📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 প্রকৃত জ্ঞানী

📄 প্রকৃত জ্ঞানী


তিনি আরো বলেন, প্রকৃত জ্ঞানী সে ব্যক্তি যে তিনটি কাজ করে। যথা- ১. দুনিয়া তাকে ত্যাগ করার পূর্বে সে দুনিয়াকে ত্যাগ করে। ২. কবরে প্রবেশের পূর্বে নিজের কবর তৈরি করে। ৩. আপন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে তাকে সন্তুষ্ট করে।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 বিজ্ঞবচন

📄 বিজ্ঞবচন


عَنْ عَلِّي بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ : مَنْ جَمَعَ سِتَّ خِصَالٍ لَمْ يَدَعْ لِلْجَنَّةِ مَطْلَبًا وَلَا عَنِ النَّارِ مَهْرَبًا. يَعْنِي لَمْ يَتْرُكِ الْجَهْدَ فِي طَلَبِ الْجَنَّةِ وَالْهَرَبِ مِنَ النَّارِ. أَوَّلُهَا عَرَفَ اللَّهَ تَعَالَى فَأَطَاعَهُ، وَعَرَفَ الشَّيْطَانَ فَعَصَاهُ، وَعَرَفَ الْحَقَّ فَاتَّبَعَهُ، وَعَرَفَ الْبَاطِلَ فَاتَّقَاهُ، وَعَرَفَ الدُّنْيَا فَرَفَضَهَا، وَعَرَفَ الْآخِرَةَ فَطَلَبَهَا

হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যার মধ্যে ছয়টি গুণ পাওয়া গেছে, সে জান্নাতের অন্বেষণ এবং জাহান্নাম থেকে পলায়নে কমতি করেনি। যথা- ১. যে আল্লাহকে চিনতে পেরেছে এবং তার অনুগত্য করেছে। ২. যে শয়তানের ফন্দি সম্পর্কে জেনেছে এবং তার অবাধ্য হয়েছে। ৩. যে সত্যকে জেনেছে এবং তার অনুসরণ করেছে। ৪. যে বাতিলকে জেনেছে এবং তা থেকে বেঁচে থেকেছে। ৫. যে দুনিয়াকে জেনেছে এবং তাকে পরিত্যাগ করেছে। ৬. যে আখেরাতকে জেনেছে এবং তা অন্বেষণ করেছে।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 দুর্ভাগ্যের লক্ষণ

📄 দুর্ভাগ্যের লক্ষণ


عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ : يَا عَلَى أَرْبَعُ خِصَالٍ مِنَ الشَّقَاءِ : جُمُودُ الْعَيْنِ، وَقَسَاوَةُ الْقَلْبِ، وَحُبُّ الدُّنْيَا، وَبُعْدُ الْأَمَلِ .

জাফর ইবন মুহাম্মাদ তিনি তার পিতা থেকে দাদার সূত্রে রাসূল থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল আলী রাযি. কে লক্ষ্য করে বলেছেন, হে আলী! চারটি বিষয় দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। যথা- ১. দৃষ্টির স্থিরতা। ২. কলবের কঠোরতা। ৩. দুনিয়ার ভালোবাসা। ৪. দীর্ঘ আশা।

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ : لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَزِنُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ.

সাহল ইবনে সাদ রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, দুনিয়া যদি আল্লাহর নিকট মাছির পালকের সমতুল্যও হতো, তবে তিনি কোনো কাফেরকে এক ফোঁটা পানিও পান করাতেন না。

টিকাঃ
৫১৬. হিলইয়াতুল আউলিয়া ৬/১৭৫; আল-ফিরদাউস হাদীস-১৫০০; মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/২২৬। হাফেজ যাহাবী হাদীসটিকে মুনকার বলেছেন [মীযানুল ইতিদাল: ৪/২৯১]।
৫১৭. সুনানে তিরযিমী হাদীস-২৩২০, ইবনে মাজাহ হাদীস-৪১১০। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী সহীহ বলেছেন।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 দুনিয়ার নশ্বরতার উদাহরণ

