📄 এক আবেদ ও এক কৃপণের গল্প
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, ঈসা আ.-এর যুগে এক ব্যক্তিকে তার কৃপণতার কারণে মালউন তথা অভিশপ্ত নামে ডাকা হতো। জনৈক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, হে অভিশপ্ত! আমাকে সমরাস্ত্র দাও, আমি তা যুদ্ধে ব্যবহার করব এবং এ দান তোমার মুক্তির কারণ হবে, ফলে তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু সে তাকে কিছুই দিলো না। তাই লোকটি ফিরে গেল। কিছু দূর গেলে তার মধ্যে অনুশোচনা আসল। সে মনে মনে লজ্জিত হলো। আর তাকে ডেকে এনে একটি তরবারী দান করল। পথিমধ্যে হযরত ঈসা আ.-এর সঙ্গে তার সাক্ষাত হলো। তার সঙ্গে একজন আবেদও ছিলেন। সে ক্রমাগত সত্তর বছর আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। ঈসা আ. তাকে বললেন, এ তরবারী কোথায় পেলে? সে বলল, ঐ অভিশপ্ত ব্যক্তি আমাকে দান করেছে। একথা শুনে হযরত ঈসা আ. অত্যন্ত খুশি হলেন। উক্ত অভিশপ্ত তখন তার দরজায় বসা ছিল। ঈসা আ. আবেদকে সঙ্গে নিয়ে তার পাশ দিয়ে গমন করলেন। অভিশপ্ত সেই ব্যক্তি ঈসা আ. ও আমাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে গেল এবং তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করল। আবেদ তখন বললেন, আমাকে তার আগুনে ভস্ম করার পূর্বেই আমি তার থেকে পালাই। তখন আল্লাহ তা'আলা ঈসা আ. কে ওহী পাঠালেন, আমার বান্দাকে বল, তরবারী দান এবং তোমাকে ভালোবাসার ফলে আমি তার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছি। আর আবেদকে বল, এই অভিশপ্তই জান্নাতে তার সাথী হবে। ঈসা আ. উভয়কে সংবাদ জানালেন। একথা শুনে আবেদ বলল, আল্লাহর শপথ! আমি তার সঙ্গে জান্নাত চাই না, আমার এমন বন্ধুরও প্রয়োজন নেই। তখন আল্লাহ ঈসা আ. কে ওহীর মাধ্যমে জানালেন যে, আমার বান্দাকে বল, তুমি আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট হওনি এবং তাঁর বান্দাকে অপমান করেছ। সুতরাং আমি তোমাকে জাহান্নামী ও অভিশপ্ত বানিয়ে দিলাম। জাহান্নামে যারা তার বন্ধু হওয়ার কথা ছিল, তাদেরকে তোমার বন্ধু বানিয়ে দিলাম এবং জান্নাতে তোমার যারা বন্ধু হওয়ার কথা ছিল, তোমার সে বন্ধুদেরকে তার বন্ধু বানিয়ে দিলাম।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ مَلَكًا يُنَادِي مِنْ أَبْوَابِ السَّمَاءِ يَقُولُ مَنْ يُقْرِضِ الْيَوْمَ يَجِدْ غَدًا، وَمَلَكُ آخَرُ يُنَادِي يَا مَعْشَرَ بَنِي آدَمَ لِدُوا لِلْمَوْتِ وَابْنُوا لِلْخَرَابِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, আসমানের দরজা থেকে এক ফেরেশতা ঘোষণা করতে থাকেন, যে আজ কর্জ দেবে, ভবিষ্যতে তা পাবে। অপর ফেরেশতা ঘোষণা করতে থাকেন, হে আদম সন্তান! তোমাদের জন্ম হয়েছে মৃত্যুর জন্য এবং তোমাদের নির্মাণ বিরান হওয়ার জন্য।
টিকাঃ
৬৮২. সহীহ ইবনে হিব্বান ৫/১৪০। হাফেজ ইবনে হাজার হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন [মুওয়াফাকাতুল খবর: ২/২৯৮]
📄 উত্তম জীবন
হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! দুনিয়া থেকে আপনার অন্তর্ধানের পর আমাদের জন্য দুনিয়ার পিঠ (জীবন) উত্তম নাকি তার পেট (মৃত্যু) উত্তম? হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল বললেন-
