📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিংসার ক্ষতিসমূহ

📄 হিংসার ক্ষতিসমূহ


আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. বলেন, হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই, কৃপণের কোনো বিশ্বাস নেই, বিরক্তিকর মানুষের কোনো বন্ধু নেই, মিথ্যাবাদীর কোনো মানবিকতা নেই, বিশ্বাসঘাতকের কোনো মত নেই অর্থাৎ, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং চরিত্রহীনের কোনো নেতৃত্ব নেই। অর্থাৎ, তা গ্রহণীয় না।

জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, হিংসুক জালেম, তবে তার পরিণতি মজলুমের চেয়েও করুণ।

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, আমি কাউকে কখনো পার্থিব কোনো কারণে হিংসা করিনি। কারণ, যাকে হিংসা করব সে হয়তো জান্নাতী, নয়ত জাহান্নামী। যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি কীভাবে তাকে হিংসা করব, অথচ সে জান্নাতী! আর যদি সে জাহান্নামী হয় তাহলে একজন জাহান্নামীকে কীভাবে আমি হিংসা করব, সে তো জাহান্নামে যাচ্ছে!

হযরত হাসান বসরী রহ বলেন- যাপ্ না আদমা লিমা তাহাসুদু আখাকা, ফাইনাল্লাজি আত্হুলাহু লিকারামাতিহি আলাইহি ফালিমা তাহাসুদু মান আকরামাহুল্লাহু তা’আলা, ওয়া ইন ইয়াকুন গাইরা যালিকা ফালা ইয়ানবাগি লাকা আন তাহসুদা মান মাসিরুহু ইলান্নার (يَا ابْنَ آدَمَ لِمَ تَحْسُدُ أَخَاكَ، فَإِنَّ الَّذِي أَعْطَاهُ اللهُ لِكَرَامَتِهِ عَلَيْهِ فَلِمَ تَحْسُدُ مَنْ أَكْرَمَهُ اللهُ تَعَالَى، وَإِنْ يَكُنْ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَنْبَغِي لَكَ أَنْ تَحْسُدَ مَنْ مَصِيرُهُ إِلَى النَّارِ)।

হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাইকে হিংসা করছ কেন? কারণ, আল্লাহ যদি তাকে ভালো কিছু দান করে থাকেন, তাহলে এর অর্থ আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। তাহলে আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেছেন তুমি তাকে কীভাবে হিংসা করতে পার? আর যদি ভিন্ন রকম হয়ে থাকে, তাহলে কেন এমন ব্যক্তিকে হিংসা করছ যে নাকি জাহান্নামে যাবে?

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন- ثَلَاثَةٌ لَا تُسْتَجَابُ دَعْوَتُهُمْ آكِلُ الْحَرَامِ، وَمِكْتَارُ الْغِيبَةِ، وَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ غِلَّ أَوْ حَسَدٌ لِلْمُسْلِمِينَ। তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। ১. সুদখোর। ২. অতিরিক্ত গীবতকারী। ৩. হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারী।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিংসার বৈধ প্রকার

📄 হিংসার বৈধ প্রকার


عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ تَعَالَى الْقُرْآنَ وَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ تَعَالَى مَالًا وَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ.

হযরত সালিম তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, দুই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো জন্য হিংসা করা বৈধ নয়।
১. সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন শিক্ষার তাওফীক দান করেছেন এবং সে দিনরাত কুরআন নিয়ে থাকে।
২. সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে দিনরাত তা থেকে দান করে।

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, এখানে হিংসা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের মতো হতে চেষ্টা করতে পারা, রাতদিন কুরআন তিলাওয়াত করতে পারা, তাহাজ্জুদ পড়তে পারা এবং বেশি বেশি দান সদকা করতে পারা। এরূপ করা পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয়ও। কিন্তু যদি অন্যের থেকে এ নিয়ামতগুলো দূর হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, তাহলে তা হবে নিন্দনীয়। তবে অন্যের অনুরূপ নিয়ামত কামনা করা দোষের কিছু নয়।

এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ
অর্থ: তোমরা এমন কিছু কামনা কর না যাতে আল্লাহ কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন।

অন্য এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন- وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ কামনা কর। অর্থাৎ, তোমরা অন্যের ভালোটা নিজের জন্য চেয়ো না। বরং আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ কামনা কর। তিনি তার ভাণ্ডার থেকে তোমাদেরকে দান করবেন।

সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের জন্য উচিত হলো, অপর মুসলমানকে আল্লাহ তা'আলা যে নিয়ামত দান করেছেন, তার ধ্বংস না চাওয়া। তবে তার অনুরূপ নিয়ামত চাওয়া দোষের কিছু নয়। অতএব, প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হলো, নিজেকে হিংসা হতে বিরত রাখা। কারণ, হিংসাকারী আল্লাহর অসন্তুষ্ট। আর অন্যের কল্যাণকামী আল্লাহর হুকুমে সন্তুষ্ট।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, হিংসা দুই প্রকার। যথা- ১. বৈধ হিংসা। বৈধ হিংসা হলো, অপরের কোনো ভালো দেখে ভালো লাগা এবং আল্লাহর নিকট তার অনুরূপ নেয়ামত কামনা করা। ২. অবৈধ হিংসা। অবৈধ হিংসা হলো, অপরের ভালো কিছু দেখে এই কামনা করা যে, তার যা আছে সেটা যেন শেষ হয়ে যায় এবং আমার হয়ে যায়। অনুরূপ হিংসা হারাম।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الدِّينُ النَّصِيحَةُ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, দীন হলো মঙ্গলকামিতার নাম।

সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের উচিত অপর মুমিনের উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং তাদের কল্যাণ কামনা করা ও হিংসা না করা।

টিকাঃ
৩৯৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৭৫২৯; সহীহ মুসলিম হাদীস-৮১৫; সুনানে তিরমিযী হাদীস-১৯৩৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২০৯।
৩৯৮. সূরা নিসা: আয়াত-৩২
৩৯৯. সূরা নিসা: আয়াত-৩২
৪০০. সহীহ মুসলিম: হাদীস-৫৫; সুনানে আবু দাউদ: হাদীস-৪৯৪৪।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক

📄 এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ عَنْ حَقَّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ فَقَالَ : حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتَّةُ أَشْيَاءَ قِيلَ : مَا هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ? قَالَ : إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلَّمْ عَلَيْهِ، وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبُهُ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمَّتْهُ، وَإِذَا مَرِضَ عُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبَعْهُ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হলো, মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের কী কী হক রয়েছে? রাসূল ﷺ বললেন, এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, কী কী? রাসূল ﷺ বললেন- ১. সাক্ষাত হলে সালাম করা। ২. ডাকলে ডাকে সাড়া দেওয়া। ৩. পরামর্শ চাইলে ভালো পরামর্শ দেওয়া। ৪. হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে হাঁচির উত্তর দেওয়া। ৫. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া। ৬. মৃত্যুবরণ করলে জানাযায় শরীক হওয়া।

টিকাঃ
৪০১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২১৬২; সহীহ বুখারী: হাদীস-১২৪০; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৭৩৭।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত থাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত

📄 হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত থাকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত


عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : خَدَمْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَأَنَا ابْنُ ثَمَانِ سِنِينَ، فَكَانَ أَوَّلُ مَا عَلَّمَنِي قَالَ: يَا أَنَسُ ، أَحْكِمْ وُضُوءَكَ لِصَلَاتِكَ تُحِبُّكَ حَفَظَتُكَ، وَيَزِدْ فِي عُمْরِكَ يَا أَنَسُ اغْتَسِلْ مِنَ الْجَنَابَةِ وَبَالِغُ فِيهَا، فَإِنَّ تَحْتَ كُلَّ شَعْرَةٍ جَنَابَةً : قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ أُبَالِغُ فِيهَا? قَالَ: رَوِّ أُصُولَ شَعْرِكَ، وَأَنْقِ بَشْرَتَكَ، تَخْرُجْ مِنْ مُغْتَسَلِكَ وَقَدْ غُفِرَ ذَنْبُكَ. يَا أَنَسُ لَا يَفُوتَنَّكَ رَكْعَتَا الضُّحَى فَإِنَّهَا صَلَاةُ الْأَوَّابِينَ، وَأَكْثِرِ الصَّلَاةَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، فَإِنَّكَ مَا دُمْتَ فِي الصَّلَاةِ فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ يُصَلُّونَ عَلَيْكَ يَا أَنَسُ، وَإِذَا قُمْتَ لِلصَّلَاةِ فَانْصِبْ نَفْسَكَ للهِ تَعَالَى، وَإِذَا رَكَعْتَ فَاجْعَلْ رَاحَتَيْكَ عَلَى رُكْبَتَيْكَ، وَفَرِّجْ بَيْنَ أَصَابِعِكَ، وَارْفَعْ عَضُدَيْكَ عَنْ جَنْبَيْكَ، وَإِذَا رَفَعْتَ رَأْسَكَ فَقُمْ حَتَّى يَعُودَ كُلُّ عُضْرٍ إِلَى مَكَانِهِ، وَإِذَا سَجَدْتَ فَأَلْقِ وَجْهَكَ بِالْأَرْضِ وَلَا تَنْقُرْ نَقْرَ الْغُرَابِ، وَلَا تَبْسُطُ ذِرَاعَيْكَ بَسْطَ الثَّعْلَبِ، وَإِذَا رَفَعْتَ رَأْسَكَ مِنَ السُّجُودِ فَلَا تُقْعِ كَمَا يُقْعِي الْكَلْبُ، وَضَعْ إِلْيَتَكَ بَيْنَ قَدَمَيْكَ، وَالْزَقُ ظَاهِرَ قَدَمَيْكَ بِالْأَرْضِ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى لَا يَنْظُرُ إِلَى صَلَاةٍ لَا يَتِمُّ رُكُوعُهَا وَلَا سُجُودُهَا، وَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ عَلَى الْوُضُوءِ فِي يَوْمِكَ وَلَيْلَتِكَ فَافْعَلْ، فَإِنَّهُ إِنْ يَأْتِكَ الْمَوْتُ وَأَنْتَ عَلَى ذَلِكَ لَمْ تَفْتَكَ الشَّهَادَةُ يَا أَنَسُ، إِذَا دَخَلْتَ بَيْتَكَ فَسَلَّمْ يَعْنِي عَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ تَكْثُرُ بَرَكَتُكَ وَبَرَكَةُ بَيْتِكَ. وَإِذَا خَرَجْتَ لِحَاجَةٍ فَلَا يَفْعَنَّ بَصَرُكَ عَلَى أَحَدٍ مِنْ أَهْلِ قِبْلَتِكَ إِلَّا سَلَّمْتَ عَلَيْهِ تَدْখُلْ حَلَاوَةُ الْإِيمَانِ فِي قَلْبِكَ. وَإِنْ أَصَبْتَ ذَنْبًا فِي مَخْرَجِكَ رَجَعْتَ وَقَدْ غُفِرَ لَكَ. يَا أَنَسُ لَا تَبِيتَنَّ لَيْلَةٌ وَلَا تُصْبِحَنَّ يَوْمًا وَفِي قَلْبِكَ غِيٌّ لِأَحَدٍ مِنْ أَهْلِ الْإِسْلَامِ، فَإِنَّ هَذَا مِنْ سُنَّتِي، وَمَنْ أَخَذَ بِسُنَّتِي فَقَدْ أَحَبَّنِي، وَمَنْ أَحَبَّنِي فَهُৱ مَعِي فِي الْجَنَّةِ. يَا أَنَسُ، إِذَا عَمِلْتَ بِهَذَا وَحَفِظْتَ وَصِيَّتِي فَلَا يَكُونُ شَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنَ الْمَوْتِ فَإِنَّ فِيهِ رَاحَتَكَ.

হযরত আনাস রাযি. বলেন, আমি আট বছর বয়স থেকে রাসূল ﷺ-এর খেদমত করেছি। তিনি আমাকে সর্বপ্রথম যা শিক্ষা দিয়েছেন তা হলো, হে আনাস! নামাযের পূর্বে ভালোভাবে উযূ করবে। এতে হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ তোমাকে পছন্দ করবেন এবং তোমার হায়াত বাড়বে। হে আনাস! জানাবত (যে নাপাকীর কারণে গোসল ফরয হয়) থেকে গোসল করার সময় ভালোভাবে গোসল করবে। কেন না, চুলের গোড়ায়ও জানাবাত আছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ভালোভাবে গোসল করার মানে কী? তিনি বললেন, চুলের গোড়া ভালোভাবে ভিজিয়ে রাখ এবং শরীরের চামড়া ভালো করে পরিষ্কার কর। এভাবে গোসল করলে, তুমি গোসলখানা থেকে নিষ্পাপ হয়ে বের হয়ে আসবে।

