📄 নীরবতার উপকারিতাসমূহ
কোনো এক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, নীরবতায় সাত হাজার কল্যাণ নিহিত আছে। সাতটি বাক্যে এর সারনির্যাস তুলে ধরা হলো, যার প্রতিটি কথা এক হাজার কল্যাণের ইঙ্গিতবহ।
১. নীরবতা হলো, ক্লান্তি ও কষ্টহীন ইবাদত।
২. এটি হলো, অলঙ্কারহীন সৌন্দর্য।
৩. এটি হলো, ক্ষমতা ছাড়া ভয়ের কারণ।
৪. এটি প্রাচীর ব্যতীত সুরক্ষা।
৫. এর কারণে কারো কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয় না।
৬. এটি কিরামান কাতেবিন তথা সম্মানিত লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণের প্রশান্তির কারণ।
৭. এটি ব্যক্তির ত্রুটিসমূহের জন্য পর্দাস্বরূপ।
বলা হয়, নীরবতা আলেমের জন্য সৌন্দর্য, আর মূর্খদের জন্য পর্দাস্বরূপ। জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, মানুষের দেহ তিনটি অংশে বিভক্ত। ১. প্রথম অংশ কলব। ২. দ্বিতীয় অংশ জিহ্বা। ৩. এবং তৃতীয় অংশ অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি অংশকেই সম্মানে ভূষিত করেছেন। কলবকে সম্মান দিয়েছেন তার মারিফাত ও তাওহীদের সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে। জিহ্বাকে সম্মান দিয়েছেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্যদান এবং তার কিতাব তিলাওয়াতের মাধ্যমে এবং অপরাপর অঙ্গকে সম্মান দিয়েছেন সালাত, সওম ও যাবতীয় কায়িক ইবাদত আদায়ের মাধ্যমে। আর তিনি প্রতিটি অংশের জন্য নিয়োগ দিয়েছেন একজন হিসাব রক্ষক ও পর্যবেক্ষণকারী। কুরআনে এসেছে- مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ (অর্থ: মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার নিকট রয়েছে ওঁতপাতা প্রহরী)। আর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গর উপর আদেশ ও নিষেধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি অঙ্গ থেকেই দায়িত্ব সম্পাদনের ইচ্ছা করেছেন। কলবের দায়িত্ব হলো, ঈমানের উপর দৃঢ় থাকা এবং হিংসা, খেয়ানত ও কপটতার থেকে নিজেকে বিরত রাখা। জিহ্বার দায়িত্ব হলো, গীবত, মিথ্যাচার এবং অনর্থক কথা পরিহার করা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দায়িত্ব হলো, আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতায় লিপ্ত না হওয়া এবং কোনো মুসলমানকে কষ্ট না দেওয়া। কাজেই যার কলব দায়িত্ব পালন করে না, সে মুনাফিক। যার জিহ্বা দায়িত্ব পালন করে না, সে কাফের এবং যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দায়িত্ব পালন করে না, সে গুনাহগার।
টিকাঃ
৪৭৮. সূরা কা-ফ: আয়াত-১৮
📄 দেহের সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বনিকৃষ্ট অংশ
বলা হয়, লোকমান হাকীম একজন হাবশী দাস ছিলেন। প্রথম তার হিকমত প্রকাশ পায় এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ঘটনাটি হলো- একবার তার মনিব বলল, হে গোলাম! একটি বকরী জবাই কর এবং সর্বোৎকৃষ্ট দু'টি টুকরা আমার নিকট নিয়ে এসো। লোকমান হাকীম জিহ্বা ও কলব নিয়ে এলেন। এরপর মনিব বলল, আরেকটি বকরী জবাই কর এবং এর সর্বনিকৃষ্ট দু'টি টুকরা আমার নিকট নিয়ে এসো। তিনি আবার বকরীর জিহ্বা ও কলব নিয়ে এলেন। মনিব এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, দেহের এ দু'টি অংশ যখন ভালো থাকে, তখন দেহে এর চেয়ে ভালো আর কোনো অঙ্গ নেই। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায়, তখন দেহে এর চেয়ে খারাপ আর কোনো অঙ্গ নেই।
عَنِ الْحَسَنِ قَالَ : نَظَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ إِلَى شَابٍّ فَقَالَ : يَا شَابُّ إِنْ وُقِيتَ شَرَّ ثَلَاثٍ فَقَدْ وُقِيتَ شَرَّ الشَّبَابِ: إِنْ وُقِيتَ شَرَّ لَقْلَقِكَ يَعْنِي لِسَانَكَ، وَذَبْذَبِكَ يَعْنِي فَرْجَكَ، وَقَبْقَبِكَ يَعْنِي بَطْنَكَ.
হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. জনৈক যুবককে বললেন, হে যুবক! যদি তিন জিনিসের অনিষ্টতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পার, তবে যৌবনের অনিষ্টতা থেকে তুমি রক্ষা পাবে। যথা- ১. জিহ্বা, ২. লজ্জাস্থান ৩. এবং উদর।
📄 হযরত মুআয রাযি. কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপদেশ
রূবিয়া আন রাসুলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা আন্নাহু লাম্মা বাআছা মুআযান ইলাল ইয়ামানি, ফাক্বলা: ইয়া নাবীয়্যাল্লাহি আওসিনী, ফাআশারা ইলা লিসানিহি। ইয়ানি আলাইকা বিহিফজিল লিসানি। ফাকাআন্নাহু তাহাওয়ানা বিহি। ফাক্বলা: ইয়া নাবীয়্যাল্লাহি আওসিনী ক্বলা: ছাকিলতকা উম্মুকা। ওয়াহাল ইয়াকুব্বুন্নাসা ফী নারি জাহান্নামা ইল্লা হাসাইদু আলসিনতিহিম।
রাসূল ﷺ মুআয রাযি. কে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময় তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উপদেশ দিন! রাসূল ﷺ তখন তার জিহ্বার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এটা হেফাজত কর। মুআয একে তুচ্ছ জ্ঞান করে পুনরায় বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমাকে উপদেশ দিন! তখন রাসূল ﷺ বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে তার জিহ্বার কারণেই মুখ থুবড়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।
টিকাঃ
৪৭৯. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-২৬১৬; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস-৩৯৭৩। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন।
📄 বুজুর্গদের উক্তি
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, যার কথা বেশি, তার ভুল বেশি। যার সম্পদ বেশি, তার গুনাহ বেশি এবং যার আচরণ মন্দ, সে নিজেই শাস্তি দেয়।
হযরত সুফইয়ান সাওরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিজেকে কোনো ব্যক্তি তীরের বিদ্ধ করা, আমার নিকট অধিক প্রিয় কথার বিদ্ধ করার চেয়ে। কারণ, তিরের নিশানা অনেক সময় ভুল হয়, কিন্তু জিহ্বার নিশানা কখনো ভুল হয় না।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ : إِذَا أَصْبَحَ ابْنُ آدَمَ سَأَلَتِ الْأَعْضَاءُ كُلُّهَا اللَّسَانَ، وَقُلْنَ يَا لِسَانُ. تُنْشِدُكَ اللَّهَ أَنْ تَسْتَقِيمَ، فَإِنَّهُ إِنِ اسْتَقَمْتَ اسْتَقَمْنَا وَإِنِ اعْوَجَجْتَ اعْوَجَجْنَا.
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. বলেন, ব্যক্তি সকালে উপনীত হলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে ডেকে বলে, সত্য-ন্যায়ের পথে থেকো। কারণ, তুমি সত্য-ন্যায়ের পথে থাকলে আমরাও সত্য-ন্যায়ের পথে থাকি। আর তুমি পদচ্যুত হলে আমরাও বাঁকা হয়ে যাই।
টিকাঃ
৪৮০ সুনানে তিরমিযী : হাদীস-২৪০৭; মুসনাদে আহমদ : ১৮/৪০২। শায়েখ আরনাউত সনদটিকে হাসান বলেছেন।