📄 চারটি বিষয় ব্যতীত চারটি বিষয়ের দাবী অর্থহীন
عَنْ حَاتِمِ الزَّاهِدِ أَنَّهُ قَالَ: مَنِ ادَّعَى أَرْبَعًا مِنْ غَيْرِ أَرْبَعٍ فَهُৱ مُكَذِّبٌ، مَنِ ادَّعَى حُبَّ مَوْلَاهُ مِنْ غَيْرِ وَرَعٍ عَنْ مَحَارِمِهِ، وَمَنِ ادَّعَى حُبَّ الْجَنَّةِ مِنْ غَيْرِ إِنْفَاقِ مَالِهِ فِي طَاعَةِ اللهِ تَعَالَى، وَمَنِ ادَّعَى حُبَّ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ غَيْرِ اتَّبَاعِ سُنَّتِهِ، وَمَنِ ادَّعَى حُبَّ الدَّرَجَاتِ مِنْ غَيْرِ صُحْبَةِ الْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ.
হযরত হাতেম রহ. বলেন, চারটি বিষয় ব্যতীত চারটি বিষয়ের দাবিদাররা মিথ্যাবাদী। যথা-
১. নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ না করে আল্লাহর ভালোবাসার দাবী।
২. আল্লাহর আনুগত্যে ধন-সম্পদ ব্যয় করা ব্যতীতই জান্নাতের ভালোবাসার দাবী।
৩. রাসূল ﷺ-এর সুন্নতের অনুসরণ করা ব্যতীতই তাঁর ভালোবাসার দাবী।
৪. দরিদ্র ও মিসকীনদের সাহচর্য ব্যতীতই উঁচু মর্যাদার দাবী।
কোনো এক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, যার মধ্যে চার ধরনের ত্রুটি পাওয়া যায়, সে অবশ্যই যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। ১. الْمُتَطَاوِلُ عَلَى مَنْ تَحْتَهُ অর্থাৎ, অধীনস্তের প্রতি অত্যাচারের হাত প্রসারিত করা। ২. وَالْعَاقُ لِوَالِدَيْهِ অর্থাৎ, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। ৩. وَ مَنْ يُحَقَّرُ الْغَرِيبَ অর্থাৎ, ভিনদেশীদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা। ৪. وَ مَنْ يُعَيَّرُ الْمَسَاكِينَ لِمَسْكَنَتِهِمْ অর্থাৎ, দরিদ্রকে তার দারিদ্র্যের কারণে অবহেলা করা।
رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: مَا أَوْحَى اللَّهُ تَعَالَى إِلَيَّ أَنْ أَجْمَعَ الْمَالَ وَأَكُونَ مِنَ التَّاجِرِينَ، وَلَكِنْ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ سَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ. وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ (الحجر : ٩٩)
রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট এই ওহী পাঠাননি, আমি যেন সম্পদ জমা করি ও ব্যবসা করি। বরং আমাকে নিম্নোক্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ (অর্থ : সুতরাং তুমি তোমার রবের প্রশংসার সাথে তাসবীহ পাঠ কর এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও আর মৃত্যু অবস্থায় উপনীত হওয়া পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদত কর)।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ لَا تَحْمِلْكُمُ الْعُسْرَةُ عَلَى أَنْ تَطْلُبُوا الرِّزْقَ مِنْ غَيْرِ حِلَّةٍ ، فَإِذَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : اللَّهُمَّ تَوَفَّنِي فَقِيرًا وَلَا تَتَوَفَّنِي غَنِيًّا، وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَإِنَّ أَشْقَى الْأَشْقِيَاءِ مَنِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِ فَقْرُ الدُّنْيَا وَعَذَابُ الْآخِرَةِ.
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে লোক সকল! অভাব-অনটন ও দরিদ্রতা যেন তোমাদেরকে নিষিদ্ধ উপায়ে রিযিক অন্বেষণে লিপ্ত না করে। কারণ, আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যু দান করুন, ধনী অবস্থায় না এবং কিয়ামতের দিন মিসকীনদের সঙ্গে আমার হাশর করুন। কারণ, সবচেয়ে দুর্ভাগা সে ব্যক্তি, যে দুনিয়াতে অভাবী থাকে আর আখেরাতে শাস্তি ভোগ করে।
টিকাঃ
৫০৮. সূরা হিজরাত: আয়াত-৯৮-৯৯। হাদীস: দাইলামী: ৬১৯৭; হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩১।
৫০৯. মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৭৯১১; সুনানে তিরমিযী, কাশফুল খাফা, ফায়যুল কাদীর। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, 'ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল জাওযী হাদীসটিকে জাল বলে সঠিক করেননি।' কেন না অনেক মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যেমন- হাকেম, যাহাবী, যিয়াউদ্দীন, আলবানী প্রমুখ।
📄 ধন-সম্পদ ফেতনা তুল্য
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ أَتَى بِغَنَائِمَ مِنْ غَنَائِمِ الْقَادِسِيَّةِ فَجَعَلَ يَتَصَفَّحُهَا وَيَنْظُرُ إِلَيْهَا وَيَبْكِي . فَقَالَ لَهُ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ: هُذَا يَوْمُ السُّرُورِ وَالْفَرَحِ، وَأَنْتَ تَبْكِي يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ قَالَ : أَجَلْ وَلَكِنْ مَا أُوتِيَ هَذَا قَوْمٌ إِلَّا أَوْقَعَ بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ.