হে আনাস! সতর্ক থাকবে, চাশতের দু'রাকাত নামায যেন কখনো ছুটে না যায়। কারণ, তা আওয়াবীন বা আল্লাহওয়ালাদের নামায। রাত-দিন বেশি বেশি নামাযরত থাকবে। কারণ, যতক্ষণ তুমি নামাযের মধ্যে থাকবে ফেরেশতারা তোমার জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন। যখন নামাযে থাকবে নিজেকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করাবে। যখন রুকূতে যাবে তখন দুই হাত হাঁটুতে রাখবে এবং আঙ্গুলগুলো ফাঁকা রাখবে ও দুই বাহু পার্শ্ব থেকে পৃথক রাখবে। যখন রুকু থেকে উঠবে তখন সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াবে। যখন সেজদায় যাবে তখন মুখ মাটিতে লাগিয়ে রাখবে, কাকের মতো ঠোকর মারবে না এবং শেয়ালের মত দুই হাত ছড়িয়ে রাখবে না। তারপর সেজদা থেকে উঠে কুকুরের মত বসবে না। দুই পায়ের মাঝে নিতম্ব রেখে বসবে এবং পায়ের পাতার উপরের অংশ মাটিতে বিছিয়ে রাখবে। কারণ, যে নামাযের রুকু সেজদা পূর্ণরূপে করা হয় না, আল্লাহ তা'আলা সে নামাযের দিকে তাকান না। সম্ভব হলে সর্বদা উযূতে থাকবে। কারণ, উযূ অবস্থায় মৃত্যু হলে কালেমায়ে শাহাদৎ ছুটবে না।

হে আনাস! যখন বাড়িতে প্রবেশ করবে, তখন বাড়ির মানুষদের সালাম করবে, তাহলে তোমার ও তোমার ঘরের বরকত বৃদ্ধি পাবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কোনো মুসলমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম করবে। কারণ, এতে তোমার অন্তরে ঈমানের স্বাদ অনুভব হবে এবং সে যাত্রায় কোনো গুনাহ করে থাকলে বাড়ি ফিরে আসার পূর্বে তোমার সে গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

হে আনাস! মনে কোনো মুসলমানের সাথে ধোঁকাবাজির পরিকল্পনা নিয়ে রাতে ঘুমাতে যাবে না বা সকালে ঘুম থেকে উঠবে না। কারণ, এটা আমার সুন্নত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের উপর আমল করে সে আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে সে আমার সাথে জান্নাতে যাবে। আনাস তুমি আমার এই উপদেশ মেনে চল এবং তার উপর আমল কর। তাহলে মৃত্যু তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হবে। কারণ, তাতেই তোমার শান্তি রয়েছে।

এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মন থেকে হিংসা বিদ্বেষ দূর করা নবী ﷺ এর সুন্নত। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের উচিত মন থেকে হিংসা বিদ্বেষ দূর করা। কারণ, এটা শ্রেষ্ঠ আমল।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ إِذْ قَالَ : يَطْلَعُ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ مُعَلَّقُ نَعْلَيْهِ بِشِمَالِهِ. فَطَلَعَ رَجُلٌ بِهَذِهِ الصَّفَةِ فَسَلَّمَ وَجَلَسَ مَعَ الْقَوْمِ. فَلَمَّا كَانَ مِنَ الْغَدِ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِثْلَ ذَلِكَ فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ عَلَى مِثْلِ هَيْئَتِهِ، فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الثَّالِثُ قَالَ مِثْلَ ذَلِكَ. فَلَمَّا قَامَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ سَارَ مَعَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ وَقَالَ : قَدْ وَقَعَ بَيْنِي وَبَيْنَ أَبِي كَلَامُ، وَأَقْسَمْتُ أَنْ لَا أَدْخُلَ عَلَيْهِ ثَلَاثَ لَيَالٍ، فَإِذَا رَأَيْتَ أَنْ تَأْوِينِي إِلَيْكَ لِأَجْلِ يَمِينِي فَعَلْتَ. قَالَ أَنَسُ : فَكَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يُحَدِّثُ أَنَّهُ بَاتَ عِنْدَهُ لَيْلَةً فَلَمْ يَقُمْ مِنْهَا سَاعَةً، إِلَّا إِنَّهُ إِذَا نَامَ عَلَى فِرَاشِهِ ذَكَرَ اللهَ تَعَالَى وَكَبَّرَهُ حَتَّى يَقُومَ مَعَ الْفَجْرِ. فَإِذَا تَوَضَّأَ أَسْبَغَ الْوُضُوءَ وَأَتَمَّ الصَّلَاةَ، ثُمَّ أَصْبَحَ وَهُৱ مُفْطِرٌ ، قَالَ : فَرَمَقْتُهُ ثَلَاثَ لَيَالٍ، لَا يَزِيدُ عَلَى ذَلِكَ، غَيْرَ أَنَِّي لَا أَسْمَعُهُ يَقُولُ إِلَّا خَيْرًا، فَلَمَّا مَضَتِ الثَّلَاثُ وَكِدْتُ أَنْ أُحَقِّرَ عَمَلَهُ قُلْتُ لَهُ إِنِّي لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَ أَبِي غَضَبٌ وَلَا هِجْرَةٌ، وَلَكِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ فِي ثَلَاثِ مَجَالِسَ : يَطْلَعُ عَلَيْكُمْ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَطَلَعْتَ أَنْتَ فَأَرَدْتُ أَنْ آوِيَ إِلَيْكَ حَتَّى أَنْظُرَ مَا تَعْمَلُهُ فَأَقْتَدِيَ بِكَ، فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَثِيرًا، فَمَا الَّذِي بَلَغَ بِكَ مَا قَالَ النَّبِيُّ ? قَالَ : مَا هُৱ إِلَّا مَا رَأَيْتَ فَانْصَرَفْتُ عَنْهُ، فَدَعَانِي حِينَ وَلَّيْتُ فَقَالَ : مَا هُৱ إِلَّا مَا رَأَيْتَ، غَيْرَ أَنَّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي شَرًّا لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، وَلَا أَحَسَدُهُ عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللهُ إِيَّاهُ، قَالَ : فَقُلْتُ هَذَا الَّذِي بَلَغَ بِكَ مَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَهُৱ الَّذِي لَا أُطِيقُ عَلَيْهِ

