📄 সদকার দশটি লাভ
ফকীহ সমরকান্দি রহ. বলেন, কম-বেশি যাই হোক সদাকা করবে। কারণ, সদকার দশটি প্রশংসিত বিষয় রয়েছে। পাঁচটি দুনিয়াতে, পাঁচটি আখেরাতে। দুনিয়াতে পাচঁটি হলো-
১. সম্পদকে পবিত্র করা। রাসূল ইরশাদ করেন- أَلاَّ إِنَّ الْبَيْعَ يَحْضُرُهُ اللَّغْوُ وَالْحَيْفُ وَالْكَذِبُ فَشُوبُوهُ بِالصَّدَقَةِ অর্থাৎ, বেচাকেনার সময় অর্থহীন কথা, শপথ ও মিথ্যার উপস্থিতি থাকে। তাই সদকার মাধ্যমে তাকে পবিত্র করে নাও।
২. এর মাধ্যমে গুনাহ থেকে দেহ পবিত্র করা হয়। কুরআনে এসেছে- খোজ মিন আমওয়ালিহিম সাদাকাতান তুতওয়াহহিরুহুম ওয়াতুজাক্কিহিম বিহা অর্থ: তাদের সম্পদ থেকে তুমি সদকা গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিচ্ছন্ন করবে।
৩. এর মাধ্যমে বিপদাপদ ও রোগ-ব্যধি দূর হয়। রাসূল ইরশাদ করেন, দাওউ মারদ্বাকুম বিসসাদাক্বাহ অর্থাৎ, সদকার মাধ্যমে তোমাদের অসুস্থতার নিরাময় কর।
৪. এর মাধ্যমে দরিদ্রদেরকে আনন্দ দান করা হয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো মুমিনদেরকে আনন্দ দান করা।
৫. এর মাধ্যমে সম্পদে বরকত ও রিযিকে প্রশস্ততা আসে। কুরআনে এসেছে- ওয়ামা আনফাক্বতুম মিন শাইইন ফাহুয়া ইউখলিফুহু অর্থ: আর যা কিছু তোমরা আল্লাহর জন্য ব্যয় কর, আল্লাহ তার বিনিময় দিবেন।
আখেরাতের পাঁচটি হলো-
১. সদকা কিয়ামতের প্রচণ্ড গরমে ছায়া হবে।
২. এর কারণে হিসাব লঘু হবে।
৩. আমলের পাল্লা ভারী হবে।
৪. পুলসিরাত পার হওয়া সহজ হবে।
৫. জান্নাতে দারাজাত বুলন্দ হবে।
যদি মিসকিনদের দোয়া ছাড়া সদকায় আর কোনো লাভ নাও থাকতো, তবুও জ্ঞানীদের উচিত হলো, এতে আগ্রহী হওয়া। আর যখন এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শয়তানের বিরক্তি রয়েছ, তখন এরূপ হওয়া চাই।
হাদীস শরীফে এসেছে- মা ইয়াখরুজু রাজুলুন শাইআন মিনাস সাদাক্বাতি হাত্তা ইউফাক্কা আনহু লাহউই সাবয়ীনা শাইতওয়ানান। 'যখন কেউ (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) কোনো সদকা করে, তার দ্বারা সে সত্তরটি শয়তানের চোয়ালের হাড় ভেঙে ফেলে।' (অর্থাৎ, তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়)
উপরন্তু এতে সালেহীনের অনুসরণ করা হয়। সালেহীন সর্বদা মনে মনে সদকার চিন্তা পোষণ করতেন।
টিকাঃ
৬৮৫. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৩৩২৬; সুনানে তিরমিযী হাদীস-১২০৮। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
৬৮৬. সূরা তাওবা: আয়াত-১০৩
৬৮৭. মারাসিলে আবী দাউদ : হাদীস-১০৫; শোয়বুল ঈমান : হাদীস-৩৫৫৭। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন [সহীহুল জামে-৩৩৫৮]।
৬৮৮. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২২৯৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম : হাদীস-১/৪১৭; সহীহ ইবনে খুযাইমা: হাদীস-২৪৫৭। যাহাবী, সুয়ূতী, ইবনুল মুলাক্কিন রহ. প্রমুখ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি.-এর দানশীলতা
عَنْ أُمِّ ذَرٍّ، وَكَانَتْ تَدْخُلُ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهَا قَالَتْ: بَعَثَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ إِلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا بِمَالٍ فِي غِرَارَتَيْنِ فِيهِمَا ثَمَانُونَ وَمِائَةُ أَلْفِ دِرْهَمْ وَهِيَ صَائِمَةٌ، فَجَعَلَتْ تُقَسِّمُ بَيْنَ النَّاسِ فَأَمْسَتْ وَمَا عِنْدَهَا مِنْ ذَلِكَ دِرْهَمٌ، فَلَمَّا أَمْسَتْ قَالَتْ يَا جَارِيَةُ : هَلُمِّي فُطُورِي، فَجَاءَتْهَا بِخُبْرٍ وَزَيْتٍ، فَقَالَتْ لَهَا : أَمَا اسْتَطَعْتِ فِيمَا قَسَّمْتِ هَذَا الْيَوْমَ أَنْ تَشْتَرِي لَنَا لَحْمًا بِدِرْهَم؟. قَالَتْ: لَا تُعَنِّفِينِي لَوْ كُنْتِ ذَكَرْتِينِي لَفَعَلْتُ.
