📄 কান্নার ভান করা
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আউযায়ী রহ. বলেন, এখানে ছোট গুনাহ বলতে মুচকি হাসি, আর বড় গুনাহ বলতে অট্ট হাসি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, অট্টহাসি কবীরা গুনাহ।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّهُ قَالَ: لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا، وَلَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَسَجَدَ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَنْقַטِعَ صُلْبُهُ، وَلَصَرَخَ حَتَّى يَنْقַطِعَ صَوْتُهُ، ابْكُوا إِلَى اللَّهِ تَعَالَى، فَإِذَا لَمْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমার ইবনুল আস রাযি. বলেন, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা কম হাসতে আর বেশি বেশি কাঁদতে। আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে এতো লম্বা সেজদা করতে যে, মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যেত। আর এতটাই চিৎকার করতে যে, কণ্ঠনালী ছিঁড়ে ফেলতে। আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি কর। যদি কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান কর।
📄 তিন ধরনের চোখ
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَجْلَانَ فِي حَدِيثٍ يَذْكُرُهُ قَالَ : كُلُّ عَيْنٍ بَاكِيَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا ثَلَاثَةَ أَعْيُنٍ : عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ تَعَالَى، وَعَيْنٌ غَضَّتْ عَنْ مَحَارِمِ اللَّهِ تَعَالَى، وَعَيْنٌ سَهِرَتْ فِي سَبِيلِ اللهِ تَعَالَى .
হযরত মুহাম্মদ ইবনে আজলান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তিন ধরনের চোখ ছাড়া কিয়ামতের দিন প্রতিটি চোখকে কাঁদতে হবে।
১. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে।
২. যে চোখ হারাম থেকে বিরত থেকেছে।
৩. যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় জাগ্রত থেকেছে।
টিকাঃ
৪৪১ হিলইয়াতুল আউলিয়া ৩/১৬৩; কানযুল উম্মাল হাদীস-৪৩৩৫৭; হাদীসটিকে আল্লামা আসবাহানী গরীব ও শায়েখ আলবানী জয়ীফ বলেছেন।
📄 ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর উক্তি
عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ : ضَحِكْتُ مَرَّةً وَأَنَا مِنَ النَّادِمِينَ عَلَى ذَلِكَ وَ ذَلِكَ أَنِّي نَاظَرْتُ عَمْرَو بْنَ عُبَيْدِ الْقَدَرِيَّ، فَلَمَّا أَحْسَسْتُ بِالظَّفَرِ ضَحِكْتُ. فَقَالَ لِي : تَتَكَلَّمُ فِي الْعِلْمِ وَتَضْحَكُ، فَلَا أُكَلِّمُكَ أَبَدًا، وَأَنَا مِنَ النَّادِمِينَ عَلَى ذَلِكَ إِذْ لَوْ لَمْ يَكُنْ ضِحْكِي لَرَدَدْتُهُ إِلَى قَوْلِي فَكَانَ فِي ذَلِكَ صَلَاحُ الْعِلْمِ.
হযরত ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, আমি জীবনে একবার হেসেছিলাম। আর এ জন্য আমি এখনও অনুতপ্ত। একবার আমি মুতাযিলী ইমাম আমর ইবনে উবাইদ কাদরীর সাথে মুনাযারা করছিলাম। যখন আমি জিতে যাওয়ার বিষয়টি অনুভব করলাম, তখন হেসে ফেললাম। তাই দেখে কাদরী বলল, আপনি ইলমের আলোচনায় বসে হাসছেন? আমি আপনার সাথে কখনো কথা বলব না। তখন আমার খুব আফসোস হলো। কারণ, আমি যদি না হাসতাম তাহলে অবশ্যই তাকে আমার মতে নিয়ে আসতে পারতাম এবং তর্কে আমি জিতে যেতাম। এতে ইলমের অনেক উপকার হতো।
📄 নয়টি পরিত্যাগে নয়টি বিষয় লাভ
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আবেদ রহ. বলেন, যে ব্যক্তি নয়টি বিষয় পরিত্যাগ করবে আল্লাহ তাকে নয়টি বিষয় দান করবেন-
১. مَنْ تَرَكَ فُضُولَ النَّظَرِ ওফফিকা লীল খুশুয়ী (وُفِّقَ لِلْخُشُوعِ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অর্থহীন দৃষ্টিপাত পরিত্যাগ করবে আল্লাহ তাকে খুশু বা খোদাভীতি দান করবেন।
২. وَمَنْ تَرَكَ الْكِبْرَ ওফফিকা লীত্ তাওয়াজুয়ী অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অহংকার থেকে বেঁচে থাকবে আল্লাহ তাকে বিনয় দান করবেন。
৩. وَمَنْ تَرَكَ فُضُولَ الْكَلَامِ ওফফিকা লীল হিকমাতি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অর্থহীন কথা পরিত্যাগ করবে আল্লাহ তাকে প্রজ্ঞা দান করবেন。
৪. وَمَنْ تَرَكَ فُضُولَ الطَّعَامِ ওফফিকা লীহালাওয়াতীল ইবাদাতি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় খাবার বর্জন করবে আল্লাহ তাকে ইবাদতের স্বাদ দান করবেন。