হযরত আনাস রাযি. বলেন, একদা আমরা রাসূল ﷺ-এর দরবারে বসা ছিলাম। তিনি বললেন, এখন এক জান্নাতী লোক তোমাদের কাছে আসবে। তার দাড়ি থেকে পানি ঝরবে এবং বাম হাতে জুতা থাকবে। তখন ঠিকই সেরূপ এক ব্যক্তি এসে হাজির হলো এবং উপস্থিতদের সালাম করে মজলিসে বসে গেল। পরের দিন নবীজী এমনই বললেন। আর ওই ব্যক্তি নবীজীর বলা আকৃতি নিয়ে উপস্থিত হলেন। তৃতীয় দিনও এমন হলো। তৃতীয় দিন রাসূল মজলিস থেকে উঠে গেলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাযি. উক্ত ব্যক্তির নিকট গেলেন এবং বললেন, আমার বাবার সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে এবং আমি কসম খেয়েছি তিন দিন তার সাথে সাক্ষাৎ করব না। তুমি কি আমাকে এই কয়দিন তোমার সাথে থাকতে দিবে?

আনাস রাযি. বলেন, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাযি. বলেন, আমি এক রাত তার সাথে কাটালাম। লক্ষ্য করলাম সে রাতে নামায পড়ার জন্য ওঠেনি। তবে ঘুমানোর সময় কিছুক্ষণ আল্লাহর যিকির করত। তারপর আল্লাহু আকবার বলে ঘুমিয়ে যেত। সকালে উঠে ভালো করে উযূ করত ও উত্তমরূপে নামায আদায় করত। দিনে সে রোযাও রাখত না। এইভাবে তিন দিন কেটে গেল। সে এর বেশি কোনো আমল করে না। তবে আমি তাকে কখনো খারাপ কোনো কথা বলতে শুনিনি। তার আমলটা আমার নিকট সামান্য মনে হতে লাগল। আমি তাকে বললাম, আমার সাথে আমার বাবার কোনো ঝগড়া হয়নি। বরং পরপর তিন দিন রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, আজ তোমাদের নিকট এক জান্নাতী ব্যক্তি আসবে আর তুমি এসেছ। তাই আমি তোমার নিকট তিন দিন থেকে কী আমল কর তা দেখতে চেয়েছিলাম এবং তোমাকে অনুসরণ করে সে আমল করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে তেমন কোনো আমলই করতে দেখলাম না। তাহলে এই মরতবা তুমি কিভাবে হাসিল করলে, যার কথা রাসূল বলেছেন? সে বলল, আমার আমল তাই যা তুমি দেখেছ। এরপর আমি তার থেকে চলে আসতে লাগলাম। তখন সে আমাকে ডেকে বলল, তুমি যা দেখেছ আমার আমল তাই। তবে কোনো মুসলমান সম্পর্কে আমার মনে খারাপ ধারণা নেই এবং কারো প্রতি হিংসাও করি না। তখন আমি বললাম, তোমার এই গুণগুলোই তোমাকে রাসূলের বলা মর্যাদা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। আর এটাও করতে আমি সক্ষম নই।

টিকাঃ
৪০২. আল্লামা হাইসামী বলেন, হাদীসটি আবু ইয়া'লা ও ত্ববারানী বর্ণনা করেছেন। উক্ত সনদে একজন জয়ীফ রাবী রয়েছেন [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১/২৭২]।
৪০৩. মুসনাদে আহমাদ: ২০/১২৪; মুসনাদে হুমাইদী হাদীস-১১৬০। শায়েখ শুয়াইব আরনাউত সনদটিকে সহীহ বলেছেন। হাদীসটি বুখারী মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px