📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিসাব নিকাশের পূর্বেই জাহান্নামে গমন

📄 হিসাব নিকাশের পূর্বেই জাহান্নামে গমন


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: سِتَّةٌ بِسِتَّةِ يَدْخُلُونَ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَبْلَ الْحِسَابِ يَعْنِي سِتَّةُ أَصْنَافٍ، بِسَبَبٍ سِتَّةِ أَشْيَاءَ يَدْخُلُونَ النَّارَ قَبْلَ الْحِسَابِ، قِيلَ : يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ هُمْ? قَالَ : لَأُمَرَاءُ مِنْ بَعْدِي بِالْجَوْرِ، وَالْعَرَبُ بِالْعَصَبِيَّةِ، وَالدَّهَّاقِينَ بِالْكِبْرِ، وَالتَّجَّارُ بِالْخِيَانَةِ، وَأَهْلُ الرُّسْتَاقِ بِالْجَهَالَةِ، وَأَهْلُ الْعِلْمِ بِالْحَسَدِ، يَعْنِي الْعُلَمَاءَ الَّذِينَ يَطْلُبُونَ الدُّنْيَا، يَحْسُدُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, ছয় শ্রেণীর মানুষ ছয় কারণে কিয়ামতের হিসাব নিকাশের পূর্বেই জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? তিনি বললেন-
১. আমার পরে আগত শাসকরা, তারা জাহান্নামে যাবে জুলুমের কারণে।
২. আরবরা সাম্প্রদায়িকতার কারণে।
৩. নেতারা, অহংকারের কারণে।
৪. ব্যবসায়ীরা খেয়ানতের কারণে।
৫. মূর্খরা অজ্ঞতার কারণে।
৬. আলেমরা হিংসার কারণে।
অর্থাৎ, দুনিয়াদার আলেমরা যারা দুনিয়ার কারণে পরস্পর হিংসা করে থাকে। সুতরাং আলেমের উচিত আখেরাতের উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করা। আলেম যখন ইলম অর্জন করে আল্লাহর সন্তুটি ও তার দীনের সেবা করার জন্য, তখন তার মনে কোনো হিংসা থাকে না। ফলে সে জাহান্নামী আলেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যে আলেম দুনিয়ার জন্য ইলম অর্জন করে তার মনে হিংসা আসে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইহুদী আলেমদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন,
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
অর্থ: নাকি আল্লাহ অন্যদেরকে (অর্থাৎ, মুহাম্মদ ﷺ) যে শ্রেষ্ঠত্ব (অর্থাৎ, নবুওয়াত) দান করেছেন তার জন্য তারা তাদেরকে হিংসা করছে?

টিকাঃ
৩৯৩. আল-ফিরদাউস লি-দাইলামী : হাদীস-৩৪১১।
৩৯৪. সূরা নিসা: আয়াত-৫৪

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আসমান ও জমিনের প্রথম গুনাহ

📄 আসমান ও জমিনের প্রথম গুনাহ


জনৈক দরবেশ বলেন, হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, হিংসা হলো আসমান ও জমিনের প্রথম গুনাহ। আসমানে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শয়তানের ঘটনা। ইবলীস শয়তান সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী করে আসমানে যখন সে হিংসা করে বলেছিল
خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ
অর্থ: আমাকে আপনি তৈরি করেছেন আগুন দিয়ে আর তাকে তৈরি করেছেন মাটি দিয়ে।

আর জমিনের সর্বপ্রথম নাফরমানি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাবিল ও কাবিলের ঘটনা। আদমের পুত্র কাবিল, সে হিংসার বশে তার ভাই হাবিলকে খুন করে। আর এটাই ছিল দুনিয়াতে সংঘটিত প্রথম অপরাধ ও নাফরমানী। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ.
অর্থ: আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।

টিকাঃ
৩৯৫. সূরা আল আরাফ: আয়াত-১২
৩৯৬. সূরা মায়েদা: আয়াত-২৭

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিংসার ক্ষতিসমূহ

📄 হিংসার ক্ষতিসমূহ


আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. বলেন, হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই, কৃপণের কোনো বিশ্বাস নেই, বিরক্তিকর মানুষের কোনো বন্ধু নেই, মিথ্যাবাদীর কোনো মানবিকতা নেই, বিশ্বাসঘাতকের কোনো মত নেই অর্থাৎ, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং চরিত্রহীনের কোনো নেতৃত্ব নেই। অর্থাৎ, তা গ্রহণীয় না।

জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, হিংসুক জালেম, তবে তার পরিণতি মজলুমের চেয়েও করুণ।

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, আমি কাউকে কখনো পার্থিব কোনো কারণে হিংসা করিনি। কারণ, যাকে হিংসা করব সে হয়তো জান্নাতী, নয়ত জাহান্নামী। যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি কীভাবে তাকে হিংসা করব, অথচ সে জান্নাতী! আর যদি সে জাহান্নামী হয় তাহলে একজন জাহান্নামীকে কীভাবে আমি হিংসা করব, সে তো জাহান্নামে যাচ্ছে!

