📄 মূর্খের পরিচয়
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন, ছয়টি স্বভাবের মাধ্যমে মূর্খকে চেনা যায়। যথা-
১. তুচ্ছ বিষয়ে রেগে যাওয়া। অর্থাৎ, মানুষ, চতুষ্পদ প্রাণী কিংবা অপ্রিয় কোনো জড় পদার্থের ব্যাপারে রেগে উঠা। এটি মূর্খতার লক্ষণ।
২. অর্থহীন কথা বলা। অতএব, বোধসম্পন্ন ব্যক্তির উচিত নয় এমন কথা বলা, যাতে না দুনিয়াবী উপকার আছে, না পরকালীন উপকার আছে। এটি মূর্খতার লক্ষণ। সুতরাং তার উচিত এমন কথা বলা, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে উপকার রয়েছে।
৩. অপাত্রে দান করা। অর্থাৎ, মূর্খরা এমন ব্যক্তিকে দান করে, যাতে কোনো সওয়াব হয় না। এটি মূর্খতার লক্ষণ।
৪. যার তার কাছে গোপন কথা ফাঁস করা।
৫. যার তার উপর ভরসা করা।
৬. শত্রু মিত্রের পার্থক্য করতে না পারা। অর্থাৎ, ব্যক্তির উচিত তার বন্ধুকে শনাক্ত করতে পারা, যাতে তাকে সঙ্গ দিতে পারে। শত্রুকে শনাক্ত করা, যাতে তাকে পরিহার করতে পারে। শয়তান হলো, মানুষের প্রধান শত্রু। সুতরাং শয়তান যা নির্দেশ করে, তা বর্জন করতে হবে।
📄 হযরত ঈসা আ.-এর বাণী
হযরত ঈসা বিন মারইয়াম আ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে কথায় আল্লাহর যিকির নেই, তা অনর্থক। যে নীরবতায় ফিকির নেই, তা উদাসীনতা এবং যে দৃষ্টিতে শিক্ষাগ্রহণ নেই, তা অর্থহীন। সুতরাং সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সে, যার কথায় আল্লাহর যিকির রয়েছে, নীরবতায় ফিকির রয়েছে এবং দৃষ্টিতে শিক্ষাগ্রহণ রয়েছে।
হযরত আওযাঈ রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, মুমিনের কথা স্বল্প, কর্ম অধিক। মুনাফিকের কথা বেশি, কর্ম কম।
رُوِيَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: خَمْسٌ لَا تَكُونُ فِي الْمُنَافِقِ الْفِقْهُ فِي الدِّينِ، وَالْوَرَعُ بِاللَّسَانِ، وَالتَّبَسُمُ فِي الْوَجْهِ، وَالنُّورُ فِي الْقَلْبِ، وَالْمَوَدَّةُ فِي الْمُسْلِمِينَ.
রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, পাঁচটি বিষয় মুনাফিকের মধ্যে পাওয়া যাবে না। ১. দীনী বিষয়ের গভীর জ্ঞান। ২. যবানের ব্যাপারে সাবধানতা। ৩. চেহারায় উৎফুল্ল। ৪. অন্তরে নূর। ৫. এবং মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা।
হযরত ইয়াসিন বিন আকসাম রহ. বলেন- مَا صَلُحَ مَنْطِقُ رَجُلٍ إِلَّا عُرِفَ ذَلِكَ فِي سَائِرِ عَمَلِهِ، وَلَا فَسَدَ مَنْطِقُ رَجُلٍ إِلَّا عُرِفَ ذَلِكَ فِي سائرِ عَمَلِهِ. যে ব্যক্তির কথা-বার্তা শুদ্ধ হয়ে যায়, তার যাবতীয় কর্মে এর ছাপ পরিলক্ষিত হয়। আর যার কথা অশুদ্ধ ও অনিষ্টকর, তার ছাপও কাজ-কর্মে পরিলক্ষিত হয়। হযরত লোকমান হাকীম থেকে বর্ণিত। একবার তিনি তার পুত্রকে লক্ষ্য করে বললেন- يَا بُنَيَّ مَنْ يَصْحَبُ صَاحِبَ السُّوءِ لَمْ يَسْلَمْ، وَمَنْ يَدْخُلْ مَدْخَلَ السُّوءِ يُتَّهَمْ، وَمَنْ لَا يَمْلِكُ لِسَانَهُ يَنْدَمْ (বৎস! যে অসৎ লোকের সঙ্গ গ্রহণ করে, সে নিরাপদ নয়। যে মন্দস্থানে প্রবেশ করে, সে কলুষতার অভিযোগে দুষ্ট হয়। আর যে জবানকে হেফাজত করে না, সে অনুতপ্ত হয়)।
عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : طُوبَى لِمَنْ مَلَكَ لِسَانَهُ، وَوَسِعَهُ بَيْتُهُ وَبَكَى عَلَى خَطِيئَتِهِ.
