📄 অহংকারের পরিচয়
عَنْ يَحْيَى بْنِ جِعْلَةَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ. قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ : إِنِّي لَيُعْجِبُنِي نَقَاءُ ثَوْبِي، وَشِرَاكَ نَعْلِي، وَعِلَاقَهُ سَوْطِي أَفَهُذَا مِنَ الْكِبْرِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ : إِنَّ اللهَ تَعَالَى جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، وَيُحِبُّ إِذَا أَنْعَمَ عَلَى عَبْدِهِ نِعْمَةً أَنْ يَرَى أَثَرَهَا عَلَيْهِ، وَيُبْغِضُ الْبُؤْسَ وَالتَّبَاؤُسَ، وَلَكِنَّ الْكِبْرَ أَنْ يَسْفَهَ الْحَقَّ وَيَغْمِصَ الْخَلْقَ.
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে জিদাহ রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যার মনে এক দানা পরিমাণ অহংকার আছে সে জান্নাতে যেতে পারবে না। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতা এবং জুতার ফিতা ও কোড়া ঝুলিয়ে রাখা আমার ভালো লাগে এটা কি অহংকার হবে? রাসূল ইরশাদ করলেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। আর তিনি কাউকে নেয়ামত দান করলে তার গায়ে, চলনে সেটা প্রকাশ পাওয়াকেও তিনি পছন্দ করেন। তিনি দৈন্যদশা এবং দৈন্যতার ভান করা অপছন্দ করেন। অহংকার হলো, সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।
عَنِ الْحَسَنِ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ : مَنْ خَصَفَ نَعْلَهُ، وَرَقَّعَ ثَوْبَهُ، وَعَفَّرَ وَجْهَهُ لِلَّهِ فِي السُّجُودِ فَقَدْ بَرِئَ مِنَ الْكِبْرِ.
হযরত হাসান রহ. বর্ণনা করেন, রাসূল ইরশাদ করেন, যে নিজের জুতা নিজেই মেরামত করে, নিজের পোশাক নিজেই তালি লাগায় এবং আল্লাহর জন্য সেজদা করে চেহারায় দাগ ফেলে দেয় সে অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
রাসূল আরো ইরশাদ করেন- مَنْ لَبِسَ الصُّوفَ، وَانْتَعَلَ الْمَخْصُوفَ، وَرَكِبَ حِمَارَهُ، وَحَلَبَ شَاتَهُ، وَأَكَلَ مَعَ عِيَالِهِ، وَجَالَسَ الْمَسَاكِينَ، فَقَدْ مَحَا اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ الْكِبْرَ.
যে ব্যক্তি পশমের পোশাক পরিধান করে তালিযুক্ত জুতা ব্যবহার করে, গাধার পিঠে চড়ে চলাফেরা করে, বকরির দুধ দোহন করে, পরিবারের সাথে বসে খায় এবং মিসকীনদের সাথে উঠা-বসা করে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তর থেকে অহংকারের চিহ্ন মুছে দেন।
টিকাঃ
৪০৭. সহীহ মুসলিম: হাদীস-৯১; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৯৯৮; সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪০৯১; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৫৯।
৪০৮. মুসনাদে হুমাইদী: হাদীস-৬৭৩; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব হাদীস-৬০।
৪০৯. তবারানী ৭/১৫৩, শুআবুল ঈমান : হাদীস-৬১৬৪; আল্লামা হাইসামী রহ. সনদে বর্ণিত ইয়াযীদ নামক রাবিকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১/৯৯]।
📄 সর্বাধিক অপছন্দনীয় ব্যক্তি
বর্ণিত আছে, হযরত মূসা আ. আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে রব! কে আপনার নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয়? তিনি বললেন, যার অন্তর অহংকারী, মুখ কঠিন, বিশ্বাস দুর্বল এবং হাত কৃপণ।
📄 অহংকার ও বিনয়
হযরত উরওয়া ইবনে জুবাইর রহ. বলেন- التَّوَاضُعُ أَحَدُ مَصَائِدِ الشَّرَفِ . وَكُلُّ ذِي نِعْمَةٍ مَحْسُودٌ عَلَيْهَا إِلَّا التَّوَاضُعَ বিনয় হলো, শারাফাত বা কৌলিন্যের অন্যতম আলামত। বিনয় ব্যতীত প্রতিটা গুণ ঈর্ষণীয়।
জনৈক দরবেশ বলেন- ثَمَرَةُ الْقَنَاعَةِ الرَّاحَةُ، وَثَمَرَةُ التَّوَاضُعُ الْمَحَبَّةُ অল্পেতুষ্টির ফলাফল হলো, আত্মার প্রশান্তি আর বিনয়ের ফলাফল হলো, মানুষের ভালোবাসা লাভ।
