📄 চার জিনিস দ্বারা কলব কঠিন হয়ে যায়
চার জিনিস দ্বারা কলব কঠিন হয়ে যায়। যথা- ১. بَطْنُ مُمْتَلِئٌ অর্থাৎ, পূর্ণ উদর। ২. صُحْبَةُ صَاحِبِ السُّوءِ অর্থাৎ, অসৎসঙ্গ। ৩. نِسْيَانُ الذُّنُوبِ الْمَاضِيَةِ অর্থাৎ, অতীত গুনাহের বিস্মরণ। ৪. طُولُ الْأَمَلِ অর্থাৎ, দীর্ঘ আশা।
সুতরাং মুমিনের উচিত তার আশাকে দীর্ঘ না করা। কারণ, সে জানে না, কোন প্রশ্বাসে এবং কোন কদমে তার জন্য মৃত্যু লেখা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ. অর্থ: এবং কোনো নফস জানে না, কোন জমিনে তার মৃত্যু হবে। কোনো কোনো মুফাসসির যমীনকে কদম বা পদক্ষেপ দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। অন্য আয়াতে এসেছে- إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ অর্থ : নিশ্চয় তুমি মৃত্যুবরণ করবে এবং তারাও মৃত্যুবরণ করবে। অপর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ. অর্থ: অতঃপর যখন তাদের নির্ধারিত সময় উপস্থিত হবে, তখন তারা মুহূর্তকাল বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়ে আসতে পারবে না। সুতরাং মুসলমানের কর্তব্য, অধিকহারে মৃত্যুকে স্মরণ করা।
📄 ছয়টি বিষয় মুমিনের জন্য আবশ্যকীয়
মুমিনকে ছয়টি বৈশিষ্ট্য অবশ্যই অর্জন করতে হবে। যথা-
১. عِلْمٌ يَدُلُّهُ عَلَى الْآخِرَةِ অর্থাৎ, এমন ইলম, যা তাকে আখেরাতের পথ দেখাবে।
২. رَفِيقٌ يُعِينُهُ عَلَى طَاعَةِ اللهِ تَعَالَى وَيَمْنَعُهُ عَنْ مَعْصِيَتِهِ অর্থাৎ, এমন বন্ধু, যা তাকে আল্লাহর আনুগত্যে সহায়তা করবে এবং তার অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখবে।
৩. مَعْرِفَةُ عَدُوِّهِ وَالْحَذَرُ مِنْهُ . অর্থাৎ, শত্রুকে শনাক্ত করা এবং তার থেকে সতর্ক থাকা।
৪. عِبْرَةٌ يَعتبرُ بِهَا آيَاتِ اللهِ تَعَالَى وَفِي اخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ . অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা'আলার আয়াতসমূহ এবং রাত দিনের বিবর্তন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা।
৫. إِنْصَافُ الْخَلْقِ كَيْلَا يَكُونَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خَصْمٌ . অর্থাৎ, সকলের সঙ্গে ইনসাফ করা, যাতে কিয়ামতের দিন তার বাদি না থাকে।
৬. الاسْتِعْدَادُ لِلْمَوْتِ قَبْلَ نُزُولِهِ لِكَيْلَا يَكُونَ مُفْتَضَحًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ . অর্থাৎ, মৃত্যুর পূর্বে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, যাতে কিয়ামতের দিন লজ্জিত হতে না হয়।
عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِأَصْحَابِهِ : أَيُرِيدُ كُلُّكُمْ أَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ? قَالُوا : نَعَمْ. جَعَلَنَا اللهُ تَعَالَى فِدَاءَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ : قَصَّرُوا الْأَمَلَ وَاسْتَحْيُوا مِنَ اللهِ حَقَّ الْحَيَاءِ. قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ كُلُّنَا نَسْتَحِي مِنَ اللَّهِ تَعَالَى قَالَ : لَيْسَ ذَلِكَ بِالْحَيَاءِ وَلَكِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ اللهِ تَعَالَى أَنْ تَذْكُرُوا الْمَقَابِرَ وَالْبِلَى وَتَحْفَظُوا الْجَوْفَ وَمَا وَعَى وَالرَّأْسَ وَمَا حَوَى . وَمَنْ يَشْتَهِي كَرَامَةَ الْآخِرَةِ يَدَعُ زِينَةَ الدُّنْيَا، فَهُنَالِكَ يَسْتَحِي الْعَبْدُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى حَقَّ الْحَيَاءِ وَبِهَا يُصِيبُ وِلَايَةَ اللَّهِ تَعَالَى.
