📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 ধৈর্য ও সহনশীলতার ফযীলত

📄 ধৈর্য ও সহনশীলতার ফযীলত


অতীত যুগের জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণিত আছে- তার একটি ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটি ছিল তার খুব প্রিয় ও আদরের। একদিন সে দেখল ঘোড়া তিন পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি গোলামকে বললেন, কেন এমন করল? গোলাম বলল, আমি করেছি। তিনি বললেন, কেন করেছ? সে বলল, এর মাধ্যমে আমি আপনাকে ক্রুদ্ধ করতে চেয়েছি। তিনি বললেন, যে (শয়তান) তোমাকে এ নির্দেশ দিয়েছে আমিও তাকে রাগাব। যাও, আজ থেকে তুমি স্বাধীন এবং ঘোড়াও তোমার।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতিফল

📄 ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতিফল


ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, মুসলমানের উচিত সহনশীল ও ধৈর্যশীল হওয়া। কেন না, তা মুত্তাকীদের স্বভাব। আল্লাহ তা'আলা সহনশীলের প্রশংসা করে বলেছেন-
وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
অর্থ: যে ব্যক্তি জুলুমের উপর ধৈর্য ধারণ করবে, জালেমকে এড়িয়ে চলবে এবং তাকে ক্ষমা করে দেবে। নিশ্চয় এটি বড় সাহসিকতার কাজ।

অপর আয়াতে এসেছে-
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
অর্থ: ভালো কথা মন্দ কথার সাথে তুলনীয় নয়। তোমরা প্রতিউত্তর কর এমন কথার মাধ্যমে, যা উত্তম। এর ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সেও পরিণত হবে উষ্ণ বন্ধুতে।

আল্লাহ তা'আলা তার বন্ধু ইবরাহীম আ.-এর সহনশীলতার প্রশংসা করে বলেছেন-
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ
অর্থ : নিশ্চয় ইবরাহীম অতি সহনশীল, বেদনাকাতর এবং প্রবলভাবে আল্লাহমুখী।
আল্লাহ তা'আলা নবীদেরকে ধৈর্য ও সহনশীলতার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর পূর্ববর্তী নবীগণও এ গুণের অধিকারী ছিলেন। কুরআনে এসেছে- فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ অর্থ : সুতরাং আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, যেরূপ ধৈর্যধারণ করেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। 'উলুল আযম' (أُولُو الْعَزْم) বলতে এমন লোকদেরকে বলা হয়েছে, যারা সর্বক্ষেত্রে অটল থাকে।

হযরত হাসান রহ. নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন- وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا অর্থ : যখন তাদেরকে মূর্খরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম। উল্লিখিত আয়াতে মূর্খদের কথার জবাবে তারা সহনশীল বাক্য বলে ধৈর্যের কারণে। তাদের সাথে মূর্খতাসুলভ আচরণ করলেও তারা সহনশীলতা দেখায় ধৈর্যের কারণে।

টিকাঃ
৪৫৩. সূরা শুরা: আয়াত-৪৩
৪৫৪. সূরা ফুসসিলাত: আয়াত-৩৪
৪৫৫. সূরা হুদ: আয়াত-৭৫
৪৫৬. সূরা আহকাফ: আয়াত-৩৫

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 জনৈক আবেদর ঘটনা

📄 জনৈক আবেদর ঘটনা


ওহাব বিন মুনাব্বিহ রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, বনী ইসরাঈলের জনৈক আবেদ ছিল। শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সক্ষম হয়নি। একদিন উক্ত আবেদ কোথাও বের হলেন। শয়তান সুযোগের অপেক্ষায় তার পিছু নিল। তার প্রবৃত্তি ও ক্রোধের মাধ্যমে ভ্রষ্ট করতে চেষ্টা করল। কিন্তু সক্ষম হলো না। অতঃপর সে ভীতির মাধ্যমে পথভ্রষ্ট করতে চাইল এবং পাহাড়ের বিশাল পাথর তার মাথার দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। আবেদ আল্লাহর নাম নেওয়ার সাথে সাথে তা সরে গেল। ফলে শয়তান সফল হলো না। এরপর শয়তান বাঘ ও হিংস্র পশুর বেশে উপস্থিত হলো। আবেদ আল্লাহকে স্মরণ করলেন এবং তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। আবেদ নামাযে দাঁড়ালে শয়তান সাপের বেশে উপস্থিত হলো। সে তার পায়ে লেপ্টে গেল। এক সময় মাথা পর্যন্ত লেপ্টে ফেলল। এরপর সেজদার জায়গায় পড়ে থাকে। তিনি সেজদার জন্য ঝুঁকলে, সাপটি মুখ হা করে তাকে গিলে ফেলার উপক্রম হয়। তিনি হাত দিয়ে সাপটি সরিয়ে সেজদা করতেন। এভাবে আবেদ নামায শেষ করলেন।