হযরত উম্মে যর রাযি. থেকে বর্ণিত। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিকট এক লক্ষ আশি হাজার দিরহামের দু'টি থলে প্রেরণ করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. সেদিন রোযা রেখেছিলেন। তিনি তা মানুষের মধ্যে বণ্টন আরম্ভ করলেন। বিকেলে দেখা গেল, তার নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা হলে দাসীকে বললেন, ইফতারের জন্য কিছু আন! দাসী রুটি ও তেল উপস্থিত করল আর বলল, আজ এত দান করলেন, সেখান থেকে এক দিরহাম দিয়ে কিছু গোশতই কিনে রাখতেন। তিনি বললেন, এখন বলে লাভ কী, আগে বললে তো কিনে নেয়া যেত।
বর্ণিত আছে, আব্দুল মালেক বিন আবজার মিরাছ সূত্রে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম পেলেন। দিরহামের থলেগুলো ভাইয়ের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আমি তাদের জন্য জান্নাতের দোয়া করি। সুতরাং দুনিয়ার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে কীভাবে কৃপণতা করব?
📄 হাস্সান বিন আবূ সিনানের ঘটনা
এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত হাসান বিন আবু সিনানের নিকট জনৈকা নারী এসে সুওয়াল করল। তিনি তার দিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন, অত্যন্ত সুন্দরী রমণী সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি দাসকে ডেকে বললেন, একে চারশত দিরহাম দিয়ে দাও। পরে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, সে আপনার নিকট এক দিরহাম চেয়েছে, আপনি তাকে চারশত দিরহাম দিয়ে দিলেন যে! তিনি বললেন, তার সৌন্দর্য দেখে আমার আশঙ্কা হলো যে, অভাবের কারণে সে না আবার পাপে জড়িয়ে যায়। তাই তাকে আমি ধনী বানিয়ে দিতে চাইলাম। হয়তো সম্ভ্রান্ত কেউ তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে বিয়ে করবে।
📄 শিক্ষণীয় এক দাস্তান
হাদীসে এসেছে, জনৈক সাহাবীকে বকরীর মাথা হাদিয়া দেয়া হলো। তিনি ভাবলেন, আমার অমুক ভাই আমার চেয়ে অনেক বেশি অভাবী। সে তার নিকট মাথাটি পাঠিয়ে দিল। যার কাছে পাঠানো হলো, সেও ভাবল যে, তার চেয়ে অমুক ব্যক্তি বেশি অভাবী। এভাবে একের পর এক হাত হয়ে সাত বাড়ি ঘুরে হাদিয়াটি আবার প্রথম বাড়িতে এল। এ প্রসঙ্গেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়েছে-
ওয়াইউছিরুনা আলা আনফুসিহিম ওয়ালাও কানা বিহিম খাসাসাহ অর্থ: তারা নিজেদের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের অনটন থাকে। আর যে কৃপণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে, তারাই সফলকাম।
আরেক বর্ণনা মতে, উক্ত আয়াত জনৈক আনসারী ব্যক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছে। ঘটনাটি হলো, রাসূলের যুগে এক ব্যক্তি রোযা রেখেছিল। সন্ধ্যায় ইফতারের জন্য তার নিকট কিছুই ছিল না। কেবল পানি পানের মাধ্যমে সে ইফতার করল এবং দ্বিতীয় দিনেও রোযা রাখল। এভাবে তৃতীয় দিনেও রোযা রাখলে ক্ষুধার যন্ত্রণায় সে কাতর হয়ে গেল। জনৈক আনসারী জানতে পেরে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তোমার নিকট কোনো কিছু আছে কি? তিনি বললেন, না, কেবল বাচ্চাদের খাবার আছে। তিনি বললেন, কোনো জিনিস দ্বারা তাদেরকে ভুলিয়ে রাখবে এবং তারা যখন রাত্রে খাবার চাইবে, তখন তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। অতঃপর যখন আমাদের মেহমান (ঘরে) প্রবেশ করবে, তখন বাতি নিভিয়ে দেবে এবং তাকে দেখাবে যে, আমরাও খাচ্ছি। সুতরাং তাঁরা সকলেই খাওয়ার জন্য বসে গেলেন, মেহমান খাবার খেল এবং তাঁরা দু'জনে উপবাসে রাত কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর যখন তিনি সকালে নবী ﷺ-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, আজকের রাতে তোমাদের মেহমানের সাথে তোমাদের ব্যবহারে, আল্লাহ বিস্মিত হয়েছেন!
টিকাঃ
৬৮৯. সূরা হাশর: আয়াত-৯
৬৯০. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩৭৯৮; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২০৫৪।