📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হযরত উমর রাযি.-এর বিনয়ের ঘটনা

📄 হযরত উমর রাযি.-এর বিনয়ের ঘটনা


কায়েস ইবনে আবূ হাযেম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত উমর রাযি. সিরিয়ায় গমন করলে সেখানকার উলামা এবং নেতৃবৃন্দ তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসল। তখন কেউ তাকে বলল, আপনি এই ঘোড়াটিতে উঠে বসুন, যাতে লোকে আপনাকে দেখতে পায়। তিনি বললেন, তোমরা বিষয়টি দেখছ এই দিক থেকে। কিন্তু মূলত সিদ্ধান্ত হয় ওই দিক থেকে। এই বলে তিনি আকাশের দিকে ইশারা করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

আরেক বর্ণনা মতে তিনি সিরিয়ায় যাওয়ার সময় গোলামের সাথে পালা বণ্টন করে নিলেন। তিনি এক ফারছাখ দূরত্ব পরিমাণ চড়তেন, গোলাম লাগাম ধরে গাধাকে টেনে নিয়ে যেত। তারপর এক ফারছাখ পরিমাণ পথ গোলাম গাধার পিঠে চড়ত আর তিনি লাগাম হাতে হাঁটতেন। এইভাবে চলতে চলতে সিরিয়ায় প্রবেশকালে গোলামের পালা পড়ল। সে আরোহণ করল আর উমর রাযি. উটের লাগাম ধরলেন। পথে পানি পড়লে তিনি সে অবস্থাতেই বাম বগলের নিচে জুতা রেখে পানিতে নেমে গেলেন। সে সময় সেখানকার আমির ছিলেন হযরত আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ। তিনি খলীফা উমরকে এগিয়ে নিতে এসেছিলেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, খলীফা! সিরিয়ার শাসকরা আপনাকে এই অবস্থায় দেখলে কী ভাববে? তিনি বললেন, আল্লাহ ইসলাম দ্বারা আমাদের সম্মানিত করেছেন। ইসলামই আমাদের মর্যাদার উৎস। মানুষ কী বলল, এতে কিছু যায় আসে না।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হযরত সালমান ফারসী রাযি.-এর বিনয়

📄 হযরত সালমান ফারসী রাযি.-এর বিনয়


বর্ণিত আছে, হযরত সালমান ফারসী রাযি. মাদাইনের গভর্নর ছিলেন। সেখানকার কোনো এক সরদার বাজার থেকে সদাই ক্রয় করে, সালমান রাযি.- এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে মজদুর ভেবে বলল, এই মজদুর! আমার সদাইগুলো মাথায় তুলে নাও। হযরত সালমান বোঝা মাথায় উঠিয়ে নিলেন। পথে লোকজন তাকে চিনে ফেলে বোঝাটা নিতে চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। এই দিকে সে লোক তো লজ্জায় শেষ। সে ওযরখাহি করে বলল, আমীর! ক্ষমা করুন। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। তিনি বললেন, তুমি তো কোনো অপরাধ করনি। চল তোমার বাসা পর্যন্ত। এই বলে তিনি তার মাল তার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। আর ওই ব্যক্তি ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি.-এর বিনয়

📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি.-এর বিনয়


وَرُوِيَ عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ أَمِيرًا بِالْكُوفَةِ، فَخَرَجَ إِلَى حَانُوتِ الْعَلَّافِ فَاشْتَرَى مِنْهُ الْقَتَّ، فَرَبَطَهُ الْبَائِعُ ، وَأَخَذَ الْبَائِعُ جَانِبَ الْحِرْمَةِ، فَجَعَلَ يَمُدُّ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا يَدَهُ، حَتَّى صَارَ نِصْفُ الْقَتِّ فِي يَدِ هُذَا، وَنِصْفُهُ فِي يَدِ هُذَا، ثُمَّ جَعَلَهُ عَلَى عَاتِقِ عَمَّارٍ فَذَهَبَ بِهِ إِلَى مَنْزِلِهِ।

বর্ণিত আছে, কুফার আমীর থাকাকালে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির বাজারে গেলেন। বাজার থেকে পশুর খাদ্য ক্রয় করলেন এবং নিজ কাঁধে নিয়ে বাড়িতে আসলেন।

وَرُوِيَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ بَعَثَهُ عُمَرُ بْنِ الْخَطَّابِ أَمِيرًا عَلَى الْبَحْرَيْنِ، فَدَخَلَ الْبَحْرَيْنِ وَهُوَ رَاكِبُ عَلَى حِمَارٍ، وَجَعَلَ يَقُولُ : طَرَّقُوا لِلْأَمِيرِ، طَرَّقُوا لِلْأَمِيرِ، فَهَؤُلَاءِ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ خُلُقُهُمُ التَّوَاضُعَ، وَكَانُوا أَعِزَّاءَ عِنْدَ الْخَلْقِ، وَعِنْدَ الْمَلَائِكَةِ وَعِنْدَ اللَّهِ سُبْحَانَهُ وَতَعَالَى।

হযরত উমর রাযি. তার শাসনকালে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. কে বাহরাইনের আমীর বানিয়ে ছিলেন। তখন তিনি একা একটি গাধায় চড়ে বাহরাইন গমন করলেন এবং গাধার পিঠে চড়ে নিজেই চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমীর আসছে রাস্তা ছেড়ে দাও! আমীর আসছে রাস্তা ছেড়ে দাও!!

