📄 বিপদাপদে ধৈর্যধারণের সওয়াব
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، قَالَ : شَكَا نَبِيٌّ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ إِلَى رَبِّهِ، فَقَالَ : يَا رَبُّ الْعَبْدُ الْمُؤْمِنُ يُطِيعُكَ وَيَجْتَنِبُ مَعَاصِيكَ، تَزْوِي عَنْهُ الدُّنْيَا وَتَعْرِضُ لَهُ الْبَلَاءُ. وَيَكُونُ الْعَبْدُ الْكَافِرُ لَا يُطِيعُكَ وَيَجْتَرِئُ عَلَى مَعَاصِيكَ، تَزْوِي عَنْهُ الْبَلَاءَ وَتَبْسُطُ لَهُ الدُّنْيَا. فَأَوْحَى اللَّهُ تَعَالَى إِلَيْهِ أَنْ الْعِبَادَ لِي، وَالْبَلاءَ لِي، وَكُلُّ يُسَبِّحُ بِحَمْدِي. فَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ عَلَيْهِ مِنَ الذُّنُوبِ فَأَزْوِي عَنْهُ الدُّنْيَا، وَأَعْرِضُ لَهُ الْبَلَاءَ فَيَكُونُ كَفَّارَةً لِذُنُوبِهِ، حَتَّى يَلْقَانِي فَأَجْزِيَهُ بِحَسَنَاتِهِ. وَيَكُونُ الْكَافِرُ لَهُ السَّيِّئَاتُ، فَأَبْسُطُ لَهُ فِي الرِّزْقِ فَأَزْوِي عَنْهُ الْبَلاءَ حَتَّى يَلْقَانِي فَأَجْزِيهِ بِسَيِّئَاتِهِ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক নবী আল্লাহর নিকট অনুযোগ করে বললেন, হে রব! মুমিন বান্দা আপনার আনুগত্য করে এবং আপনার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে। অথচ আপনি তার দুনিয়ার নিয়ামত নিয়ে যান আর তাকে বিপদের মুখোমুখি করেন। পক্ষান্তরে কাফের বান্দা, যে আপনার আনুগত্য করে না, আপনার অবাধ্যতা করে, তার থেকে আপনি বিপদকে দূরে রাখেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত দান করেন। তখন আল্লাহ তার নিকট ওহী পাঠালেন, মুমিন বান্দাগণও আমার এবং বিপদাপদও আমার সৃষ্টি। সকলেই আমার প্রশংসা করে ও তাসবীহ পড়ে। মুমিনের কিছু গুনাহ থাকে, ফলে আমি তার থেকে দুনিয়াকে দূরে সরিয়ে দিই এবং তাকে বিপদের মুখোমুখি করি। যেন এগুলো তার গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়। এভাবে সে আমার সাথে পাপমুক্ত হয়ে সাক্ষাৎ করে। তখন আমি তাকে তার ভালো কর্মের প্রতিদান দিই। আর কাফেরেরও কিছু নেকি থাকে। ফলে তার বিপদাপদ দূর করি, তাকে পর্যাপ্ত রিযিক দান করি। এভাবে সে আমার সাথে নেকিমুক্ত হয়ে সাক্ষাৎ করে। তখন তাকে আমি তার কৃত যাবতীয় মন্দকর্মের শাস্তি দিই。
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِ خَيْرًا، أَوْ أَرَادَ أَنْ يُصَافِيَهُ، صَبَّ عَلَيْهِ الْبَلَاءَ صَبًّا، وَتَجَهُ عَلَيْهِ تَجَا، وَإِذَا دَعَاهُ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ: يَا رَبُّ صَوْتٌ مَعْرُوفٌ، فَإِذَا دَعَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ : يَا رَبُّ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، لَا تَسْأَلْنِي شَيْئًا إِلَّا أُعْطِيكَ، أَوْ دَفَعْتُ عَنْكَ مَا هُৱ شَرٌّ، وَادَّخَرْتُ عِنْدِي لَكَ مَا هُৱ أَفْضَلُ مِنْهُ. فَإِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ جِيءَ بِأَهْلِ الْأَعْمَالِ فَוُقُوا أَعْمَالَهُمْ بِالْمِيزَانِ، وَلَا يُنْشَرُ لَهُمُ الدِّيوَانُ، وَيُصَبُّ عَلَيْهِمُ الْأَجْرُ صَبًّا، كَمَا يُصَبُّ عَلَيْهِمُ الْبَلَاءُ، فَيَוَدُّ أَهْلُ الْعَافِيَةِ فِي الدُّنْيَا لَوْ أَنَّهُمْ كَانَتْ تُقْرَضُ أَجْسَادُهُمْ بِالْمَقَارِيضِ لِمَا يَرَوْنَ مِمَّا يَذْهَبُ بِهِ أَهْلُ الْبَلَاءِ مِنَ الثَّוَابِ، فَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى: إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ (الزمر : ১০)