হযরত উমর বিন খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত। কাদিসিয়া যুদ্ধের গনীমতের মাল তাঁর সামনে উপস্থিত করা হলে, তিনি তা নাড়াচাড়া দিলেন এবং এর দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠলেন। আব্দুর রহমান বিন আউফ রাযি. বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আজ আনন্দিত ও উৎফুল্ল হওয়ার দিন অথচ আপনি কাঁদছেন! উমর রাযি. বললেন, ঠিক বলেছ। তবে যখন কোনো সম্প্রদায়ের নিকট ধন-সম্পদ আসতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।
عَنْ كَعْبِ بْنِ عِيَاضٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّ لِكُلِّ أُمَّةٍ فِتْنَةً وَإِنَّ فِتْنَةَ أُمَّتِي الْمَالُ.
কাব ইবনে ইয়াজ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-কে আমি বলতে শুনেছি, প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি করে ফেতনা থাকে, আমার উম্মতের ফেতনা হলো, সম্পদ।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ أَحَبَّ الْخَلْقِ إِلَى اللهِ الْفُقَرَاءُ لِأَنَّهُ كَانَ أَحَبَّ الْخَلْقِ إِلَى اللَّهِ الْأَنْبِيَاءُ فَابْتَلَاهُمْ بِالْفَقْرِ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, দরিদ্ররাই আল্লাহ তা'আলার নিকট সৃষ্টিকুলের সর্বাধিক পছন্দনীয় ব্যক্তি। কারণ, তাঁর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় ব্যক্তি ছিলেন নবীগণ। আর তাদেরকে তিনি দারিদ্র্যের অবস্থায় রেখেছেন।
টিকাঃ
৫১০. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-২৩৩৬; মুসনাদে আহমাদ : হাদীস-১৭৪৭১। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাকে দুনিয়া থেকে দূরে রাখেন
হযরত ইমাম হাসান বসরী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ.কে ওহীর মাধ্যমে জানালেন যে, আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বান্দা এবং জমিনবাসীরও সর্বাধিক পছন্দনীয় ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবে। তুমি তাঁর নিকট যাও। তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর এবং তাঁর কবরে গিয়ে দণ্ডায়মান হও।
নির্দেশ পেয়ে মূসা আ. লোকালয়ে উক্ত বান্দার অনুসন্ধান করলেন। কোথাও তাঁর খোঁজ পেলেন না। অতঃপর তিনি বিরান ভূমিতে তার সন্ধান করলেন। কিন্তু সেখানেও পেলেন না। ইত্যবসরে মাটি বহনকারী একদল লোকের দেখা পেলেন। তাদেরকে বললেন, তোমরা কি কোনো অসুস্থ বা মৃত ব্যক্তিকে দেখেছ? তাদের কেউ বলল, আমরা বিরান ভূমিতে একজনকে অসুস্থ অবস্থায় দেখেছি। আপনি হয়তো তাকেই খুঁজছেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকেই আমি খুঁজছি। অতঃপর সে স্থানে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। তাঁর মাথার নিচে একটি কাঁচা ইট রাখা। সে নড়ে উঠলে ইট থেকে মাথা পড়ে গেল। এ ব্যক্তির অবস্থা দেখে মূসা আ. দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। আর বললেন, হে রব! ইনি আপনার সর্বাধিক প্রিয় বান্দা। অথচ তাঁর খবর নেওয়ার মতো কেউ নেই। আল্লাহ তা'আলা ওহী পাঠালেন, হে মূসা! যখন আমি কোনো বান্দাকে ভালোবাসি, তখন তার থেকে দুনিয়াকে দূরে সরিয়ে দেই।
📄 বিভিন্নভাবে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করে
হযরত হাসান রহ. বলেন, সর্বপ্রথম যখন মুদ্রা বানানো হয়, ইবলীস সেটাকে দু'চোখে রেখে বলে ছিল, যে তোমাকে ভালোবাসবে, সে আমার গোলাম।
ওহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার বৃদ্ধের আকৃতিতে শয়তান সুলাইমান আ.-এর নিকট উপস্থিত হলো। সুলাইমান আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে বল, ঈসা বিন মারইয়ামের উম্মতের জন্য তুমি কী ফন্দি এঁটে রেখেছ? সে বলল, আমি তাদেরকে আহ্বান করব, যেন আল্লাহ ছাড়াও আরো দুই খোদার উপাসনা করে। সুলাইমান আ. আবার জিজ্ঞেস করলেন, বলো, মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মতের জন্য তুমি কী ফাঁদ এঁটে রেখেছো? সে বলল, আমি তাদেরকে টাকা-পয়সার দিকে আহ্বান করবো। এমনকি টাকা-পয়সা তাদের নিকট 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-র চেয়েও অধিক প্রিয় বস্তু হয়ে উঠবে। সুলাইমান আ. বললেন, আমি আল্লাহর নিকট তোমার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর তাকিয়ে দেখলেন, ইবলীস পালিয়েছে。
সারকথা: ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, দরিদ্রের উচিত আল্লাহর অনুগ্রহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা। সেই সাথে একথাও মনে রাখা যে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দয়া দেখিয়েই দুনিয়াকে তার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন আর তাকে নবী ও আউলিয়াগণের সম্মানে ভূষিত করেছেন। তার উচিত সর্বদা আল্লাহর প্রশংসা করা, দারিদ্র্যের কারণে ভেঙ্গে না পড়া, জীবন যাপনের সঙ্কট ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা। মনে রাখা যে, দুনিয়াতে তাকে যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এর চেয়ে আখেরাতে তার জন্য প্রস্তুতকৃত নেয়ামতরাজী বহুগুণ উত্তম ও মূল্যবান। দরিদ্রের ফযীলতের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, এটা ছিল রাসূল ﷺ-এর পেশা।