৫. وَمَنْ تَرَكَ الْمُزَاحَ ওফফিকা লীল বাহা-ই অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ঠাট্টা-তামাশা পরিত্যাগ করে চলবে আল্লাহ তার স্বভাবে গাম্ভীর্য দান করবেন。
৬. وَمَنْ تَرَكَ الضَّحِكَ ওফফিকা লীল হাইবাতি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হাসি-তামাশা পরিত্যাগ করে চলবে আল্লাহ তার স্বভাবে গাম্ভীর্য দান করবেন。
৭. وَمَنْ تَرَكَ الرَّغْبَةَ ওফফিকা লীল মাহাব্বাতি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অপরের সম্পদের লোভ বর্জন করবে আল্লাহ তাকে জনপ্রিয়তা ও মানুষের ভালোবাসা দান করবেন。
৮. وَمَنْ تَرَكَ التَّجَسُّسَ ওফফিকা লীইছলাহী উয়ূবিহি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খোঁজার অভ্যাস পরিত্যাগ করবে আল্লাহ তাকে নিজের ত্রুটি সংশোধনের তাওফীক দান করবেন。
৯. وَمَنْ تَرَكَ التَّوَهُمَ فِي صِفَاتِ اللهِ تَعَالَى، ওফফিকা লীন নাজতি মীন আশশাক্কি ওয়ান নিফাক্বি অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলী নিয়ে সন্দেহ করা বর্জন করবে আল্লাহ তাকে সংশয় ও মুনাফিকী থেকে রক্ষা করবেন。
আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَكَانَ تَحْتَهُ كَنْزُ لَّهُمَا অর্থ : তার নিচে তাদের জন্য এক ধনভাণ্ডার রক্ষিত ছিল। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, তার নিচে মূলত একটি স্বর্ণ ফলক রক্ষিত ছিল, যাতে পাঁচটি লাইন লেখা ছিল। যথা-
১. عَجِبْتُ لِمَنْ أَيْقَنَ بِالْمَوْتِ كَيْفَ يَفْرَحُ অর্থাৎ, আশ্চর্য সে ব্যক্তির জন্য যে তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও আনন্দ উল্লাস করে।
২. عَجِبْتُ لِمَنْ أَيْقَنَ بِالنَّارِ كَيْفَ يَضْحَكُ অর্থাৎ, আশ্চর্য সে ব্যক্তির জন্য যে জাহান্নাম নিশ্চিত জানা সত্ত্বেও হাসি-তামাশা করতে পারে!
৩. وَعَجِبْتُ لِمَنْ أَيْقَنَ بِالْقَدَرِ كَيْفَ يَحْزَنُ অর্থাৎ, আশ্চর্য সে ব্যক্তির জন্য যে তকদীর বা ভাগ্য বিশ্বাস করে কোনো কারণে বিষণ্ণ হয়।
৪. وَعَجِبْتُ لِمَنْ أَيْقَنَ بِزَوَالِ الدُّنْيَا وَتَقَلُّبِهَا بِأَهْلِهَا كَيْفَ يَطْمَئِنُّ إِلَيْهَا অর্থাৎ, আশ্চর্য সে ব্যক্তির জন্য যে দুনিয়া ও দুনিয়ার উত্থান-পতন দেখে এবং সে দুনিয়ার ধ্বংস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও দুনিয়াদারী করে।
৫. পঞ্চম লাইনটিতে কালেমায়ে তাইয়িবা লেখা ছিল। لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ الله অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।
সাবেত বুনানী রহ. বলেন, মুমিন যখন হাসে, তখন আখেরাতের কথা ভুলে হাসে। তা ভুলে না গেলে সে হাসতে পারে না। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআজ রাজী রহ. বলেন, দুঃখের মাধ্যমে এমন আনন্দ তালাশ কর, যাতে কোনো দুঃখ নেই। অর্থাৎ, তুমি যদি জান্নাতে সুখ পেতে চাও, তাহলে দুনিয়াতে দুঃখ-দুর্দশা এবং কষ্ট সহ্য কর।
বলা হয়ে থাকে, তিনটি বিষয় অন্তরকে কঠিন করে দেয়। ১. অকারণে হাসা। ২. ক্ষুধা ছাড়াই খাওয়া। ৩. অপ্রয়োজনে কথা বলা।
عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدَّهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ قَالَ : وَيْلٌ لِمَنْ يَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ النَّاسَ، وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ.
বাহয ইবন হাকিম তার বাবা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তার ধ্বংস হোক! একথাটি রাসূল তিনবার বললেন।
হযরত ইবরাহীম নাখাঈ রহ. বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন মজলিসের কাউকে মিথ্যা বলে হাসায়, তখন আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হন এবং তার পার্শ্ববর্তী সকলের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। আর কোনো ব্যক্তি যখন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো কথা বলে তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর সন্তুষ্ট হন এবং তার ও তার আশেপাশের সবার উপর আল্লাহর রহমত নেমে আসে。
টিকাঃ
৪৪২. সূরা কাহফ : আয়াত-৮২
৪৪৩. শুআবুল ঈমান : হাদীস-২১৩; মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৭/৫৩; তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/১০০। আল্লামা হাইসামী বলেন, এই হাদীসের সনদে অপরিচিত রাবী রয়েছে।
৪৪৪. সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৯৯০; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৩১৫। হাদীসটি হাসান।