📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হযরত ঈসা আ.-এর বাণী

📄 হযরত ঈসা আ.-এর বাণী


ফকীহ সমরকান্দী রহ. বলেন, হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, হযরত ঈসা আ. একবার তার সঙ্গীদেরকে বলেছেন, হে দুনিয়ার লবণ! তুমি নষ্ট হয়ে যেও না। কারণ, কোনো কিছু নষ্ট হলে লবণ দিয়ে তা সংশোধন করা হয়। খোদ লবণই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে নষ্ট জিনিস কী দ্বারা সংশোধন করা হবে? হে আমার সঙ্গীগণ! ধর্ম শিক্ষা দিয়ে তাই নিবে, যা আমাকে দিয়েছ। আর মনে রাখবে তোমাদের মাঝে দু'টি অজ্ঞতার স্বভাব রয়েছে। ১. অকারণে হাসা। ২. রাত্রি জাগরণ না করে সকালে ঘুমানো।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, দুনিয়ার লবণ দ্বারা আলেমদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, আলেমরাই মানুষের সংশোধন করেন এবং তাদেরকে জান্নাতের পথ দেখান। এখন যদি তারাই পরকালের পথ ছেড়ে দেয়, তাহলে মানুষদেরকে আখেরাতের পথ দেখাবে কে? আর সাধারণ মূর্খ লোকেরা কার অনুসরণ করবে? তিনি যে বলেছেন, ধর্মশিক্ষা দিয়ে তাই নিবে, যা আমাকে দিয়েছ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আলেমগণ হলেন নবীগণের ওয়ারিশ। নবীগণ ধর্মশিক্ষা দিয়ে কোনো প্রতিদান গ্রহণ করেননি। তাই আলেমদের উচিত ধর্মশিক্ষা দিয়ে বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ না করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى
অর্থ: আপনি বলুন, আত্মীয়তার ভালোবাসা ছাড়া আমি তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাই না।

অন্য এক আয়াতে এসেছে- إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ অর্থ: আমার প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর নিকট।

সুতরাং আলেমদের উচিত নবীগণের আদর্শ অনুসরণ করা এবং ধর্মশিক্ষা দিয়ে কোনো বিনিময় গ্রহণ না করা। অকারণে হাসা বলতে, অট্টহাসিকে বুঝানো হয়েছে। বিনা কারণে অট্টহাসি দেওয়া মাকরূহ। আর এটি নির্বোধ লোকদের কাজ। রাত্রি জাগরণ না করে সকালে ঘুমানো ঠিক না। এটা এক ধরনের বোকামি। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন- النَّوْمُ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ حُمْقُ وَفِي أَوْسَطِهِ خُلُقُ، وَفِي آخِرِهِ خُرْقُ দিনের প্রথম ভাগে ঘুমানো বোকামি, মাঝে ঘুমানো উত্তম এবং শেষ ভাগে ঘুমানো অজ্ঞতা।

টিকাঃ
৪৩১. সূরা শুরা: আয়াত-২৩
৪৩২. সূরা সাবা: আয়াত-৪৭
৪৩৩. মুসতাদরাকে হাকেম ৪/২৯৩; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : হাদীস-৬৬৭৭। হাফেজ যাহাবী তালখীসে এই হাদীসটি সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ

📄 অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ


عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، قَالَ : خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ إِلَى الْمَسْجِدِ، فَإِذَا قَوْمٌ يَتَحَدَّثُونَ وَيَضْحَكُونَ، فَوَقَفَ وَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ: أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَادِمِ اللَّذَاتِ، قُلْنَا: وَمَا هَادِمُ اللَّذَاتِ? قَالَ: الْمَوْتُ. ثُمَّ خَرَجَ بَعْدَ ذَلِكَ مَرَّةً أُخْرَى فَإِذَا قَوْمٌ يَضْحَكُونَ فَقَالَ : أَمَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا. ثُمَّ خَرَجَ أَيْضًا. فَإِذَا قَوْمٌ يَتَحَدَّثُونَ وَيَضْحَكُونَ، فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ : إِنَّ الْإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَقِيلَ وَمَنِ الْغُرَبَاءُ يَوْমَ الْقِيَامَةِ? قَالَ : الَّذِينَ إِذَا فَسَدَ النَّاسُ صَلَحُوا.

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, একদা রাসূল ﷺ মসজিদে গেলেন। দেখলেন একদল লোক কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। তা দেখে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাদের সালাম দিলেন। অতঃপর ইরশাদ করলেন- তোমরা স্বাদ বিস্বাদকারীর কথা স্মরণ কর। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন। স্বাদ বিস্বাদকারী কী? রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, মৃত্যু।

এরপর তিনি বের হয়ে আসলেন। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলেন আরেক দল লোক হাসাহাসি করছে। তা দেখে তিনি বললেন, সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা কম হাসতে এবং বেশি বেশি কাঁদতে।