এরূপ ছিল রাসূল ﷺ-এর মহান সাহাবীগণের চরিত্র। বিনয় ছিল তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ফলে তারা মানুষ, ফেরেশতা এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানিত হয়েছেন।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয় ও আল্লাহর দাসত্ব অবলম্বন করেছেন

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয় ও আল্লাহর দাসত্ব অবলম্বন করেছেন


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ وَأَنَّهُ قَالَ : مَا نَقَصَ مَالٌ مِنْ صَدَقَةٍ، وَمَا عَفَا رَجُلٌ عَنْ مَظْلَمَةٍ إِلَّا زَادَهُ اللَّهُ تَعَالَى عِزَّا.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত- রাসূল ইরশাদ করেন, সদকা করলে সম্পদ কমে না। কারো উপর করা জুলুম ক্ষমা করলে তার মর্যাদাই বৃদ্ধি পায়।

একদা নবী কারীম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে ছিলেন। তার সামনে ছিল গোশতের পাত্র। তিনি হাঁটুর উপর বসে থালায় রাখা গোশত খাচ্ছিলেন ইত্যবসরে এক মহিলা এলো, যার চলাফেরা ছিলো খুবই উগ্র। সে বলল, انْظُرُوا إِلَيْهِ يَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ অর্থাৎ, দেখ গোলাম যেভাবে বসে, সেও সেভাবে বসেছে। গোলাম যেভাবে খায়, সেও সেভাবে খাচ্ছে। রাসূল ইরশাদ করলেন- أَنَا عَبْدُ أَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ، وَأَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ অর্থাৎ, আমি আসলেই একজন গোলাম এবং গোলামের মত বসে খাই। তারপর তাকে আহ্বান করে বললেন, তুমিও আমার সাথে খাও। সে বলল, তুমি হাত দিয়ে খাইয়ে না দিলে খাব না। রাসূল তাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন। তারপর সে বলল, আর খাব না। তবে তোমার মুখ থেকে দিলে খেতে পারি। আর রাসূল ﷺ-এর মুখে ছিল একটি শক্ত গোশতের টুকরা। তিনি তা চিবিয়ে নরম করে তাকে দিয়ে দিলেন। সে গোশতের টুকরা তার পেটে যেতেই সে বদলে গেল। তার স্বভাব চলে গেল। এরপর সে এতটা লজ্জাবতী হয়ে গেল যে, কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারত না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর থেকে তার মুখ থেকে আর কখনো অশালীন কথা শোনা যায়নি।

عَنِ الْحَسَنِ عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : أُوتِيتُ مَفَاتِيحَ الْأَرْضِ، فَخُيِّرْتُ بَيْنَ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا نَبِيًّا أَوْ نَبِيًّا مَلَكًا، فَأَوْمَا إِلَيَّ جِبْرِيلُ أَنْ تَوَاضَعُ وَكُنْ عَبْدًا، فَاخْتَرْتُ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا نَبِيًّا، فَأُوتِيتُ ذَلِكَ وَإِنِّي أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُ عَنْهُ الْأَرْضُ، وَأَنَّاي أَوَّلُ شَافِعِ.
হযরত হাসান রহ. বর্ণনা করেন- নবী কারীম ইরশাদ করেন, আমাকে পৃথিবীর যাবতীয় ধনভাণ্ডারের চাবি দেওয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল আপনি দাস নবী বা বাদশাহ নবী, দু'টির কোনো একটি বেছে নিতে পারেন। জিবরাঈল আ. আমাকে ইঙ্গিতে বললেন, বিনয় অবলম্বলন করুন এবং দাসত্ব বেছে নিন। আমি তাই করলাম। কিয়ামতের দিন আমি কবর থেকে সবার আগে উঠব এবং আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশ করব।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন- مَنْ تَوَاضَعَ تَخَشُعًا رَفَعَهُ اللهُ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ تَطَاوَلَ تَعَظَّمًا، وَضَعَهُ اللَّهُ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ. যে ব্যক্তি বিনয় অবলম্বন করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন। আর যে ব্যক্তি মর্যাদার বড়াই করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন।

عَنْ قَتَادَةَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى أَنَّهُ قَالَ : ذُكِرَ لَنَا أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ كَانَ يَقُولُ : مَنْ فَارَقَتْ رُوحُهُ جَسَدَهُ. وَفِي رِوَايَةٍ مَنْ فَارَقَ الدُّنْيَا وَهُوَ بَرِيءٌ مِنْ ثَلَاثٍ دَخَلَ الْجَنَّةَ : مِنَ الْكِبْرِ وَالْخِيَانَةِ وَالدَّيْنِ.
হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত- রাসূল বলতেন, অহংকার, খেয়ানত, এবং ঋণ এই তিন জিনিস থেকে মুক্ত অবস্থায় যার মৃত্যু হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

টিকাঃ
৪২০. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২০২৯; মুসনাদে আহমাদ: ১২/১৩৯। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
৪২১. আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ: হাদীস-৫৮৮। হাদীসটিকে শায়েখ আলবানী মুরসাল সহীহ বলেছেন।
৪২২. আল্লামা হাইসামী বলেছেন, বায্যার ও ত্ববারানী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের সকল রাবী বিশ্বস্ত [মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৯/১৯২] ।
৪২৩. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৫৭২; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-২৪১২; মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/৭৪। হাদীসটি সহীহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px