লিল-বায্যার : হাদীস-১০৬০; হাদীসটির সনদ সহীহ [মাজমা: ৩/১৮৩]
২৪. সূরা আনআম: আয়াত-১৬০
২৫. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-৭৪৪; সুনানে আবী দাউদ : হাদীস-২৪২১; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস-১৭২৬। হাদীসটি সহীহ। তবে ইমাম আবূ দাউদ হাদীসটিকে মানসুখ বলেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, রাসূল সা. প্রথমত আহলে কিতাবদের সাথে সাজুয্যতা করে শনিবার রোজা রাখতেন পরে আহলে কিতাবদের বিরোধিতার নির্দেশ দেন। আর শুধুমাত্র শনিবার রোজা রাখতে নিষেধ করেন। আবু দাউদ হয়তো প্রথম আমলের হাদীসটিকে মানসুখ বলেছেন। [আত-তালখীসুল হাবীর: ২/৪৭০ (৯৩৮)]।

ফন্ট সাইজ
15px
17px