ইজা কা-না উমারাউকুম খিয়ারা কুম, ওয়া আগ্নিয়াউকুম আসখিয়া-আকুম, ওয়া উমুরুকুম শু-রা বাইনাকুম, ফাজাহরুল আরদ্বি খাইরুল্লাকুম মিম বাতনিহা, ওয়া ইজা কা-না উমারাউকুম শিরারা কুম, ওয়া আগ্নিয়াউকুম বুখালা-আকুম, ওয়া উমুরুকুম ইলাল নিসা-ইকুম, ফাবাতনুল আরদ্বি খাইরুল্লাকুম মিন যাহরিহা।
যখন তোমাদের নেতারা শ্রেষ্ঠ হবে, ধনীরা দানশীল হবে, যাবতীয় বিষয় পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে তখন তোমাদের জন্য জমিনের পেট থেকে পিঠই উত্তম। আর যখন তোমাদের নেতারা সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হবে, ধনীরা সর্বাধিক কৃপণ হবে, তোমাদের সর্ববিষয় নারীদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তখন দুনিয়ার পিঠ থেকে পেটই উত্তম।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ : إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَجْعَلَ كَنْزَكَ حَيْثُ لَا يَأْكُلُهُ السُّوسُ، وَلَا تَنَالُهُ النُّصُوصُ فَافْعَلْ بِالصَّدَقَةِ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, তোমরা যদি চাও যে, তোমরা তোমাদের সম্পদকে এমন স্থানে সংরক্ষিত করবে, যেখানে তা ধ্বংস হবে না এবং চোরে নিবে না, তাহলে সদকার মাধ্যমেই কেবল তা সম্ভব।
عَنْ خَالِدٍ بْنِ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ الْأَنْصَارِيَّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: مَنْ أَدَّى الزَّكَاةَ، وَأَقْرَى الضَّيْفَ، وَأَدَّى الْأَمَانَةَ وُقِيَ شُحَّ نَفْسِهِ.
খালেদ ইবনে যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন, যে যাকাত আদায় করে, মেহমানের মেহমানদারী করে এবং আমানত আদায় করে, সে কৃপণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করল।
টিকাঃ
৬৮৩. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২২৬৬; ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গরীব বলেছেন।
৬৮৪. মারাসিলে আবী দাউদ হাদীস-২৩১; কিতাবুস সিকাত: ৪/২০২; জামে সগীর হাদীস-৩১১৭; হাদীসটি জয়ীফ [মাজমা ৩/৭১; জয়ীফুল জামে: ২৩২৫]।
📄 সদকার দশটি লাভ
ফকীহ সমরকান্দি রহ. বলেন, কম-বেশি যাই হোক সদাকা করবে। কারণ, সদকার দশটি প্রশংসিত বিষয় রয়েছে। পাঁচটি দুনিয়াতে, পাঁচটি আখেরাতে। দুনিয়াতে পাচঁটি হলো-
১. সম্পদকে পবিত্র করা। রাসূল ইরশাদ করেন- أَلاَّ إِنَّ الْبَيْعَ يَحْضُرُهُ اللَّغْوُ وَالْحَيْفُ وَالْكَذِبُ فَشُوبُوهُ بِالصَّدَقَةِ অর্থাৎ, বেচাকেনার সময় অর্থহীন কথা, শপথ ও মিথ্যার উপস্থিতি থাকে। তাই সদকার মাধ্যমে তাকে পবিত্র করে নাও।
২. এর মাধ্যমে গুনাহ থেকে দেহ পবিত্র করা হয়। কুরআনে এসেছে- খোজ মিন আমওয়ালিহিম সাদাকাতান তুতওয়াহহিরুহুম ওয়াতুজাক্কিহিম বিহা অর্থ: তাদের সম্পদ থেকে তুমি সদকা গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিচ্ছন্ন করবে।
৩. এর মাধ্যমে বিপদাপদ ও রোগ-ব্যধি দূর হয়। রাসূল ইরশাদ করেন, দাওউ মারদ্বাকুম বিসসাদাক্বাহ অর্থাৎ, সদকার মাধ্যমে তোমাদের অসুস্থতার নিরাময় কর।
৪. এর মাধ্যমে দরিদ্রদেরকে আনন্দ দান করা হয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো মুমিনদেরকে আনন্দ দান করা।
৫. এর মাধ্যমে সম্পদে বরকত ও রিযিকে প্রশস্ততা আসে। কুরআনে এসেছে- ওয়ামা আনফাক্বতুম মিন শাইইন ফাহুয়া ইউখলিফুহু অর্থ: আর যা কিছু তোমরা আল্লাহর জন্য ব্যয় কর, আল্লাহ তার বিনিময় দিবেন।
আখেরাতের পাঁচটি হলো-
১. সদকা কিয়ামতের প্রচণ্ড গরমে ছায়া হবে।
২. এর কারণে হিসাব লঘু হবে।