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন আল্লাহ তা'আলা কোনো বান্দার কল্যাণ কামনা করেন, কিংবা তাকে আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করার ইচ্ছা করেন, তখন তার উপর বিপদাপদ ও দুর্ভোগ চাপিয়ে দেন। আর যখন সে চিৎকার করে দোয়া করে, তখন ফেরেশতাগণ বলেন, হে রব! এ তো পরিচিত আওয়াজ। এরপর বান্দা যখন পুনরায় আল্লাহকে ডাকে, তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে আমার বান্দা, আমি হাজির! তুমি যা চাও, তাই তোমাকে দিব অথবা যা তোমার জন্য অকল্যাণকর, তা দূর করে দিব। আর আমার নিকট তোমার জন্য এমন কিছু সঞ্চয় করে রাখবো, যা তোমার কাম্য বস্তু থেকেও উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। কিয়ামতের দিন আমলকারীদেরকে উপস্থিত করে মীযানের পাল্লায় মেপে মেপে তাদেরকে প্রতিদান পূর্ণ প্রদান করা হবে। সালাত, সিয়াম, সদকা, ও হজ্ব পালনকারীদেরকে তাদের প্রতিদান মেপে দেয়া হবে। অতঃপর বিপদগ্রস্থদেরকে উপস্থিত করা হবে। তাদের জন্য কোনো পাল্লা স্থাপন করা হবে না, কিতাব খোলা হবে না, বরং তাদের সওয়াব ঢেলে দেওয়া হবে। তখন দুনিয়াতে বিপদমুক্ত জীবন যাপনকারীরা বিপদগ্রস্তদের বিপুল সওয়াব দেখে আফসোস করতে থাকবে। তাদের মনে এ আকাঙ্ক্ষা জাগবে যে, হায় যদি দুনিয়াতে তাদের দেহকে কেটে ফেলা হতো। এ বিষয়টিকেই কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে-
ইন্নামা ইউওয়াফ্ফাস সা-বিরুনা আজরাহুম বিগাইরি হিসা-ব (إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ) অর্থ: নিশ্চয় ধৈর্যধারণকারীদেরকে তাদের প্রতিদান বেহিসাব প্রদান করা হবে।
বর্ণিত আছে, মুমিন ও কাফের একদা মাছ ধরতে গেলে কাফের তার উপাস্যদের নামে জাল ফেলে অনেক মাছ পেলো। মুমিন আল্লাহর নাম নিয়ে জাল ফেলে কিছুই পেলো না। সন্ধ্যায় একটি মাছ পেলেও তা পালিয়ে গেল। মুমিনের ফেরেশতা আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে মুমিনের এবং জাহান্নামে কাফেরের আবাস দেখালেন। ফেরেশতা তখন শান্ত হয়ে বলল, আখেরাতের এই নিআমত ও আযাবের তুলনায় দুনিয়ার লাভ-লোকসান কিছুই না।
টিকাঃ
৫৪৩. আল-মারায : হাদীস-২২০; আল-ফিরদাউস, দাইলামী : হাদীস-৯৭২। আল্লামা ইরাকী হাদীসটিকে জয়ীফ বলেছেন [তাখরীজুল এহইয়া: ১/৪০৪৫]。
৫৪৪. সূরা যুমার: আয়াত-১০
📄 কিয়ামতের দিন চার নবীকে চার ধরনের ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হবে
বলা হয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা চার শ্রেণির মানুষের জন্য চারজন নবীকে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করবেন।
১. ধনী শ্রেণীর সামনে হযরত সুলাইমান আ.কে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা হবে। সুতরাং ধনীরা যখন বলবে যে, ধনৈশ্বর্য আমাদেরকে আপনার ইবাদত থেকে বিরত রেখেছে, তখন সুলাইমান আ.-এর উদাহরণ পেশ করে আল্লাহ বলবেন, তুমি তো সুলায়মান আ. থেকে অধিক ধনী ছিলে না। ধনৈশ্বর্য তাকে আমার ইবাদত থেকে বিরত রাখেনি।
২. গোলামদের সামনে ইউসুফ আ. কে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা হবে। যখন গোলামরা বলবে যে, আমি গোলাম ছিলাম বিধায় আপনার ইবাদত করতে পারিনি তখন আল্লাহ ইউসুফ আ.-এর উদাহরণ পেশ করে বলবেন, গোলামী তো ইউসুফকে আমার ইবাদত থেকে বিরত রাখেনি।