নামায শেষ হলে শয়তান তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আমিই আপনার সাথে এতক্ষণ এমন করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই সফল হয়নি। তাই আপনার সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব করতে চাই এবং আজকের পর আপনাকে কখনো পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করব না।

আবেদ বললেন, আজ তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছ। কিন্তু আল্লাহর শোকর, আমি ভয় পাইনি। তোমার সাথে বন্ধুত্বের কোনো প্রয়োজন আমার নেই। শয়তান বলল, আপনি আপনার পরিজন সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করুন যে, আপনার পরে আমি তাদেরকে কিভাবে আক্রান্ত করব। আবেদ বললেন, আমি তাদের পূর্বেই মৃত্যুবরণ করব। শয়তান বলল, তাহলে জিজ্ঞেস করুন, কীভাবে আদম সন্তানদেরকে আমি ভ্রষ্ট করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদেরকে কীভাবে ভ্রষ্ট কর, তা বলতে পার। শয়তান বলল, তিনটি উপায়ে আমি তাদেরকে ভ্রষ্ট করি।
১. কৃপণতা।
২. ক্রোধ।
৩. মত্ততা。
কেন না, মানুষ যখন কৃপণ হয়, তখন তার দৃষ্টিতে সম্পদকে অত্যন্ত স্বল্প করে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সে হক আদায়ে বিরত থাকে এবং অন্যের সম্পদের প্রতি লোভী হয়ে ওঠে। আর যখন সে ক্রোধান্বিত হয়, তখন তাকে আমাদের মাঝে এমনভাবে ঘুরানো হয়, যেভাবে শিশুরা তাদের খেলায় বল ঘুরায়। আর সে যখন মাতাল হয়, তখন তাকে পশুর মতো কান ধরে যেখানে যেভাবে ইচ্ছা পরিচালনা করা যায়।

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, উক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, শিশুদের হাতে বল যেমন খেলার উপকরণ, তেমনি ক্রোধান্বিত ব্যক্তিও শয়তানের খেলার উপকরণ। সুতরাং ক্রোধান্বিত ব্যক্তির উচিত ধৈর্যের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধা করা, যাতে সে শয়তানের ক্রীড়াকে পরিণত না হয়। অন্যথায় তার আমল নষ্ট হয়ে যাবে।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হযরত মূসা আ.-এর নিকট ইবলিসের আবেদন

📄 হযরত মূসা আ.-এর নিকট ইবলিসের আবেদন


বলা হয়, একদা ইবলীস শয়তান হযরত মূসা আ.-এর নিকট এসে বলল, হে মূসা! আপনি এমন ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রেসালাতের জন্য মনোনীত করেছেন এবং আপনার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি তো আল্লাহরই এক সৃষ্টি, আমি আপনার রবের নিকট তাওবা করতে চাই। আপনি তার কাছে প্রার্থনা করুন, যাতে তিনি আমার তাওবা কবুল করেন। শয়তানের মুখে এ কথা শুনে মূসা আ. অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি পানি আনিয়ে উযূ করলেন এবং যত মন চায় নামাযে দাঁড়ালেন। নামায শেষে দোয়া করলেন, হে আমার রব, ইবলীস, আপনারই এক সৃষ্টি, আপনার নিকট মাফ চায়, আপনি তাকে মাফ করে দিন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী এলো, হে মূসা! সে তো তাওবা করবে না। মূসা বললেন, হে রব, সে তো আপনার কাছে মাফ চায়। তখন আল্লাহ তা'আলা ওহী প্রেরণ করলেন, হে মূসা! তাকে বলো সে যেন আদমের কবরে সেজদা করে। তাহলে আমি তাকে মাফ করে দেব। মূসা আ. খুশি হয়ে ফিরে এলেন এবং শয়তানকে পুরো ঘটনা জানালেন। শয়তান তা শুনে ক্রুদ্ধ হলো এবং দম্ভভরে বলল আমি তাকে জীবিতাবস্থাতেই সেজদা করিনি, এখন মৃত্যুর পর সেজদা করব? অতঃপর শয়তান বলল, হে মূসা! আপনি যেহেতু আমার জন্য সুপারিশ নিয়ে গিয়েছিলেন, তাই আপনাকে আমি তিনটি উপদেশ দিচ্ছি।
১. রেগে গেলে আমাকে স্মরণ করবেন। কারণ, তখন আমি শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যাই।
২. যুদ্ধে সংখ্যায় বেশি এমন শত্রু দলের মুখোমুখি হলে আমাকে স্মরণ করবেন। কারণ, আদম সন্তান যুদ্ধে গেলে আমি তার নিকট উপস্থিত হই এবং স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনের কথা স্মরণ করিয়ে দিই, ফলে সে যুদ্ধ ছেড়ে পালায়।
৩. মাহরাম নয় এমন নারীর সঙ্গে নির্জনে মিলিত হওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ, তখন উভয়ের মধ্যে আমি কামনার দূত হয়ে উঠি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px