হযরত হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের সকলেই কি জান্নাতে যেতে চাও? সকলে বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহ আমাদেরকে আপনার তরে কুরবান করুন! তখন তিনি বললেন, তোমরা আশাকে সংক্ষিপ্ত কর এবং আল্লাহর সঙ্গে উপযুক্ত লজ্জা পোষণ কর। তারা বললেন, হে আবু দারদা! আমরা তো আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে লজ্জা পোষণ করি। রাসূল ﷺ বললেন, সে তো লজ্জা নয়। বরং আল্লাহর ক্ষেত্রে লজ্জা হলো, তোমরা কবরসমূহ ও বিপদাপদের কথা স্মরণ করবে। উদর ও তাতে যা রয়েছে এবং মাথা ও তাতে যা রয়েছে তার হেফাজত করবে। যে ব্যক্তি আখেরাতের সম্মান লাভ করতে চায়, সে যেন দুনিয়ার সৌন্দর্য ও সাজ-সজ্জা বর্জন করে। এভাবে বান্দা আল্লাহর ক্ষেত্রে যথার্থ লজ্জা করতে সক্ষম হয় এবং এতেই আল্লাহর অভিভাবকত্ব লাভ হয়।
টিকাঃ
৪৯১. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-২৪৫৮; মুস্তাদরাকে হাকেম : হাদীস-৭৯১৫; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৩৬৭১; শায়েখ আরনাউত হাদীসটির সনদটিকে জয়ীফ বলেছেন।
📄 উপকারী ধন সম্পদ
عَنِ الْعِجْلِي قَالَ: قَرَأَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ (التكاثر: ১-২) فَقَالَ: يَقُولُ ابْنُ آدَمَ مَالِي مَالِي? وَهَلْ لَكَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ، أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَبْقَيْتَ.
মুআররিক আল-ইজলি রহ. বলেন, রাসূল নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলেন- أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ অর্থ: প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। অতঃপর তিনি বললেন, আদম সন্তান বলে, আমার সম্পদ আমার সম্পদ। তোমার সম্পদ তো তাই যা তুমি ভক্ষণ করে নিঃশেষ করেছ, যা তুমি পরিধান করে নষ্ট করেছ এবং যা তুমি সদকা করে স্থায়ী করে নিয়েছ। এ ছাড়া তোমার কোনো সম্পদ নেই।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, তাওরাতে তিনটি কথা লেখা ছিল। যথা- ১. الْغُنْيَةُ فِي الْقَنَاعَةِ অর্থাৎ, অল্পেতুষ্টিতেও ধনাট্যতা। ২. وَالسَّلَامَةُ فِي الْعَزْلَةِ অর্থাৎ, নির্জনতায় নিরাপত্তা। ৩. وَالْحَرِّيَّةُ فِي رَفْضِ الشَّهَوَاتِ অর্থাৎ, প্রবৃত্তির বর্জন স্বাধীনতা। ৪. وَالْمَحَبَّةُ فِي تَرْكِ الرَّغْبَةِ অর্থাৎ, আগ্রহ ত্যাগে ভালোবাসা। ৫. وَالتَّمَتُّعُ فِي أَيَّامٍ طَوِيلَةٍ بِالصَّبْرِ فِي أَيَّامٍ قَلِيلَةٍ অর্থাৎ, কয়েক দিন ধৈর্য ধারণে, দীর্ঘ দিনের প্রশান্তি。
টিকাঃ
৪৯২. সূরা তাকাসুর: আয়াত-১-২
৪৯৩. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৫৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৩৪২; মুসনাদে আহমাদ: ২৬/২৩২।
📄 দুনিয়ার নশ্বরতা
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : يَا عَائِشَةُ إِنْ أَرَدْتِ اللُّחُوقَ بِي فَلْيَكْفِكِ مِنَ الدُّنْيَا كَزَادِ الرَّاكِبِ وَإِيَّاكِ وَمُجَالَسَةَ الْأَغْنِيَاءِ وَلَا تَسْتَخْلِقِي ثَوْبًا حَتَّى تُرَقَّعِيهِ.