৩. আমলের পাল্লা ভারী হবে।
৪. পুলসিরাত পার হওয়া সহজ হবে।
৫. জান্নাতে দারাজাত বুলন্দ হবে।
যদি মিসকিনদের দোয়া ছাড়া সদকায় আর কোনো লাভ নাও থাকতো, তবুও জ্ঞানীদের উচিত হলো, এতে আগ্রহী হওয়া। আর যখন এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শয়তানের বিরক্তি রয়েছ, তখন এরূপ হওয়া চাই।
হাদীস শরীফে এসেছে- মা ইয়াখরুজু রাজুলুন শাইআন মিনাস সাদাক্বাতি হাত্তা ইউফাক্কা আনহু লাহউই সাবয়ীনা শাইতওয়ানান। 'যখন কেউ (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) কোনো সদকা করে, তার দ্বারা সে সত্তরটি শয়তানের চোয়ালের হাড় ভেঙে ফেলে।' (অর্থাৎ, তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়)
উপরন্তু এতে সালেহীনের অনুসরণ করা হয়। সালেহীন সর্বদা মনে মনে সদকার চিন্তা পোষণ করতেন।
টিকাঃ
৬৮৫. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৩৩২৬; সুনানে তিরমিযী হাদীস-১২০৮। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
৬৮৬. সূরা তাওবা: আয়াত-১০৩
৬৮৭. মারাসিলে আবী দাউদ : হাদীস-১০৫; শোয়বুল ঈমান : হাদীস-৩৫৫৭। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন [সহীহুল জামে-৩৩৫৮]।
৬৮৮. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২২৯৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম : হাদীস-১/৪১৭; সহীহ ইবনে খুযাইমা: হাদীস-২৪৫৭। যাহাবী, সুয়ূতী, ইবনুল মুলাক্কিন রহ. প্রমুখ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি.-এর দানশীলতা
عَنْ أُمِّ ذَرٍّ، وَكَانَتْ تَدْخُلُ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهَا قَالَتْ: بَعَثَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الزُّبَيْرِ إِلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا بِمَالٍ فِي غِرَارَتَيْنِ فِيهِمَا ثَمَانُونَ وَمِائَةُ أَلْفِ دِرْهَمْ وَهِيَ صَائِمَةٌ، فَجَعَلَتْ تُقَسِّمُ بَيْنَ النَّاسِ فَأَمْسَتْ وَمَا عِنْدَهَا مِنْ ذَلِكَ دِرْهَمٌ، فَلَمَّا أَمْسَتْ قَالَتْ يَا جَارِيَةُ : هَلُمِّي فُطُورِي، فَجَاءَتْهَا بِخُبْرٍ وَزَيْتٍ، فَقَالَتْ لَهَا : أَمَا اسْتَطَعْتِ فِيمَا قَسَّمْتِ هَذَا الْيَوْমَ أَنْ تَشْتَرِي لَنَا لَحْمًا بِدِرْهَم؟. قَالَتْ: لَا تُعَنِّفِينِي لَوْ كُنْتِ ذَكَرْتِينِي لَفَعَلْتُ.
হযরত উম্মে যর রাযি. থেকে বর্ণিত। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিকট এক লক্ষ আশি হাজার দিরহামের দু'টি থলে প্রেরণ করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. সেদিন রোযা রেখেছিলেন। তিনি তা মানুষের মধ্যে বণ্টন আরম্ভ করলেন। বিকেলে দেখা গেল, তার নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা হলে দাসীকে বললেন, ইফতারের জন্য কিছু আন! দাসী রুটি ও তেল উপস্থিত করল আর বলল, আজ এত দান করলেন, সেখান থেকে এক দিরহাম দিয়ে কিছু গোশতই কিনে রাখতেন। তিনি বললেন, এখন বলে লাভ কী, আগে বললে তো কিনে নেয়া যেত।
বর্ণিত আছে, আব্দুল মালেক বিন আবজার মিরাছ সূত্রে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম পেলেন। দিরহামের থলেগুলো ভাইয়ের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আমি তাদের জন্য জান্নাতের দোয়া করি। সুতরাং দুনিয়ার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে কীভাবে কৃপণতা করব?