রাসূল ﷺ বলেছেন- সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যে আপন জবানকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, নিজগৃহে থাকে এবং নিজের কৃত গুনাহের জন্য ক্রন্দন করে।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আমার পিতা হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, লোকেরা বলতো, প্রজ্ঞাবানের কথা থাকে কলবের আড়ালে। যখন তিনি কিছু বলার ইচ্ছা করেন, তখন কলবের সম্মতি নিয়ে বলেন। কলব অসম্মত হলে বিরত থাকেন। আর মূর্খদের কলব থাকে কথার আড়ালে। ফলে তা অন্তর দিয়ে যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে মুখে যা আসে তাই বলে।
টিকাঃ
৪৭৫. মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ১০/২৯৯; ফায়জুল কাদীর: ৪/২৮২। আল্লামা হাইসামীর ভাষ্যমতে, হাদীসটি ত্ববারানী বর্ণনা করে সনদটিকে হাসান বলেছেন।
📄 জ্ঞানী ব্যক্তির চিন্তাভাবনা এবং আমলের জন্য সময় বণ্টন
عَنْ أَبِي ذَرِّ الْغِفَارِيِّ أَنَّهُ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ مَا كَانَ فِي صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ? قَالَ : كَانَ فِيهَا أَمْثَالٌ وَعِبَرٌ، يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ مَا لَمْ يَكُنْ مَغْلُوبًا فِي عَقْلِهِ أَنْ يَكُونَ حَافِظًا لِلِسَانِهِ عَارِفًا بِزَمَانِهِ مُقْبِلًا عَلَى شَانِهِ، فَإِنَّهُ مَنْ حَسِبَ كَلَامَهُ مِنْ عَمَلِهِ قَلَّ كَلَامُهُ إِلَّا فِيمَا يَعْنِيهِ.
আবু যর গিফারী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! ইবরাহীম আ.-এর সহীফায় কী লেখা ছিল? তিনি বললেন তাতে কিছু উদাহরণ ও শিক্ষণীয় প্রবচন ছিল। সেখানে লেখা ছিল- ১. বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির উচিত যতক্ষণ তার বোধশক্তি থাকে, সে যেন জবানকে হেফাজত করে। ২. সময়ের মূল্যায়ন করে। ৩. নিজের বিষয়াদির প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হয়। কারণ, যে কথার হিসাব নেয়, তার কথা কমে যায়। তবে প্রয়োজনীয় কথা তো বলতেই হবে।
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ لَا يَكُونَ شَاخِصًا إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: مَرَمَّةٍ لِمَعَاشِهِ أَوْ خَلْوَةٍ لِمَعَادِهِ، أَوْ لَذَّةٍ فِي غَيْرِ مُحَرَّم. قَالَ : يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ لَهُ فِي النَّهَارِ أَرْبَعُ سَاعَاتٍ: سَاعَةً يُنَاجِي فِيهَا رَبَّهُ، وَسَاعَةً يُحَاسِبُ فِيهَا نَفْسَهُ، وَسَاعَةً يَأْتِي فِيهَا أَهْلَ الْعِلْمِ الَّذِي يُبَصِّرُونَهُ بِأَمْرِ دِينِهِ وَدُنْيَاهُ وَيَنْصَحُونَهُ. وَسَاعَةٌ يُخَلِّي بَيْنَ نَفْسِهِ وَلَذَاتِهَا فِيمَا يَحِلُّ وَيَجْمُلُ. وَقَالَ : يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَنْظُرَ فِي شَأْنِهِ وَيَعْرِفَ أَهْلَ زَمَانِهِ وَيَحْفَظَ فَرْجَهُ وَلِسَانَهُ.
হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, তিনটি বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির মনোযোগী হওয়া উচিত। যথা- ১. জীবন চলার পাথেয় সংগ্রহে। ২. পরকালের ধ্যানমগ্নতায়। ৩. বৈধ আনন্দের দিকে। তিনি আরো বলেন, জ্ঞানীর জন্য দিনে চারটি সময় নির্ধারিত থাকা উচিত। ১. কিছু সময়, যখন সে আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করবে। ২. কিছু সময়, যখন সে নিজের হিসাব-নিকাশ করবে। ৩. কিছু সময়, যখন সে জ্ঞানীদের দরবারে উপস্থিত হবে, যাদের সংস্পর্শে তার ধর্মীয় ও পার্থিব জ্ঞানের বিস্তার ঘটবে এবং যারা তাকে নসীহত করবেন। ৪. আর কিছু সময়, যখন সে নিজের নফসকে বৈধ স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ করে দেবে। তিনি আরো বলেন, জ্ঞানী ব্যক্তির উচিত, নিজের ব্যাপারে পূর্ণ যত্নবান হওয়া। তার সমসাময়িক লোকদের সম্পর্কে জানা এবং তার লজ্জাস্থান ও জবানের হেফাজত করা। হযরত দাউদ আ.-এর পরিবারের হিকমত হিসাবে একথাগুলো উল্লেখ করা হয়。
টিকাঃ
৪৭৬. হাদীসের এই অংশটি একটি দীর্ঘ হাদীস থেকে নেওয়া হয়েছে। [সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস- ৩৬১; শায়েখ শুয়াইব আরনাউত সনদটিকে অত্যন্ত জয়ীফ বলেছেন। সনদে হাদীস জালকারী রাবী বিদ্যমান।
📄 নীরব থাকার উপকারিতা
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّ لُقْمَانَ الْحَكِيمَ دَخَلَ عَلَى دَاوُدَ النَّبِيَّ ﷺ وَكَانَ دَاوُدُ يَسْرُدُ الدَّرْعَ، فَجَعَلَ يَتَعَجَّبُ مِمَّا يَرَى فَأَرَادَ أَنْ يَسْأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ فَمَنَعَتْهُ حِكْمَتُهُ، فَأَمَسْكَ نَفْسَهُ وَلَمْ يَسْأَلْهُ. فَلَمَّا فَرَغَ قَامَ دَاوُدُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَلَبِسَ الدَّرْعَ ثُمَّ قَالَ : نِعْمَ الدَّرْعُ لِلْحَرْبِ، وَنِعْمَ عَامِلُهُ ، فَقَالَ لُقْمَانُ : الصَّمْتُ حِكْمَةٌ. وَقَلِيلٌ فَاعِلُهُ.
আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। একবার লোকমান হাকীম নবী দাউদ আ.-এর নিকট উপস্থিত হলেন। দাউদ আ. তখন বর্ম বানাচ্ছিলেন। তিনি বর্ম বানানো দেখে আশ্চর্য হলেন। অতঃপর এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করার উপক্রম হলেন। কিন্তু তার হিকমত তাকে জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত রাখল। তাই তিনি নিজেকে সংবরণ করলেন এবং প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকলেন। দাউদ আ. বর্ম বানানো শেষে দাঁড়িয়ে বর্মটি পরে নিলেন এবং বলতে লাগলেন, যুদ্ধের জন্য এ বর্ম খুবই উত্তম এবং তার নির্মাণকারীও খুব দক্ষ। লোকমান হাকীম তখন বললেন, নীরবতাই হিকমত কিন্তু নীরবতা অবলম্বনকারীর সংখ্যা খুবই কম।
কোনো কবি বলেন-
الْعِلْمُ زَيْنٌ وَالسُّكُوتُ سَلَامَةٌ * فَإِذَا نَطَقْتَ فَلَا تَكُنْ مِكْثَارًا
مَا إِنْ نَدِمْتُ عَلَى سُكُوتِي مَرَّةً * وَلَقَدْ نَدِمْتُ عَلَى الْكَلَامِ مِرَارًا
ইলম হলো, সৌন্দর্য আর নীরবতা হলো, নিরাপত্তা। কাজেই যখন কথা বলো কম বলো। কারণ, নীরবতার জন্য আমি কখনো লজ্জিত হইনি। বরং অধিক কথার কারণেই লজ্জিত হয়েছি বারংবার।
কবি বলেন-
يَمُوتُ الْفَتَى مِنْ عَثْرَةٍ بِلِسَانِهِ * وَلَيْسَ يَمُوتُ الْمَرْءُ مِنْ عَثْرَةِ الرِّجْلِ
لَا تَنْطِقَنَّ بِمَا كَرِهْتَ فَرُبَّمَا * نَطَقَ اللِّسَانُ بِحَادِثٍ فَيَكُونُ
'জবানের স্খলন ব্যক্তির জন্য ধ্বংস বয়ে আনে। অথচ পদস্খলনের ফলে মৃত্যু হয়েছে, এমন হয়নি কখনো। যা অপছন্দ তা বলো না। কারণ, অনেক সময় মুখের কথাই সত্য হয়।'
টিকাঃ
৩৯৫. আল-ফিরদাউস, দাইলামী : হাদীস-৮৮৮৮; আল-ইলালুল মুতানাহিয়া : ২/৭০৯। হাদীসটির সনদে হারেস নামক রাবী মিথ্যাবাদী। ইবনুল জাওযী হাদীসটিকে জাল বলেছেন।