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, হে আয়েশা! তুমি যদি আমার সঙ্গীনী হতে চাও, তাহলে পথিকের পাথেয়ের তুল্য পাথেয়কেই তুমি যথেষ্ট মনে কর। ধনীদের সাথে এক মজলিসে বসা বর্জন কর। কাপড়ে তালি লাগানোর পূর্বে তাকে পুরোনো ভেব না।
رُوِيَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: اللَّهُمَّ مَنْ أَحَبَّنِي فَارْزُقْهُ الْعَفَافَ وَالْكَفَافَ، وَمَنْ أَبْغَضَنِي فَأَكْথِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ.
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, হে আল্লাহ! যে আমাকে ভালোবাসে, তাকে এ পরিমাণ দান করুন, যাতে অপরের নিকট হাত না পাততে হয় এবং তার জন্য তাই যথেষ্ট হয়। আর যে আমাকে ঘৃণা করে, তার সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিন।
عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيَّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الرَّغْبَةُ فِي الدُّنْيَا تُكْثِرُ الْهَمَّ وَالْحَزَنَ، وَالزُّهْدُ فِي الدُّنْيَا يُرِيحُ الْقَلْبَ وَالْبَدَنَ، وَمَا الْفَقْرُ أَخَافُ عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمُ الْغِنَى أَنْ تُبْسَطَ لَكُمُ الدُّنْيَا كَمَا بُسِطَتْ لِمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوا فَيُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَهُمْ.
হযরত হাসান বিন আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি মানুষের দুশ্চিন্তা ও দুঃখ বাড়িয়ে দেয়। দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অন্তর ও দেহকে প্রশান্তি দেয়। আমি তোমাদের ব্যাপারে দারিদ্র্যকে ভয় করছি না। বরং ভয় করছি ধনসম্পদের। তোমাদের জন্য দুনিয়াকে এমনভাবে প্রশস্ত করে দেয়া হবে, যেভাবে তোমাদের পূর্বর্তীদের জন্য প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছিল। ফলে তোমরা দুনিয়ায় মত্ত হয়ে পড়বে, যেমন তারা মত্ত হয়ে পড়েছিলো। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, যেমন তারা ধ্বংস হয়েছিল।
رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: صَلَاحُ أَوَّلِ هَذِهِ الْأُمَّةِ بِالزُّهْدِ وَالْيَقِينِ وَهَلَاكُ آخِرِ هَذِهِ الْأُمَّةِ بِالْبُخْلِ وَالْأَمَلِ.
রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন। এ উম্মতের প্রথম দিকের লোকদের সংশোধন ছিল একীন ও যুহুদের মাধ্যমে। আর এ উম্মতের শেষ দিকের লোকেরা ধ্বংস হবে কৃপণতা ও দীর্ঘ আশার মাধ্যমে।
টিকাঃ
৪৯৪. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৭৮০; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৭৮৬৭; ইবনে হাজার আসকালানী হাদীসটিকে হাসান বললেও অধিকাংশ হাদীসবেত্তাদের মতে, হাদীসটি জয়ীফ।
৪৯৫. শুআবুল ঈমান: হাদীস-১৪৭৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-২৪৪৮; জয়ীফুল জামে: হাদীস-১২৮৮। হাদীসটির সনদ জয়ীফ।
৪৯৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪২৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৬১。
৪৯৭. শুআবুল ঈমান: হাদীস-১০৮৪৪; ত্ববারানী, আওসাত: হাদীস-৭৬৫০। হাফেজ সুযুতী, মুনযিরী ও শায়েখ আলবানী প্রমুখের মতে, হাদীসটি হাসান সহীহ।