হযরত হাসান বসরী রহ বলেন- যাপ্ না আদমা লিমা তাহাসুদু আখাকা, ফাইনাল্লাজি আত্হুলাহু লিকারামাতিহি আলাইহি ফালিমা তাহাসুদু মান আকরামাহুল্লাহু তা’আলা, ওয়া ইন ইয়াকুন গাইরা যালিকা ফালা ইয়ানবাগি লাকা আন তাহসুদা মান মাসিরুহু ইলান্নার (يَا ابْنَ آدَمَ لِمَ تَحْسُدُ أَخَاكَ، فَإِنَّ الَّذِي أَعْطَاهُ اللهُ لِكَرَامَتِهِ عَلَيْهِ فَلِمَ تَحْسُدُ مَنْ أَكْرَمَهُ اللهُ تَعَالَى، وَإِنْ يَكُنْ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَنْبَغِي لَكَ أَنْ تَحْسُدَ مَنْ مَصِيرُهُ إِلَى النَّارِ)।

হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাইকে হিংসা করছ কেন? কারণ, আল্লাহ যদি তাকে ভালো কিছু দান করে থাকেন, তাহলে এর অর্থ আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। তাহলে আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেছেন তুমি তাকে কীভাবে হিংসা করতে পার? আর যদি ভিন্ন রকম হয়ে থাকে, তাহলে কেন এমন ব্যক্তিকে হিংসা করছ যে নাকি জাহান্নামে যাবে?

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন- ثَلَاثَةٌ لَا تُسْتَجَابُ دَعْوَتُهُمْ آكِلُ الْحَرَامِ، وَمِكْتَارُ الْغِيبَةِ، وَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ غِلَّ أَوْ حَسَدٌ لِلْمُسْلِمِينَ। তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। ১. সুদখোর। ২. অতিরিক্ত গীবতকারী। ৩. হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারী।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 হিংসার বৈধ প্রকার

📄 হিংসার বৈধ প্রকার


عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ تَعَالَى الْقُرْآنَ وَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ تَعَالَى مَالًا وَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ.

হযরত সালিম তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, দুই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো জন্য হিংসা করা বৈধ নয়।
১. সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন শিক্ষার তাওফীক দান করেছেন এবং সে দিনরাত কুরআন নিয়ে থাকে।
২. সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে দিনরাত তা থেকে দান করে।

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, এখানে হিংসা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের মতো হতে চেষ্টা করতে পারা, রাতদিন কুরআন তিলাওয়াত করতে পারা, তাহাজ্জুদ পড়তে পারা এবং বেশি বেশি দান সদকা করতে পারা। এরূপ করা পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয়ও। কিন্তু যদি অন্যের থেকে এ নিয়ামতগুলো দূর হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, তাহলে তা হবে নিন্দনীয়। তবে অন্যের অনুরূপ নিয়ামত কামনা করা দোষের কিছু নয়।

এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ
অর্থ: তোমরা এমন কিছু কামনা কর না যাতে আল্লাহ কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন।

অন্য এক আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন- وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ কামনা কর। অর্থাৎ, তোমরা অন্যের ভালোটা নিজের জন্য চেয়ো না। বরং আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ কামনা কর। তিনি তার ভাণ্ডার থেকে তোমাদেরকে দান করবেন।

সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের জন্য উচিত হলো, অপর মুসলমানকে আল্লাহ তা'আলা যে নিয়ামত দান করেছেন, তার ধ্বংস না চাওয়া। তবে তার অনুরূপ নিয়ামত চাওয়া দোষের কিছু নয়। অতএব, প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হলো, নিজেকে হিংসা হতে বিরত রাখা। কারণ, হিংসাকারী আল্লাহর অসন্তুষ্ট। আর অন্যের কল্যাণকামী আল্লাহর হুকুমে সন্তুষ্ট।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, হিংসা দুই প্রকার। যথা- ১. বৈধ হিংসা। বৈধ হিংসা হলো, অপরের কোনো ভালো দেখে ভালো লাগা এবং আল্লাহর নিকট তার অনুরূপ নেয়ামত কামনা করা। ২. অবৈধ হিংসা। অবৈধ হিংসা হলো, অপরের ভালো কিছু দেখে এই কামনা করা যে, তার যা আছে সেটা যেন শেষ হয়ে যায় এবং আমার হয়ে যায়। অনুরূপ হিংসা হারাম।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الدِّينُ النَّصِيحَةُ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, দীন হলো মঙ্গলকামিতার নাম।

সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের উচিত অপর মুমিনের উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং তাদের কল্যাণ কামনা করা ও হিংসা না করা।

টিকাঃ
৩৯৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৭৫২৯; সহীহ মুসলিম হাদীস-৮১৫; সুনানে তিরমিযী হাদীস-১৯৩৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২০৯।
৩৯৮. সূরা নিসা: আয়াত-৩২
৩৯৯. সূরা নিসা: আয়াত-৩২
৪০০. সহীহ মুসলিম: হাদীস-৫৫; সুনানে আবু দাউদ: হাদীস-৪৯৪৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px