📄 দুনিয়ার নশ্বরতার উদাহরণ


عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عُثْمَانَ قَالَ : ... فَرَأَى سَخْلَةً تَتَنَفَسُ فِي سَلَاهَا . يَعْنِي تَتَحَرَّكُ الدُّودَةُ فِي جِلْدِهَا، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَمْسَكَ نَاقَتَهُ حَتَّى قَامَ الْقَوْমُ فَقَالَ : أَتَرَوْنَ أَهْلَ هَذِهِ الدَّمْنَةِ أَغْنِيَاءَ عَنْ سَخْلَتِهِمْ هَذِهِ، وَقَدْ هَانَتْ عَلَيْهِمْ فَقَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ السَّخْلَةِ عَلَى أَهْلِهَا.

হযরত আব্দুর রহমান বিন উসমান রাযি. বলেন, একবার রাসূল ﷺ একটি ছাগল ছানা দেখতে পেলেন। সেটার চামড়ায় পোকা-মাকড় হেঁটে বেড়াচ্ছিল। এটা দেখে রাসূল স্বীয় বাহনকে দাঁড় করালেন। ফলে সাহাবায়ে কেরামও দাঁড়িয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, তোমাদের কেউ কি মনে কর যে, এই গোত্রের নিকট ছাগল ছানাটির কোনো মূল্য নেই, এটি তাদের নিষ্প্রয়োজনীয়? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই সেরূপ মনে করি। রাসূল ﷺ বললেন, সে সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! এ গোত্রের নিকট ছাগল ছানাটি যতটা মূল্যহীন, আল্লাহর নিকট দুনিয়া তার চেয়েও মূল্যহীন।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ قَالَ : الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ، وَالْقَبْرُ حِصْنُهُ وَالْجَنَّةُ مَأْوَاهُ، وَالدُّنْيَا جَنَّةُ الْكَافِرِ، وَالْقَبْرُ سِجْنُهُ، وَالنَّارُ مَأْوَاهُ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার স্বরূপ, কবর তার জন্য দুর্গ স্বরূপ, আর জান্নাত তার ঠিকানা। পক্ষান্তরে কাফেরের জন্য দুনিয়া হলো, জান্নাত স্বরূপ, কবর তার জন্য কারাগার স্বরূপ, আর জাহান্নাম তার ঠিকানা।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, 'দুনিয়া মুমিনের কারাগার' এ উক্তির ব্যাখ্যা হলো, মুমিন নেয়ামত, সুখ-সমৃদ্ধি ও প্রশস্ততায় জীবন যাপন করলেও আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছেন, সে তুলনায় যেন সে কারাগারে বসবাস করছে। মুমিনের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তার নিকট জান্নাতকে উপস্থাপন করা হবে, আল্লাহ তার জন্য যে সম্মান ও মর্যাদা প্রস্তুত করে রেখেছেন, স্বচক্ষে সে তা দেখতে পাবে, তখন তার উপলব্ধি হবে যে, ইতঃপূর্বে সে নিতান্ত কারাগারে বসবাস করেছে। আর কাফেরের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে জাহান্নামকে তার সম্মুখে উপস্থিত করা হবে, আল্লাহ তার জন্য যে শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন, সে তা স্বচক্ষে দেখতে পাবে। তখন তার মনে হবে যে, ইতঃপূর্বে সে জান্নাতে বসবাস করেছে। সুতরাং যে জ্ঞানী, সে কারাগারে আনন্দ খুঁজে বেড়াবে না এবং দুনিয়ার আনন্দও তালাশ করবে না। তাই জ্ঞানী ব্যক্তির উচিত দুনিয়া ও আল্লাহ দুনিয়ার ক্ষেত্রে যে সমস্ত উপমা দিয়েছেন, তাতে চিন্তা-ভাবনা করবে।

আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالْأَنْعَامُ حَتَّى إِذَا أَخَذَتِ الْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ.