মুহাল্লাব ইবনে আবূ সাফরা ছিলেন হাজ্জাজের সেনাবাহিনীর সেনাপতি। একদিন তিনি মাতরাফ ইবনে আব্দুল্লাহকে মূল্যবান পোশাক পরে দম্ভভরে চলতে দেখে বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার এই চলন আল্লাহ ও তার রাসূলের পছন্দনীয় নয়। সে বলল, তুমি কি আমাকে চিন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, চিনব না কেন? তোমার শুরু হলো, এক ফোঁটা নাপাক পানি এবং তোমার শেষ পরিণতি হলো দুর্গন্ধময় মৃত দেহ। আর সূচনা ও সমাপ্তির মাঝের সময়টুকু তুমি তোমার ভিতরে কিছু আবর্জনা বহন করে বেড়াচ্ছ। এই কথা শুনে মাতরাফ অহংকারী চলন পরিবর্তন করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে লাগল।
জনৈক আরেফ বলেন, মুমিনের গর্ব হলো তার রবকে নিয়ে আর তার মর্যাদা হলো দীনের কারণে। পক্ষান্তরে মুনাফিকের গর্ব হলো তার বংশ নিয়ে আর তার মর্যাদার উৎস তার সম্পদ।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: إِذَا رَأَيْتُمُ الْمُتَوَاضِعِينَ فَتَوَاضَعُوا لَهُمْ. وَإِذَا رَএয়ْتُمُ الْمُتَكَبَّرِينَ فَتَكَبَّرُوا عَلَيْهِمْ فَإِنَّ ذَلِكَ لَهُمْ صَغَارُ وَمَذَلَّةٌ وَلَكُمْ بِذَلِكَ صَدَقَةٌ.
হযরত ইবনে উমর রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল ইরশাদ করেছেন, বিনয়ীদের সাথে সাক্ষাত হলে তোমরাও তাদের সাথে বিনয়ী আচরণ কর। আর অহংকারীদের সাথে সাক্ষাত হলে তাদের সাথে অহংকার প্রদর্শন কর। তাতে তারা লাঞ্ছিত হবে এবং তোমরা সদকার সওয়াব পাবে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : مَا تَوَاضَعَ رَجُلٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللهُ تَعَالَى.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলে কারীম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তা'আলা তার মর্যাদা উঁচু করে দেন।
عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ رَأْسُ التَّوَاضُعِ أَنْ تَبْدَأَ بِالسَّلَامِ عَلَى مَنْ لَقِيتَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، وَأَنْ تَرْضَى بِالدُّونِ مِنَ الْمَجْلِسِ، وَأَنْ تَكْرَهَ أَنْ تُذَكَّرَ بِالْبِرِّ وَالتَّقْوَى.
হযরত উমর রাযি. বলেন, বিনয়ের শীর্ষ স্তর হলো, যার সাথেই দেখা হবে তাকেই প্রথমে সালাম করবে। সমাজে সাধারণ অবস্থান নিয়ে তুষ্ট থাকবে। আর তার নেক আমল ও তাকওয়ার আলোচনাকে সে অপছন্দ করবে।
টিকাঃ
৪১০. আল্লামা ইরাকী হাদীসটিকে গরীব বলেছেন আর ইবনুস সুবকী বলেছেন, আমি হাদীসটির সনদ পাইনি। [তাখরীজুল এহইয়া: ২/৩৪১]।
৪১১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২০২৯।
📄 বিনয় নবীদের এবং অহংকার কাফেরদের স্বভাব
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, অহংকার হলো, কাফের ও ফিরআউনদের স্বভাব আর বিনয় হলো নবী ও নেক বান্দাদের স্বভাব। কারণ, আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের স্বভাব বর্ণনা করে বলেছেন-
إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ অর্থ: যখন তাদের বলা হতো আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তখন তারা অহংকার করত।
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ. অর্থ: কারুন, ফিরআউন এবং হামান তাদের নিকট মূসা আ. স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে হাজির হলেন। তারা জমিনে অহংকার করেছিল।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন- إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ অর্থ: যারা অহংকার বশত আমার ইবাদত করে না, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
অন্য আয়াতে এসেছে- ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ অর্থ: তোমরা চিরদিনের জন্য জাহান্নামের দরজাগুলো দিয়ে প্রবেশ কর, অহংকারীদের আশ্রয়স্থল খুবই নিকৃষ্ট।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন- إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُসْتَكْبِرِينَ অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।
টিকাঃ
৪১২. সূরা সাফ্ফাত ৩৫
৪১৩. সূরা আনকাবুত: আয়াত-৩৯
৪১৪. সূরা মু'মিন: আয়াত-৬০
৪১৫. সূরা যুমার: আয়াত-৭২
৪১৬. সূরা নাহল: আয়াত-২৩