৩. অভাবীদের সামনে ঈসা আ.কে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা হবে। অভাবীরা যখন অভিযোগ করবে যে, আমার অভাব আমাকে আপনার ইবাদত থেকে বিরত রেখেছে, তখন আল্লাহ তা'আলা ঈসা আ.-এর উদাহরণ উপস্থাপন করে বলবেন, তুমি কি ঈসার চেয়েও অধিক অভাবী ছিলে? ঈসাকে তো তার অভাব-অনটন আমার ইবাদত থেকে বিরত রাখেনি।
৪. অসুস্থদের সামনে আইয়ূব আ.কে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা হবে। অসুস্থ ব্যক্তিরা যখন অভিযোগ করবে যে, অসুস্থতা আমাকে আপনার ইবাদত থেকে বিরত রেখেছে, তখন আল্লাহ তা'আলা আইয়ূব আ.কে উপস্থাপন করে বলবেন, তুমি কি আইয়ূব এর তুলনায় অধিক অসুস্থ ছিলে? অসুস্থতা তো তাকে আমার ইবাদত থেকে বিরত রাখেনি।
ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সামনে পেশ করার মতো কোনো ওযরই থাকবে না। সালেহীন ও সৎপথের পথিকরা অসুস্থতা ও কঠিন অবস্থায় নিপতিত হয়ে আনন্দিত হতেন। কারণ, এর মাধ্যমে পাপ মোচন হয়।
📄 দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : ثَلَاثُ مَنْ رُزِقَهُنَّ فَقَدْ رُزِقَ خَيْرَيِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ الرِّضَا بِالْقَضَاءِ، وَالصَّبْرُ عَلَى الْبَلَاءِ وَالدُّعَاءُ عِنْدَ الرَّخَاءِ.
হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, তিনটি বিষয় যাকে দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত কল্যাণ দান করা হয়েছে। যথা-
১. তকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি।
২. বিপদে ধৈর্যধারণ।
৩. সচ্ছল অবস্থাতে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানানো।
টিকাঃ
৫৪৫. হাদীসটি আবুশ শায়েখ তাঁর সাওয়াবে ও দাইলামী তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন [ফাইযুল কাদীর: ৩/৩১৪; জয়ীফুল জামে: হাদীস-২৫৭০]।
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُৱ مُسْتَلْقٍ فَقَالَ : مِنْ أَيِّ شَيْءٍ تَشْتَكِي? قَالَ : الْخَمْصُ يَعْنِي الْجُوعَ، فَبَكَى الرَّجُلُ، ثُمَّ ذَهَبَ يَعْمَلُ فَاسْتَقَى لِرَجُلٍ دِلَاءً كُلُّ دَلْוٍ بِتَمْرَةٍ، ثُمَّ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ مِنْ تَمْرٍ فَقَالَ: مَا أَرَاكَ فَعَلْتَ هَذَا إِلَّا وَأَنْتَ تُحِبُّنِي. قَالَ: إِي وَاللَّهِ، إِنِّي لَأُحِبُّكَ. قَالَ: إِنْ كُنْتَ صَادِقًا فَأَعِدَّ لِلْبَلاءِ جِلْبَابًا، فَوَاللهِ لَلْبَلَاءُ أَسْرَعُ إِلَى مَنْ يُحِبُّنِي مِنَ السَّيْلِ مِنْ أَعْلَى الْجَبَلِ إلى الحضيض.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূল-এর দরবারে উপস্থিত হলো। রাসূল ﷺ তখন চিৎ হয়ে শুয়েছিলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল, কী কারণে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন? তিনি বললেন, ক্ষুধার কারণে। একথা শুনে লোকটি কেঁদে ফেলল এবং এরপর কাজ করতে চলে গেল। এক ব্যক্তিকে পানি এনে দিল। বালতিপ্রতি একটি করে খেজুর পেল। অতঃপর সে রাসূলের নিকট কিছু খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলো। রাসূল ﷺ বললেন, তুমি নিশ্চয় আমাকে ভালোবেসে এ কাজ করেছ? লোকটি বলল, অবশ্যই, আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল ﷺ বললেন, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে বিপদের জন্য প্রস্তুত হও। কারণ, উঁচু ভূমি থেকে নিচু ভূমিতে পানির স্রোত যতটা গতিশীল, যে আমাকে ভালোবাসি, তার দিকে বিপদাপদ এর চেয়ে দ্রুত গতিশীল।
টিকাঃ
৫৪৬. তারীখে বাগদাদ: ৩/১৫৫; আত-তারগীব: হাদীস-৮৫৫; জয়ীফুল জামে: হাদীস-১২৯৭