অর্থ: নিশ্চয় জীবনের তুলনা তো পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাযিল করি, অতঃপর তার সাথে জমিনের উদ্ভিদের মিশ্রণ ঘটে, যা মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তু ভোগ করে। অবশেষে যখন জমিন শোভিত ও সজ্জিত হয় এবং তার অধিবাসীরা মনে করে জমিনের উৎপন্ন ফসল করায়ত্ত্ব করতে তারা সক্ষম, তখন তাতে রাতে কিংবা দিনে আমার আদেশ চলে আসে। অতঃপর আমি সেগুলোকে বানিয়ে দেই কর্তিত ফসল, মনে হয় গতকালও এখানে কিছু ছিল না। এভাবে আমি চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।

رُوِيَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ رَجُلًا قَدِمَ عَلَيْهِ مِنْ أَرْضِ الشَّامِ فَسَأَلَهُ عَنْ أَرْضِهِمْ فَأَخْبَرَهُ عَنْ سِعَةِ أَرْضِهِمْ، وَكَثْرَةِ النَّعِيمِ فِيهَا . فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : كَيْفَ تَفْعَلُونَ? قَالَ : إِنَّا نَتَّخِذُ أَلْوَانًا مِنَ الطَّعامِ وَنَأْكُلُهَا . قَالَ : ثُمَّ تَصِيرُ إِلَى مَاذَا? قَالَ : إِلَى مَا تَعْلَمُ يَا رَسُولَ اللهِ. يَعْنِي تَصِيرُ بَوْلًا وَغَائِطًا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَذَلِكَ مَثَلُ الدُّنْيَا

রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি শাম থেকে রাসূল ﷺ-এর নিকট আগমন করল। রাসূল ﷺ তার কাছে তাদের ভূমি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সে তাদের ভূমির প্রশস্ততা ও তাতে ব্যাপক ফসল উৎপাদনের কথা জানালো। রাসূল ﷺ বললেন, তোমরা সেগুলোকে কী কর? সে বলল, আমরা নানান ধরনের খাদ্য উৎপন্ন করে তা খাবার হিসেবে গ্রহণ করি। রাসূল ﷺ বললেন, সেগুলো কোথায় যায়? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কোথায় যায়, তা তো আপনিই ভালো জানেন। অর্থাৎ, তা মলমূত্রে পরিণত হয়। রাসূল ﷺ বললেন, দুনিয়ার উদাহরণ এমনই।

হযরত ইয়াহইয়া বিন মাআয রহ. বলেন, দুনিয়া হলো, সৃষ্টিকর্তার শস্যক্ষেত্র, মানুষ হলো, তার শস্য, মৃত্যু হলো কাস্তে, আর মালাকুল মওত হলো, কর্তনকারী, কিয়ামত হলো, মাড়াইয়ের স্থান, জান্নাত ও জাহান্নাম হলো তার আসল ঠিকানা। তখন একদল জান্নাতে যাবে, অপর দল জাহান্নামে যাবে। লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে বৎস! দুনিয়া হলো, এক গভীর সমুদ্র, অনেকে তাতে ডুবে গেছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর ভীতিকে এর কিশতি বানিয়ে নাও।

টিকাঃ
৫১৮. সুনানে তিরযিমী হাদীস-২৩২১; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪১১১। হাদীসটি সহীহ।
৫১৯. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৫৬; সুনানে তিরযিমী : হাদীস-২৩২৪; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস- ৪১১৩。
৫২০. সূরা ইউনুস: আয়াত-২৪
৫২১. মুসনাদে আহমাদ: ৩৫/১৬১; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস-৭০২। আল্লামা মুনযিরী, হাইসামী, শুয়াইব আরনাউত প্রমুখ সনদটিকে সহীহ বলেছেন [মাজমা-১০/৫১৪]।

ফন্ট সাইজ
15px
17px