এরপর তিনি বের হয়ে আসলেন। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলেন আরো একদল লোক কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। তিনি মসজিদে প্রবেশ করে তাদেরকে সালাম দিলেন। তিনি বললেন, ইসলাম অপরিচিতের মত প্রকাশ পেয়েছে। অচিরেই তা যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে সে অবস্থায় ফিরে যাবে। সুতরাং কিয়ামতের দিন গুরাবা বা অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, অপরিচিতরা কারা? তিনি বললেন, সর্বত্র ফাসাদ দেখা দিলেও যারা সৎ থাকে।

টিকাঃ
৪৩৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৬২১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৪২৬,১৪৫।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হযরত খিজির আ.-এর উপদেশ

📄 হযরত খিজির আ.-এর উপদেশ


হযরত ইসহাক ইবনে মানসূর বলেন, মূসা আ. বিদায়কালে হযরত খিজির আ.-কে বললেন, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন-
১. يَا مُوسَى، إِيَّاكَ وَاللَّجَاجَةَ অর্থাৎ, হে মূসা! তুমি কার সাথে ঝগড়া কর না।
২. وَلَا تَكُنْ مَاشِيًّا بِغَيْرِ حَاجَةٍ অর্থাৎ, অপ্রয়োজনে কোথাও সফর কর না।
৩. وَلَا تَضْহَكْ مِنْ غَيْرِ عَجَبٍ অর্থাৎ, অকারণে হাসাহাসি কর না।
৪. وَلَا تَعْجَبْ عَلَى الْخَاطِئِ بِخَطِيئَتِهِ অর্থাৎ, গুনাহগারকে তার গুনাহের কথা বলে লজ্জা দিও না।
৫. وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ يَابْنَ عِمْرَانَ অর্থাৎ, ইবনে ইমরান! বরং নিজের গুনাহের জন্য কাঁদো।

عَنْ عَوْفِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَضْحَكُ إِلَّا تَبَسُّمًا، وَلَا يَلْتَفِتُ إِلَّا جَمِيعًا.

হযরত আউফ ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ খুব কম হাসতেন, যখন হাসতেন মুচকি হাসি হাসতেন।

টিকাঃ
৪৩৫. মুসনাদে আহমাদ: ৩৪/৪৬৬; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৩৬৪৫। হাদীসটি হাসান।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আমলদার আলেমদের কথাই মনে প্রভাব ফেলে

📄 আমলদার আলেমদের কথাই মনে প্রভাব ফেলে


এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুচকি হাসি জায়েয আর অট্টহাসি নিষেধ। সুতরাং, বুদ্ধিমানের উচিত অট্ট হাসি না দেওয়া। কারণ, দুনিয়াতে যে সামান্য অট্টহাসি দিবে, কিয়ামতের দিন তাকে অনেক কাঁদতে হবে। তাহলে যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সবসময় অট্টহাসি হাসে, কিয়ামতের দিন তার পরিণতি কী হবে ভাববার বিষয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- فَلْيَضْহَكُوا قَلِيلًا وَلْيَبْকُوا كَثِيرًا অর্থ: তোমরা কম হাস এবং বেশি বেশি কাঁদো।

রবি ইবনে হাইসাম বলেন, তারা দুনিয়াতে সামান্য হাসুক। কারণ, আখেরাতে তারা অনেক কাঁদবে। হাসান বসরী রহ. বলেন, তারা দুনিয়ায় সামান্য হাসুক। কারণ, তাদের কৃতকর্মের জন্য আখেরাতে অনেক কাঁদতে হবে। তিনি আরো বলেন- يَا عَجَبًا كُلَّ الْعَجَبِ مِنْ ضَاحِكٍ وَمِنْ وَرَائِهِ النَّارُ ، وَمِنْ مَسْرُورٍ وَمِنْ وَرَائِهِ الْمَوْتُ.
অর্থাৎ, কী আশ্চর্য! মানুষ হাসে অথচ জাহান্নাম তার পিছনে। মানুষ আনন্দ করে অথচ মৃত্যু তার পশ্চাতে।

বর্ণিত আছে, একদা হাসান বসরী রহ. কোনো এক সময় এক যুবকের নিকট দিয়ে গমন করছিলেন, আর যুবকটি হাসছিল।
তিনি বললেন- يَا بُنَيَّ هَلْ جُزْتَ عَلَى الصَّرَاطِ? অর্থাৎ, হে বৎস! তুমি কি পুলসিরাত পার হয়ে গেছ?
সে বলল, না।
তিনি বললেন, هَلْ تَبَيَّنَ لَكَ، إِلَى الْجَنَّةِ تَصِيرُ أَمْ إِلَى النَّارِ? অর্থাৎ, তুমি জান্নাতী না জাহান্নামী তা জানো কী?
সে বলল, না।
তিনি বললেন, فَفِيمَ هُذَا الضَّحِكُ অর্থাৎ, তাহলে কীভাবে তুমি হাসছ? এরপর থেকে সে যুবককে আর হাসতে দেখা যায়নি।

হাসান বসরী রহ.-এর কথা তার মনে গেঁথে যায়। ফলে সে হাসা থেকে তাওবা করে। সেকালের আলেমরা এমনই ছিলেন। তারা কোনো কথা বললে তা যথাযথ কার্যকর হতো। কারণ, তারা ইলম অনুযায়ী আমল করত। ফলে তাদের ইলম দ্বারা অন্যরাও উপকৃত হতো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px